বাংলার ভোট মানেই শুধুই কথার ফুলঝুরি নয়, কুকথার ঝড় ওঠে সেখানে। বাংলার ভোট মানেই যেন এক বিশাল “বাচন অলিম্পিক”। যেখানে প্রতিযোগী কয়েকজন চেনা মুখ।
প্রথমেই মঞ্চে ওঠেন মাননীয়া। তাঁর বক্তৃতা শুরু হয় ঝড়ের বেগে –“আমি লড়াই করেই আজ এখানে, আমি ভয় পাই না। আমাকে বেশী ঘাটাতে এসো না। তোমাদের ঘুঘুর ফাঁদ দেখিয়ে ছাড়বো। ভোটের মরশুমে পরিযায়ী পাখিদের মতো উড়ে এসে জুড়ে বসে বাংলার মানুষকে অতো সহজে চমকাতে, ধমকাতে পারবে না।” কখনো বা বলেন –“আগে দিল্লি সামলাও, তারপর বাংলার দিকে নজর দিও। বাংলার ভাষা সংস্কৃতি খাদ্যাভাস বদলে দিতে তোমরা পারবে না। পারবে না, পারবে না যতদিন আমরা আছি।”
তারপর একটু বিরতি নিয়ে প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে এমন সব তীর্যক মন্তব্য করেন, যা শুনে সমর্থকেরা হাততালি দেয়, আর বিরোধীরা মুখ বাঁকায়। তাঁর ভাষা যেন বিদ্যুৎ। ঝলকানি বেশি, আঘাতও কম নয়! তিনি মানুষের ভাষা বোঝেন। মানুষের আবেগ উপলব্ধি করেন। মানুষের নাড়িতে হাত রাখতে জানেন।
এরপর মঞ্চ কাঁপাতে আসেন রাজা সাহেব ও শাহজাদা। তাঁদের বক্তৃতা অনেকটা গল্প বলার মতো –
“ভাই ও বোনেরা”… দিয়ে শুরু, তারপর ধীরে ধীরে প্রতিপক্ষকে খোঁচা। এমনভাবে বলেন যে শ্রোতারা বুঝে যায় কার দিকে কীসের ইঙ্গিত। যেন কটাক্ষের শিল্পকলায় পিএইচডি করেছেন! পিএইচডি মার্কা বক্তিমের সারমর্ম –“অনেক তো দেখলেন। এবার আমাদের একটিবার সুযোগ দিন। সব ভাতা ডাবল ডাবল করে আমাদের ইঞ্জিন ছুটবে বন্দে ভারতের বেগে। বাংলায় উন্নয়নের জোয়ার বইবে। আমরা সুনার বাঙালা গড়বো।” আরও সুর চড়িয়ে ভেসে আসে প্রচ্ছন্ন হুমকি –“এখানে আর মছলি, মাংস এসব রেওয়াত করা হবে না।” বেশ বেশ! সবাই সাধু-সন্ত, সন্ন্যাসী বনে গেলে ক্ষতি কিসে?
কখনো আবার রাগত স্বরে বলেন –“চুন চুন করকে মারুঙ্গা। কিসিকো নেহি ছোড়েঙ্গা। টুকরে টুকরে গ্যাংকে লটা দেঙ্গা।” এরসাথে ইডি, সি বি আই, এন এ আই হানার হুমকি তো আছেই।
নাটকের চতুর্থ কুশীলব যাত্রাপালার সনাতনী অধিকারী বাবু। তিনি মঞ্চে উঠেই গরম মেজাজে খেলতে শুরু করেন। তাঁর বক্তব্যে যুক্তির চেয়ে চেঁচানি বেশি। তথ্যের ধার না ধেরে কল্পনার জাল বুনে কুকথার বন্যা বইয়ে দিতে তিনি সিদ্ধহস্ত। বিভেদ, বিভাজন, ঘৃণা, হিংসার বিষবাষ্প ছড়াতে সনাতনীর এজেন্ট নেওয়া এই ভদ্দরলোকের জুড়ি মেরা ভার। তিনি শুধু অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশি খুঁজে চলেন বাঙালিদের মধ্যে। আর মাঝে মাঝে এমন মন্তব্য ছুড়ে দেন যা সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে যায় পরদিন। যেন ক্রিকেটে টি-টোয়েন্টি। ধৈর্য, যুক্তি তক্কোর সময় নেই, শুধুই বাউন্ডারি!
