পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

অরাজনীতির রাজনীতি

  • 18 May, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 645 view(s)
  • লিখেছেন : নিশান চট্টোপাধ্যায়
মধ্যবিত্ত ঘরে বসে। লকডাউন ডিপ্রেশন উদযাপন করছে। আর লক্ষ লক্ষ শ্রমিক হেঁটে চলেছেন অনন্যোপায় হয়ে। মৃত্যুমিছিল চলছে। এরই মাঝে রামমন্দিরের টাকার বন্দোবস্ত হয়েছে। দেশের সবকিছু বিক্রি করা হয়েছে। আমাদের হেলদোল নেই। এই নিয়ে পরে আলোচনা করব, কিন্তু আদত সত্যিটা একটু বলে যাই। সেটা হোলো আপনার আমার এখনও শোকের অবকাশ আছে। ভয়ানক ডিপ্রেশন হলে এই খবর এড়িয়ে যাবার ক্ষমতা আছে। অনেকের নেই। শ্রমিকের নেই।

পরিভাষা খুব মারাত্মক জিনিস। পরিভাষা তৈরী করার সময়ে আমরা অনেক সময়ই শব্দের মূলটুকু হারিয়ে ফেলি। এরকম একটা কথা 'রাজনীতি'। রাজ অর্থে রাজা, নীতি অর্থে যা বোঝা গেলো তাই। ফলে রাজনীতি মূলগত ভাবে রাজার নীতি। এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়ালে যে 'রাজ' করে তার নীতি। অর্থাৎ শাসনবিধি, রাজ্যচালনা ইত্যাদি।

শব্দটার সবই ঠিক আছে, খালি শুনলে মনে হয় আমার আপনার দায় নেই বিশেষ। দায়টা শাসকের বা যে শাসক হতে চাইছে তার...

অন্যদিকে ইংরাজি শব্দটির দিকে আমরা তাকিয়ে দেখলে দেখি, কথাটি পলিটিক্স। কোথা থেকে এলো? গ্রীক পোলিস মানে শহর, সেখান থেকে পোলিটেস অর্থাৎ নাগরিক সেখান থেকে পোলিটিকোস অর্থাৎ নাগরিকের আচরণবিধি নীতি ইত্যাদি... সেই পোলিটিকোস লাতিনে ঢুকে রূপ বদলায়নি। সেখান থেকে  ফরাসীতে ঢুকে পোলিতিকে, সেখান থেকে মধ্য ইংরাজির পলিটিক এবং আজ পলিটিক্স।

লক্ষণীয় ইংরাজি শব্দটির মধ্যে নাগরিকের দায়িত্বটি ঢুকে বসে আছে যা আমাদের পরিভাষায় নেই।

ফরাসী বিপ্লবোত্তর বাস্তবতায় আমরা লক্ষ করি সেইটিই আদত। লোকের হাতে ক্ষমতা দেওয়া এবং ক্ষমতার ব্যবহার জানা। অর্থাৎ পলিটিক্স মূলগত ভাবে নাগরিকের দায়। পক্ষান্তরে রাজনীতি রাজার দায়, এখানেই তফাৎ। যাইহোক পরিভাষা যাই হোক না কেন আমরা রাজনীতিকে পলিটিক্স হিসাবেই দেখবো এবং আমরা এখানে ধরে নেবো রাজনীতি পলিটিক্সের বাংলা এবং আমরা ধরে নেবো 'পলিটিক্স' কথার সমগ্রতা রাজনীতির মধ্যেও বিধৃত থাকছে।

বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখলে আমরা দেখতে পাই সেখানে জনতার দাবী খুব কম রাখা হয়। জনতা ভাবে তার একটা কোনো এজেন্ডা আছে, বা তাকে ভাবানো হয়, এবং সে তার পেছনে দৌড়তে শুরু করে। যাকে বলে পপুলিস্ট পলিটিক্স, হা কপাল। জনমোহিনী রাজনীতি। আমাদের সময়ে দাঁড়িয়ে তাই রাজনীতি জিনিসটারই মূল্য হারিয়ে গেছে। আমরা রাজনীতি বলতে একটাই জিনিস বুঝি, তা হোলো আকচা আকচি। আর ভোটের জেতা হারা প্রায় ফুটবল খেলার মত উত্তেজনাকর হয়ে দাঁড়ায়। একই ধরণের খিস্তাখিস্তি হয়ে থাকে কিন্তু যেহেতু একটি বিপুল পরিমাণ অর্থ ও ক্ষমতা এই খেলার সাথে জড়িয়ে থাকে সেজন্য লাশ টাশও পড়ে।

