পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

এপস্টিন ফাইল: বিকৃত যৌনতার সীমানা অতিক্রম করে কিছু কথা

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 200 view(s)
  • লিখেছেন : সুমন কল্যাণ মৌলিক
এপস্টিন ফাইলস একটা অন্য পৃথিবীর ছবি আমাদের সামনে উপস্থিত করে।পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যে গণতন্ত্র, নৈতিকতা, সাম্যের ভাবনা ও বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে স্থাপিত আইনের শাসনের কথা বলে তা যে নেহাৎই এক মরিচীকা,এপস্টিন ফাইলস তা ছত্রে ছত্রে প্রমাণ করে।এই নথিগুলো এক প্যারালাল ইউনিভার্সের খোঁজ দেয় যেখানে ক্ষমতাবানরা তাদের সম্পদ ও ক্ষমতার জোরে পৃথিবীর সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে।

এপস্টিন ফাইলস নিয়ে বিশ্ব রাজনীতি আবার উত্তাল,এমনকি ভারতও সেই অভিঘাতের বাইরে নয়।বিশেষ করে মার্কিন কংগ্রেসে পাশ করা ' এপস্টিন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট' এর ডেটলাইন অনুসারে ৩০ জানুয়ারি (২০২৫) মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস ৩০ লাখ অতিরিক্ত পৃষ্ঠা প্রকাশের পর।ফাইলের এই পর্বে আজ তিনহাজার ভিডিও এবং এক লক্ষ আশি হাজার ইমেজ।আধুনিক সময়ে ধনতন্ত্রের ইতিহাস এই ধরণের ফাইল জনসমক্ষে উন্মোচিত হওয়া কোন নতুন ঘটনা নয়।এর আগে পানামা পেপারের উন্মোচন দেখিয়েছিল কিভাবে পুঁজিপতিদের বিপুল সম্পদ অফশোর খাঁড়িপথে পাচার হয়ে যায় বিশ্বের বিভিন্ন ট্যাক্স হেভেনে,প্যারাডাইস পেপার  প্রায় কোটির কাছাকাছি আর্থিক লেনদেনের কাগজ সামনে এনেছিল যা ক্ষমতাবানদের কর ফাঁকি,শেল কোম্পানি ও আর্থিক দুর্নীতির এক অভূতপূর্ব কোলাজ।ভারতের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশে আমাদের মনে আছে নীরা রাডিয়া টেপের কথা যা বহু বিজ্ঞাপিত ভারতীয় গণতন্ত্রের ঘুন ধরা ক্ষমতা কাঠামোকে উন্মোচিত করেছিল।এপস্টিন ফাইলসের নথি অবশ্য শুধু মাত্র টাকার হদিশ করে নি,তার সঙ্গে এই ফাইলস উন্মোচিত করে সেক্স র‍্যাকেট,নারী শরীরের বিকিকিনি,রাজনৈতিক দল ও কর্পোরেট কর্তাদের অশুভ যুগলবন্দী তদুপরি আইনের উর্ধ্বে ধনতন্ত্রের নগ্ন উল্লাস। কদর্য ধনতন্ত্র ও বিকৃতকাম ক্ষমতাবানদের আন্তঃসম্পর্ক ও পুৃঁজিবাদের লাম্পট্যকে অনুধাবন করাটা আজ ভীষণ জরুরি। আমরা যদি এপস্টিন ফাইলসের কুশীলবদের দিকে নজর ফেরাই  তাহলে দেখব রাজনৈতিক নেতৃত্ব ( মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিল ক্লিন্টন,এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সহ অনেকে),কর্পোরেট ধনকুবের (এলন মাস্ক,বিল গেটস,অনিল আম্বানি ইত্যাদি), বিভিন্ন নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের প্রতিভূ,উচ্চ পদের আমলা,সাংস্কৃতিক জগতের লোক ( উডি অ্যালেন,মাইক জ্যাগার ইত্যাদি) --- এক কথায় ক্ষমতার অলিন্দে বিচরণকারী বিভিন্ন মানুষেরা কিভাবে এক অনৈতিক বাস্তুতন্ত্র গড়ে তুলেছে তার হাতে গরম উদাহরণ এপস্টিন ফাইলস। আমরা যদি ধনতন্ত্রের এই বিকৃত যৌনতার উদযাপনকে একমাত্র আলোচনার বিষয়বস্তু না করি তাহলে দেখতে পাব এই নথিগুলো অফশোর ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট,কালো টাকা,পুঁজির অনৈতিক চলনের এক চিত্রনাট্য যা কিন্তু আধুনিক আর্থিক পুঁজিবাদের কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য। কারেন্সি,ইমেইল, আলোকচিত্র, ট্রাভেল রেকর্ড ও ভিডিও দ্বারা গঠিত এক সমান্তরাল বিশ্ব যা এপস্টিনের মত দালাল,ইজরায়েলের গুপ্তচর তথা বিকৃতকাম নরাধম, ব্ল্যাকমেলের রাজনীতির কুশলী খেলোয়াড় পরম যত্নে তৈরি করেছিলেন।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত এপস্টিন ফাইলের দিকে আমরা যদি নজর ফেরাই তবে ক্ষমতার দালালদের বাস্তুতন্ত্রটা আমরা উপলব্ধি করতে পারব।প্রথমে ভারতের উদাহরণটা সামনে আনা দরকার।প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অনুষঙ্গে যে নামটি এসেছে তা হল কুখ্যাত ব্যবসায়ী ও নরেন্দ্র মোদির ইনার সার্কেলের সদস্য অনিল আম্বানির নাম।এখানে এক বিকৃতকাম ও যৌন অপরাধে দন্ডিত এপস্টিনের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি হয়ে কথা বলছেন অনিল আম্বানি। তার কাজ হল ট্রাম্প সহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ নেতৃত্বের সঙ্গে মোদির মিটিং এর বন্দোবস্ত করা।২০১৭ সালের ১৬ মার্চ ট্রাম্প প্রথমবার মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর অনিল আম্বানি এপস্টিনকে ইমেল করছেন, তাতে বলা হচ্ছে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় বসতে এপস্টিনের সাহায্য চাইছে।এক্ষেত্রে এপস্টিন মার্চ ২৯ এর এক মেসেজে ইজরায়েলের সঙ্গে মোদির আলোচনার কথা বলছেন।২০১৭ সালের ২৬ জুন মোদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ করছেন।এরপর ২০১৭ সালের ৬ জুলাই মোদি ভারত সরকারের এতদিনের প্যালেস্টাইন পলিসিকে পরিত্যাগ করে ইজরায়েল ভ্রমণে যাচ্ছেন। সেই বছরই ভারত হয়ে উঠছে ইজরায়েলের অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ( অর্থমূল্য ৭১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)।এপস্টিন তার ইমেলে লিখছেন, " The Indian prime minister modi took advice and danced and sang in israel for the benefit of the us president "।একই সঙ্গে আম্বানি রিলায়েন্স ডিফেন্স লিমিটেড, ইজরায়েল স্টেট ডিফেন্স গ্রুপের সাথে প্রায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের অস্ত্র চুক্তি করছে।মোদি ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বার ভোটে জেতার পর হোয়াইট হাউসের অন্যতম পলিসি নির্ধারক স্টিভ ব্যাননের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন এপস্টিনের সৌজন্যে। এমনকি ব্যানন ও এপস্টিনের ইমেলে উঠে আসছে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি,চিন বিরোধিতার মত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি।