ঘোষবাবুও কম যান কিসে? ঝাঁটার বাড়ি বা তাড়া খেয়ে রেগে মেগে মহিলাদের গালিগালাজ করতে এই ভদ্রলোকের বাঁধে না। ভুলভাল বকেই তিনি খবরের শিরোনামে থাকতে চান। কখনও তিনি আবার গরুর দুধে সুনা খুঁজে পান।
ধর্ষণ রাজ্যের মধ্যমনি মন্ত্রীসাব বাংলা এসে বুলডোজার সংস্কৃতির অবতারণাও করে যান। বাংলার ভবিষ্যতের ললাটে সরবে লেখা হয়ে চলেছে একদিকে ধর্ষণ, খুন জখম, গুন্ডারাজ সংস্কৃতি। আর অন্যদিকে বুলডোজার, পুলিশ, ফুলিশ প্রশাসন দিয়ে সব বিরোধ বিদ্রোহ বিক্ষোভকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ভয়ঙ্কর ভবিষ্যৎ!
এই নাটকে আরও এক মধ্যমনি রয়েছেন। তিনি তরুণ তুর্কি। দলকে গড়ে পিঠে সাজাতে চান। তাঁর ভাষা একটু আধুনিক, একটু স্টাইলিশ। আবেগ কম হলেও যুক্তি তথ্য দিয়ে, কখনও বা তীক্ষ্ণ কৌতুকে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করেন। চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। উত্তর আসে না বিরোধী পক্ষ থেকে।
বড় বড় ন্যাতা নেত্রীদের তস্য নেতারা আরও এককাঠি উপরে। তাঁরা যেন বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়। এঁদের কথায় কোনো লাগাম থাকেনা। যা খুশি তাই বকেন। অন্যদের চমকান, ধমকান। যেখানে যেমন মনে করেন, তাই বলে ফেলেন। চাপে পড়ে মাঝে মাঝে আবার ভুলও স্বীকার করেন।
ঢাক ঢোল কাঁসর ঘন্টার দামামা, শঙ্খ নিনাদ, আর মাইকের দানবীয় আস্ফালন চলতেই থাকে। এদিক ওদিক বোমা, গুলিও ফাটতে থাকে মুড়ী মুড়কির মতো। ভীত সন্ত্রস্ত মানুষকে মনের গভীর ক্ষতে আশ্বাসের প্রলেপ দিতে জল বাতাসা গুড়, ডিম্ভাত, লুচি আলুরদম, এমনকি চিকেন বিরিয়ানির পসরা সাজানো হয়। কেউ কেউ আবার লুকিয়ে চুরিয়ে পাঁচশো, হাজার, দুই হাজারও গুঁজে দেন আকাঙ্খিত ভোটারদের কাছে।
আগডুম বাগডুম ভাষণ শুনতে শুনতে জনগণের মনে হয় –“এটা কি রাজনৈতিক বক্তৃতা, না স্ট্যান্ড-আপ কমেডির স্ক্রিপ্ট?”
সব মিলিয়ে দৃশ্যটা এমন –
একজন বলেন, “ওরা ভুল”।
আরেকজন বলেন, “না, ওরা শুধুই ভুলে ভরা।”
তৃতীয়জন বলেন, “সবচেয়ে বড়ো ভুল তো ওরাই!”