রাজনীতি মানেই একটি নোংরা খেলা। এবং ক্রমশঃ পিতা মাতা ভ্রাতা সকলে শেখান "বাবু রাজনীতি কোরো না, গেছো পড়তে, পড়ে ফিরে আসবে"... আমরা লক্ষ করলাম না এর মধ্যেই রাজনীতি ঢুকে বসে রইলো। ধীরে ধীরে আসি। ধাপে ধাপে।

নারীবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গে একটি কথা উঠে আসে 'পার্সোনাল ইজ পলিটিক্যাল' অর্থাৎ ব্যক্তিগতও আসলে রাজনৈতিক। নব্য উদারনীতির যুগে জন্মানো রিকশাওয়ালা হতে চাওয়া নব্য আঁতেল বাবুরা বলবেন, দু পেগ ঢেলে নিয়ে " আমি এসব মানি না "...  কিন্তু ঐ না মানার মধ্যেও রাজনীতি ঢুকে আছে।

আসলে মানুষ সামাজিক প্রাণী। আমরা জঙ্গলে একা থাকলে বাঁচার সম্ভাবনা বেশ কম। আমরা সমাজে বাস করি। আমরা সমাজে বাস করি বলেই আমাকে চাষ করতে হয় না, খাবার উৎপাদন করতে হয় না, অনেককে শিক্ষকতা করতে হয় না, না করেই চলে যায় আর কি। ঠিক সেই কারণেই আমাদের সত্যগুলি সামাজিক সত্য। যে চেয়ারে বসে যেই ফোনে আমি এই লেখা টাইপ করছি সেই ক্ষুদ্রতম কাজটিই আমাকে বিশ্ব সমাজের সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছে। প্রতি মুহূর্তে। আমি চাই বা না চাই। আসলে শিক্ষকতা করতে গিয়ে দেখেছি আমাদের শিক্ষার ধারণা মূলতঃ গাঁতিয়ে নাম্বার পাওয়া। একটা বিষয়কে বোঝার ক্ষমতা তাতে তৈরী হয় না। ধরা যাক, নিউটনের প্রথম সুত্র: বাহির হইতে প্রযুক্ত বল ব্যতিরেকে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির ও গতিশীল বস্তু চিরকাল সমবেগে সরলরেখায় গতিশীল থাকে। স্থির কী? স্থির বলে কিছু হয়? হয় না। স্থির বা অস্থির সবসময় পারিপার্শ্বের উপর নির্ভরশীল।

যেমন ট্রেনে চাপলে আমার সহযাত্রী আমার সাপেক্ষে স্থির এবং বাইরের গাছটি আমার সাপেক্ষে গতিশীল। সরলরেখাই বা কী? অঙ্কের লোক হলে জানেন সরলরেখা আইডিয়া মাত্র, সংজ্ঞা হয় না, অন্য কেউ অন্য কিছু জেনে থাকলে আপনি ভুল জানেন।

অর্থাৎ এই সুত্রটি একটি কাঠামো বিশেষ। আদি সত্য। এখনও অব্দি জ্ঞাত বিজ্ঞানমতে দৃশ্যমান জগতের আদি সত্য গোছের। এইটুকুই। তেমনই আমাদের যে নিজেকে একক স্বয়ম্ভু মনে হয়, তাও একটি বিমূর্ত আদি সত্য বিশেষ। আদি সত্য বটে কিন্তু সেই সত্যে উত্তীর্ণ হবার পথে আপনি একা নন। কেউ অত আধ্যাত্মিক না।

এই গেলো একটি দিক।

দ্বিতীয়ত ছোটবেলার অঙ্ক বইতে সব জিনিস সরলরেখায় চলতো বলে বাস্তবে চলে কি? না! ওটা বাচ্চাদের বুঝতে সুবিধার জন্য। বাস্তব অনেক জটিল। অনেক জিনিস হয়। বাস্তব সম্ভাবনাময় এবং সেইজন্যই স্ট্যাটিস্টিক্স পড়া ভালো। যদিও বিষয়টা বুঝলে প্রথমেই বোঝা উচিত অ্যাবসোলিউট ট্রুথ বলে কিছু হয় না। প্রতিটি সত্যই অনেক ধাপে গঠিত হয়।

