পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

এক অনুশীলনপর্ব ও রবীন্দ্রদর্শন

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 201 view(s)
  • লিখেছেন : অশোক চট্টোপাধ্যায়
রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’র নিখিলের কথাগুলো তো সারা বাংলাময় ধ্বনি থেকে প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে : দেশকে দেবতা বলিয়ে যখন তোমরা অন্যায়কে কর্তব্য, অধর্মকে পুণ্য বলে চালাতে চাও তখন আমার হৃদয়ে লাগে বলেই আমি স্থির থাকতে পারি নে। একদিকে দেশপ্রেমকেই ‘দেবতা’ বলে প্রচার করা আর অন্যদিকে অন্যায় এবং অধর্মকে প্রয়োজনীয় অনুশীলন হিসেবে কার্যকরী করা একসঙ্গে কী করে চলতে পারে?

রবীন্দ্রনাথ কখনও  দলীয় রাজনীতি পছন্দ করতেন না। তবে তিনি অনেকবারই রাজনীতি বিষয়ে কথা বলেছেন। দলীয় রাজনীতি পছন্দ না করলেও তিনি তাঁর চিন্তাচেতনা-অনুশীলন কিম্বা সামাজিক ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে একটি পক্ষ নিয়েছিলেন তাঁর ইচ্ছা নিরপেক্ষভাবেই। ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের একটা সীমিত পর্যায়ে তাঁর ভূমিকা অবশ্যই একটা পক্ষ নিয়েছিল। গান্ধিজির সঙ্গে বিতর্কেও তিনি একটি পক্ষ নিয়ে ফেলেছিলেন। জালিয়ানওআলাবাগ গণহত্যার প্রতিবাদেও তিনি অতি সতর্কভাবেই একটা অবস্থান নিয়ে ফেলেছিলেন। জেলে জেলে রাজবন্দিহত্যা এবং বন্দিমুক্তির প্রশ্নেও তিনি একটা পক্ষ নিয়েছিলেন। এমনকি তাঁর প্রাথমিক অবস্থানের ঘোর কাটিয়ে তিনি তো ফ্যাসিবাদবিরোধিতার ক্ষেত্রেও একটা অবস্থান নিয়েছিলেন জীবনের শেষ পর্যায়ে। আবার এদেশে ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদের প্রশ্নেও তিনি একটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছিলেন।

কিন্তু এখন  সেই  রবীন্দ্রনাথই রাজনৈতিক চর্চার কেন্দ্রভূমিতে চলে এসেছেন। আমাদের দেশে এমন রাজনৈতিক দল বোধহয় নেই যারা তাঁদের দলীয় স্বার্থে রবীন্দ্রনাথকে ব্যবহার করেন না। প্রায় সবাই তো তাঁকে ‘গুরু’ অভিধায় পুজো করে থাকেন। এই পর্যায়ে তিনি আর আমাদের প্রিয় পরিচিত রক্তমাংসের মানুষ থাকেন না। তাঁর সঙ্গে বিবাদ করা যায় না, তাঁর সঙ্গে তর্ক করা যায় না, তিনি হয়ে ওঠেন দেওয়ালের ফ্রেমে বাঁধানো ঈশ্বর, যিনি অপ্রশ্নেয়, পূজ্য, বন্দনীয়। তিনি অবলীলায় দেবতার স্থলাভিষিক্ত হয়ে যান!

