পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

সোহরাওয়ার্দী এভিনিউ - নামবদল না ইতিহাস বদল? পর্ব ৫-৬

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 206 view(s)
  • লিখেছেন : সুমন্ত গোস্বামী
RSS নামে সংগঠনের ঐতিহাসিক উৎস কোথায়?এবং ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী ছিল? এই প্রশ্নগুলি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আধুনিক জাতিরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বৈধতার অন্যতম উৎস হলো স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তরাধিকার। যে কোনো রাজনৈতিক শক্তি স্বাভাবিকভাবেই নিজেকে জাতীয় মুক্তির ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করতে চায়। ফলে RSS-এর ক্ষেত্রেও স্বাধীনতা আন্দোলনে তার ভূমিকার প্রশ্নটি শুধু অতীতের নয়; বর্তমানেরও প্রশ্ন। সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ থেকে সমকালীন বাংলার রাষ্ট্র, ইতিহাস ও গণতন্ত্র পর্ব ৫-৬ সেই ইতিহাসকে ফিরে দেখার চেষ্টা।


শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে ঘিরে সমকালীন রাজনৈতিক স্মৃতির আলোচনা আমাদের একটি বৃহত্তর আদর্শিক পরিসরে নিয়ে আসে। কারণ তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে আজ যে শক্তিগুলি নিজেদের ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করে, তাদের কেন্দ্রে রয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা RSS। ফলে শ্যামাপ্রসাদকে বোঝার পরবর্তী যৌক্তিক ধাপ হলো RSS-কে বোঝা।
কিন্তু RSS-কে নিয়ে আলোচনা শুরু করার আগেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। সমকালীন ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতায় RSS একটি অসাধারণ প্রভাবশালী সংগঠন। শিক্ষা, সংস্কৃতি, শ্রমিক সংগঠন, ছাত্র রাজনীতি, সামাজিক সংগঠন এবং নির্বাচনী রাজনীতির বিস্তৃত ক্ষেত্রে তার প্রভাব রয়েছে। এই বাস্তবতা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই।
প্রশ্নটি অন্যত্র।
এই সংগঠনের ঐতিহাসিক উৎস কোথায়?
এবং ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী ছিল?
এই প্রশ্নগুলি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আধুনিক জাতিরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বৈধতার অন্যতম উৎস হলো স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তরাধিকার। যে কোনো রাজনৈতিক শক্তি স্বাভাবিকভাবেই নিজেকে জাতীয় মুক্তির ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করতে চায়। ফলে RSS-এর ক্ষেত্রেও স্বাধীনতা আন্দোলনে তার ভূমিকার প্রশ্নটি শুধু অতীতের নয়; বর্তমানেরও প্রশ্ন।
RSS প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর নাগপুরে। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কেশব বালিরাম হেডগেওয়ার। তিনি নিজে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন এবং কংগ্রেসের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল। কিন্তু তিনি যে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন, তার প্রধান লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশবিরোধী গণআন্দোলন পরিচালনা করা নয়। সংগঠনের প্রধান উদ্বেগ ছিল হিন্দু সমাজের সাংগঠনিক পুনর্গঠন।
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের মধ্যে দুটি ভিন্ন প্রবণতা দেখা যায়। প্রথম প্রবণতা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে গণসংগ্রামকে কেন্দ্রে রাখে। দ্বিতীয় প্রবণতা সমাজের অভ্যন্তরীণ সংগঠন ও সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনকে অগ্রাধিকার দেয়। RSS মূলত দ্বিতীয় ধারার প্রতিনিধিত্ব করে।
এই কারণেই স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান গণ-অভিযানগুলির ইতিহাসে RSS-এর উপস্থিতি সীমিত।
১৯২০-২২ সালের অসহযোগ আন্দোলন, ১৯৩০ সালের সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স আন্দোলন কিংবা ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলন—এই বৃহৎ গণআন্দোলনগুলিতে RSS সংগঠন হিসেবে নেতৃত্ব দেয়নি।
বিশেষত ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের প্রসঙ্গ এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত ছাড়ো আন্দোলন ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের সবচেয়ে বিস্তৃত গণ-অভ্যুত্থানগুলির একটি। কংগ্রেসের নেতৃত্ব গ্রেপ্তার হওয়ার পর আন্দোলন বহু অঞ্চলে স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহের রূপ নেয়। রেললাইন কাটা হয়, যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, প্রশাসনিক কাঠামো আক্রান্ত হয়। ব্রিটিশ সরকার কঠোর দমননীতি গ্রহণ করে।
এই সময় RSS-এর ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক নেই; বরং একটি উল্লেখযোগ্য ঐকমত্য রয়েছে। সংগঠনটি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেনি।
এই তথ্যকে ঘিরে অবশ্য দুটি ভিন্ন ব্যাখ্যা আছে।
সমালোচকদের মতে, স্বাধীনতা সংগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গণআন্দোলনের সময় RSS রাজনৈতিকভাবে অনুপস্থিত ছিল। তাঁদের যুক্তি হলো, ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের পরিবর্তে সংগঠনটি নিজস্ব সাংগঠনিক সম্প্রসারণে মনোনিবেশ করেছিল।
অন্যদিকে RSS-এর সমর্থকেরা যুক্তি দেন যে সংগঠনের প্রধান লক্ষ্য ছিল দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পুনর্গঠন। তাঁদের মতে, প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক আন্দোলনের পরিবর্তে সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলাই ছিল অগ্রাধিকার।
এই বিতর্কে অবস্থান যাই হোক না কেন, একটি তথ্য অস্বীকার করা কঠিন—স্বাধীনতা আন্দোলনের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলিতে RSS-এর ভূমিকা সীমিত ছিল।
এখানেই ইতিহাসের একটি অস্বস্তিকর বৈপরীত্য দেখা যায়।
স্বাধীনতা সংগ্রামে তুলনামূলকভাবে সীমিত উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে RSS ক্রমশ একটি কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।
এই রূপান্তর কীভাবে সম্ভব হলো?
