পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

হৃৎপিণ্ডে আঘাত না করে নাক কান কাটলে রাক্ষস মরবে?

  • 17 April, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 381 view(s)
  • লিখেছেন : অশোককুমার মুখোপাধ্যায়
মনে পড়ে যাচ্ছে, কলকাতা ১৯৬৫-৬৬’র কথা। খাদ্যের জন্য আন্দোলন; আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের গুলি--বসিরহাট, বারাসাত, কৃষ্ণনগর। খাদ্য চাই, সেই চাওয়া আদায় করে নেবে আন্দোলনকারীরা, এমনই প্রতিজ্ঞা! ৪৫ জন শহীদ। আন্দোলনের এই প্রসার, জনতার এই রুদ্ররোষ কমিউনিস্ট ও বামপন্থী দলগুলির কল্পনার বাইরে, এবং এই আন্দোলনকে সহমর্মিতা দেখিয়েই তাদের ক্ষমতায় আসা!

অদ্ভুত এক সময়। সব্জি বাজার থেকে ফলের বাজার, মাছ-মাংসের দোকান থেকে ডিমপট্টিতে যেন আগুন লেগে গেছে! প্রত্যেক দিন এইসব আহার্যের দাম ঊর্ধগামী হতে হতে ক্রমশ মধ্যবিত্তের ধরাছোঁয়ার বাইরে! অথচ না পেট্রোল না ডিজেল, কোনও জ্বালানীরই দাম বাড়েনি; এইটা বলবার কোনও উপায় নেই যে ট্রাকে আনা-নেওয়ার খরচ বেড়েছে বলেই দামের বৃদ্ধি, বলবার পক্ষে কোনও যুক্তি নেই ট্যাক্সি জাতীয় যানবাহনের খরচ বেড়েছে বলেই তা চেপে বসছে আহার্যের ওপরে! এ এক অদ্ভুত সময় যখন, ‘জলেরও গায়ে হাত দিলে টের পাওয়া যায়/হু হু করা একশ তিন জ্বর।’

হ্যাঁ, এ-কথা সত্যি যে বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম বেড়েছে। গত পরশু এক অটোচালক বিকাশ বললেন, কখনও দু-টাকা, কখনও পাঁচটাকা করতে করতে অটোর জ্বালানী গ্যাসের দাম কেজি প্রতি প্রায় পঁচিশ টাকা বেড়ে গেছে। এ-কথাও সত্যি, বাড়াবার তেমন কোনও যুক্তি না থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্যিক রান্নার গ্যাসের দামও প্রচুর বেড়েছে, কিন্তু তার জন্য আনাজপত্রের বাজারে দাম বাড়ে কেন? ক’দিন আগেই তো প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ইরান-যুদ্ধে ভারতের গ্যাস পেতে সমস্যা হবে না। তাহলে অকস্মাৎ দাম বাড়ল কেন? সিলিণ্ডার পেতেই বা কেন এত সমস্যা? এর ফলে রাস্তার যে-সব নিম্ন-মধ্যবিত্ত খাবারের দোকান, তাদের অবস্থা খুব খারাপ। বিবাদী বাগ থেকে সল্ট লেকের বিভিন্ন ভবনের কর্মচারী আর সেক্টর ফাইভের আইটি কর্মীদের বড় ভরসার জায়গা ফুটপাতের এইসব অসংগঠিত ‘ঝুপস’, তাদের অনেকগুলিই ধুঁকছে। কেউ-কেউ একবেলা দোকান খুলে বেঁচে থাকবার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এমনিতেই ফুটপাথে দোকান চালাতে তাদের নিয়মিত ‘হপ্তা’ দিতে হয় এলাকার ‘দাদা’কে, তার ওপর গ্যাসের দাম বেড়ে, জোগানের অপ্রতুলতায়, স্থৈর্য রাখা শক্ত। তাদের কাছে ‘টিফিন’ খেতে আসেন যারা, তাদের অধিকাংশই নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। উপায় না দেখে দাম বাড়াতে হচ্ছে ঝুপড়ি দোকান মালিকদের, ভাবছেন, কী করে গ্যাসের জোগান অক্ষুণ্ণ রাখা যায়! টিফিন খেতে আসা মানুষ ভাবছেন কি খেলে খাইখরচের চাপ কমবে? যে সব রেস্টোরান্ট ধাক্কা খেয়েছে, তাদের কর্মচারীর মুখ শুকনো, এইভাবে কতদিন?

অটোচালক বললেন, জানেন দাদা, যুদ্ধের হিড়িক তুলে দাম বাড়ানোর খেলা শুরু হয়ে গেছে! কথাটা যে একেবারে মিথ্যে, কেমন করে বলা যায়? আনাজপত্র-ফলের বাজারের নিয়ন্ত্রণ এই মুহূর্তে নিয়ে নিয়েছে পাইকার-দালাল-ফড়ে’রা; যে কৃষক ফসল ফলাচ্ছেন, তাদের হাতে যে এই টাকা যাচ্ছে, তা নয়, যুদ্ধের ধোঁয়াশা ছড়িয়ে বিপুল-বিসদৃশ লাভ কামাচ্ছে কৃষক-আর-উপভোক্তার মধ্যে থাকা দালাল-ফড়ের দল; এবং সবচেয়ে যা খারাপ, এইটা দমনের কোনও ব্যবস্থা নেই! কলকাতার কোনও বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে হানার খবর এখনও কানে আসেনি।

এও জানা গেল, অটোচালকরা মিলিতভাবে অসন্তোষ জানাবার পরেই নাকি অটোর গ্যাসের জোগান অনেক স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। দাদা, সব মিডলম্যানদের খেলা! বললেন, সেই অটোচালক। জানতে ইচ্ছে করে, তিনি কাকে ভোট দেবেন?

