পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

আম্পান বিপর্যয় : মানবিকতা বনাম দায়বদ্ধতা

  • 25 May, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 307 view(s)
  • লিখেছেন : মনসুর মণ্ডল
আম্পান বিপর্যয় নিয়ে চর্চায় বাংলার রাজনীতিতে অন্যতর এক হৈচৈ শোনা গেল। রাজনীতি নিয়ে নয়, হৈচৈ মানবিকতা নিয়ে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দেশের প্রধানমন্ত্রীকে আহ্বান জানিয়েছিলেন, রাজ্যে আম্পানের তাণ্ডবে কী বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তিনি এসে স্বচক্ষে দেখে যান। অর্থাৎ মানবিকতার আহ্বানে সাড়া পাওয়া গেল  মানবিকতারই খাতিরে।

 

আম্পান বিপর্যয় নিয়ে চর্চায় বাংলার রাজনীতিতে অন্যতর এক হৈচৈ শোনা গেল। রাজনীতি নিয়ে নয়, হৈচৈ মানবিকতা নিয়ে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দেশের প্রধানমন্ত্রীকে আহ্বান জানিয়েছিলেন, রাজ্যে আম্পানের তাণ্ডবে কী বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তিনি এসে স্বচক্ষে দেখে যান। অর্থাৎ মানবিকতার আহ্বানে সাড়া পাওয়া গেল  মানবিকতারই খাতিরে। এই নিয়ে জোর চর্চা, যার মর্মার্থ, এ হ’ল দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আচ্ছা, যদি এমন হ’ত, মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে ডাকলেন না, তাহলে সেই না-ডাকা কি অমানবিক হ’ত? যদি মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রের মন্ত্রীকুলের কাউকে না ডেকে বিপর্যস্ত মানুষদের পুনর্বাসন ও পরিকাঠামো পুনর্গঠনের জন্য কেন্দ্রের কাছে পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দের দাবি তুলতেন, সেটা কি  ‘রাজনীতি করা’ বলে গণ্য হ’ত?

      ২০১৯-এ ফণী সাইক্লোনে ওড়িশার পাশাপাশি বাংলারও ক্ষয়ক্ষতি কম হয়নি। প্রধানমন্ত্রীকে ডাকা হয়নি। অতি সম্প্রতি  এরাজ্যে বুলবুলে ক্ষয়ক্ষতি, বিশেষত কৃষিতে, অনেকটাই হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী না হোক, তাঁর মন্ত্রীসভার সংশ্লিষ্ট সদস্য কাউকে ডাকা হয়নি। এখন প্রধানমন্ত্রীকে ডেকে কী বিশেষত্ব সৃষ্টি করা গেল? প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনে কেন্দ্র সরকারের ভূমিকা, তার মানদণ্ড কি কতটা হাঁকডাক হ’ল, কতটা অনুনয়-বিনয় হ’ল তার উপর নির্ভর করে ? তার সঙ্গে আবার মানবিকতা নামক আবেগানুভূতির প্রলেপ দেওয়া গেলে সে তো সোনায় সোহাগা। এইসব আয়োজন-আপ্যায়নে দায়বদ্ধতার কথা কিন্তু উঠছে না মোটেই। লাখ টাকার প্রশ্ন এটাই।

      ভালো ভালো কথা শোনা যাচ্ছে আমাদের দেশে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কেন্দ্র-রাজ্য বোঝাপড়া নিয়ে। ক্ষমতার তখতে যাঁরা বসে আছেন, তাঁরা বার্তা দিচ্ছেন, আম্পান নিয়ে রাজনীতি নয়। মানে সরকারদ্বয় মানবিক দায়িত্ব পালনে বদ্ধপরিকর। সেদিক থেকে মানবিকতার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপনে দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে গেলেন দুই সরকারের দুই প্রধান। মানেটা দাঁড়াল, ক্ষমতাটা রাজনৈতিক, কিন্তু ক্ষমতার প্রয়োগ হ’ল অরাজনৈতিক। সেখানে মানবিকতার মানসিকতাকে খাড়া করা হচ্ছে। ফাঁকতালে মর্জিমাফিক যতটা করা যায় আর কি। কিন্তু প্রশ্নটা আদতে মানবিকতা নয়, দায়বদ্ধতার; সরকারি দায়বদ্ধতা পালন। মানবিকতা যদি খুঁজতে হয়, তা  দায়বদ্ধতা পালনের মধ্যেই মিলে যাবে। 