যিনি এইজায়গায় আসতে পারেননি তিনি নিজের মতকেই সারসত্য মনে করেন। একই চর্বিতচর্বণকে মনে করেন নতুনত্বের চর্চা। যেমন কুলনেস, টোন টিটকিরি, অবাধ নিহিলিজম, সিনিসিজম...  মুশকিল হচ্ছে সাধারণত এই জিনিসগুলি চলে নিজে হুড়কো খাবার প্রাকমুহূর্ত অব্দি।

তো যা বলছিলাম। প্রথমে শিক্ষার রাজনীতিতে আসি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় মূলত আত্মসারশূন্য রোবট তৈরী হয়। তারা ভাবতে শেখে না। তারা ভাবে তার আশপাশটাই জগৎ। এই মহাবিশ্বের যে অসীম বৈচিত্র যার প্রতিফলন মানুষের গোষ্ঠীবদ্ধ সিংক্রোনাস মোশনের মধ্যে, সে সেই বাস্তবতা থেকে বিচ্যুত হয়। সে বিচ্যুত হয় প্রকৃতির থেকে, চিন্তার থেকে, কৌতুহলের থেকে, নিরন্তর জিগীষা, নিরন্তর চেতনার থেকে। সে কৌমচেতনা ছেড়ে দেয়, কিন্তু পাশব প্রবৃত্তি তাকে বাধ্য করে একটি নিজের গোষ্ঠী তৈরী করে নিতে। যেখানে সে তার এবং তার মতোটুকুকেই বোঝে, দ্যাখে। সঙ্গে চলে সরলীকরণ। নিজের মতোটুকুর বাইরে যারা তাদেরকে সে মানুষ মনে করে না। তার মানসজগতের মূঢ় একচোখো বাস্তবতায় তারা দ্রব্য বিশেষ।

শ্রেণী, লিঙ্গ, ধর্ম, জাত, জাতি, ভাষা... সবক্ষেত্রেই সে এগুলি করে থাকে, কোনটায় কম, কোনটায় বেশী, কোনোটাই হয়তো নেই।

অনেক মেয়েকে দেখি তারা ফেমিনিজম বোঝে, ক্লাস বোঝে না। অনেক শ্রমিক মেয়েদের টোন টিটকিরি কাটে। অনেক শ্রমিক বস্তিতে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা হয়... এভাবেই মানুষ নিজের পরিচিতির বৈশিষ্ট্যে আটকে থাকে।

এর মাঝে, এই রাজনীতির মাঝে বসে আছে মধ্যবিত্ত বা মিডল ক্লাস।

প্রথম প্রশ্ন মধ্যবিত্ত কী বা কারা? আমি নিজে মধ্যবিত্ত। কিন্তু জিনিসটিকে আরেকটু খুঁটিয়ে দেখা কি সম্ভব?

মার্ক্স যাকে শ্রেণী বলছেন তা উৎপাদন ক্ষমতার নিরিখে। মার্ক্সীয় তত্ত্বে শ্রেণীর দুরূহ বিভাজন শেষে এসে সরলায়িত হয় দুটি শ্রেণীতে, উৎপাদক ও মালিক। প্রলেতারিয়েত ও বুর্জোয়া। কিন্তু সেও নিউটনের ফ্রেমওয়ার্কের মত।৷ লক্ষ রাখা ভালো মার্ক্স দাবী করেননি এখনই সেটা হয়ে গেছে বা যাবে। মার্ক্স অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে দেখছেন একটি "রিয়াল ডাইনামিক্যাল সিস্টেম" হিসাবে। এখানে রিয়াল অর্থে রিয়াল নাম্বার। ডাইনামিক্স মূলত ঠিক করে একটি বিশেষ প্রবণতা ক্রমাগত চললে শেষে কোনদিকে যায়। মার্ক্স যখন ইংল্যান্ডে তখনই তাঁর কাজগুলি অর্থনীতি কেন্দ্রিক, সেসময় ইংল্যান্ডে লোকে অঙ্ক বলতে বুঝতো দর কষাকষি।  যাই হোক, ডাইনামিক্সের দৃষ্টিতে একটি প্রবণতা ক্রমাগত চলতে থাকলে সিস্টেমের মধ্যের বিন্দুগুলি নানা দিকে ক্লাস্টার বা জোট তৈরী করে। মার্ক্স এই এন্ডগেমের কথা বলেছেন।

এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তাই এই বিভাজন করা খুব দুষ্কর। অনেকেই ভাবেন বুর্জোয়া মানে মধ্যবিত্ত। দুঃখের বিষয় তা আদতে সত্যি না। জেফ বেজোস বা বিল গেটস বুর্জোয়া। অকারণ নিজেকে বুর্জোয়া ভেবে আত্মপ্রসাদ বা দুঃখ পাবেন না। আপনি আমি বুর্জোয়া না, পাতি বুর্জোয়া বা পেটি বুর্জোয়া।

আজকের যুগে দাঁড়িয়ে আমরা অন্য নামে এই সম্পর্ককে চিহ্নিত করতে পারি, এমপ্লয়ার ও এমপ্লয়ি। এমপ্লয়ার মানে ছোট ব্যবসায়ীও হতে পারেন কিন্তু সে একটা ছুটকো বৈশিষ্ট্য। বিশ্বপুঁজির এই যুগে আপনি এমপ্লয়ার সন্ধান করতে চাইলে আপনাকে যেতে হবে অনেক দূর। প্রতিটা কম্পানিকে ট্র‍্যাক করুন। ট্র‍্যাক করলে দেখবেন সবার মাথা বাঁধা আছে খুব কম কিছু কম্পানির হাতে। অক্সফ্যামের রিপোর্ট অনুযায়ী পৃথিবীর ৭০% এর উপর সম্পত্তি আছে মোটামুটি ১% কি তারও কম লোকের হাতে।

এই অবস্থা কি ছিলো? না ছিলো না। কারণ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভোলিউশনের পরের যে দুরবস্থা তার নিরসন হয় দুটি বিশ্বযুদ্ধ পেরিয়ে। অনেক প্রোটেকশন আসে। এবং সাগরপারে তারও আগে এসেছে আমেরিকা। সাদা লোকের সাম্রাজ্য, লোকাল লোককে সরিয়ে। আমেরিকায় অনেকগুলি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য ছিলো, যে কারণে কার্ল মার্ক্স আমেরিকান রেভোলিউশনকে বিস্তর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। প্রথমত গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা এবং ফেডারাল স্ট্রাকচার। কুলোকে বলে সেটাও নেটিভ আমেরিকান দের থেকে ঝাঁপা আইডিয়া। এর চেয়েও বড় কথা দেশ বানাতে গেলে শ্রম চাই। শ্রমিক অপ্রতুল। এর সমাধান আমেরিকার উত্তর দিক করে ক্রমাগত বাড়া মাইনের মধ্যে দিয়ে আর দক্ষিণ দিক করে দাসপ্রথার মাধ্যমে। আমেরিকা টুক টুক করে এগোচ্ছিলো ভালোই। মাঝে আবার ১৯১৯-এ রুশ বিপ্লব, সোভিয়েতের আগমন। এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েতের এবং ইউরোপের ব্যপক ক্ষয়ক্ষতি এবং এই সময়েই উঠে আসে সুপারহিরো আমেরিকা।

সোভিয়েত যখন প্রায় হেজে গেছে, বাঙালী মডার্ন কাকুরা প্রায়ই বলতেন ক্যাপিটালিজমই আসল কথা, কারণ আমেরিকা এই , আমেরিকা সেই... আর ক্যাপিটালিজম একটি বৃহৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে পোষণ করতে পারে।

এই হোলো মধ্যবিত্ত। সর্বহারা আর মালিকের মাঝের বাফার জোনই মধ্যবিত্ত। উচ্চবিত্তের সময় নেই, নিম্নবিত্তের ক্ষমতা। মধ্যবিত্তের সবই হাল্কা হাল্কা আছে। অতএব এই সমাজে কেচ্ছা টু কেলেঙ্কারি টু বোদ্ধাপনা প্রবলাকার ধারণ করে। শ্রেণীগত দিক দিয়ে যখন মধ্যবিত্তের কথা বলা হয় তখন শ্রেণী অর্থে সামাজিক স্তরকে বোঝানো হয়। উৎপাদনের সঙ্গে তার কোনো সম্বন্ধ নেই।

এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী মূলগত ভাবে না ঘরকা না ঘাটকা। আমিও তাই। আমাদের একটি শ্রেণী কেবল মাত্র আত্মস্বার্থে নিরত, তাঁরা মনে করেন তাঁরাও চেষ্টা করলে একদিন সফল ও ধনী হবেন। আরেকটি শ্রেণী মনে করেন তাঁরা সর্বহারার রক্ষার দায়ভার নিয়ে সকলকে ধন্য করেছেন।