ভারতীয় জনতা পার্টি তথা বিজেপি দেশের শাসন ক্ষমতায় আসার পরে সঙ্ঘীদের শিক্ষা সেল-এর নেতা দীননাথ বাত্রা তো ‘এনসিইআরটি-র পাঠ্যক্রম থেকে রবীন্দ্রনাথের লেখা বাদ দেওয়ার সুপারিশও’ করেছিলেন নির্দ্বিধায়। কিন্তু নির্বাচনে বাংলা দখলের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ায় বিজেপিকেও রবীন্দ্রপুজো করতে হয়েছে রীতিমতো। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত-হয়ে-যাওয়া পশ্চিমবাংলার বিধানসভা নির্বাচনে বাংলাদখলে বদ্ধপরিকর বিজেপির অবাঙালি নেতারা  ঘনঘন বাংলায় আসা শুরু করেছিলেন এবং তাঁরা যে কত রবীন্দ্রভক্ত এবং বাংলা সংস্কৃতির কত অনুরাগী তা প্রচার করতে গিয়ে পদে পদে হোঁচট খেয়েছিলেন। সাম্প্রতিক অতীতে বিজেপির জাতীয় সভাপতি জগত প্রকাশ নাড্ডা জানিয়েছেন যে কবি রবীন্দ্রনাথের জন্ম বিশ্বভারতীতে! এই নেতার জন্ম হিমাচলপ্রদেশে হলেও তাঁর বাল্যকাল অতিবাহিত হয়েছে বাংলা সংলগ্ন পাটনায়। তিনি তাঁর বাংলা, বাঙালি এবং বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি উচ্ছ্বসিত প্রেমের নিদর্শন রাখতে অবলীলায় এই বালখিল্যতা করে বসেছিলেন। অথচ আমরা জানি যে রবীন্দ্রনাথের জন্মের দীর্ঘ ছয় দশক পরে বিশ্বভারতীর জন্ম। শ্রীনাড্ডা বলেছিলেন : ‘এই সেই বাংলাদেশ…যেখানে বিশ্বভারতী অবস্থিত, আর এখানেই টেগোর জন্মেছিলেন’! (১)  

সময় থাকতে আমরা অনেক কিছুর মর্ম বুঝি না। পরে যখন অনেক মূল্য দিয়ে বুঝি তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। আমার মা অনেক ছড়া জানতেন। বিভিন্ন ঘটনায় অবলীলায় প্রাসঙ্গিক ছড়া বলতেন, গ্রাম্যকথার ডালি ঢেলে দিতেন। তখন কি আর ভেবেছিলাম এসব উত্তরকালে আমার/আমাদের কাজে লাগতে পারে! মায়ের অবর্তমানে সেইসব কথা এখন খুব মনে হয়। মায়ের মুখে একবার শুনেছিলাম :  

অভদ্রা বর্ষাকাল

হরিণ চাটে বাঘের গাল

শোনরে হরিণ তোরে কই

কালগুণে আমি সবই সই।

আজ রবীন্দ্রনাথের অননুকরণে দেশের প্রধানমন্ত্রী সযত্নে দাড়ি লালন করেন, তাঁর সহযোদ্ধারা বিশ্বভারতীকে রবীন্দ্রনাথের জন্মস্থান বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের মেজদাকে বড়দা বলেছেন, মেজবৌদির নাম ভুল বলেছেন—এরকম আরও কত কি! এমনকি  রবীন্দ্রনাথকে কেউ তো রবীন্দ্রনাথ সান্যাল বলে ফেলেছেন অবলীলায়।

 

তাঁরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন বাঙালি আদব কায়দা নকল করতে, গায়ে চাদর জড়াতে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে গুজরাটের কত নিবিড় সম্পর্ক ছিল তা প্রমাণে প্রাণপাত করেছেন এঁরা। আমাদের দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক স্বপ্ন ‘আত্মনির্ভর ভারত’ নাকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গির-ই অনুসারী! পরম বিজ্ঞের মতো তিনি বলেই গিয়েছেন যে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে নাকি ‘বেদ থেকে বিবেকানন্দ’ সবই পাওয়া যায়! অর্থাৎ একের ভিতর সব! 

বাস্তবিক হিন্দুভারতের স্বপ্নদর্শী আরএসএস-এর রাজনৈতিক প্রকল্পের অনুশীলক বিজেপির এভাবে আসন্ন ‘বর্ষাকালে’ অর্থাৎ নির্বাচনের প্রাক্কালে রবীন্দ্র শরণ নিয়ে বাঙালির মন জয়ের লক্ষ্যে বাঘের এভাবে হরিণের ‘গাল’ চেটে দেওয়ার সময়ও সে তার ক্ষুধার্ত লাল চোখের ক্রূরতা কিন্তু দুর্নিরীক্ষ্য থাকেনি। তাঁরা যখন বিড়বিড় করে বরান : ‘শোনরে হরিণ তোরে কই/কালগুণে আমি সবই সই’—তখন তার দাঁত কিড়মিড় করার শব্দ তো আর নীরব থাকতে পারেনি।

 

