পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ইউনিয়ন সরকারের কোনও এক্তিয়ার নেই রাজ্য সরকারগুলোকে ব্যতিব্যস্ত করার

  • 16 January, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 373 view(s)
  • লিখেছেন : সৌম্য মণ্ডল
ইউনিয়ন সরকারের অপরাধের তদন্ত বা অপরাধের প্রতিকারের ক্ষমতা জনতা ছাড়া আর কারও নেই, হয় জনতা নির্বাচনের মাধ্যমে শাসক দলকে ক্ষমতাচ্যুত করবে, নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে পুরনো অপরাধের তদন্ত করবে বা নির্বাচন ব্যবস্থাও যদি শাসক দল কুক্ষিগত করে ফেলে, তখন গণ-অভ্যুত্থান ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনে একের পর এক দূর্নীতির তদন্ত গুলোর যা হাল হকিকত তাতে সেটিং তত্ব জনমানস বিশ্বাসযোগ্যতা পাচ্ছে। সব চেয়ে হাস্যকর উদাহরণ নথী অনুবাদ না হওয়ায় বঙ্গীয় বাহুবলী অনুব্রত মন্ডলের জামিন। কিন্তু সাধারণ মানুষ সাদা চোখে যা দেখে, ক্ষোভ থেকে তার যা প্রতিক্রিয়া হয়, তাত্বিক বা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বক্তব্য তা হতে পারে না, হলে সেটা মানসিক কুড়েমির লক্ষ্মণ, বরং তাত্বিকদের কাজ হল যা দেখা যাচ্ছে না তা দেখানো…নয়তো আলাদা করে একটি পার্টির পলিট্যিকাল ব্যুরোর প্রয়োজনটা কী?

কিছুক্ষণের জন্য ধরে নেওয়া যাক- কোনো সেটিং হয়নি, বা কোনো সেটিং হল না, বা সেটিং হয়েও কোনো কারণে শেষ মূহুর্তে ভেঙে পড়লো! এবার ইউনিয়ন সরকারের এজেন্সি যদি একটি স্টেটের নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীকে তুলে নিয়ে যায়, তাহলে তার পক্ষে থাকবেন নাকি বিপক্ষে থাকবেন? 


এবার প্রশ্ন হল স্টেটে ক্ষমতাসীন দল তার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে গোটা প্রশাসনকে দূর্নীতিতে নিমজ্জিত করে দূর্নীতিরাজ চালালে তার সমাধান কী হবে? স্টেটের সরকারের দূর্নীতির তদন্ত না হয় ইউনিয়ন সরকার বা যাকে আমরা ভুল অভ্যাসবশত কেন্দ্রীয় সরকার বলি তার এজেন্সি করবে, কিন্তু প্রশ্নটা হল যদি ইউনিয়ন সরকার একই প্রক্রিয়ায় ব্যাপক দুর্নীতি, গণহত্যা ইত্যাদি অপরাধ সংগঠিত করে, তবে তার তদন্ত কে করবে? 
 
ইউনিয়ন সরকারের অপরাধের তদন্ত বা অপরাধের প্রতিকারের ক্ষমতা জনতা ছাড়া আর কারও নেই, হয় জনতা নির্বাচনের মাধ্যমে শাসক দলকে ক্ষমতাচ্যুত করবে, নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে পুরনো অপরাধের তদন্ত করবে বা নির্বাচন ব্যবস্থাও যদি শাসক দল কুক্ষিগত করে ফেলে, তখন গণ-অভ্যুত্থান ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। 

এবার যদি ইউনিয়ন সরকারের অপরাধের প্রতিকারের দায়িত্ব দেশের জনতার ঘারে ছাড়া যায়, তবে স্টেটে নির্বাচিত সরকারের অপরাধের প্রতিকারের দায়িত্ব ঐ নির্দিষ্ট রাজ্যের জনতার উপর ন্যাস্ত করতে আপত্তিটা কোথায়? 