উত্তরের একটি অংশ লুকিয়ে আছে সংগঠনের কাঠামোর মধ্যে।
কংগ্রেস ছিল একটি রাজনৈতিক আন্দোলন।
RSS ছিল একটি ক্যাডারভিত্তিক সাংগঠনিক প্রকল্প।
কংগ্রেসের শক্তি ছিল তার ব্যাপকতা।
RSS-এর শক্তি ছিল তার শৃঙ্খলা।
কংগ্রেস নির্বাচনী রাজনীতি, আন্দোলন, গণসংগঠন এবং মতাদর্শিক বৈচিত্র্যের উপর দাঁড়িয়েছিল। RSS দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক প্রশিক্ষণ, নিয়মিত শাখা, সাংস্কৃতিক শিক্ষা এবং আদর্শিক ঐক্যের উপর জোর দিয়েছিল।
এই পার্থক্যের ফল স্বাধীনতার পরে স্পষ্ট হতে শুরু করে।
তবে RSS-এর ইতিহাসে আরেকটি ঘটনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধী নিহত হন। সমগ্র দেশ শোকাহত ও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এর কয়েক দিনের মধ্যেই ভারত সরকার RSS নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
এখানে ইতিহাসের প্রতি সততা বজায় রাখা জরুরি।
RSS নিষিদ্ধ হয়েছিল—এটি সত্য।
কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় RSS-কে গান্ধী হত্যার ষড়যন্ত্রকারী সংগঠন হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি।
এই দুই তথ্যই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক বিতর্কে প্রায়শই এক পক্ষ প্রথম তথ্যটি বলে, দ্বিতীয়টি বলে না। অন্য পক্ষ দ্বিতীয় তথ্যটি বলে, প্রথমটি বলে না।
ইতিহাসের কাজ উভয় তথ্যকেই একসঙ্গে রাখা।
তবে গান্ধী হত্যার পর যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা কেবল আইনগত নয়; আদর্শিকও।
নাথুরাম গডসে একসময় হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পরিসরের মধ্যে ছিলেন। তিনি হিন্দু মহাসভার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই পটভূমি স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক সৃষ্টি করে, যা আজও শেষ হয়নি।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে আরেকটি প্রশ্ন।
RSS-এর আদর্শিক বিকাশ কি সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় রাজনৈতিক ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল?
