পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

রাজনীতিকে কি নিয়ন্ত্রণ করবেন সাধুসন্তরা ?

  • 23 May, 2024
  • 0 Comment(s)
  • 860 view(s)
  • লিখেছেন : অরুন্ধতী দাশ
রামকৃষ্ণ মিশন কিংবা ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘও এই জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিয়েছে সহজেই। হিন্দুধর্মের প্রচারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই সঙ্ঘ দুটির যত না পরিচিতি, চিরকালই তার চেয়ে ঢের বড়ো করে চিরকাল প্রদর্শিত হয়েছে তাঁদের সেবামূলক প্রচেষ্টা। রামকৃষ্ণ মিশনের মূল কর্মনীতি ঘোষিতভাবেই ‘বহুজনহিতায় বহুজনসুখায়’, অন্য সঙ্ঘটির তো নামের মধ্যেই রয়েছে ‘সেবাশ্রম’ শব্দটি। তবু, তাঁদের ধর্মপ্রচারের লক্ষ্যের সঙ্গে যখন মিলে গেল একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের ধর্মীয় ঝোঁক।

‘গৈরিকীকরণ’-এর জ্বরে এই মুহূর্তে দেশ কাঁপছে। একদিকে নবনির্মিত পার্লামেন্ট ভবনের উদ্বোধন হচ্ছে কর্ণাটকের শৃঙ্গেরী মঠ থেকে আমন্ত্রিত জটাধারী সন্ন্যাসীদের ‘গণপতি হোম’ দিয়ে, গেরুয়া পরিহিত সাধুদের হাতে ঝলসে উঠছে প্রতীকী ন্যায়দণ্ড, দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা যেন তাঁরাই। গেরুয়া পদ্মের ছাপ দেয়াল থেকে শুরু করে প্যামফ্লেট পর্যন্ত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে, আন্তর্জাল ওয়েবসাইটগুলোতে পর্যন্ত ভোটের বাজারে জ্বলজ্বলিয়ে উঠছে গেরুয়া পতাকার বিজ্ঞাপন। শহর-মফস্‌সল-গ্রামের যেসব বাঁধানো বটবেদীতে আগে পাথর পুঁতে দেবতার জন্ম হত, সেইসব বুড়ো শিবতলা, শনিকালী অথবা শীতলা মন্দিরের দিন গিয়েছে। এখন সোনালি ঝালর দেওয়া তিনকোনা গেরুয়া পতাকা মাথায় নিয়ে দিকে-দিগন্তরে গজিয়ে উঠেছে পাহাড়বাহী হনুমান মন্দির, লালের বদলে দেবস্থান রাঙিয়ে উঠছে গিরিমাটিভাঙা গেরুয়া সিঁদুরের ছোপে। সন্ন্যাসীর গেরুয়া, রাজনীতির গেরুয়া, ধর্মের গেরুয়া সব মিলেমিশে পিন্ডি চটকানো অবস্থা। তার মধ্যে আমাদের জাতীয় পতাকার গেরুয়াখানি মুখ লুকোনোর জায়গা পেলে হয়!

        উলটো প্রতিরোধের হাওয়াও বেশ গরম। গোঘাটের সভায় খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একেবারে নাম করে দাবি করেছেন, রেজিনগরের ভারত সেবাশ্রম সংঘের কার্তিক মহারাজ আদতে ধর্মের ভেক ধরে রাজনীতি করছেন। আসানসোলের রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের বিরুদ্ধেও উঠে এসেছে তাঁর ক্ষোভ, আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে সরাসরি বিজেপিকে ভোট দেওয়ার পক্ষে প্রচার চালানোর অভিযোগে। রাজনীতিতে জড়িয়ে-পড়া সাধুসন্তদের বিরুদ্ধতা করার প্রতিবাদে ধর্মীয় সংগঠনগুলিও ক্ষুব্ধ হয়েছে যথেষ্ট। আগামী শুক্রবারেই বঙ্গীয় সন্ন্যাসী সমাজের ডাকে পথে নামবেন গেরুয়াধারী সন্তদের একটা বড়ো অংশ। তাঁদের দাবি, রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রম সংঘ কিংবা ইসকনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলির ভাবমূর্তি আক্রান্ত হয়েছে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর এই অবিমৃশ্যকারী মন্তব্যে। বিরোধী নেতারাও বসে নেই। ইমামরা কীভাবে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর দলের হয়ে প্রচার করতে পারেন, সে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরাও।