বিজেপির নেতা-নেত্রীরা এই বির্বাচনে বাঙালির মন পাওয়ার লক্ষ্যে আকছার বাঙালি কবিদের শরণ নিয়েছেন; রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও বঙ্কিমচন্দ্র, অরবিন্দ ঘোষেরও নাম নিয়েছেন  সচেতনভাবেই। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতিক অতীতে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তাঁর এবং তাঁর দলের বাঙালিপ্রীতির নিদর্শন রাখতে গিয়ে জানিয়েছেন যে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে ভক্তি আন্দোলন থেকে কালীসাধক রামকৃষ্ণ দেবের চিন্তার পরিচয় পেয়ে আহ্লাদিত হয়েছেন! তিনি অবলীলায় রবীন্দ্রনাথের ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’ উচ্চারণ করেছিলেন! অর্থাৎ তাঁদের ডাক যে বাঙালিরা  শুনতে চাইছেন না তিনি কি তা সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেই তিনি ভিন্ন প্রেক্ষিতে, ভিন্ন আবহে তাঁর শেখা বুলি আউড়ে গিয়েছিলেন! তিনি ব্রিটিশ ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামে নিবেদিতপ্রাণ ক্ষুদিরাম, বীণা দাশ, প্রফুল্ল চাকি, প্রীতিলতাদের নাম করে তাঁদের আদর্শের কথা স্মরণ করেছিলেন। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান ছিল এমন কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম করতে গিয়ে তিনি তো খোদ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটাই বিস্মৃত হয়েছিলেন! এমন তো হয়েই থাকে। কত আর মনে রাখা যায়?

২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ১৮ নভেম্বর আরএসএস-প্রধান মোহন ভাগবত জানিয়েছিলেন যে তাঁরা ভারতকে এক হিন্দুরাষ্ট্র-এ পরিণত করতে চান কেননা হিন্দুধর্ম বিপরীতের মধ্যে ঐক্য-এ বিশ্বাস করে, আর একথা নাকি নোবেল পুরষ্কার বিজেতা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই বলে গিয়েছিলেন! তিনি তাঁর বক্তৃতার সমর্থনে রবীন্দ্রনাথের ‘স্বদেশী সমাজ’ শীর্ষক প্রবন্ধের কথা উল্লেখ করেছিলেন। (২) —‘স্বদেশী সমাজ’ বিষয়ক রবীন্দ্রনাথের গোটা তিনেক লেখার সন্ধান পাওয়া যায়। প্রথমটি ‘স্বদেশী সমাজ’ শিরোনামে লেখা হয় ১৩১১ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে। এরপর “‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধের পরিশিষ্ট” শিরোনামে আরও একটি লেখার সন্ধান পাওয়া যায় যা লেখা হয়েছিল পূর্বোক্ত প্রবন্ধের ঠিক পরের মাসে অর্থাৎ আশ্বিনে। এরপর ‘স্বদেশী সমাজ’-এর ‘সংবিধান’ রচিত হয়। তাছাড়া ১৩১১ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধ পাঠের দুটি সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেই সভায় হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, বিপিনচন্দ্র পাল, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এই সমস্ত লেখাগুলি একত্র করে রবীন্দ্রনাথের ‘স্বদেশী সমাজ’ পুলিনবিহারী সেনের সম্পাদনায় বিশ্বভারতীর তত্ত্বাবধানে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৬৯ বঙ্গাব্দের পৌষ মাসে (অর্থাৎ ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাস নাগাদ)। ভাগবতোক্ত হিন্দুরাষ্ট্রের কথা রবীন্দ্রনাথ কোথায় বলে গিয়েছেন তা ওঁরাই জানেন।

১৩৩৬ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ মাসে এই গ্রন্থের সূচনায় ‘মর্মকথা’ প্রসঙ্গে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই বলেছিলেন :

স্বদেশী সমাজে…আমি বলেছিলুম ইংরেজ আমাদের রাজা এই কথাটা নিয়ে বকাবকি করে সময় নষ্ট না করে সেবার দ্বারা, ত্যাগের দ্বারা নিজের দেশকে নিজে সত্যভাবে অধিকার কররার চেষ্টা সর্বাগ্রে করতে হবে। দেশের সমস্ত বুদ্ধিশক্তি এবং কর্মশক্তিকে সঙ্ঘবদ্ধ আকারে কেমন করে দেশে বিস্তীর্ণ করা যেতে পারে, স্বদেশী সমাজে আমি তারই আদর্শ ব্যাখ্যা করেছিলুম।