নাকি তার উপর ইউরোপীয় আন্তঃযুদ্ধকালীন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনেরও প্রভাব ছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের সংগঠনের প্রাথমিক আদর্শিক পরিবেশের দিকে তাকাতে হবে। বিশেষত এমন একজন ব্যক্তির দিকে, যিনি RSS-এর প্রতিষ্ঠাতা নন, কিন্তু এর আদর্শিক পরিমণ্ডলের উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন।
তিনি হলেন বালকৃষ্ণ শিবরাম মুঞ্জে।
মুঞ্জেকে ঘিরে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁর জীবন আমাদের ভারতীয় ডানপন্থী জাতীয়তাবাদ এবং ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে একটি জটিল কিন্তু প্রয়োজনীয় বিতর্কের মধ্যে নিয়ে যায়। এই বিতর্ক রাজনৈতিক স্লোগানের নয়; ইতিহাসের বিতর্ক। এবং এই বিতর্ককে না বুঝলে সমকালীন ভারতীয় ডানপন্থার বৌদ্ধিক উৎসও পুরোপুরি বোঝা যায় না।
সুতরাং স্বাধীনতা আন্দোলনে RSS-এর ভূমিকার প্রশ্ন থেকে আমাদের এখন এগোতে হবে তার আদর্শিক গঠনের প্রশ্নে। কারণ ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায় শুরু হয় ভারতের মাটিতে নয়, ইউরোপে—১৯৩১ সালের ইতালিতে, বেনিতো মুসোলিনির শাসনের অধীনে।

পূর্ববর্তী অধ্যায়ে আমরা দেখেছি যে RSS-এর স্বাধীনতা আন্দোলনে ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় তার আদর্শিক উৎসের প্রশ্ন। কারণ কোনো রাজনৈতিক সংগঠনকে বোঝার জন্য কেবল সে কী করেছে তা জানাই যথেষ্ট নয়; সে নিজেকে কীভাবে কল্পনা করেছে, তার বৌদ্ধিক অনুপ্রেরণা কোথায় ছিল, এবং সমাজকে সংগঠিত করার জন্য কোন মডেলকে আদর্শ বলে মনে করেছে—সেসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণেই বালকৃষ্ণ শিবরাম মুঞ্জের নাম আলোচনায় আসে।
ভারতীয় জনপরিসরে মুঞ্জের নাম হেডগেওয়ার, গোলওয়ালকর বা সাভারকরের মতো পরিচিত নয়। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ইতিহাসে তিনি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। কারণ তাঁর জীবন ভারতীয় হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং ইউরোপীয় আন্তঃযুদ্ধকালীন ডানপন্থী আন্দোলনের মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ সংযোগের জানালা খুলে দেয়।
১৯৩১ সালে মুঞ্জে ইউরোপ সফরে যান। সেই সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ইতালি। সেখানে তিনি বেনিতো মুসোলিনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ফ্যাসিস্ট ইতালির বিভিন্ন যুব ও সামরিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন। তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরি, ভ্রমণবৃত্তান্ত এবং পরবর্তী কার্যকলাপ থেকে জানা যায় যে তিনি ইতালির সামরিকীকৃত যুব সংগঠন, শৃঙ্খলাভিত্তিক নাগরিক গঠন এবং জাতীয় চরিত্র নির্মাণের ধারণা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন।
এই তথ্য ইতিহাসের অংশ। এটি রাজনৈতিক অভিযোগ নয়।
মুঞ্জে তাঁর লেখায় ইতালীয় ফ্যাসিস্ট সংগঠনের দক্ষতা, শৃঙ্খলা এবং যুবসমাজকে সংগঠিত করার ক্ষমতার প্রশংসা করেছিলেন। ভারতে ফিরে এসে তিনি সামরিক প্রশিক্ষণ ও চরিত্র গঠনের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। নাসিকে ভোঁসলা মিলিটারি স্কুল প্রতিষ্ঠার পেছনেও এই প্রভাবের আলোচনা ইতিহাসবিদরা বারবার করেছেন।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ওঠে।
একজন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতার মুসোলিনির ইতালির প্রতি আগ্রহ কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাকে ফ্যাসিস্ট করে তোলে?
ইতিহাস সাধারণত এত দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছায় না।
কারণ ১৯৩০-এর দশকে ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদ কেবল একটি রাজনৈতিক মতবাদ ছিল না; বহু দেশের রক্ষণশীল ও জাতীয়তাবাদী চিন্তাবিদদের কাছে এটি সামাজিক শৃঙ্খলা, জাতীয় ঐক্য এবং রাষ্ট্রের দক্ষতার একটি বিকল্প মডেল হিসেবেও প্রতিভাত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, নাৎসি গণহত্যা এবং ফ্যাসিবাদের পতনের পরে আমরা যেভাবে ফ্যাসিবাদকে দেখি, ১৯৩১ সালে অনেকেই সেভাবে দেখতেন না।
তবে এখানেই আলোচনার সমাপ্তি হয় না।
কারণ ইতিহাসবিদদের আগ্রহ মুঞ্জের ব্যক্তিগত পছন্দে নয়; সেই পছন্দের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের মধ্যে।
প্রশ্ন হলো, এই প্রভাব RSS এবং বৃহত্তর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মধ্যে কতখানি প্রবেশ করেছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