       প্রাকৃতিক বিপর্যয় উত্তর পরিস্থিতিতে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের জন্য কেন্দ্রের ভূমিকা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রীয় ছাঁচে গুরুত্বপূর্ণ কিছু  বিষয় নির্দিষ্টকরণ করে কেন্দ্রীয় আইন করা হয়েছে। ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট, ২০০৫ আছে। সেখানে কেন্দ্র সরকারের কী করণীয়, বলা আছে। রাজ্যকে কী করতে হবে, তাও বলা আছে । এসব প্রধানমন্ত্রীকে ডেকে এনে দেখিয়ে  হবে, এমন নামগন্ধটুকুও নেই সেই আইনে। রাজ্যের দাবি অনুসারে কেন্দ্রীয় টিম দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে আসবে। রাজ্যের সহযোগিতায় কেন্দ্রীয় টিমের তৈরি রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় কেন্দ্রীয় বরাদ্দ পাওয়া যাবে। ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফাণ্ড ( NDRF )-এর মাধ্যমে অর্থ বরাদ্দ হবে। কেন্দ্রের দায়বদ্ধতা এইখানে। দায়বদ্ধতা রাজ্যেরও। দুর্গত মানুষদের রিলিফ দেওয়া ও প্রাথমিক সহায়তামূলক কার্যক্রম রাজ্যের দায়িত্ব। এজন্য স্টেট ডিজাস্টার রেসপন্স ফাণ্ড ( SDRF ) আছে। কেন্দ্র ও রাজ্য প্রাথমিকভাবে এক এক করে দু’হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে।  মুখ্যমন্ত্রী এক লক্ষ কোটি টাকা তুল্যমূল্য ক্ষয়ক্ষতি অনুমান করেছেন। এদিকে বিরোধী দলগুলো থেকে এই ক্ষয়ক্ষতিকে জাতীয় বিপর্যয় ঘোষণার জন্য লাগাতার দাবি তোলা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী কথায় কথায় বলেছেন, এই বিপর্যয় জাতীয় বিপর্যয়ের থেকেও বড়। কিন্তু জাতীয় বিপর্যয় ঘোষণার দাবি তিনি তুললেন না। প্রধানমন্ত্রী বাংলা-ওড়িশার পাশে থাকার আশ্বাস শোনালেন। জাতীয় বিপর্যয় প্রশ্নে নিরুত্তর। সবকিছু বড়ই ধোঁয়াশা। মন্ত্রী মহোদয়েরা হামেশাই ‘আইন আইনের পথে চলার’ কথা বলেন। বিপর্যয় মোকাবিলায় আইনি বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে তাঁদের মুখে কুলুপ আঁটা। কী মানে তবে মানবিকতার ললিত বাণীর? কোথায় দায়বদ্ধতা? 

       দায়বদ্ধতার রাজনীতির একটা স্বাভাবিক অনুষঙ্গ হ’ল মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। মানবিকতাকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাজনীতি-ঊর্দ্ধ হিসেবে দেখানো, এও একটা রাজনীতি; দায়বদ্ধতাকে আড়াল করার রাজনীতি। এই স্বার্থবুদ্ধিটা  আম্পানের পাশাপাশি  করোনায়ও দরকারি। করোনা বিপদ ও লকডাউন নিয়ে সারা দেশে বিষম পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। অভাবী মানুষদের দুর্দশা, অভিবাসী শ্রমিকদের প্রতি রাষ্ট্রের সীমাহীন অমানবিকতা, স্বাস্থ্য পরিষেবার বেহাল দশা—অপরিকল্পিত লকডাউনের জেরে মানুষের দুর্ভোগ চলছেই। ফলে ছোট-বড় শাসকরা  জনমনের ভাবগতিক নিয়ে ধন্ধে আছেন, এই সুযোগে আম্পানের দৌলতে  মানবিকতার ঠাঁটবাট যদি জনমনে বিপরীত বার্তা বয়ে আনে মন্দ কী !

                                                                                                            

                                                                                                                                    

                                                                                                            

0 Comments

Post Comment