এই ধন্য করার যে মনোবৃত্তি, এর মূলে রুশ বিপ্লব। আমেরিকান বিপ্লব যদি সেই আমলের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে থাকে, বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা রুশ বিপ্লব। লেনিন এর পুরোধা৷ একজন পাঁচফুট তিন ইঞ্চির টেকো লোক দুনিয়া কাঁপানো একটি বিপ্লবের নায়ক ছিলেন। আরো অনেকেই ছিলেন। কিন্তু লেনিনের দূরদৃষ্টি, নেতৃত্বের ক্ষমতা লেনিনকে তুলে ধরে।

লেনিন আনেন ভ্যানগার্ড থিওরি। মধ্যবিত্ত বিপ্লবী অংশ। কিন্তু লেনিনকে এমনি এমনি মহামতি লেনিন বলা হয় না। লেনিন সেই সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাথা। লেনিন স্পষ্ট জানতেন সোভিয়েত সমাজতন্ত্র না।

আমরা সাধারণত লেনিনকে দেবতা বানাই। লেনিন নিতান্ত মানুষ। বিড়াল ভালোবাসতেন। বিষ্ণু দে'র একটা কবিতা আছে, পড়ে দেখবেন।

রাশিয়ার বিপ্লবের অনতিবিলম্বেই দেশে দেশে তৈরী হয় কমিউনিস্ট পার্টি। ভারতেও তার ব্যত্যয় হয়নি। মুশকিল হোলো এর প্রতিটি পার্টিই মূলগত ভাবে পেটি বুর্জোয়া। শ্রমিক ক্যাডার হয়তো, লিডার খুউউউউউউউব কালে ভদ্রে। মহামতি মার্ক্স যে বলেছিলেন "সেল্ফ ইম্যানসিপেশন অফ দ্য ওয়ার্কিং ক্লাস" বা শ্রমিক শ্রেণীর আত্মোত্থান, সেটা হারিয়ে গেল। বিশ্বের প্রেক্ষাপটেই তাই হয়েছে। কিন্তু ভারতে বিশ্বের বাবা হয়েছে।

ভারতে শুরুতে ছিলো সিপিআই, এর পর ভেঙে সিপিআই সিপিএম, এরপর ভেঙে সিপিআইএমএল... এর পর ৫ জন করে লোক নিয়ে প্রায়শঃই একেকটা দল তৈরী হোতো, এখনও হয়। সাদা বাঙলায় এদের কারোরই ফাটছে না তো, সবাই নিজেদের মনে করে ফাটায় ব্যাণ্ডেজ দিচ্ছে। স্বভাবতই নানা তাত্ত্বিক আলোচনার আর বিভেদের সুত্র থাকে। মাঝখান থেকে শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ হারিয়ে গেলো।

জাম্প কাট...

কালে কালে সোভিয়েত গ্যালো ধ্বসে। চীন যে কী জিনিস সে বলাই বাহুল্য। নর্থ কোরিয়া কাম্বোডিয়া সব চুলকে চুয়াল্লিশ। সোভিয়েত হারানোয় অধিকাংশ কমিউনিস্ট পার্টি বাবা হারানোর বেদনা পেলো। আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ হোলো। আরো কত কী...

ভারতে কেরালায় বাংলায় সিপিএম এলো। আঁতেলরা রইলো সিপিআই তে, লড়াকুরা নকশাল, মাঝে সিপিএম।

এখানে আমি সিপিএম সমালোচনা করতে আসিনি। খালি একটি ট্রেন্ডের কথা বলি। এরই মধ্যে বাজারে এসেছে নিও লিবারাল ইকোনমি। নিও লিবারাল ইকোনমি কেনসিয়ান ইকোনমির কাউন্টারে দাঁড়িয়ে অর্থাৎ প্রাইভেটের যে অপরিসীম গুরুত্ব তার স্তুতিগাথা  গাইছেন এর প্রবক্তারা। আমেরিকায় গ্রেট ডিপ্রেশনের আমলে শ্রমিক সংগঠন, কমিউনিস্ট পার্টি এবং সোশ্যালিস্ট পার্টির যৌথ ব্যাম্বুতে রুজভেল্ট বাধ্য হয়েছিলেন নিউ ইকোনমিক পলিসি আনতে। যার ফল আজকের হাইওয়ে সিস্টেম (টোল ফ্রী) যার ফল পোস্টাল অ্যাক্ট অনেককিছু... নিও লিবারেলিজম এই জিনিসের মাজা ভেঙে দ্যায়। ধীরে ধীরে সে বিশ্বকে গ্রাস করে। মধ্যবিত্ত শুরুতে কাঁচা পয়সা পায়, এবং পয়সার মোহ সাংঘাতিক জিনিস। লোভ আকাশ থেকে পড়ে না। নিও লিবারেলিজমে যদিও নতুন বা লিবারাল, কোনো জিনিসটাই ছিলো না। নিও লিবারেলিজম আমাদের শেখায় মানুষ আসলে চূড়ান্ত যৌক্তিক এবং চূড়ান্ত স্বার্থপর একটি প্রাণী। কারণ অর্থনীতি একা আসে না, সে সঙ্গে নিয়ে আসে আইডিওলজিকে। সেই আইডিওলজি আজ বিশ্বব্যপী...  সঙ্গে এসেছে প্রযুক্তির উন্নতি। কালে কালে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, আই এম এফ এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক দুনিয়ার অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে থাকে।

এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে দেশ বা রাজ্যের কনসেপ্ট অচল। একটি দেশের সার্বভৌম সরকারের নীতিও স্থির হয় এদের অঙ্গুলিসংকেতে। এবার ভাবুন তো, একটা কি দুটো রাজ্যে সিপিএম এসে ঠিক কোন বিপ্লবটা করবে? কীভাবে করবে?

সিপিএম ভালো করতে চাইলেও ভালো করতে পারতো না। তার উপর বাংলার সিপিএম আমলে বড় হওয়া আমার সন্দেহ আছে আদৌ কতটা ভালো চাওয়া হয়েছিলো। সালেম টাটা এইসব তো আছেই, সঙ্গে সিপিএমের ধনী নেতারা আছেন। সিপিএমের বিপ্লব আটকে গেছে মার্ক্স মহোদয়ের হাফ কোটেশনে। তাঁরা এও ঠিক করে দেন জনগণের কী চাওয়া উচিত। বাংলা তার উপর আবেগী জায়গা। লোকে যখন তখন গান গায় আর কাঁদে। ফলে কালে কালে কমিউনিস্ট কথারই মানে বদলে গেলো। পার্টি লাইন উধাও। শেষে তৃণমূল। অনেক বুদ্ধিজীবি বললেন তৃণমূল নেত্রীই আসল কমিউনিস্ট।

নকশাল আন্দোলনের দিকে দেখলে আমরা দেখি "এ যৌবনজলতরঙ্গ রুধিবে কে?" কিন্তু নকশাল আন্দোলন আবেগসর্বস্ব অনেকটাই। চারুবাবুর অজস্র ভ্রান্তির মধ্যে একটি গণ সংগঠনের গুরুত্ব অস্বীকার করা। কিন্তু একটি কথা ভুললে বা না তুললে অবিচার হবে, তেভাগা তেলেঙ্গানা খুব গুরুত্বপূর্ণ হলেও নকশাল আন্দোলনের গুরুত্ব একটি জায়গায়, সে হোলো রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের লড়াই। এই দাবী ভূভারতে এর আগে ওঠেনি। নকশাল আন্দোলন সফল না ব্যর্থ সেই প্রসঙ্গেও যাবো না... চৌ এন লাইকে চীন বিপ্লবের পর একজন জিজ্ঞাসা করেন "ফরাসী বিপ্লবের গুরুত্ব কী", চৌ এন লাই উত্তর করেন " It is too early to say"... আমিও সাফল্যের দিকে যাবো না। কিন্তু নকশাল আন্দোলন পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সাহিত্য শিল্প থেকে আমরা দেখি একটি ব্যপক পরিবর্তন। সেই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যে দাবী করে তৃণমূলই কমিউনিজমের পুরোধা, তার বোধশক্তি সম্বন্ধে সন্দিহান হওয়া বাতুলতা না।