কিছু ইতিহাসবিদ যুক্তি দেন যে RSS-এর সাংগঠনিক কাঠামো, ইউনিফর্ম, দৈনিক শাখা, শারীরিক প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা এবং সাংস্কৃতিক ঐক্যের উপর জোর ইউরোপীয় আন্তঃযুদ্ধকালীন ডানপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে তুলনাযোগ্য।
অন্যদিকে অন্য গবেষকেরা সতর্ক করেন যে সরাসরি সমীকরণ টানা বিপজ্জনক। তাঁদের মতে, RSS-এর শিকড় ভারতীয় সামাজিক বাস্তবতা, ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা এবং হিন্দু সমাজসংগঠনের নিজস্ব ইতিহাসের মধ্যেই বেশি গভীরভাবে প্রোথিত।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম উঠে আসে—মাধব সদাশিব গোলওয়ালকর।
গোলওয়ালকর RSS-এর দ্বিতীয় সর্সংঘচালক এবং সংগঠনের সবচেয়ে প্রভাবশালী তাত্ত্বিক ব্যক্তিত্বদের একজন। তাঁর নেতৃত্বে RSS একটি আঞ্চলিক সংগঠন থেকে সর্বভারতীয় সাংগঠনিক শক্তিতে পরিণত হয়।
গোলওয়ালকরের প্রাথমিক লেখাগুলির মধ্যে বিশেষভাবে আলোচিত একটি গ্রন্থ হলো We, or Our Nationhood Defined। এই বইটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের মতে, বইটির কিছু অংশে জাতীয় ঐক্য, সাংস্কৃতিক সমরূপতা এবং সংখ্যালঘুদের অবস্থান নিয়ে এমন ধারণা প্রকাশ পেয়েছে, যা ইউরোপীয় জাতিগত জাতীয়তাবাদের সঙ্গে তুলনা আমন্ত্রণ করে। সমর্থকেরা পাল্টা যুক্তি দেন যে বইটি গোলওয়ালকরের পরিণত চিন্তার পূর্ণ প্রতিফলন নয় এবং পরবর্তী সময়ে RSS-এর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বিকাশকে সেই একক গ্রন্থের মাধ্যমে বিচার করা উচিত নয়।
এই বিতর্ককে বুঝতে গেলে আরেকটি সতর্কতা জরুরি।
"ফ্যাসিবাদ" শব্দটি ইতিহাসে একটি নির্দিষ্ট অর্থ বহন করে।
এটি কেবল শক্তিশালী জাতীয়তাবাদ নয়।
এটি কেবল রক্ষণশীলতা নয়।
এটি কেবল ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতিও নয়।
ফ্যাসিবাদ বলতে সাধারণত এমন এক রাজনৈতিক প্রকল্পকে বোঝানো হয়, যেখানে চরম জাতীয়তাবাদ, একক সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দাবি, শক্তিশালী নেতৃত্বের পূজা, রাজনৈতিক বহুত্ববাদের প্রতি অবিশ্বাস এবং সমাজের সামরিকীকৃত সংগঠনের প্রবণতা একত্রে উপস্থিত থাকে।
এই কারণে কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে "ফ্যাসিস্ট" বলা একটি গুরুতর ঐতিহাসিক দাবি।
এই প্রশ্নে গবেষকরা একমত নন।
কিছু ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক RSS এবং হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কিছু বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের তুলনা করেছেন।
অন্যদিকে কিছু গবেষক এই তুলনাকে সীমিত বা বিভ্রান্তিকর বলে মনে করেন। তাঁদের মতে, ভারতীয় সামাজিক বাস্তবতা, গণতান্ত্রিক নির্বাচন, বর্ণব্যবস্থা, ধর্মীয় বহুত্ব এবং ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের অভিজ্ঞতা থেকে এতটাই ভিন্ন যে সরাসরি সমীকরণ টানা সম্ভব নয়।
কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করা কঠিন।
মুঞ্জের ইতালি সফর, মুসোলিনির সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং ফ্যাসিস্ট সংগঠনগুলির প্রতি তাঁর আগ্রহ ইতিহাসে নথিভুক্ত ঘটনা। এগুলি রাজনৈতিক কল্পনা নয়।
তবে এই তথ্য থেকে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হবে, তা ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্কের বিষয়।
এখানেই ইতিহাস ও রাজনীতির পার্থক্য।
রাজনীতি দ্রুত রায় দিতে চায়।
ইতিহাস ধীরে প্রশ্ন করতে চায়।
এই অধ্যায়ের আলোচনার ফলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়। RSS-কে বোঝা মানে কেবল তার বর্তমান রাজনৈতিক প্রভাবকে বোঝা নয়। তার আদর্শিক গঠন, তার সাংগঠনিক সংস্কৃতি এবং তার বৌদ্ধিক উৎসগুলিকেও বোঝা। কারণ সমকালীন রাজনৈতিক শক্তিগুলি শূন্য থেকে জন্ম নেয় না। তারা দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার ফল।
কিন্তু এখানেই আমাদের আলোচনার একটি নতুন মোড় আসে।
এতক্ষণ আমরা অতীত নিয়ে কথা বলেছি—১৯৪৬, দেশভাগ, শ্যামাপ্রসাদ, RSS, মুঞ্জে, গোলওয়ালকর।
এখন প্রশ্ন হলো: এই সমস্ত ইতিহাস আজ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
কেন একটি রাস্তার নাম পরিবর্তন, একটি মূর্তি, একটি পাঠ্যপুস্তক বা একটি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে এত রাজনৈতিক শক্তি ব্যয় করা হয়?