        রাজনীতিতে ধর্মকে জড়িয়ে দেওয়ার খেলা ইতিহাসে নতুন নয়। ধর্মযুদ্ধ ক্রুসেড থেকে শুরু করে এ যাত্রা অব্যাহত এবং পরীক্ষিতরকম হিট ফর্মুলা, কারণ অধিকাংশ মানুষ বস্তুত ধর্মভীরু। এই ভীরুতা প্রায় ‘প্যাথোলজিকাল’ রকমের অকাট্য ও অনস্বীকার্য, কারণ কোনো যুক্তি, সমাজতত্ত্ব, বিজ্ঞানবোধ, কার্যকারণের সত্য এর পথরোধ করতে পারে না। জন্মান্ধের কাছে আলোপৃথিবী যেমন শোনা কথার বিশ্বাস, কিন্তু চেনা সত্য নয়, ঠিক সেইরকম অনড় বিশ্বাসের শিকড় শক্ত হয়ে গেঁথে আছে ধর্মের আড়ালে। সংস্কার হয়ে উঠেছে বিশ্বাস, বিশ্বাস হয়ে উঠেছে প্রত্যয় আর প্রত্যয়ই শেষ সত্য। সত্যের সংস্কার ছেড়ে এই সংস্কারের সত্যে মজে-থাকা মানুষের আত্মপরিচয়ের সঙ্গে ক্রমশ জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ধর্মীয় মোড়ক— ‘গর্ব সে বোলো হাম হিন্দু হ্যায়’।

        কিন্তু সে তো গেল রাজনৈতিক ফায়দার উদ্দেশ্য। ধর্মকে কাজে লাগিয়ে নিখুঁত টোপ সাজানো হয়েছে ভোটবাক্স ঘিরে। এখন রাজনীতিকে কেন্দ্র করে পালটা ফাঁদ ধর্মপ্রতিষ্ঠানগুলোও পাতছে কিনা, প্রশ্নটা সেই দিকে। রামকৃষ্ণ মিশনের তরফে অবশ্য একটি বিবৃতি জারি করা হয়েছে যে, মিশন কোনোভাবেই প্রত্যক্ষত কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে না, মিশনের সন্ন্যাসীরা কখনও ভোটাধিকারও প্রয়োগ করেন না, এমনকি রাজনৈতিক নির্বাচন বিষয়ে ভক্তদের কী করণীয় বা কী করণীয় নয়, সে নিয়েও কোনো উপদেশ বা ফতোয়া দেওয়া থেকে বিরত থাকে মিশন। মিশন একটি আন্তর্জাতিক এবং অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান।

        কিন্তু গত কয়েক বছরে মিশনের কার্যকলাপ এই মন্তব্যের খুব একটা পক্ষে রায় দেয় না। অযোধ্যায় রামমন্দিরের ভূমিপূজার দিন বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয় খোদ বেলুড় মঠে, এমনকি মিশনের তরফে ভূমিপূজার জন্য মাটিও পাঠানো হয়েছিল অযোধ্যায়। এখন মিশন একটি আদ্যোপান্ত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। রামকৃষ্ণ মিশনের তরফে বেশ কয়েকজন সন্ন্যাসী সেই সময় সর্বভারতীয় খবরের চ্যানেলে রীতিমতো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে বলেন, সনাতন হিন্দুধর্ম ও ঐতিহ্যের পুনঃপ্রচার ও প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত যে-কোনো উদ্যোগকে স্বাগত জানানো তাঁদের কর্তব্য। অর্থাৎ, রামমন্দির প্রসঙ্গ তাঁদের কাছে সম্পূর্ণত ধর্মীয় একটি অনুষঙ্গ নিয়ে এসেছে। মিশনের সাম্প্রতিক বিবৃতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে এর অর্থ একটাই। তাঁরা ধর্ম নিয়ে ভাবিত, রাজনীতি নিয়ে নন। এখন যুক্তির বিচারে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও রামমন্দিরের পুজোয় বসে কোনো অসাংবিধানিক কাজ করেননি, নিশ্চিত। ভারতীয় সংবিধানের ২৫ থেকে ২৮ নং ধারা অনুযায়ী প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের ধর্মীয় রীতি পালন করার অধিকার রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হলে সংবিধানে পাওয়া মৌলিক অধিকার ত্যাগ করতে হবে, এমন কথাও কোথাও বলা নেই, ঠিকই।