কিন্তু ঐ, শিক্ষা। যে শিক্ষা শুধু মুখস্থ করতে শেখায়, সেই শিক্ষায় বোধ গজানো অসম্ভব। আমাদের প্রজন্মের বাপ মা ছেলেমেয়েকে বলে গেছেন পড়াশোনা করো, রাজনীতি করতে যেও না। সঙ্গে সেন্টিমেন্টাল সিনেমা। সঙ্গে হিরোইক সিনেমা, যেখানে একজন ত্রাতা এসে সব সমস্যা নিরসন করেন... সবে মিলে আজ আমরা এই জায়গায়। আমাদের প্রজন্ম সেল্ফ মেড বড়লোকে বিশ্বাস করে, প্রফিট মডেলে বিশ্বাস করে, বিশ্বাস করে তারাও একদিন ধনী হবে, বিশ্বাস করে তারাই শ্রেষ্ঠ... এদিকে বাস ভর্তি করে কলেজের ছাত্রছাত্রী যায় তৃণমূল বিজেপি সিপিএমের র‍্যালিতে, তাদের ধারণাও নেই র‍্যালিটা কী নিয়ে। রামকৃষ্ণ মিশনে যেমন রাজনীতি করা মানা, এদিকে মিশনের টঙে কোন লেভেলের ক্ষমতাদ্বন্দ্ব চলে মিশন ফেরত চক্ষুষ্মান লোকে ভালোই জানেন। কদিন আগে মোদীর সঙ্গে দাঁত কেলিয়ে সাধুদের ছবিও দেখলেন। রাজনীতি এদিকে অস্তিত্বহীন যদি হয়, তাহলে মোদী ঠিক কোন দিক দিয়ে হিরো? তাহলে দাঁত ক্যালালেন ক্যান?

শিক্ষার এই রাজনীতিশূন্যতা তাই জন্ম দিয়েছে একটি স্বার্থপর অরাজনৈতিক প্রজন্মের। যারা কিছুতেই রাজনীতি দ্যাখে না প্রায়।

এবার আসি একটু লিঙ্গ রাজনীতির কথায়।
পিতৃতন্ত্রে ক্ষমতাসীন লিঙ্গ কে? পুরুষ। তা সে কাউকে রেপের হুমকি তো আগেই দিতে পারতো, চিরকাল দিয়েই এসেছে। এটা কি বাকস্বাধীনতা নাস আদিম অ্যাবিউজ!  আদ্দেক বোঝায় এই সমস্যাটাই হয়। অভিজিত নোবেল পেলে তার কোন বৌ ডবকা আর কোন বৌ শুকনি জেনে গেলাম এইসব জায়গায়, এও বিরাট বিপ্লব যদিও। কিন্তু দুশ্চরিত্র জমিদার লেভেলের এই ইয়ার্কিতে বিপ্লব কোথায় আমার বোঝা হোলো না আর।
বাকস্বাধীনতা কাকে বলে? বাকস্বাধীনতার অর্থ যা খুশী বলার অধিকার। বুর্জোয়া গণতন্ত্রের একটি অনন্য সম্পদ এই বাকস্বাধীনতা। দুর্বলের কণ্ঠ সবল চিরকালই রোধ করে এসেছে। আগে রাজার বিরুদ্ধে কথা বললে লোকে ফাঁসি যেতো। আজকাল সাধারণত যায় না। মূলে ঐ বাকস্বাধীনতা। যা দুর্বলকে বিনা ভয়ে নিজের মত রাখতে দেয়।

সে মত সবলের বিরুদ্ধে গেলেও। সাধারণ বোধ বলে সবলের পক্ষের মত রাখলে সবল ঝামেলা করে না। করে উল্টো মত রাখলে।

যাই হোক বাকস্বাধীনতা দুর্বলের নিরাপত্তা। সবল বা ক্ষমতাশীলের ওটা লাগে না। সে এমনিই বলতে পারে।

এরপরেও লোকে বয়েজ লকার রুম নিয়ে লোকে আশ্চর্য হয়। সত্যিই তো সোনা ছেলেগুলো, আসল ডাইনী মেয়েগুলো। আজকাল আবার তৃতীয় লিঙ্গও উঠেছে, তাদের কেন আমরা ছক্কা বলবো সেই নিয়েও বক্তব্য দেখে ফেল্লাম।

সঙ্গে আছে নারী পুরুষে সমান খিস্তির অধিকার, যদিও সামাজিক স্তরে ক্ষমতার বিভিন্নতা আছে। বা ভারতে মুসলমান মৌলবাদের চেয়ে হিন্দু মৌলবাদ ঢের বিপদের হলেও আপনাকে প্রকৃত অরাজনৈতিক এবং নিরপেক্ষ হতেই হবে।