মনে পড়ে যাচ্ছে, কলকাতা ১৯৬৫-৬৬’র কথা। খাদ্যের জন্য আন্দোলন; আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের গুলি--বসিরহাট, বারাসাত, কৃষ্ণনগর। খাদ্য চাই, সেই চাওয়া আদায় করে নেবে আন্দোলনকারীরা, এমনই প্রতিজ্ঞা! ৪৫ জন শহীদ। আন্দোলনের এই প্রসার, জনতার এই রুদ্ররোষ কমিউনিস্ট ও বামপন্থী দলগুলির কল্পনার বাইরে, এবং এই আন্দোলনকে সহমর্মিতা দেখিয়েই তাদের ক্ষমতায় আসা!

এখনকার তরুণ বামপন্থীরা কি এই ইতিহাস ভুলে গেছেন? ভুলে গেছেন ওই সময়ে ঘটা দমদম বাজারের ঘটনা? যখন রেশন দোকানের মালিককে চাল মজুত করবার জন্য, কালোবাজারে বিক্রি করবার অপরাধে ঠেঙিয়েছিল, ক্ষুব্ধ জনতা? যার থেকে ওই গণধোলাইয়ের নাম হয়ে গেল--দমদম দাওয়াই? যার ফলে দমদম তো বটেই, অন্যান্য বাজারেও কালোবাজারিরা একটু হলেও ভয় পেয়ে গেল, থমকে গেল তাদের অপ্রতিহত মানুষ মারার অভিযান?

মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা ধরে  অগ্রসর হলে, সাধারণ মানুষের ওপর প্রতিনিয় বর্ষিত হচ্ছে যে অনাচার, অসাম্য এবং মিথ্যাচারের প্রবাহ, তার স্বরূপ সহজেই উন্মোচন করা যায়-- একথা কি ভুলে গেছেন, আজকের বামপন্থীরা? এদেশে বামপন্থী তথা কমিউনিস্টদের, এমনকি, পনেরো বছর আগে, এ-রাজ্যে বামফ্রন্ট বিরোধীদের উত্থানও তো এই বহু-পরীক্ষিত পথে! দৈনন্দিন সমস্যার মূলটি চেনাতে পারলেই সহজে বোঝান যায় আমেরিকা-রাশিয়ার দাদাগিরির সঙ্গে দেশের শাসকদের কী যোগাযোগ? সমস্যার মূল কোথায় বোঝাতে পারলেই তো সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে, কোন ভণ্ড গুরুর টিকি ধরে টানলে কোন দানবের মাথা জেগে ওঠে! তখন তাকে আর মানুষের সমর্থন টানতে অমুক চোর, অমুক তোলাবাজ এইসব বলে ভোটের প্রচার করতে হয় না। যদি অ-বামপন্থী, অ-কমিউনিস্টদের প্রচারের সঙ্গে বামপন্থী প্রচারের কোনও গুণগত পার্থক্য না থাকে, তাহলে আর কীসের বামপন্থা? শুধুমাত্র ভোটের সওদা নয়, নীতিগতভাবে বামপন্থা যে বাজার-চলতি ক্ষমতাভোগী, ক্ষমতালোভী পার্টিগুলির থেকে বহুগুণে সমৃদ্ধ, বহু মানুষের ত্যাগে মহীয়ান, তাও তো বোঝাতে হবে বামপন্থীদের। এ-কথাও তো এই যুদ্ধের আশঙ্কায় কাঁপতে থাকা মানুষকে, মূল্যবৃদ্ধিতে পীড়িত মানুষকে বোঝাতে হবে, অহরহ বুঝিয়ে যেতে হবে, সমাজবাদই, তা সে যার হাত ধরেই আসুক, একমাত্র বাঁচবার পথ।

মনে হয়, চারপাশের ভোটমুখী বামেরা সাধারণ মানুষের বিচারবুদ্ধির ওপর, সমাজবাদের ওপর তেমন একটা আস্থা রাখেন না। মনে মনে ধরে নেন, ভোটের সংখ্যার বাড়-বৃদ্ধি তাদের মধ্যে টাকা বিতরণের সমানুপাতিক! শাসকদের হাতে টাকার থলে,অতএব...। যদি তাও হয়, তাহলেও তো এ-কথা বোঝাবার অবকাশ থাকছে, এই টাকা আসছে কোথা থেকে? একদা, জ্যোতি বসু বলেছিলেন যে, বিজেপি বর্বরের দল। এখন আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে বলা যায়, শুধু বর্বর নয়, বর্বরদের কূলচূড়ামণি একনায়ক, পুরুষতান্ত্রিক দল। ঠাকুরমার ঝুলিতে পড়া দৈত্য; তা সে দৈত্যের কান বা নাক  অথবা চুরি করা-ভাতা-দেওয়া হাত কাটলে তো দৈত্য মরবে না, তার হৃৎপিণ্ড ধুকধুক করছে যেখানে তাতে আঘাত করতে হবে। হৃৎপিণ্ড গেলে, হাত-কান-মুখ-চোখ-নাক সব অকেজো এবং মৃত!

হে কমরেডগণ, এই সত্য না বুঝে এগোলে, তা হবে লোকদেখান যাত্রাপালা; বিশ্বের কোথাও কী এমন যাত্রাপালার ফক্কিকারির করে বাম-আন্দোলন এগিয়েছে? যদি-বা বর্তমান শাসকের অনাচারের জন্য, সাধারণ মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বামপন্থীদের ভোট দেয়, তাহলেও তা হবে অপশাসন বিরোধী ভোট, বামপন্থাকে সমর্থনের ভোট নয়, তাই না কমরেড?

0 Comments

Post Comment