পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

বাতেলার কথা

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 201 view(s)
  • লিখেছেন : অনুপম প্রামাণিক
বাংলা ভাষায় কিছু শব্দ আছে যাদের কোনও সম্মানজনক বংশপরিচয় নেই। তারা অভিধানের সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করেনি। এসেছে পিছনের গলি, হাট, ঘাট, শ্রমিক বস্তি, নৌকো, মেলা কিংবা চায়ের দোকান থেকে। "বাতেলা" এমনই একটি শব্দ।

এটা ভদ্রলোকের ভাষা নয়। কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষণ বা সরকারি নথিতে "বাতেলা" শব্দটা সচরাচর দেখা যায় না। সেখানে "অতিশয়োক্তি", "অসত্য বর্ণনা", "বাগাড়ম্বর" ইত্যাদি শব্দের মর্যাদা আছে। কিন্তু "বাতেলা" রয়ে গেছে রাস্তার ধুলো মাখা এক শব্দ হিসেবে। তবু আশ্চর্যের বিষয়, "অতিশয়োক্তি" যা বলতে পারে না, "বাতেলা" তা এক মুহূর্তে বলে দিতে পারে। এখানে একটা রাজনৈতিক প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। কেন একটি শব্দকে অশালীন বা অমার্জিত বলা হয়?  অনেক সময় তার কারণ যারা শব্দটি ব্যবহার করে তারা সামাজিক ক্ষমতার কেন্দ্রে নেই। অর্থাৎ শব্দেরও শ্রেণি আছে।

"বাতেলা" শব্দটির মধ্যে এক ধরনের নৈতিক আপত্তি লুকিয়ে আছে। এটা নিছক গল্প নয়, নিছক কল্পনাও নয়। বাতেলা মানে বাড়িয়ে বলা। যে ঘটনা যতটুকু, তাকে তার চেয়ে বড় করে দেখানো। যে অর্জন যতটুকু, তাকে মহাকাব্যে পরিণত করা। যে বিপদ সীমিত, তাকে সর্বনাশ বলে প্রচার করা। তাই বাতেলা শেষ পর্যন্ত সত্যের বিরুদ্ধে এক ধরনের সহিংসতা।

বাংলা সমাজে একসময় বাতেলাবাজ মানুষকে গুরুত্ব দেওয়া হতো না। পাড়ার আড্ডায় কেউ অতিরঞ্জিত গল্প বললে তাকে ঠাট্টা করে বলা হতো—"বাতেলা মারিস না।" অর্থাৎ বাস্তবে ফিরে আয়। সত্যকে বড় করার দরকার নেই; সত্য নিজেই যথেষ্ট। বাংলা ভাষায় "বাতেলা" শব্দটার মধ্যে এক ধরনের হাস্যরস আছে। আমরা বাতেলাবাজকে নিয়ে মজা করি, তাকে গুরুত্ব দিই না। "বাতেলা" এখানে বিনোদনের অংশ। 

বাতেলা একমাত্রিক নয় বহুমাত্রিক। বাতেলার মধ্যে থাকে আকাঙ্ক্ষা, অপূর্ণতা, আত্মসম্মান রক্ষার চেষ্টা। যে মানুষ বাস্তবে বড় নয়, সে কথার মধ্যে বড় হতে চায়। এই কারণে বাতেলা অনেক সময় অন্ত্যজের কল্পনার স্বাধীনতা। ক্ষমতাবান মানুষ নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য সংবাদপত্র, ইতিহাস, রাষ্ট্রযন্ত্র ও শিক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু প্রান্তিক মানুষের হাতে থাকে আতিরঞ্জিত গল্প। তাই অন্ত্যজ মানুষের ভাষায় বাতেলা শুধু হাস্যরস নয়; এটা একধরনের প্রতিরোধও।