কেন বর্তমান বারবার অতীতের দিকে ফিরে যায়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের প্রবেশ করতে হবে স্মৃতির রাজনীতির আরও গভীর স্তরে—যেখানে ইতিহাস কেবল অতীতের বিবরণ নয়, বর্তমানের ক্ষমতার একটি উপকরণে পরিণত হয়।
সেই কারণেই পরবর্তী অধ্যায়ে আমাদের আলোচনার কেন্দ্র হবে স্মৃতি, রাষ্ট্র এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্ক। কারণ সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ-এর বিতর্কের প্রকৃত তাৎপর্য শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে নয়; ইতিহাসের ব্যবহারে নিহিত।

পূর্ববর্তী অধ্যায়ে আমরা দেখেছি যে ইতিহাসের বিতর্ক কখনও কেবল অতীতের বিতর্ক নয়। মুঞ্জে, গোলওয়ালকর, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কিংবা সোহরাওয়ার্দীকে নিয়ে সমকালীন সংঘর্ষ আসলে বর্তমানের রাজনৈতিক সংঘর্ষ। এই কারণেই প্রশ্নটি এখন আর ব্যক্তি বা সংগঠনের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশ্নটি রাষ্ট্রকে ঘিরে ওঠে।
রাষ্ট্র ইতিহাসকে কীভাবে ব্যবহার করে?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র কেন ইতিহাসকে ব্যবহার করে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের প্রথমে একটি সহজ সত্য স্বীকার করতে হবে। কোনো রাষ্ট্রই সম্পূর্ণ ইতিহাসনিরপেক্ষ নয়। প্রত্যেক রাষ্ট্রই একটি নির্দিষ্ট অতীতকে স্মরণ করে এবং অন্য একটি অতীতকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেয়। জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় দিবস, পাঠ্যপুস্তক, সরকারি স্মৃতিসৌধ, রাস্তার নাম, ডাকটিকিট, মুদ্রা—এসবই রাষ্ট্রের নির্বাচিত স্মৃতির বাহক।
কিন্তু স্মৃতি যখন রাষ্ট্রের বিষয় হয়, তখন তা আর কেবল স্মৃতি থাকে না। তা ক্ষমতার প্রশ্নে পরিণত হয়।
কারণ যে রাজনৈতিক শক্তি একটি সমাজের অতীতকে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষমতা অর্জন করে, সে অনেকাংশে সেই সমাজের বর্তমান রাজনৈতিক কল্পনাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
এই কারণেই পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে স্মৃতির মানচিত্র পরিবর্তিত হয়।
ফরাসি বিপ্লবের পরে রাজতন্ত্রের প্রতীক সরানো হয়েছিল।
রুশ বিপ্লবের পরে জারের স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে লেনিন ও স্টালিন-সম্পর্কিত বহু প্রতীক অপসারিত হয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের অবসানের পরে জনপরিসরের বহু নাম পরিবর্তিত হয়েছে।
অর্থাৎ নাম পরিবর্তন কোনো ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক কাজ নয়।
প্রশ্নটি নাম পরিবর্তনে নয়।
প্রশ্নটি নির্বাচন প্রক্রিয়ায়।
কোন স্মৃতি সংরক্ষিত হবে এবং কোন স্মৃতি প্রতিস্থাপিত হবে—এই সিদ্ধান্তের মধ্যেই রাজনৈতিক প্রকল্পের প্রকৃতি প্রকাশ পায়।
সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ-এর নাম পরিবর্তনের ঘটনাও এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের মধ্যে পড়ে।
সরকারপক্ষ এটিকে ঐতিহাসিক সংশোধন বলতে পারে।
সমালোচকেরা এটিকে স্মৃতির পুনর্গঠন বলতে পারেন।
কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই একটি বিষয় স্পষ্ট—এটি ইতিহাস নিয়ে নয়, ইতিহাসের অর্থ নিয়ে সংঘর্ষ।
এই সংঘর্ষের পেছনে আরও একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা কাজ করে।
সমকালীন গণতন্ত্রে রাজনীতি কেবল নীতি দিয়ে পরিচালিত হয় না; প্রতীক দিয়েও পরিচালিত হয়।
একটি কর্মসংস্থান প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে বছর লেগে যেতে পারে।
একটি শিল্পনীতি ফল দিতে দশক লেগে যেতে পারে।
একটি শিক্ষা সংস্কারের প্রভাব পরিমাপ করতে প্রজন্ম লেগে যেতে পারে।
কিন্তু একটি রাস্তার নাম পরিবর্তন, একটি মূর্তি স্থাপন বা একটি স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক বার্তা তৈরি করে।
প্রতীক দ্রুত কাজ করে।
নীতির কাজ ধীর।
এই কারণেই রাজনৈতিক শক্তিগুলি প্রায়শই প্রতীকী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়।
তবে এখানেই একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক প্রশ্ন উঠে আসে।
রাষ্ট্রের প্রধান কাজ কী?
রাষ্ট্র কি মূলত অতীতের বিচারক?
নাকি বর্তমানের মানুষের কল্যাণের রক্ষক?
