পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

যারে তুমি ফেলেছো পশ্চাতে

  • 26 March, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 281 view(s)
  • লিখেছেন : আয়েশা খাতুন
এই করোনা আক্রান্ত সময়ে গ্রামের মানুষজন কি করছেন? তাঁরাও কি ঘরবন্দী হয়ে আছেন? তাঁদের কি ঘরবন্দী হলে চলবে?

 

বেশিরভাগ গ্রাম তার কাজ নিয়েই ব্যস্ত।করোনা নিয়ে কথা বলতে গেলেই ওদের বেশির ভাগ মানুষ বলছে ‘ ধুর ধুর ধুর অসব আতান্দার কতা।
ঘরে কি কেউ কাম প্যাট থগিত রেখে ফ-ফ করে ঘুরে বেড়িনে মরে যাবো নাকিনে?উসব ক্যোরোন্যা মর‍্যোন্যা লিয়ে ভেবে সুময় লস্ট কততে প্যারবো না’।


এ জেলা সে-জেলায় নিজের কাজগুলো করতে করতে সময় শেষ। করোনা এবারে বাড়ির দোরগোড়ায়।তাই বেরিয়েছিলাম গ্রামের মানুষের ঘরে ঘরে করোনা নিয়ে বলতে গত ১০ মার্চ।কেউ কেউ দাঁড়িয়ে শুনলো কেউ কেউ বললো সত্যিই তো আমাদের কী হবে!কেউ বললো।ওগো কপালের ল্যাখন কে খন্ডাবে মা! লিজে হাতে ল্যাখন যতিবা ল্যাখে এনেছি তো আমাদের ওই কুর‍্যুনাতেই মত্তে হবে!অপরঅলা যতিবা চাই বাঁচাবে থালে বাঁচাবে।

বললাম হাদিস থেকে কোরান থেকে উদাহরণ তুলে তুলে । দেখো খোদার নবীরা কী কষ্ট করেছেন ,চেষ্টা করেছেন, তাহলে আপনিও চেষ্টাটা অন্তত করুন!

আমার করুণ মুখ দেখে কেউ কেউ বড়ো কষ্ট পেয়ে বললো ‘আচ্ছা গো আচ্ছা তুমি এতো ভেবো না,হাত ধুয়েই যা করার করব্যো মা’।

এবার ঘোষণা হলো লকডাউন। বাড়ি থেকে কেউ বেরোতে পারবে না।আমাদের এখন তৃতীয় সপ্তাহ চলছে , খুব দুঃসময়!বাড়িতে বসে আছি,আমাদের সমস্ত স্কুল ছুটি দিয়েছি মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার সঙ্গেই । হোস্টেল আছে তাই  অভিভাবকরা ঘন ঘন ফোন করছেন, করোনার সঙ্গে পড়াশুনার কী সম্পর্ক? ছেলেরা বড়ো দুষ্টু , বাড়িতে আটকে রাখতে পারছি না।আপনারা স্কুল হোস্টেল খুলুন।কেবল বুঝিয়ে যাচ্ছি, করোনা কী, কী ভাবে মানুষ থেকে মানুষের শরীরে চলে যায় । কীভাবে ফুসফুসে ঢুকে পড়ে, উপসর্গ কী, কী ভাবে মানুষ মারা যায়!সকলেই শুনে ফোন রেখে দেন। কিন্তু আবার তারা ফোন করেন। এতো এতো ছাত্র ছাত্রী, তাদের অভিভাবকরা ফোন করতেই থাকেন।আমরা যেন কন্ট্রোল রুম খুলেছি।কিছু করার নেই, বলতেই হবে।তাদের কাছে যে অন্য কোনো উপায়ও নেই।
যে সমস্ত ছাত্র ছাত্রীরা হোস্টেলে থাকে তারা এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ ঘরের ছেলেমেয়ে।বিপদ আপদ তাদের ঘরে তাদের সঙ্গেই বাস করে।তাদের কাছে এই করোনা এমন কোনো বড়ো কথাই নয়।হবেই না বা কেন! কঠিন অসুখের সময়ে তারা একাই লড়ে,একাই মরে। সেদিন পড়শিরাই সান্ত্বনা দেয়, কী করবে বলো তুমার ছেলে মারা গেলো তাতো অপরঅলার হুকুমেই।তার আর হায়াত ছিলো না।তানার ইচ্ছার বাইরে গাছের পাতা হিলে না।তুমি সবুর করো।সবুর করো।সুতরাং সবুর তাদের করতেই হবে।কিন্তু এই সামান্য বাড়ির বাইরে বেরোবো তো এতো কিসের কথা? কারো খায় না কারো পরে না। কেনে গো এতো গায়ে পড়ে উতগর কততে আচ্ছো বাছা!

