পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

‘তুমি মাটির পৃথিবীতে হারিয়ে যাচ্ছ’

  • 01 September, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 110 view(s)
  • লিখেছেন : চম্পা খাতুন
আধুনিক সময়ে শিল্প তৈরী হয়। সৃষ্টি হয় কতটুকু? প্রকৃত শিল্পসৃষ্টি কোনকিছুর মাপে হয় না। তার এক মাত্র বৈশিষ্ট্য আনন্দ, নিজেকে প্রকাশ করা। কারো মাপে নয়, কারো হিসেবে নয়, কারো বায়নায় নয়, কারো ইচ্ছায় নয়।

মানুষ শেষ যে পশুটিকে বশ করেছিল, তা আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে। প্রাচীন মানুষের দল বন জঙ্গল থেকে তুলে এনে জন্তুদের নিজের বন্ধু বানিয়েছে, গৃহপালিত হিসাবে সম্পর্ক স্থাপন করেছে। গত চার হাজার বছরে একটিও জন্তুজানোয়ারকে মানুষ নিজের বশে আনতে পারেনি। পশু ভালোবাসা বোঝে, অকৃত্রিম ভালোবাসা বোঝে। যে ভালোবাসার তাগিদে বন্য পশু মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করেছিল, তা আজ আর নতুন করে হবার নয়। মানুষ ক্রমাগত আধুনিক হয়েছে, ততই সংস্পর্শ কমেছে প্রকৃতি, পশু-পাখি, আকাশ-বাতাস থেকে। যতই ঘর বেঁধেছে ততই অনুভবের জন্য আকাশ ছোট হয়েছে। হয়ত যন্ত্র বানিয়ে মুহূর্তে উড়ে গেছে, কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগ কমেছে, আর কমেছে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম অনুভূতি।

লোকশিল্পের ক্ষেত্রেও একই সত্য। বাঙালির কথাই ধরা যাক। নতুন ধারায় লোকগান সৃষ্টি হয়েছে বহু আগে। ‘লোক’ই নেই তো লোকগান থাকবে কী করে? কোথায় আছে কলুর বলদ আর কুমোর-কামার? লোকসংস্কৃতি গড়ে ওঠে বহু মানুষের একত্র গোষ্ঠীবদ্ধ অবদানে। বাংলার লোকগানের তালিকা কত বড়, তার কতটুকু খবর আমাদের জানা আছে? আলকাপ, গম্ভীরা, মারফতি, দরবেশি, গাজন, ঘুমপাড়ানি, ঝালসি, জলভরার গান, ছাদ পেটানো গান, নলকূপের গান, গোনাই বিবি, বনবিবি, দক্ষিণ রায়ের গান, জারি, সারি, মর্শিয়া, ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়া, চটকা, মাহুতবন্ধুর গান; রাঢ় বাংলার ভাদু, টুসু, ঝুমুর, লেটো ইত্যাদি লোকগান। একই সঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন অঞ্চলের বাউল, রয়েছে লালন, দুরবিন শা, পাঞ্জু শা, হাসন রাজা, আবদুল করিম, শরৎশশী, জাদুবিন্দু, হাউর গোসাই, দীন তাঁতী ইত্যাদি মহামানবের গান। বাংলার লোকগানের যে দীর্ঘ তালিকা, নতুন ভাবে তাতে আর একটিও যোগ হয় না। কারণ ‘লোক’ তার বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে। যে ‘লোক’ থেকে লোকসংস্কৃতি আসত, সে ‘লোক’ এখন পেটের তাগিদে পূর্বপুরুষের নিজস্ব পেশা ছেড়ে শহুরে শ্রমিক হয়ে যাচ্ছে। বাবুদের খুশি করার তাগিদে, দু-পয়সা রোজগারের আশায় লোকগান আজ মঞ্চে পৌঁছেছে।