এই প্রশ্ন নতুন নয়।
উনবিংশ শতাব্দীর উদারপন্থী রাজনৈতিক চিন্তা থেকে শুরু করে আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণা পর্যন্ত একটি বিষয় বারবার ফিরে এসেছে—রাষ্ট্রের বৈধতা শেষ পর্যন্ত তার নাগরিকদের জীবনমানের উপর নির্ভর করে।
মানুষ রাষ্ট্রকে মূল্যায়ন করে প্রধানত তিনটি প্রশ্নে।
আমি কি নিরাপদ?
আমি কি মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারছি?
আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ কি আমার চেয়ে ভালো হবে?
কোনো সমাজে যখন কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পায়, জনস্বাস্থ্য চাপে পড়ে, শিক্ষাব্যবস্থা সংকটে থাকে এবং সামাজিক বৈষম্য বাড়তে থাকে, তখন রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এই প্রশ্ন কোনো নির্দিষ্ট সরকারকে ঘিরে নয়।
এটি গণতন্ত্রের মৌলিক প্রশ্ন।
কারণ নাগরিকের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি রাস্তার নামের গুরুত্ব এবং একটি হাসপাতালের কার্যকারিতার গুরুত্ব এক নয়।
একটি নাম পরিচয়ের প্রশ্ন হতে পারে।
কিন্তু স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য, বাসস্থান এবং কর্মসংস্থান অস্তিত্বের প্রশ্ন।
এই বাস্তবতা থেকেই সমকালীন ভারতে এবং বাংলায় প্রতীকী রাজনীতিকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়।
সমালোচকেরা যুক্তি দেন যে ইতিহাস, ধর্মীয় পরিচয়, সাংস্কৃতিক প্রতীক এবং অতীতের সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে জনপরিসরে অতিরিক্ত মনোযোগ সৃষ্টি করা হলে বর্তমানের বাস্তব সমস্যাগুলি আড়ালে চলে যেতে পারে।
অন্যদিকে সমর্থকেরা বলেন যে সাংস্কৃতিক পুনরুদ্ধার এবং ঐতিহাসিক সংশোধনও জাতীয় পুনর্গঠনের অপরিহার্য অংশ।
এই দুই অবস্থানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তেজনা রয়েছে।
কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য সম্ভবত আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কোথায়?
কারণ ইতিহাসের স্মৃতি প্রয়োজন।
কিন্তু স্মৃতি একা সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে না।
জাতীয় গৌরব প্রয়োজন।
কিন্তু গৌরব একা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে না।
সাংস্কৃতিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু পরিচয় একা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা নির্মাণ করে না।
এই কারণেই রাজনৈতিক তাত্ত্বিকেরা প্রায়শই প্রতীকী বৈধতা এবং কর্মক্ষম বৈধতার মধ্যে পার্থক্য করেন।
প্রতীকী বৈধতা আসে পতাকা, স্মৃতি, ইতিহাস, পরিচয় এবং জাতীয় কল্পনা থেকে।
কর্মক্ষম বৈধতা আসে প্রশাসন, অর্থনীতি, সামাজিক সুরক্ষা এবং জনকল্যাণ থেকে।
একটি স্থিতিশীল গণতন্ত্র সাধারণত এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে।
যখন কোনো রাষ্ট্র প্রতীকহীন হয়ে পড়ে, তখন তার সামাজিক সংহতি দুর্বল হয়।
আবার যখন কোনো রাষ্ট্র প্রতীকের মধ্যে অতিরিক্ত নিমজ্জিত হয়, তখন তার বাস্তব কর্মক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ-এর বিতর্ক সেই বৃহত্তর উত্তেজনারই একটি ক্ষুদ্র প্রতিফলন।
কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি এই নয় যে রাস্তার নাম কী হবে।
প্রশ্নটি হলো—একটি সমাজ তার রাজনৈতিক শক্তি কোথায় বিনিয়োগ করছে?
অতীতের ব্যাখ্যায়?
নাকি ভবিষ্যতের নির্মাণে?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়।
কিন্তু ইতিহাসের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অন্তত একটি বিষয় শেখায়। যে সমাজ কেবল অতীত নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সে ভবিষ্যৎ হারানোর ঝুঁকি নেয়। আবার যে সমাজ অতীতকে সম্পূর্ণ ভুলে যায়, সে নিজের পরিচয় হারানোর ঝুঁকি নেয়।
সুতরাং চ্যালেঞ্জ হলো একটিকে বেছে নেওয়া নয়।
চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া।
এবং সেই ভারসাম্যের প্রশ্ন থেকেই আমাদের এই প্রবন্ধের শেষ অধ্যায়ে পৌঁছাতে হবে।
কারণ এখন পর্যন্ত আমরা ইতিহাসের মানুষদের নিয়ে কথা বলেছি—হাসান সোহরাওয়ার্দী, হুসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, গোপাল পাঁঠা, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, মুঞ্জে, গোলওয়ালকর।
এখন সময় এসেছে ইতিহাসের বাইরে এসে সেই মানুষদের কথা বলার, যাদের জন্য রাষ্ট্রের অস্তিত্ব—সাধারণ নাগরিকদের।
প্রবন্ধের শেষ অধ্যায়ে তাই প্রশ্নটি আর অতীতকে ঘিরে থাকবে না।
প্রশ্নটি হবে বর্তমানকে ঘিরে।
রাষ্ট্র কি স্মৃতির রক্ষক, নাকি মানুষের?