        কিন্তু মুশকিল হল, তিনি নিজে জনপ্রতিনিধি। তাই তাঁর নিজস্ব অধিকার পালনের পাশাপাশি ভারতের সাধারণ নাগরিকের অধিকার খর্ব হল কিনা, সে বিষয়টি সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করাও কর্তব্য। রামমন্দির তো শুধু একটি হিন্দু মন্দির প্রতিষ্ঠার ‘শুভ’ সংবাদ নিয়ে আসেনি, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার নারকীয় ইতিহাস। সংখ্যালঘুর ধর্মাচরণের স্বাধীনতায় বলপ্রয়োগের সেই নজির কলঙ্কিত করে রেখেছিল মন্দিরসূচনার পর্বকে। রামমন্দির প্রতিষ্ঠালগ্নের এই বিপুল জৌলুশ, আলোকসজ্জা, জাঁকজমকের বাড়াবাড়ি স্তম্ভিত করে দিয়েছিল গোটা দেশকে।

রামকৃষ্ণ মিশন কিংবা ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘও এই জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিয়েছে সহজেই। হিন্দুধর্মের প্রচারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই সঙ্ঘ দুটির যত না পরিচিতি, চিরকালই তার চেয়ে ঢের বড়ো করে চিরকাল প্রদর্শিত হয়েছে তাঁদের সেবামূলক প্রচেষ্টা। রামকৃষ্ণ মিশনের মূল কর্মনীতি ঘোষিতভাবেই ‘বহুজনহিতায় বহুজনসুখায়’, অন্য সঙ্ঘটির তো নামের মধ্যেই রয়েছে ‘সেবাশ্রম’ শব্দটি। তবু, তাঁদের ধর্মপ্রচারের লক্ষ্যের সঙ্গে যখন মিলে গেল একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের ধর্মীয় ঝোঁক, তখন রাজনৈতিক ছাপ্পা গায়ে লাগবে বুঝেও তাঁরা সরে এলেন না তার ছত্রছায়া থেকে। বহু জনের হিতাকাঙ্ক্ষা বা সেবার চাইতে অনেক বেশি বড়ো হয়ে উঠল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা। অথচ এই ‘ভ্যালিডেশন’-এর প্রয়োজন তাঁদের ছিল না। অন্তত এই দুটি মিশনের কোনোটিরই কোনো অস্তিত্বের সংকট নেই। শুধু দেশ নয়, বিশ্বজোড়া ভক্তকুল সদাই সংবিগ্ন হয়ে থাকে তাঁদের উন্নতিকামনায়, ধন সম্পদ অর্থ বিত্ত যশ খ্যাতি প্রতিষ্ঠা— কিছুরই অভাব ছিল না এঁদের। তবু, দেশনায়কের হাতে লেগে থাকা দাঙ্গার রক্ত তাঁরা সেদিন আড়াল করে দাঁড়ালেন তাঁদের এতদিনের প্রতিপত্তি ও লোকবলের শক্তিতে।

এ দেশে আর কখনও কোনো ধর্মস্থানের প্রতিষ্ঠা এভাবে কোনো বিশেষ একটি রাজনৈতিক দল পরিচালিত সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এত ঘটা করে হয়নি। এক ধর্মের বিরুদ্ধে আর-এক ধর্মের পোশাকি ‘জয়’ প্রদর্শনের এই অশ্লীল আড়ম্বর মাথা নীচু করে দিয়েছে আমাদের, আইনের পৃষ্ঠায় ‘ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র’ তকমাটি দেখতে লাগছিল প্রহসনের মতো। আজ মিশন যতই বিবৃতি দিয়ে রাজনীতির ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলার কথা বলুক, সেদিন ধর্মের রাজনীতিতে তাদের সেই অংশগ্রহণ ইতিহাসের পাতায় সালতারিখ সুদ্ধু লেখা হয়ে গেছে, তাকে আর মুছে ফেলা যায় না। পালটা রাজনীতির তরজা চলছে ইমাম-বিতর্ক ঘিরেও। একইভাবে, সংখ্যালঘু সেন্টিমেন্ট কাজে লাগিয়ে মাঠে নেমে পড়েছেন বিরোধী নেতানেত্রীরাও। তার নজির আমরা দেখেছি এ রাজ্যের গত বিধানসভা নির্বাচনেও যখন ঘোষিতভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বাইরে থাকা একটি বিরোধী রাজনৈতিক দল জোট বেঁধেছিল পিরজাদার সঙ্গে। এঁরা প্রত্যেকেই নিজস্ব ধর্মপালনের নাগরিক অধিকারের প্রয়োগ নিরঙ্কুশভাবেই করে চলেছেন, সেকথা ঠিক। কিন্তু দেশের কিংবা রাজ্যের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ক্ষমতার শীর্ষে বসে থেকে জননেতার দায়িত্ব পালন করতে পারছেন কি? রাজার ধর্ম আর রাজধর্মের মধ্যে এই দুস্তর ব্যবধান ঘোচাবে কে?

0 Comments

Post Comment