পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

পশ্চাতে রেখেছ যারে ...

  • 29 March, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 599 view(s)
  • লিখেছেন : নীহারুল ইসলাম
শুধু লকডাউন বললেই যদি সমস্যার সমাধান হয়ে যায় তাহলে আমরা আমাদের সমাজে এত বৈপরীত্য দেখছি কেন? আসলে আমরা প্রত্যেকেই নিজের নিজের অবস্থান থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি। মহামারী উপলক্ষ্য মাত্র।

 

 

তখন সদ্য গ্রাজুয়েট হয়েছি। অবাধ ছুট। সকাল-দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যা শুধু ক্লাব-ক্লাব-ক্লাব আর ক্লাব। তাসখেলা, ক্যারামখেলা, ঘনঘন চা খাওয়া, ভাগ করে বিড়ি টানা। সে এক অদ্ভূত সময় ছিল আমাদের জীবনে। তার চেয়ে বড় কথা আমাদের বন্ধুবান্ধবেরা ছিল বিভিন্ন শ্রেণি থেকে উঠে আসা সাধারণ ঘরের সব সন্তান। যেমন ইঞ্জিনিয়ার ছিল, তেমনি মাস্টারও ছিল। বড় ব্যাবসায়ী থেকে সব্জিবিক্রেতা, আইসক্রিমবিক্রেতা, হকারি করে বেড়ায়-এমন বন্ধুও ছিল কেউ কেউ। বিবিধের মাঝে মহামিলনের আদর্শ জায়গা বলতে যা বোঝায় তাই ছিল আমাদের ক্লাব। পালপার্বণ, পারিবারিক অনুষ্ঠান ছাড়াও আপদে বিপদে আমরা ছিলাম একে অপরের পরিপূরক।
আমাদের ক্লাবের পাশেই গুরুপদদার চায়ের দোকান। সেও আমাদের সবকিছুর শরিক ছিল। তো, একদিন সে এসে একটা বিয়ের কার্ড দিয়ে বলল, আপানদের সবার নিমন্ত্রণ।
-    কিসের নিমন্ত্রণ?
-    হামার বিটির বিহা।
গুরুপদদার বিটি মানে তো সেই গুড়িয়া। যে প্রতিদিন ঠিক সকাল ন’টা-সাড়ে ন’টা নাগাদ তার বাবার জন্য জলখাবার নিয়ে আসে। পরণে ফ্রক। কিশোরী হলেও পায়ে শিশুর চঞ্চলতা। তার বিয়ে!
আমরা বললাম, গুড়িয়ার বিয়ে দিবি মানে! বয়স কত হল?
আমাদের এই প্রশ্নের উত্তরে গুরুপদদা বলেছিল, বয়স ভেবে কী করব? সমন্ধ এস্যাছে। ভালো ঘর। ছেল্যাও ভালো। করিৎকর্মা। তাহলে মাথার ওপর বোঝা রেখ্যা লাভ কী?
আমরা জিজ্ঞেস করি, বিটি বোঝা হয় কী করে?
গুরুপদদা উত্তরে বলেছিল, ওসব আপনার বুঝবেন না। হামি ভোর ভোর চলে আসি চায়ের দোকান খুলতে। ওদিকে হামার বউ বেরহিয়ে যায় পরের বাড়িতে ঝি খাটতে। সেই ফাঁকে কেহু যদি লবেঞ্চুষের লোভ দেখিয়ে হামার বিটিকে পাশের পাটের ভুঁইয়ে লিয়ে যায় তখুন হামি কী করবো? জানেন তো গাঁয়ে এখুন দূয়ারে দূয়ারে মুদির দোকান। আর সেইসব দোকানে হরেক কিসিমের লবেঞ্চুষ বিক্রি হয়।
আমাদের কাছে গুরুপদদার প্রশ্নের কোনও উত্তর ছিল না। আজও নেই। কারণ, আমরা এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করিনি।  

 