এই প্রবন্ধের সূচনা হয়েছিল একটি রাস্তার নাম নিয়ে। কলকাতার একটি রাস্তা, যার নাম পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল ইতিহাস, স্মৃতি এবং রাজনীতির এক জটিল বিতর্ক। কিন্তু সেই বিতর্কের পথ অনুসরণ করতে করতে আমরা পৌঁছে গেছি বহু দূরে—১৯৪৬ সালের কলকাতায়, দেশভাগের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলায়, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারে, RSS-এর সাংগঠনিক ইতিহাসে, মুঞ্জের ইতালি সফরে এবং রাষ্ট্রের স্মৃতি নির্মাণের প্রকল্পে।
এই দীর্ঘ আলোচনার শেষে একটি বিষয় ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ-এর নাম পরিবর্তন আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ঘটনা নয়। এটি সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক শক্তিগুলি অতীতকে পুনর্ব্যাখ্যা করে, নতুন প্রতীক নির্মাণ করে এবং জাতীয় স্মৃতির মানচিত্রকে পুনর্গঠিত করে।
ইতিহাসের ভাষায় এটি স্মৃতির রাজনীতি।
রাষ্ট্র কখনও সম্পূর্ণ ইতিহাসনিরপেক্ষ নয়। প্রতিটি রাষ্ট্রই কোনো না কোনো অতীতকে বেছে নেয়। কিছু মানুষকে স্মরণ করে, কিছু মানুষকে বিস্মৃত করে। কিছু ঘটনাকে জাতীয় স্মৃতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে, কিছু ঘটনাকে প্রান্তে সরিয়ে দেয়। রাস্তার নাম, মূর্তি, স্মৃতিসৌধ, পাঠ্যপুস্তক, সরকারি অনুষ্ঠান—এসবের মাধ্যমে রাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট অতীতকে জনপরিসরে প্রতিষ্ঠিত করে।
এই প্রক্রিয়া নতুন নয়। পৃথিবীর প্রায় সব জাতিরাষ্ট্রই কোনো না কোনোভাবে এটি করেছে। কিন্তু ইতিহাস আমাদের একই সঙ্গে আরেকটি শিক্ষাও দেয়। কোনো রাষ্ট্রের চূড়ান্ত সাফল্য তার স্মৃতিনির্মাণের দক্ষতায় নয়; তার নাগরিকদের জীবনমানের উন্নতিতে।
কারণ ইতিহাস পরিচয় দেয়, কিন্তু জীবনধারণের শর্ত তৈরি করে না।
স্মৃতি আবেগ সৃষ্টি করে, কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে না।
প্রতীক রাজনৈতিক আনুগত্য গড়ে তুলতে পারে, কিন্তু হাসপাতাল নির্মাণ করে না।
একটি মূর্তি একটি জাতীয় কল্পনাকে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু একটি বিদ্যালয়ের বিকল্প হতে পারে না।
এই কথাগুলি ইতিহাসের গুরুত্বকে অস্বীকার করে না। বরং ইতিহাসকে তার যথার্থ স্থানে স্থাপন করে। একটি সুস্থ সমাজ অতীতকে স্মরণ করে, কিন্তু অতীতের মধ্যে বসবাস করে না। সে ইতিহাসকে জানে, কিন্তু ইতিহাসকে বর্তমানের বিকল্পে পরিণত করে না।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন প্রতীক বাস্তবতার উপর আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সামনে সবসময় দুটি সমান্তরাল কাজ থাকে। প্রথমটি হলো জাতীয় স্মৃতিকে সংরক্ষণ করা। দ্বিতীয়টি হলো নাগরিকদের জীবনকে উন্নত করা। প্রথম কাজটি গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় কাজটি অপরিহার্য।
আজকের পৃথিবী অভূতপূর্ব অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন খাদ্য, কৃষি এবং জনস্বাস্থ্যের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তন শ্রমবাজারকে পুনর্গঠন করছে। যুদ্ধ এবং ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থির করছে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকদের প্রত্যাশাও পরিবর্তিত হয়।
তারা জানতে চায় না কেবল কোন রাস্তার নাম কী হবে।
তারা জানতে চায় তাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ কী হবে।
তারা জানতে চায় শিক্ষা কতটা উন্নত হবে।
তারা জানতে চায় চিকিৎসা কতটা সহজলভ্য হবে।
তারা জানতে চায় কাজ কোথায় সৃষ্টি হবে।
তারা জানতে চায় রাষ্ট্র তাদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে কি না।
এই প্রশ্নগুলি গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু।
এই কারণেই রাষ্ট্রের বৈধতা শেষ পর্যন্ত প্রতীকের উপর নয়, নাগরিক আস্থার উপর দাঁড়িয়ে থাকে।
আর নাগরিক আস্থার সবচেয়ে মৌলিক ভিত্তি হলো রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি।