এদিকে গরিবি আর জাতপাতের জন্য একটা সম্প্রদায় কেবলই পিছিয়ে যায়। কেবলই তাদের পিছনে ফেলে যে আমরা বহুদূর শিক্ষায় দীক্ষায় বিদ্বেষে এগিয়ে গেছি। আমরা তো  ঘরে বসে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর জাতির উদ্দেশে ভাষণ শুনছি। কিন্তু ওই যে যাদের ফেলেছি পশ্চাতে সেই ওরা জীবন বাঁচাতে,পরিবার বাঁচাতে চলে গেছে গ্রামের বাইরে বহুদূরে, আরো দূরে, ভিন রাজ্যে। ষাট থেকে দশ বছরের পুরুষ এবং ছেলেবাচ্চারা নিজের গ্রামের  সূর্য ওঠা সূর্য ডোবা দেখেনা । তারা ফিরেছে করোনার তাড়া খেয়ে। নামছে দলে দলে লরি থেকে । তাদের গ্রামে ফেরার কী উল্লাস! কে কাকে দেখে! এদের মধ্যেও পাওয়া গেছে সেই করোনার রঙ। এখন কী হবে!পুলিশ বিডিও এসে হাজির,তার মা লুকিয়ে দিয়েছে বাছাকে। মুখে  কালো মেঘের ছায়া। একটি ছেলের করোনা হয়েছে আর পুলিশ এসেছে সেই বাচ্চাটাকে নিয়ে যাবে। মা দাঁড়িয়ে বলে যাচ্ছে পাচুঠে রাতের কপালে ল্যাখোনের কথা । যমের দুয়ারে পড়ুক কাঁটা। কিন্তু এ কাঁটা যে তীক্ষ্ণ কাবাবের শিক। একটায় শান্ত নয়, এক সঙ্গে হাজার লাশ গাঁথার শক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

এদিকে গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা যাদের মায়েরা অতদূরে পাঠাতে চায়নি বাছাদের, সেই বাছারা গ্রামের ভিতরেই শুরু করেছে ছোটো ছোটো ব্যবসা।সেই পান গুমটি,বিড়ির দোকান,গলি তামাকের পাটা,মুদির দোকান, সিমেন্ট, রড,রং,রাজমিস্ত্রি, গ্রিল,লোহালক্কড়,সব খোলা।স্বাভাবিক নিয়মে নগদে ধারে মালামাল কেনার জন্য খরিদ্দার আসা-যাওয়া করছে। যারা রাস্তার তেমাথার মোড়ে দোকান করেছে তারা বন্ধ করেছে দোকানের ঝাঁপ। কিন্তু এই ভাবে তো চুপ করে ঘরে বসে থাকা যায় না তাই চলছে আড্ডা।ক্রিকেট খেলা,তাস পেটানো কেরামখেলা। পান চেবানো,তেরঙা চিবানো মুখ ভরতি থুতু রাস্তায়,নিজের উঠোনে ছড়ানো একই ভাবে চলছে।

রেশন দোকানে দুকেজি চাল,দু কেজি আলু আসেনি, গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ ভিড় করেনি এখনো ডিলারের দরজায়।ব্যাঙ্ক খোলা আছে, ব্যাঙ্কের কর্মী কোন কঞ্জিউমারকে ঢুকতে দিচ্ছেনা। ব্যাঙ্কে তাই তারা ভিড় করে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করছে কখন তার নাম ডাকে,গল্প,আড্ডা, মস্করা, বিড়ি পান সিগারেট খাওয়া,থুতু ফেলা হাত মেলানো দেদার চলছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাইকিং করছে প্রতিদিন।  স্কুলের  ছাত্র ছাত্রীদের কাঁচা চাল কাঁচা আলু নিয়ে যাবার জন্য ডাকা হচ্ছে। বাচ্চারা ঝোলা নিয়ে লাইন দিয়ে হাজির ,সঙ্গে তাদের মা দাদু,ঠাম্মা,দাদিও হাজির। ভালোই ভিড় প্রাইমারি স্কুলগুলোতে। মসজিদে নিজের গরজে আজান দেয়া মুসোল্লিরা ঠিক  হাজির।আর হবেই না বা কেন !  উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীও সমস্ত লক ডাউন অমান্য করে রাম মন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য শুরু করলেন অযোধ্যায় পূজাপাঠ।

কে কার কথা শোনে?গ্রামের কথা হলো, মেয়েমানুষ কোনো কথা বলবে না। তারা কিছুই জানেনা। আরো সহজ গল্প  হলো মেয়েমড়োলি ধ্বংসের কারণ।তাছাড়া মেয়েদের কথা যদি বা শুনতেই হয় তাহলে মমতার কথা শুনবো। আমাদের মমতা আছে।আমাদের কিছুই হবে না।