যে সমাজ নিজে নিরপেক্ষ না, সেখানে নিরপেক্ষতার মানে আপনি ক্ষমতাবানের দালাল। সংখ্যাগুরুর দালাল। এবং আপনার নিজের প্রিভিলেজকে আপনি অধিকার বলে জেনে এসেছেন। তার ব্যত্যয় হলে আপনি যেন তেন প্রকারেণ বিরোধীকে চুপ করাতে ভালোবাসেন। আপনার তুলনায় বিজেপী-মুসলমান এক, আপনার মধ্যবিত্ত কাঁদুনিতে শ্রমিকরা কত সুবিধা পাচ্ছে আর আপনার কত কষ্ট সেই নিয়ে আপনি মরে যাবেন।

এই আমাদের অবস্থা। অত্যন্ত অসমতল জমিতে দাঁড়িয়ে আমরা। এরই মাঝে এলো করোনা ভাইরাস। বিশ্বজুড়ে রেসপন্সগুলো একটু দেখে নেওয়া ভালো।

আমেরিকায় ট্রাম্প শুরুতে বলেন এ এমন কিছু না, এবং তিনি এও দাবী করেন যে এই ঝড়টাকে যেতে দিলেই বা কী হবে? অ্যান্টনী ফাউচি একমাত্র লোক যিনি সোচ্চারে জানান অনেক লোক মরে যাবে। আমেরিকার স্বাস্থ্য প্রাইভেট। এর ফল? লোকে কিলোদরে মরেছে। মুশকিল হোলো এই মৃতদের মধ্যে অধিকাংশই কালো বা লাতিন। আমেরিকায় নেট ওয়ার্থ দেখলেই এ জিনিস টের পাওয়া যায়। যাঁরা এই প্রাইভেট স্বাস্থ্যের হ্যাজ দ্যান তাঁরা একটু খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। প্রফিট মডেলে আমেরিকায় ঠিক কী হয়েছে। উন্নত দেশগুলির মধ্যে এইহারে সংক্রমণ আর কোথাও হয়নি।

আর ভারত... মধ্যবিত্ত ঘরে বসে। লকডাউন ডিপ্রেশন উদযাপন করছে। আর লক্ষ লক্ষ শ্রমিক হেঁটে চলেছেন অনন্যোপায় হয়ে। মৃত্যুমিছিল চলছে। এরই মাঝে রামমন্দিরের টাকার বন্দোবস্ত হয়েছে। দেশের সবকিছু বিক্রি করা হয়েছে। আমাদের হেলদোল নেই। এই নিয়ে পরে আলোচনা করব, কিন্তু আদত সত্যিটা একটু বলে যাই। সেটা হোলো আপনার আমার এখনও শোকের অবকাশ আছে। ভয়ানক ডিপ্রেশন হলে এই খবর এড়িয়ে যাবার ক্ষমতা আছে। অনেকের নেই। শ্রমিকের নেই। কিন্তু আপনি আঁতেল। আপনি পুরোন মদ নতুন বোতলে ভরে হেব্বি কুল হয়েছেন তাই মানেন না এসবে রাজনীতি আছে। আপনি এমনিতেও সেল্ফ মেড।

বন্ধু, অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ বলে you may not take an interest in politics but politics will always take an interest in you... আপনি খাটা পায়খানায় হাগেন না কমোডে না রেললাইনে সেটাও আপনার শ্রেণী কিম্বা লিঙ্গ অবস্থানের উপর নির্ভর করে। এই বাস্তবতা থেকে বিচ্যুত হয়ে যে নিরালম্ব বায়ুভূত হতে চাইছেন, সেটা আপনার কপোলকল্পনা। করোনার রাজনীতি নিয়ে আরো বিস্তারে পরে বলবো, তবে এটুকু জেনে রাখুন খুব খুব খুব খারাপ সময় আসছে। আপনার আজ যে দুঃখ দেখে বুক ফাটছে, সে দুঃখের আপনার আমার দরজায় কড়া নাড়তে বিশেষ দেরি নেই। আজ যে বিজেপি ক্ষমতায় আর সব বিক্রি হয়ে যাচ্ছে এ আপনার আমার জাতীয় নির্বুদ্ধিতার ফল, মহামতি এঙ্গেলস যেমন প্রাশিয়ার সরকার প্রসঙ্গে বলেছিলেন "The prussians of that day had the government that they deserve"... সময় থাকতে সচেতন হোন কারণ সবকিছুই এমনকি ব্যক্তিগত পরিসরটুকুও আদতে চূড়ান্ত রাজনৈতিক, সূর্যের ওঠা নামা যেমন আপনার ইচ্ছার উপর নির্ভর করে না, এটাও করে না।

0 Comments

Post Comment