গত দু’দিন ঘুম ভেঙেছিল পাখির ডাক শুনে। কিন্তু আজ ভোরবেলা ঘুম ভাঙল এমন এক জনরবে, শুনে মনে হল বাড়ির পাশে স্কুলমাঠে বুঝি ফুটবল ম্যাচ হচ্ছে। তারপর মনে পড়ল গতকাল সন্ধ্যায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রচার করা হয়েছিল যে, আজ থেকেসব্জির বাজার বসবে এই স্কুল মাঠে।
এমনিতেই ঘুম ভাঙলে আমি বিছানায় থাকি না। উঠে প্রাতঃকৃত্য সারি। আজ কিন্তু উঠে গেলাম আমাদের বাড়ির তিনতলা ছাদে। তারপর যা দেখলাম, শুধু আশ্চর্য হলাম না- বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম অনেকক্ষণ।
এতদিন ভোরবেলা ট্রেন ধরতে গিয়ে সিণ্ডিকেট মোড়ে পাইকারি সব্জিবাজার দেখেছি। কী ভিড়! কী ভিড়! অগোছালো। বিশৃংখল। আমাদের বাড়ি থেকে স্টেশন পায়ে হেঁটে মাত্র পাঁচ মিনিটের পথ। অথচ ওই পথের ওপর সিণ্ডিকেট মোড়ের মাত্র একশো মিটার সব্জিবাজার পেরিয়ে স্টেশন পৌঁছতে দশ মিনিট লেগে যেত। আজ বাজারের স্থান পরিবর্তন হলেও বাজারের চরিত্রের কোনও বদল দেখলাম না। আজ স্কুল মাঠের সব্জিবাজারের একশো মিটার পেরোতে দশ মিনিট কেন, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় লেগে যাবে বলেই মনে হল।
তাহলে এই লকডাউন, এত প্রচার, এত সচেতনা বাড়ানোর চেষ্টা- এসবের ফল কী হচ্ছে?
এই প্রশ্নেরও কোনও উত্তর নেই আমাদের কাছে। আমরা উত্তর খোঁজার চেষ্টাও করছি না। শুধু গালাগাল করছি ওই মানুষগুলিকে।  

সম্প্রতি দেখেছি ওষুধের দোকানের ভিড় সরাতে ক্রেতার ওপরে পুলিশের লাঠচার্য। জোর করে মুদির দোকান বন্ধ করে দেওয়া। একান্ত জরুরি প্রয়োজনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পুলিশের তাড়া খাওয়া।
শেষপর্যন্ত কাল বিকেল চারটেয় দিল্লির আনন্দবিহার বাসস্ট্যান্ডে পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার যে গিজগিজে ভিড় হয়েছিল , তা দেখে তো একদল লোক ভিরমি খেল, আরেকদল  সেটাকে ফেক নিউজ বলে চালানোর চেষ্টা করল।
কিন্তু, আমাদের কি সত্যিই স্পষ্ট ধারণা আছে কেন এমন হচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তরও আমাদের জানা নেই। এমনিতেই এই বিপদে বিভ্রান্তিতে আছি। তারপর এসব দেখে আমরা আরও বিভ্রান্ত হচ্ছি। প্রশাসন, কিংবা সরকার এ ব্যাপারে আগে কখনও আমাদের সজাগ করেনি। হঠাৎ শিয়রে শমন দেখে আজ বলছে, লকডাউন।
কিন্তু শুধু লকডাউন বললেই যদি সমস্যার সমাধান হয়ে যায় তাহলে সবাই মিলে ঘরে ঢুকে পড়লেই তো হয়। আমরা তো ঢুকে পড়েছি, সবাই  ঢুকতে পারছে না কেন ?
আসলে আমরা প্রত্যেকেই নিজের নিজের অবস্থান থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি। মহামারী উপলক্ষ্য মাত্র। কিন্তু ভাবটা দেখাচ্ছি, দেখো- আমরা কত মানবদরদী। মানবসভ্যতাকে বাঁচাতে আমাদের কত ত্যাগ!
সত্যি কি তাই?


আসুন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে একবার স্মরণ করে দেখি:

“ হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান,
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান!
মানুষের অধিকারে
বঞ্চিত করেছ যারে,
সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান,
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান। ”

কিংবা ...
“ যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে
পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।
অজ্ঞানের অন্ধকারে
আড়ালে ঢাকিছ যারে
তোমার মঙ্গল ঢাকি গড়িছে সে ঘোর ব্যবধান।
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান। ”

বিভ্রান্তি কাটছে কি? আর আমাদের প্রশ্নের উত্তরগুলি ...

 

cover picture : Anandabajar

Picture : Laboni

0 Comments

Post Comment