লোকগানের নিজস্ব পরিবেশ প্রকৃতি আছে। যে বাউল গানের নিজস্ব জীবনদর্শন আছে, সহজ ধারায় জীবনযাপনের ইচ্ছা, তা যদি কিছু সংখ্যক মানুষকে তুষ্ট করার জন্য লেজার লাইট আর সিন্থেসাইজার সহযোগে শোনাতে হয়, তবে তার ভবিষ্যৎ খুব বেশিদিন স্থায়ী নয়। আধুনিক মানুষ মানুষের খোঁজখবর রাখে কতটুকু? সত্যিকারের দেশকে চিনতে হলে প্রত্যন্ত মানুষের সঙ্গে দিন কাটাতে হবে। সেজন্য সকল ধর্মই বলে পর্যটনের কথা। এক জায়গায় বসে ধর্মপালন হয় না। দরবেশের কাজই হল ঘোরা। ঘুরে বেড়ান বলেই সত্যকে জানতে পারেন। মহাপ্রভু যেখানে যেখানে রাত্রিবাস করেছেন, সেখানকার মানুষ এতদিন পরেও তাঁকে নিয়ে উৎসব করেন। আসল কথা হল বাঁচতে হলে মানুষের কাছে যেতে হবে। যে কীর্তন বাঙালি তার ড্রয়িংরুমে বসে চা সিঙাড়া সহযোগে শুনতে চায়, আর সেই কীর্তন যখন মফস্বলে বা গ্রামীণ পরিবেশে হাজার হাজার শ্রোতা দর্শকের মাঝে গাওয়া হয়, দুটোর আবেদন কি এক? গ্রহণ করার অনুভূতি কি এক? কী ঘটছে শ্রোতার মনের মধ্যে? এত দিনের গড়ে তোলা মনটা নিয়েই কি আগাগোড়া শুনছেন, না তাঁর পরিবেশের প্রভাবে ক্রমশ পাল্টাতে থাকছেন আর সেই ক্রমপরিবর্তনশীল মনটা নিয়ে শুনছেন? না হলে উত্তরণ ঘটবে কোন পথে? আধুনিক সময়ে শিল্প তৈরী হয়। সৃষ্টি হয় কতটুকু? প্রকৃত শিল্পসৃষ্টি কোনও কিছুর মাপে হয় না, তার একমাত্র বৈশিষ্ট্য আনন্দ, নিজেকে প্রকাশ করা, কারোর মাপে নয়, কারোর হিসেবে নয়, কারোর বায়নায় নয়, কারোর ইচ্ছায় নয়। শিল্প তৈরী তো অনেকে করে, শিল্প সৃষ্টি করে কজন? পরিবেশ প্রকৃতি থেকে যত দূরে সরবে, মানুষ থেকে যত দূরে সরবে, সৃষ্টি ততই কমবে। বইপত্র থেকে অনেক কিছু জানা যায় তবে অন্যরকম গভীরতা আসে মানুষের সংস্পর্শ থেকে। জল, মাটি, আকাশ প্রকৃতি মানুষ এখানে সবই সমান। মানুষের সময় কম। তাই কেবল ফুর্তি চায়, এবং দ্রুততা চায়। এ জীবন হাল্কা করে বেঁচে গেলেই হল। ভালো নাটক, ভালো গান, ভালো সিনেমার পেছনে দৌড়ে চটজলদি বাঁচার আনন্দ কমাতে রাজি নয়। ভোগের অবসাদ আফশোস ডেকে আনে। ভোগের অবসাদ সৃষ্টিশীলতা বোঝে না। জীবনের কোন অর্জনটা বড়? টাকা-পয়সা, সম্মান, নাম, যশ, প্রতিপত্তি, প্রতিষ্ঠা, সংসার, সন্তান-সন্ততি, সাংস্কৃতিক চেতনা, রাজনৈতিক উত্থান, সামাজিক কর্তৃত্ব? কোন অর্জন সবচেয়ে বড়? প্রকৃত মানুষ অবশ্যই বলবেন সন্তুষ্টি। মনের সন্তোষ। সব আছে সন্তুষ্টি না থাকলে কিছুই নেই। সন্তুষ্টি অন্যের মাপে জীবন কাটিয়ে, উদ্দাম জীবন উদ্‌যাপনে অর্জন করা যায় না। তা পেতে হলে চাই সৃষ্টি ও সৃষ্টির আনন্দ। যা প্রকৃতি ও মানুষ থেকে দূরে সরে সম্ভব নয়। মানুষ অনেক কিছুই অর্জন করেছে, নির্মাণ করেছে, কিন্তু ক্রমশ হারাচ্ছে অমূল্য সম্পদ ‘সন্তুষ্টি’।


 
0 Comments

Post Comment