একজন নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ প্রকাশ ঘটে ভোটের মাধ্যমে। ভোটাধিকার কেবল একটি সাংবিধানিক অধিকার নয়; এটি রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের পূর্ণ সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার প্রতীক। একজন নাগরিক যখন ভোট দেন, তখন তিনি কেবল প্রতিনিধি নির্বাচন করেন না; তিনি ঘোষণা করেন যে রাষ্ট্র তাঁরও।
এই কারণেই সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় ভোটার তালিকার Special Intensive Revision (SIR) বিতর্ক একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
নির্বাচন কমিশন এই উদ্যোগকে ভোটার তালিকা পরিশুদ্ধ করার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। তাদের যুক্তি ছিল, মৃত, স্থানান্তরিত, ডুপ্লিকেট বা অযোগ্য ভোটারদের নাম শনাক্ত ও অপসারণ করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতার জন্য প্রয়োজনীয়। অন্যদিকে বিরোধী দল, নাগরিক অধিকার সংগঠন এবং বহু পর্যবেক্ষক অভিযোগ করেছেন যে এই প্রক্রিয়ার ফলে বিপুল সংখ্যক বৈধ ভোটারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, বহু মানুষকে নিজেদের বৈধতা প্রমাণের জন্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়েছে, এবং বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।
এই বিতর্কের সত্যতা ও পরিসর নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অন্যত্র।
যদি একটি সমাজে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ মনে করতে শুরু করেন যে তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব অনিশ্চিত, যদি নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকারের প্রশ্ন উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে, তবে তা কেবল একটি প্রশাসনিক বিতর্ক থাকে না। তখন তা গণতন্ত্রের গুণগত মানের প্রশ্নে পরিণত হয়।
এখানেই ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের গভীর সংযোগ।
আমরা এই প্রবন্ধে দেখেছি কীভাবে রাষ্ট্র স্মৃতি নির্মাণ করে। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি স্মৃতি নির্মাণে নয়; অন্তর্ভুক্তি নির্মাণে।
একটি রাষ্ট্র রাস্তার নাম পরিবর্তন করতে পারে।
একটি রাষ্ট্র নতুন স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করতে পারে।
একটি রাষ্ট্র অতীতকে নতুন ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারে।
কিন্তু যদি সেই রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই প্রতীকী সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
কারণ গণতন্ত্রের ভিত্তি স্মৃতির একরূপতা নয়।
গণতন্ত্রের ভিত্তি সমান নাগরিকত্ব।
এই কারণেই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব হলো এমন একটি রাজনৈতিক সম্প্রদায় নির্মাণ করা, যেখানে মানুষ নিজেদের প্রথমত নাগরিক হিসেবে অনুভব করে; কোনো ভীত, অনিশ্চিত বা শর্তসাপেক্ষ সদস্য হিসেবে নয়।
সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ-এর বিতর্ক তাই শেষ পর্যন্ত আমাদের একটি বৃহত্তর সত্যের সামনে দাঁড় করায়।
ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ।
স্মৃতি গুরুত্বপূর্ণ।
পরিচয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব এগুলির কোনোটিই নয়।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব মানুষ।
একটি রাস্তার নাম অতীতকে স্মরণ করাতে পারে।
একটি মূর্তি ইতিহাসকে দৃশ্যমান করতে পারে।
একটি স্মৃতিসৌধ জাতীয় আবেগকে শক্তিশালী করতে পারে।
কিন্তু একটি বিদ্যালয় ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে।
একটি হাসপাতাল জীবন রক্ষা করে।
একটি কর্মসংস্থান প্রকল্প মর্যাদা সৃষ্টি করে।
একটি নিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনব্যবস্থা নাগরিক আস্থা নির্মাণ করে।
ইতিহাসের প্রতি সম্মান এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। প্রকৃতপক্ষে একটি সুস্থ গণতন্ত্র এই দুইয়ের সমন্বয়ের উপরই দাঁড়িয়ে থাকে। অতীতকে জানার জন্য ইতিহাস দরকার। ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য প্রয়োজন মানুষকে কেন্দ্র করে রাজনীতি।
স্মৃতির রাজনীতি হয়তো নির্বাচন জিততে সাহায্য করতে পারে।
কিন্তু মানুষের কল্যাণই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করে।

 

 

0 Comments

Post Comment