তু্ই বেড়াল, না মুই বেড়াল? কে কালো, আর কে সাদা বেড়াল? কোন বেড়াল বেশী ইঁদুর মারতে পারে? এইসব বাকবিতন্ডা, লড়াই চলতেই থাকে।
আর অন্ধ ভক্তরা বগল বাজাতে বাজাতে স্লোগান দেয় –“জয় ছিরিরাম। ভারত এবার জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে। তিনি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়।”
এদের রকম সকম দেখে বয়স্ক মানুষেরা প্রমাদ গোনেন। তাঁরা ভাবেন –“আগে মানুষ ভোটের সময় শুনত ভালো ভালো প্রতিশ্রুতি। ভোট বৈতরণী পার করে নতুন সরকার এলে তার কিছু কিছু রূপায়ণও হতো বটে। আর এখন মিথ্যে প্রতিশ্রুতির সাথে শোনে প্রতিশোধের গরমা গরম ভাষণ। আগে নেতা বলতেন “আমরা উন্নয়ন করব। দেশ গড়ে তুলব। শিক্ষায় স্বাস্থ্যে জোয়ার বইয়ে দেবো।”
এখন বলেন –“ওদেরকে দেখে নেব! বেছে বেছে অনুপ্রবেশকারী, থুড়ি মুসলিমদের দেশ ছাড়া করব। এ দেশকে ধম্মো রাজ্য বানিয়ে ছাড়ব।” এ যেন উন্নয়ন নয়, একেবারে অ্যাকশন সিনেমার ট্রেলার! আসলি মুভি আভি বাকি হ্যায়!
গ্রামের চায়ের দোকানে বসে থাকা বৃদ্ধ গণেশ একদিন বলছিলেন –“আগে ভোট মানে ছিল উৎসব, এখন তো মনে হয় রেসলিং ম্যাচ! একজন নেতা মঞ্চে উঠে অন্যজনকে এমন সব উপাধি দেন, যা শুনে অভিধানও লজ্জায় মুখ লুকোয়।”
বৃদ্ধ গণেশ বাবুর সুরে তাল মিলিয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে এক খদ্দের বলে –“এক নেতা বলছেন, “ওরা চোর!” আরেক নেতা সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেন, “ওরা ডাকাত। চোরের বাবাও ওদের কাছে হার মানে!”
তৃতীয় নেতাই বা পিছিয়ে থাকেন কেন! তিনি বলেন, “এরা শুধু চোর নয়, এরা চোরের পিএইচডি!”
এইসব শুনে পাশের বাড়ির ছোট্ট মেয়ে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করে, “বাবা, পিএইচডি মানে কি?” বাবা একটু থেমে মাথা চুলকে বলে, “ওটা বড়োদের কুকথার ডিগ্রি রে মা!”
মজার ব্যাপার হল, যত ভোট এগোয়, ততই কুকথার স্রোত নেমে যায় খাদের কিনারায়। নেতাদের মধ্যে কুকথার একটা অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলছে। কে কত বেশি কটু কথা বলতে পারে! কেউ কেউ আবার এমন শব্দ ব্যবহার করে, যা শুনে মাইকেরও লজ্জা লাগে। যদি মাইকের মুখ থাকত, সে হয়তো বলত –“আমাকে একটু বন্ধ করে দাও বাপু। এবার খ্যামা দাও। আমি আর নিতে পারছি না!”
আর আম জনতা? মনের ইচ্ছের বিরুদ্ধে মিটিংয়ে দল ভারি করে তারা বসে বসে এই সব শোনে। মাঝে মাঝে মুচকি হাসে। কখনো বা বিরক্তও হয়। আম জনতার মনের কোণে জেগে ওঠে অন্য ভাবনা – “এইসব কুকথার ফুলঝুরিতে আসল কথা আসলে হারিয়ে যাচ্ছে। রাস্তা, হাসপাতাল, চিকিৎসার ব্যবস্থা, স্কুল, কলেজ, শিক্ষা, বেকারের চাকরি, জিনিসপত্তের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি –জনগণের জীবন যাপনের সাথে জড়িত বিষয়গুলো যেন বক্তৃতার ভিড়ে হারিয়ে যায় মোবাইলে আসা বিজ্ঞাপনের মতো। সব যেন ভেসে যায় বানের জলে।”
গ্রামের এক কিশোর রাগে গজগজ করতে করতে বলে –“আর জলের দূষণ, বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ, প্রকৃতির লুণ্ঠন –এসব নিয়ে ন্যাতা বাবুদের কোন ভাবনা চিন্তাই নেই। তাদের মতে –এসব নাকি গালগল্প। বাস্তবে ঘটেই না!” তওবা তওবা!