একজন রিকশাচালক, একজন শ্রমিক, একজন উদ্বাস্তু, একজন চায়ের দোকানের আড্ডাবাজ—তারা গল্পের মাধ্যমে এমন একটি পৃথিবী তৈরি করে যেখানে তারা বাস্তবের চেয়ে বড়। এই বড় হয়ে ওঠা মিথ্যা হতে পারে, কিন্তু তার মধ্যে মর্যাদার আকাঙ্খা আছে।  ভদ্রলোকের ভাষা সত্যকে শুদ্ধ করে। অন্ত্যজের ভাষা সত্যকে জীবন্ত করে। আর সেই জীবন্ত সত্যের মধ্যে, কখনও কখনও, একটু বাতেলা মিশে থাকে। কারণ মানুষ শুধু বাস্তব দিয়ে বাঁচে না; সে বাঁচে নিজের সম্পর্কে বলা গল্প দিয়েও। সেই গল্পেরই লোকজ নাম—বাতেলা।

 

 চল ভালো হই, জমকালো হই,বড়দার বাতেলা শুনি – চন্দ্রবিন্দু

  

এই গানের লাইনে একটা সূক্ষ ব্যঙ্গ আছে। চল ভালো মানুষ হবার অভিনয় করি, জমকালো সাজি, আর বড়দার জ্ঞানগর্ভ কথা শুনি। অর্থাৎ, সত্যি ভালো হবার চেয়ে ‘ভালো দেখানোর’ সংস্কৃতি এবং যারা অন্যকে অযথা উপদেশ দেয় তাদের কথার প্রতি এক কৌতূকপূর্ণ খোঁচা বা শ্লেষ এখানে আছে। এই বাতেলা আসলে সেই বাতেলা যা বিনোদনের অংশ। বড়দার একটা সামাজিক ভূমিকা ছিল। তিনি নৈতিকতার পাহারাদার ছিলেন। পাড়ায় কেউ অন্যায় করলে তিনি বকাবকি করতেন, ঝগড়া মেটাতেন, ছোটদের শাসন করতেন। তার বাতেলা নিয়ে হাসাহাসি করা যেত, কারণ তার হাতে ক্ষমতা ছিল না। তাঁর অস্ত্র ছিল শুধু  কথা। দাদা, দিদিদের বাতেলা বরাবর এই খাতেই বয়ে এসেছে। সাহিত্য সংস্কৃতিতে তারই ছাপ স্পষ্ট।   

কিন্তু সেই বাতেলা আর এই বাতেলা এক নয়। এই বাতেলা নয়া বাতেলা। আমাদের সময়ে বড়দার চরিত্র বদলে গেছে। এখন বড়দা শুধু গল্প বলে না, শাস্তিও দেয়। শুধু ভাষণ দেননা, বুলডোজারও চালায়। শুধু ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দেয় না, ভয়ের পরিবেশও তৈরি করে। ফলে বাতেলা আর নিরীহ থাকে না। তা ক্ষমতার ভাষায় পরিণত হয়। 

এক সময় বাতেলা শুনে মানুষ হাসত। কারণ সবাই জানত গল্প আর বাস্তব এক জিনিস নয়। ঝপাং করে কোনোদিনই কিছু আর হয়না। এখন সেই হাসি হারিয়ে গেছে।

প্রতিটি রাষ্ট্র নিজের সম্পর্কে একটা গল্প বলে। সেই গল্পে থাকে গৌরব, বীরত্ব, উন্নয়ন, ঐতিহ্য ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন। রাষ্ট্র কখনও নিজেকে দুর্বল বলে না। রাষ্ট্র সবসময় নিজের একটা আদর্শ প্রতিকৃতি নির্মাণ করে। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন সেই প্রতিকৃতি এবং বাস্তবের মধ্যে দূরত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে।

বাতেলা একটা রাজনৈতিক ঘটনা। ব্যক্তি যেমন বাতেলা করে নিজের গুরুত্ব বাড়াতে, রাষ্ট্রও তেমনি বাতেলা করে নিজের বৈধতা, সক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। রাষ্ট্রের বাতেলা তাই নিছক মিথ্যা নয়। এটা ক্ষমতার এক  কৌশলগত প্রকাশ।

রাষ্ট্র কখনো বলে—“সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে”, “উন্নয়নের জোয়ার বইছে”, “দেশ ইতিহাসের সেরা সময় পার করছে”, অথবা “জনগণ সম্পূর্ণ নিরাপদ”।  এই ঘোষণাগুলি অনেক সময় আংশিক সত্য, অনেক সময় অতিরঞ্জিত। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব বক্তব্যের উদ্দেশ্য তথ্য দেওয়া নয়; বরং একটা নির্দিষ্ট বাস্তবতা নির্মাণ করা। রাষ্ট্র চায় মানুষ এমন এক বাস্তবতায় বিশ্বাস করুক  যেখানে রাষ্ট্র সবসময় সক্ষম, শক্তিশালী এবং অপরিহার্য।