এর মধ্যে হিন্দুরাষ্ট্রের কথা কোথায় তা সহজবোধ্য নয়। এছাড়া এই ‘মর্মকথা’র শুরুতেই রবীন্দ্রনাথ দেশের ‘সরকার বাহাদুর’কে ‘অমানবিক’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। স্বভাবতই ভাগবত যে রবীন্দ্রনাথকে হিন্দুরাষ্ট্রের প্রবক্তা হিসেবে আখ্যাত করে তাঁকে তাঁদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার প্রয়াস পেয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁদেরই শংসিত ‘স্বদেশী সমাজ’-এর প্রারম্ভকথায় দেশের সরকার সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন, সেই সরকার বাহাদুরের প্রয়াসকে ‘অমানবিক’ আখ্যা দিয়েছিলেন। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের ‘স্বদেশী সমাজ’ আদতে কোনও রাজনৈতিক প্রকল্প ছিলনা, এখানে যেমন ব্রিটিশবিরোধিতার স্পষ্টতা নেই, তেমনই নেই তাঁর বক্তব্যের সুঠাম শরীরি কাঠামো। তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই তিনি যেসব কথা তাঁর ‘স্বদেশী সমাজে’ বলেছেন তার মধ্যে হিন্দুত্ব এবং হিন্দুরাষ্ট্রের কথা একান্তই অনুপস্থিত।

 

মোদি-ভাগবতরা রবীন্দ্রনাথকে তাঁদের কাঙ্ক্ষিত হিন্দুত্ববাদের প্রবক্তা হিসেবেই প্রতিপন্ন করায় অপপ্রয়াস পেলেও তাঁরা বিস্মৃত হয়েছেন যে রবীন্দ্রনাথের কাছে জাতিয়তাবাদ এবং দেশপ্রেমের চাইতে মানবতাবাদই অধিকতর গুরুত্বপূর্ন বলে বিবেচিত হয়েছিল। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি লিখেছিলেন : দেশপ্রেম আমাদের অন্তিম আশ্রয় হতে পারে না। আমার অন্তিম আশ্রয় হচ্ছে মানবতাবাদ। আমি যতদিন জীবিত আছি ততদিন অন্তত মানবতাবাদের বিনিময়ে দেশপ্রেমকে অনুমোদন দেবো না। (৩)

২০১৭ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে মোহন ভাগবত পুনরায় পশ্চিমবঙ্গে তাঁদের রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতার লক্ষ্যে আবারও রবীন্দ্রনাথকে তাঁদের হিন্দুত্বের ‘আইকন’ হিসেবে প্রচার করার প্রয়াস পেয়েছিলেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের পূর্বোক্ত প্রবন্ধের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন যে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন হিন্দু এবং মুসলিমরা নিজেদের মধ্যে চিরকাল এভাবে লড়াই করে চলতে পারবে না, একটা মধ্যপথই এই সংঘর্ষের ইতি টানতে সক্ষম, আর এই মধ্যপথই হচ্ছে হিন্দুত্বের পথ! (৪) —এভাবেই ভাগবত রবীন্দ্রনাথকে নিজেদের ফ্যাসিস্ত রাজনীতির সপক্ষকরণের অপপ্রয়াস পেয়ে গিয়েছেন বেশ কয়েক বছর ধরেই।

      

আরএসএস-এর অন্যতম প্রচারক দীননাথ বাত্রা তো আবার রবীন্দ্রচিন্তার বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি রবীন্দ্রচিন্তার মধ্যে জাতীয়তাবাদের বিরোধিতার (অবশ্যই বিজেপির হিন্দুত্ববাদী জাতিয়তাবাদ) সন্ধান পেয়েছিলেন, পেয়েছিলেন ধর্ম আর মানবতাবাদের মধ্যে বিভেদরেখা টানার প্রয়াস। আর বাংলার নির্বাচনের প্রেক্ষিতে আবার সেই রবীন্দ্রনাথকে আঁকড়ে ধরে তাঁরাই আবার  বাঙালিপ্রীতি দেখাতে অতিতৎপরতার নিদর্শন রেখেছেন বাংলার নির্বাচনে সাফল্যলাভের লক্ষ্যেই। কিন্তু ভোট বড় বালাই। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে  বাংলাবিজয় তাঁদের স্বপ্নের তুঙ্গসীমায় বিরাজ করছিল। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এই বিধানসভা নির্বাচনে তাঁরা দুই শতাধিক আসন পেয়ে ক্ষমতাসীন শাসকদলকে ধরাশায়ী করে দিয়ে এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, সন্দেহ নেই। এতটা সাফল্য তাঁরাও সম্ভবত আশা করেন নি।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’র নিখিলের কথাগুলো তো সারা বাংলাময় ধ্বনি থেকে প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে :

দেশকে দেবতা বলিয়ে যখন তোমরা অন্যায়কে কর্তব্য, অধর্মকে পুণ্য বলে চালাতে চাও তখন আমার হৃদয়ে লাগে বলেই আমি স্থির থাকতে পারি নে। একদিকে দেশপ্রেমকেই ‘দেবতা’ বলে প্রচার করা আর অন্যদিকে অন্যায় এবং অধর্মকে প্রয়োজনীয় অনুশীলন হিসেবে কার্যকরী করা একসঙ্গে কী করে চলতে পারে?  

 

আজ থেকে আটদশক আগে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে তাঁর বিশ্বভারতী হচ্ছে একটা বিশাল জাহাজ, যে জাহাজ বয়ে নিয়ে চলেছে তাঁর সারাজীবনের সেরা মূল্যবান সম্পদসমূহ।—আর আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেই বিশ্বভারতীর আচার্য হয়ে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতার চিন্তাভাবনা সম্পর্কে অনবহিত থেকে বাঙালিপ্রেমের নিদর্শন রাখতে প্রয়াসী হয়েছিলেন।

 

তাঁর ‘স্বদেশী সমাজ’-এই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন :

…এই সময়েই বাঙালিকে নিয়ত স্মরণ করাইয়া দেওয়া দরকার যে, ঘর ও বাহিরের যে স্বাভাবিক সম্বন্ধ, তাহা যেন একেবারে উলটাপালটা হইয়া না যায়। …শিক্ষা করিব বাহিরে, প্রয়োগ করিব ঘরে।

বাইরের অর্জিত শিক্ষার প্রয়োগানুশীলন হবে ঘরে। অর্থাৎ বিশ্বের আঙিনা থেকে আহরিত শিক্ষার অনুশীলন হবে দেশের অভ্যন্তরে মানব কল্যাণের লক্ষ্যেই। কী হয়েছে, আর কী হয়নি, এখানে সে বিষয় প্রাসঙ্গিক নয়। রবীন্দ্রনাথকে তাঁরা কীভাবে তাঁদের চিন্তাচর্চা এবং কর্মানুশীলনে প্রয়োগ করেন সেটাই এখন দেখার।

 

নির্বাচনে তাঁদের জয়ের প্রাক্কালে স্বয়ং দেশের প্রধানমন্ত্রী কলকাতায় এসে আবির্ভূত হয়েছিলেন এক চোখ-ধাঁধানো বাঙালি পোশাকে। পঁচিশে বৈশাখ (৯ মে) বিজেপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার জনসমক্ষে শপথ গ্রহণ করবেন। সেদিনও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেই ‘মহতী’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন হয়তো পুরোপুরি বাঙালি পোশাকেই। সেদিন কি রবীন্দ্রসঙ্গীত দিকবিদিক আলোড়িত করে সুপবনে গৈরিক পতাকা উত্তোলন করবে? নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিরক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কি বাংলা সংস্কৃতির অভয়ারণ্য বিস্তারলাভ করবে? নির্বাচনোত্তর যে অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন, দখলের এবং সর্বোপরি সন্ত্রাসের যে বিষাক্ত আবহাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে, তার বিনিপাত কি ঘটবে? বিজেপির নতুন সরকার কি বাঙালি মনে-মননে সন্দেহ-অবিশ্বাসের অপনোদন করে এক নতুন দিগদর্শন হাজির করবে? ‘গণশত্রু’র পতন এবং কাঙ্ক্ষিত ‘আনন্দ এবং শান্তি’প্রাপ্তির বিনির্ঘোষ জনকল্যাণে সুস্থিতি লাভ করবে তো? এখন এটাই দেশের মানুষের কাছে তৃষিত প্রত্যাশা। তাঁদের এই প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়, তার ওপরই তো সুশাসনের সাফল্য নির্ভর করবে।

 

(১) The Telegraph, December 10, 2020

(২)   https://www.ndtv.com/india-news/rss-chief-invokes-tagore-appeals-for-hindu-rashtra-729070

(৩) Frontier, January 2, 2021

(৪) Catchnews, October  5, 2017

 

0 Comments

Post Comment