বললাম মমতাদিদিই বলেছেন ঘরে থাকতে, টিভি দেখুন,খবর দেখুন। তিনি কি ভাবে মুখে ফেনা উঠিয়ে ফেলেছেন শুধু আপনাদেরকে,সকল স্থানের সকল মানুষদের ঘরে থাকার অনুরোধ করতে করতে।

ওরা বলল, উসব বেরাম ক্যোলক্যাতাতে হয়,তিনি ক্যোলক্যাতার লোকদের  ঘরে থাকতে বল্যেছ্যেন।

 

 

থানাকে ফোন করেছি,তারা নিজে থেকেই আট লিটার পেট্রোল বা ডিজেল তেল নিয়ে আর কতোদূর দৌড়াতে পারেন! তারাও এখানে সেখানে লাঠিচার্জ করেই যাচ্ছেন।ছাগল তাড়ানোর মতো অবস্থা।যেখানে লাঠি ঘুরছে সেই রাস্তা ফাঁকা, কিন্তু গ্রামের ভিতর যেমন আছে তেমনি । এতোবড়ো গ্রামবাংলার রাস্তা নির্জন করা কি মুখের কথা! রাস্তার এপ্রান্তে পুলিশ তো ওপ্রান্তে মানুষের জটলা।

মাকু হেমরমকে ফোন করলাম। ঘন ঘন কনফারেন্স কল করছি আমাদের সকল কলিগদের মধ্যে। মাকু  একজন শিক্ষক। তিনি জানালেন দিদি আমাদের বাহা পরব চলছে । কিন্তু কী করব, আমার কথা কেউ শোনে না।
বাহা পরব তো বসন্ত উৎসব।আদিবাসী মানুষের আকাশে কোনো ঈদের চাঁদ ওঠে না আবার নবমি দশমীর হিসাব চাঁদ দেখে হয় না, তাই তাদের গ্রামের সকলের যখন অবসর আছে, সেই সময় দেখে বাহা পরবের দিন ঠিক হয়েছে।ধান কাঁটা মাড়া করে মুনিবের গোলায় তুলে দিয়েছে, আলু সরশে তুলে দিয়ে এই সবে গ্রামে ফিরেছে । এখনি তো বাহা পরব করার দিন ধার্য হয়েছে দিদি। এক এক আদিবাসী গ্রামে এক এক সময়ে হবে। শাল ফুল এসে যাচ্ছে। ফুল যদি না আপন করি ঘরে যে ফল আসবে না।জাহের থানে পুজো করে তিনদিন থেকে জঙ্গলে গিয়ে শাল গাছের গোড়ায় কজড়ের খুপড়ি বানিয়ে সেই শাল ফুলের আনাগোনা দেখে কিছু ফুল তুলে আঁচল ভরে মাঝিহাড়াম জাহের থানে বসে আছে । তিনদিন না খেয়ে আছে এখুন সবার ঘরে দু-ছড়ি শালফুল পৌঁছে দেবে। সেই ফুল সারা বছর ঘরনি তার ছামু চালের পরলে গুঁজে  রেখে দেবে গোটা ঘরের মঙ্গলের জন্য।এমন স্যাতের ফুল নেবার জন্য ঘরওলিরা অঞ্জলি বাড়িয়ে আছে মাঝিহাড়ামের দিকে।এখন বারণ ‘করোনা’।আমাদের দলে থাকতে দাও!আমাদের পিড়াহড়দের আসতে বলেছি এদেলবাহা চুলে গুঁজে  সেরেঞ্জ করবো।বারণ ‘করোনা’ গো!

শুধুকি তাই দিদি,ঘাস কেটে আনতে হবে , তবেই মেরম ভিড্ডি গুলান বাঁচবে। খরার ধান লাগালছি মুনিবের মাঠে,আমরা কিরসেনিতে করেছি, ভুঁই লিড়েইতে হবে,মাঠে বাতান দিতে হবে,বড্ডো কষ্ট কততে হবে,তবে তো কেষ্টর মুখ দেখতে পাব্বো।আর তুরা বলছিস উড়াতে ঢুকে থাক। উড়াতে দুড়ু কর।হ্যাঁগো এখুন কি উড়াকুড়ি লিয়ে ব্যসে থাকার দুড়ু করার সুময়?মাকু কথা গুলো জানাতে জানাতে সেরেঞ্জ গেয়েই উঠল।আমি ঘামছি,মুরারই বাহাদুরপুরের দুটো মানুষের শরীরের করোনার জীবাণু নাকি পাওয়া গেছে বলে শুনছি।ভাবছি এমন আকাল ভরা গ্রাম বাংলায় করোনা আসছে।অথচ এ কী ছেলে খেলা! তাহলে কুকুর বিড়াল গোশালার গরুর মতো মানুষ মরে ভ্যাটভ্যাট করবে গ্রামগুলোতে!

এখন তো ঘরের মধ্যে থাকার সময়।কী করবো কেউ কি বলতে পারেন?

0 Comments

Post Comment