আলোচনায় ঢোকার আগে কিছু পরিভাষা বুঝে নেওয়া দরকার, যেমন- বাংলায় আমরা যাকে রাষ্ট্র বলি ইংরেজিতে সেটা স্টেট, হিন্দিতে সেটাকে রাজ্য বলে। বাংলায় রাজ্য বলতে আমরা যা বুঝি ইংরেজিতে সেটা প্রভিন্স হিন্দিতে প্রদেশ। বাংলায় আমরা যেটাকে জাতীয়তাবাদ বলি ইংরেজিতে সেটা ন্যাশেনালিজম হিন্দিতে রাষ্ট্রবাদ। 


এখান থেকে ভারতের রাষ্ট্র কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে আমরা প্রবেশ করতে পারি, যা ফ্যাসিবাদী উত্থানের সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেটা হল ভারতীয় কোনো একক জাতি, ভারত কোনো একক রাষ্ট্র বা স্টেট নাকি ভারত অনেক গুলো জাতিস্বত্বার সম্মিলন এবং স্টেট গুলোর একটি ইউনিয়ন? ভারতে কেন্দ্র সরকারটাই মূল সরকার আর রাজ্য সরকার তার অধিনস্ত কিছু নাকি রাজ্য সরকার গুলোর সমমর্যাদা আছে?

ভারতের সংবিধানে  ১নং ধারা কিন্তু ভারতকে স্টেট গুলোর ইউনিয়ন বলা হয়েছে। ভারতে বাঙালি আর গুজরাটির মধ্যে যতটা মিল বা মনিপুরী আর তামিলের মধ্যে যা মিল তার থেকে অনেক বেশি মিল ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানির মত জাতিরাষ্ট্র গুলোর মধ্যে আছে। সুতরাং ভারত সাংস্কৃতিক, নৃতাত্ত্বিক ভাবে কোনো জাতি নয়, অনেক গুলোর জাতির সম্মিলন, অন্যদিকে তাই রাজনৈতিক ভাবেও ভারত একক রাষ্ট্র নয়। স্টেট বা রাষ্ট্র গুলোর ইউনিয়ন। 

তাহলে প্রশ্ন ওঠে বাংলা হোক বা কেরল, কোনো রাজ্যের নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার বা ঔধত্য ইউনিয়ন সরকারের থাকা উচিত কিনা? বিশেষত যখন এটা খুবই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা, ED, CBI বা ক্যাগ এমনকি নির্বাচন কমিশনও শাসক দলেত কুক্ষিগত। আমলা তন্ত্রে ফ্যাসিস্ট দখলদারির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আমলাদের মধ্যে থেকেই উঠে আসছে। নজিরবিহীন ভাবে গত ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের চারজন বিচারপতি সাংবাদিক সম্মেলন করে সুপ্রিম কোর্টের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ঐ বছরই CBI এর ডাইরেক্ট ডেপুটি ডাইরেক্টরের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করলে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ডাইরেক্টকে পদচ্যুত করতে আসরে নামেন। গত লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে ঝাড়খণ্ড আর দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীকে নজিরবিহীন ভাবে গ্রেফতার করে কেন্দ্রীয় এজেন্সি৷ 

এটা স্পষ্ট যে মোদী সরকার শুধু কৃষি, শিক্ষা, শ্রম, কর সমস্ত বিষয়ে লোকসভায় সংখ্যা গরিষ্ঠতার জোরে আইন পাস করিয়ে রাজ্যের দায়িত্ব গুলোতে নাক গলিয়ে রাজ্য সরকারকে মূল্যহীন  করে দিতে চাইছে, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় এজেন্সি কে কাজে লাগিয়ে বিরোধী শাসিত রাজ্য সরকার গুলোকে সায়েস্তা করতে চাইছে।

এই ফ্যাসিস্ট কেন্দ্রীভবনের সময় ফেডারালিজমপন্থীদের সজাগ থাকতে থাকা জরুরি।  একদিকে নিজরাজ্যে অপশাসন দূর্নীতির বিরুদ্ধে রাজ্যের ভিতরে লড়াই জোরদার করা, অন্য দিকে এই দ্বন্দ্বের সুযোগ যাতে হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্থানী ফ্যাস্টিট শক্তি নিতে না পারে। বামপন্থীরা যদি সেটিং তত্ব আকড়ে ধরে মমতা ব্যানার্জিকে গ্রেফতারের জন্য জনমত গঠন করে ফেলে, তার পর সত্যি যদি নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীকে কেন্দ্রীয় এজেন্সি গ্রেফতার করে তবে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং রাজ্যের জন্য তার ফল হবে ভয়াবহ। কেন্দ্রীয় এজেন্সি নয়, রাজ্যের দল গুলোর নিজেদের সাংগঠনিক জোরের উপর নির্ভর করা প্রয়োজন। স্পষ্ট ভাবে বলা উচিৎ রাজ্যের সরকারকে রাজ্যের মানুষ উল্টাবে, ইউনিয়ন সরকারের নাক গলাবার প্রয়োজন নেই।

0 Comments

Post Comment