এই আড্ডায় এক বাচাল ছোকরা বলে বসে –“আরে মশায়, রাখুন পরিবেশ প্রকৃতি। এইসব নেতাদের গুরু বাবারা তো বলেই দিয়েছে, দেশের মানুষের জন্য উন্নয়ন টুন্নয়ন করতে হলে এসব একটু এদিক ওদিক তো হবেই। নাহলে আর ওদের নাফা হবে কেমনে? আর ওদের সেবাদাসরা তো দেশ, দেশের মানুষের সহায় সম্বল সব বিকিয়ে দিয়েছে এইসব বেনিয়াদের কাছে।”
আড্ডায় খানিক হাসির রোল ওঠে। সে হাসির দমকা হওয়া আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায় কোথাও এক ভূষুন্ডির মাঠে।
সবচেয়ে মজার দৃশ্য দেখা যায় ভোট শেষ হওয়ার পর। একদিকে মারামারি, কাটাকাটি, হানাহানি চলতেই থাকে। অন্যদিকে নাটকের অন্য দৃশ্যপট রচিত হতে থাকে। ভোট প্রচারে যাঁরা একে অপরকে “দেশদ্রোহী”, “দুর্নীতিবাজ”, “অযোগ্য” বলে গাল পেড়েছিলেন, তাঁরা হঠাৎ করেই হাসিমুখে হাত মেলান, কোলাকুলি করেন। একসাথে বসে চা, আর কি কি গলায় ঢালেন, তা ‘দেব না জানন্তী’। এক দল কালো টাকার পাহাড় নিয়ে অন্য দলের ন্যাতাদের ভাগিয়ে নিয়ে যায়। দুর্নীতিবাজ দল বদলুরা ওয়াশিং মেশিন থেকে বেরিয়ে আসে একেবারে সফেদ বাবু হয়ে।
এসব অ্যাকশন গেম দেখে শুনে জনগণের দীর্ঘশ্বাস পড়ে। তারা ভাবে –“ভোট প্রচারের কুকথা, অকথাগুলো কি তবে নাটকের সংলাপ ছিল? ভোট নামক মঞ্চে অভিনীত এক বিশাল প্রহসন ছিল? ছিঃ, এদেরকেই আমরা ভোট দিয়েছি। তাও লাখ লাখ মানুষ ভোট দিতেই পারেনি। জানিনা এ মানুষগুলির কি দুর্দশা হবে ভোট মিটলে!”
শেষমেশ গণেশ কাকু আবার বলেন –“ভুল কে, ঠিক কে, তা বুঝলাম না বটে। তবে কথার ঝড়টা বেশ উপভোগ্য!”
শেষে চায়ের দোকানের আড্ডায় আবার সেই চিরন্তন মন্তব্য –“নেতারা যদি কুকথা কম বলে কাজের কথা, মানুষের কথা, দেশের ভালোর কথা, প্রকৃতির স্বাস্থ্যের কথা, বিষহীন টাটকা সতেজ খাবারে কথা একটু বেশি বলতেন, তাহলে ভোটটা ভালো লাগত! তবে হয়তো শান্তিতে পছন্দের প্রার্থীকে ছাপ মারতে পারতাম।”
কে জানে, সেদিন কতদূরে? আপনি কি সুশাসন, সুন্দর ভবিষ্যৎ, সুস্থ-সবল নীরোগ দেহের কথা, নির্মল আকাশ বাতাস জলের কথা ভাবতে পারছেন?