এপস্টিন ফাইলে ভারতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হল একদা ভারতের ফরেন সার্ভিসের আমলা ও ২০১৪ সাল থেকে বিজেপি নেতা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী।যৌন অপরাধী এপস্টিনের সঙ্গে পুরীর ইমেল যোগাযোগ শুরু হয় ২০১৪ সাল থেকে এবং এপস্টিনের নির্দেশে লিঙ্কডিনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রিড হফম্যানের ভারত সফরের ব্যবস্থা করা হয়।নথি মোতাবেক ২০১৫-১৭ সালের মধ্যে পুরী এপস্টিনের সঙ্গে তিনবার সাক্ষাৎ করেন।পুরীর বয়ান অনুযায়ী সেক্স র‍্যাকেট চালানো এই কুখ্যাত অপরাধীকে পুরী ভারতে বিদেশি বিনিয়োগ আনার জন্য মসিঁহা ঠাউরেছেন।

এই দুটো ক্ষেত্রেই ভারত সরকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।কিন্তু যেভাবে এপস্টিন ফাইলে মোদি সহ বিভিন্ন ভারতীয়ের নাম উল্লেখিত হয়েছে তা তদন্তের দাবি করে।

একইভাবে এই পর্বের নথিতে প্রাক্তন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী কেভিন রুডের ( ২০০৭-১০,২০১৩) নাম আছে,নাম রয়েছে ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ও লেবার পার্টির নেতৃত্ব পিটার ম্যানডেলসন,নরওয়ের যুবরানী ম্যাটে- মেরিটের।প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভিন্ন দ্বীপ, সুরম্য প্রাসাদে পার্টির মূল বিষয়টি হল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চুক্তি।

এখনো পর্যন্ত এই এপস্টিন ফাইলস পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জনরোষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পেরেছে।স্লোভাকিয়াতে প্রাক্তন বিদেশ মন্ত্রী ও বর্তমানে সেদেশের রাষ্ট্রপতির মুখ্য পরামর্শদাতা মিরোশ্লাভ লাচেক পদত্যাগ করেছেন।ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যে সেদেশের  গুরুত্বপূর্ণ বানিজ্যিক তথ্য পাচার ও ৭৫,০০০ মার্কিন ডলার ঘুষ নেওয়ার দায়ে পিটার ম্যানডেলসন লেবার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছেন।ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স অ্যান্ড্রু ও তার প্রাক্তন স্ত্রী সারা ফার্গুসনের যাবতীয় রাজকীয় সুবিধা ও সন্মান প্রত্যাহার করা হয়েছে। নরওয়েতে যুবরানী ম্যাটে- মেরিটের একাধিক যৌন ইঙ্গিবাহী ইমেল,ফটোগ্রাফ সামনে আসার পর সেখানকার মানুষ যাতে মেরিট ভবিষ্যতে রানী না হন,তার জন্য জনমত তৈরি করছেন।সুইডেনে ইউএনসিএইচআরের প্রেসিডেন্ট জোয়ানা রুবিনস্টেন এপস্টিনের বিলাসবহুল ক্যারিবিয়ান দ্বীপে ছুটি কাটাবার দায় মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করেছেন।আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প,এলন মাস্ক,বিল গেটসরা ক্ষমতার অলিন্দে কিভাবে কাজ করেন, এপস্টিন ফাইলে তা উন্মোচিত হবার পর সেখানে আগামী দিনে একাধিক রাজনৈতিক সংকটের সঙ্কেত মিলছে।তালিকা দীর্ঘায়িত করার পরিবর্তে শুধু এটুকু বলা যায় যে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের নৈতিকতা ও আইনের পবিত্রতা সম্পর্কিত মুখোশ খুলে যাওয়ার পর পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চালকরা কিছু পদক্ষেপ নেয় ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে,এই পদত্যাগগুলো তার উদাহরণ মাত্র। যদিও ভারতের মত দেশ,যেখানে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের ছিঁটেফোঁটা নেই সেখানে পদত্যাগ নেহাৎই কষ্ট কল্পনা।

এপস্টিন ফাইলস একটা অন্য পৃথিবীর ছবি আমাদের সামনে উপস্থিত করে।পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যে গণতন্ত্র, নৈতিকতা, সাম্যের ভাবনা ও বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে স্থাপিত আইনের শাসনের কথা বলে তা যে নেহাৎই এক মরিচীকা,এপস্টিন ফাইলস তা ছত্রে ছত্রে প্রমাণ করে।এই নথিগুলো এক প্যারালাল ইউনিভার্সের খোঁজ দেয় যেখানে ক্ষমতাবানরা তাদের সম্পদ ও ক্ষমতার জোরে পৃথিবীর সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে।শিশুদের নিয়ে যৌনতা,উদ্দাম লাম্পট্য, আর্থিক দুর্নীতি তথা আইনের হাত থেকে রক্ষা কবচ সেই পৃথিবীর চরিত্র। আদতে সেটাই পুঁজিবাদের আসল চেহারা।যতদিন পুঁজিবাদ থাকবে,এপস্টিনদের গল্প নতুন নতুন অবতারে আমাদের সামনে আসবে।এই রাজনৈতিক বার্তাকে উপলব্ধি করতে না পারলে এপস্টিন বিতর্ক নেহাৎই এক খিল্লি হয়ে থেকে যাবে।

0 Comments

Post Comment