রাষ্ট্রের বাতেলা আবার ভয়ের সঙ্গেও সম্পর্কিত। যে রাষ্ট্র যত বেশি অনিশ্চয়তায় ভোগে, অনেক সময় তার বাতেলা তত বেশি উচ্চকিত হয়। কারণ বাতেলা দুর্বলতাকে ঢেকে রাখার একটা আবরণ। যুদ্ধের সময়, দাঙ্গার সময়, অর্থনৈতিক  সংকটের সময়, রাষ্ট্র প্রায়ই নিজের শক্তির গল্প আরও জোরে বলতে শুরু করে। যেন ভাষার উচ্চস্বরে বাস্তবের ফাটল ঢেকে ফেলা যায়।

কিন্তু রাষ্ট্রের বাতেলা ও ব্যক্তির বাতেলার মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য আছে। ব্যক্তির বাতেলা শুনে মানুষ হাসতে পারে, উপেক্ষা করতে পারে। রাষ্ট্রের বাতেলার পেছনে থাকে প্রশাসন, আইন, পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং প্রচারযন্ত্র। ফলে রাষ্ট্রের বড়াই কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা মানুষের জীবন, অধিকার এবং ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে। রাষ্ট্র যখন বলে “শত্রু সর্বত্র”, তখন মানুষ সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠে; রাষ্ট্র যখন বলে “সব ঠিক আছে”, তখন অনেক অন্যায় অদৃশ্য হয়ে যায়।

বাংলার রাজনীতিতে এই বাতেলার রূপ  আরো বিচিত্র – মিছিলের মঞ্চে,  নির্বাচনী  প্রতিশ্রুতিতে,পোস্টারের ভাষায়, টেলিভিশনের বিতর্কে। প্রতিটি পক্ষ নিজেদের জনগণের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরতে চায়। যেন সমগ্র বাংলার ইচ্ছা তাদের মধ্যেই কেন্দ্রীভূত। কিন্তু বাস্তব বাংলা বহুস্বরে কথা বলে। গ্রামের বাংলা, শহরের বাংলা, উদ্বাস্তু বাংলা, সংখ্যালঘু বাংলা, শ্রমিক বাংলা, মধ্যবিত্ত বাংলা—এদের অভিজ্ঞতা এক নয়। অথচ রাজনৈতিক বাতেলা এই বহুত্বকে সরল করে একটামাত্র গল্পে পরিণত করতে চায়।   

সংখ্যা, পরিসংখ্যান, ভাষণ, এসব রাজনৈতিক তথ্য হতে পারে। কিন্তু সত্য আরও জটিল। সত্য মানুষের অভিজ্ঞতা, যন্ত্রণা, স্মৃতি ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জড়িত। রাজনীতি যখন শুধুমাত্র তথ্যের খেলা হয়ে যায়, তখন বাতেলা জন্মায়। কারণ তথ্যকে সাজানো যায়, বেছে নেওয়া যায়, প্রচার করা যায়। কিন্তু জীবনের  অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

 বাতেলার অন্যতম বিপজ্জনক রূপ হল ক্ষমতাবান মানুষের বাতেলা। কারণ সাধারণ মানুষের বাতেলা বাস্তবকে বদলাতে পারে না। কিন্তু ক্ষমতার বাতেলা বাস্তবকেই নিজের মতো করে সাজিয়ে ফেলতে পারে। এক সময় বড়দার বাতেলা ছিল পাড়ার বিনোদন। আজ বড়দার বাতেলা রাষ্ট্রের নীতি হতে চায়।

এই কারণেই আমাদের হাসি হারিয়ে গেছে। কারণ আমরা জানি, যে বাতেলার পাশে বুলডোজার দাঁড়িয়ে থাকে, তাকে আর নিছক বাতেলা বলা যায় না। তাকে ভয় বলে।

 

0 Comments

Post Comment