পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ থেকে সমকালীন বাংলার রাষ্ট্র, ইতিহাস ও গণতন্ত্র পর্ব ৩-৪

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 200 view(s)
  • লিখেছেন : সুমন্ত গোস্বামী
একজন ইতিহাসবিদ যখন শ্যামাপ্রসাদকে দেখেন, তখন তিনি ১৯৪০-এর দশকের রাজনৈতিক সংকট, দেশভাগের বাস্তবতা, হিন্দু মহাসভার ভূমিকা, কংগ্রেসের সঙ্গে মতবিরোধ এবং স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়া—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করেনকিন্তু রাজনৈতিক স্মৃতি সাধারণত এত ধৈর্যশীল নয়। স্মৃতি বেছে নেয়। কিছু ঘটনাকে উজ্জ্বল করে। সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ থেকে সমকালীন বাংলার রাষ্ট্র, ইতিহাস ও গণতন্ত্র পর্ব ৩-৪ পর্বে সেই ইতিহাসকে খুঁজে দেখার চেষ্টা।


ইতিহাসে এমন কিছু বছর থাকে, যেগুলি কেবল একটি ক্যালেন্ডার বর্ষ নয়; একটি মানসিক ভূগোল। বাংলা ও উপমহাদেশের ইতিহাসে ১৯৪৬ তেমনই একটি বছর। এই এক বছরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি শুধু ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করেনি; নির্ধারণ করেছিল কোটি কোটি মানুষের স্মৃতি, ভয়, পরিচয় এবং রাজনৈতিক কল্পনার ভবিষ্যৎও।
সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ-এর নাম পরিবর্তনের বিতর্ককে যদি তার গভীরতম স্তরে অনুসরণ করা হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়াতে হয় ১৯৪৬ সালের কলকাতায়। কারণ বর্তমান বিতর্কের আবেগগত শক্তি কোনো রাস্তার নাম থেকে আসে না; আসে সেই দাঙ্গার স্মৃতি থেকে, যা এখনও বাংলার রাজনৈতিক চেতনার এক অন্ধকার ছায়া হয়ে রয়ে গেছে।
১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট মুসলিম লীগের ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে-র আহ্বানের পর কলকাতায় যে সহিংসতা শুরু হয়, তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। কয়েক দিনের মধ্যে শহরের বিভিন্ন অঞ্চল রক্তাক্ত সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ, লুঠপাট এবং প্রতিশোধমূলক আক্রমণ একে অপরকে অনুসরণ করতে থাকে। কয়েক দশক পরেও ইতিহাসবিদরা নিহতের সঠিক সংখ্যা নিয়ে একমত নন। কিন্তু একটি বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই—এটি ছিল বিংশ শতাব্দীর ভারতীয় নগর ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক বিস্ফোরণ।
এই দাঙ্গা কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল একটি মানসিক ভাঙন। বহু মানুষের কাছে প্রথমবার স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে হিন্দু ও মুসলমানের সহাবস্থানের প্রশ্ন আর কেবল রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়; তা অস্তিত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটেই গোপাল মুখোপাধ্যায়ের নাম সামনে আসে।
ইতিহাসে তিনি গোপাল মুখোপাধ্যায়। জনস্মৃতিতে তিনি গোপাল পাঁঠা।
একজন ঐতিহাসিক চরিত্র এবং একটি রাজনৈতিক প্রতীকের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, গোপাল পাঁঠার ক্ষেত্রে তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
জনপ্রিয় স্মৃতিতে তাঁকে প্রায়শই কলকাতার হিন্দু প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এমন এক ব্যক্তি, যিনি সাম্প্রদায়িক আক্রমণের মুখে আত্মরক্ষার সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। বহু মানুষের পারিবারিক স্মৃতিতে, বিশেষত দেশভাগ-পরবর্তী উদ্বাস্তু সমাজে, তাঁর নাম এখনও এক ধরনের নিরাপত্তা ও প্রতিরোধের প্রতীক।
কিন্তু ইতিহাসবিদের কাজ স্মৃতিকে পুনরাবৃত্তি করা নয়; স্মৃতির উৎপত্তি বিশ্লেষণ করা।
গোপাল পাঁঠার জনপ্রিয়তা বোঝার জন্য তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই সামাজিক পরিবেশ, যেখানে তাঁর কিংবদন্তির জন্ম হয়। কারণ কিংবদন্তি কখনও শূন্য থেকে জন্ম নেয় না। কিংবদন্তি জন্ম নেয় ভয়, অনিশ্চয়তা এবং সমষ্টিগত আঘাতের অভিজ্ঞতা থেকে।
১৯৪৬ সালের কলকাতার হিন্দু মধ্যবিত্ত সমাজের একটি বড় অংশ মনে করেছিল যে রাষ্ট্র তাদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রশাসনের উপর আস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। পুলিশ ও সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল। এই পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষার ধারণা রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। গোপাল পাঁঠা সেই মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োজনের প্রতীক হয়ে ওঠেন।
কিন্তু একই সময়ে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও রয়েছে।
যদি এক সম্প্রদায়ের স্মৃতিতে কেউ রক্ষক হন, অন্য সম্প্রদায়ের স্মৃতিতে তিনি কী?
ইতিহাসের ট্র্যাজেডি এখানেই।
সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে খুব কম চরিত্রই এমন আছেন, যাঁদের সম্পর্কে সব পক্ষ একই কথা বলে। যে মানুষকে এক পক্ষ বীর বলে মনে করে, অন্য পক্ষ তাকে ভয়ের প্রতীক হিসেবেও স্মরণ করতে পারে। ফলে গোপাল পাঁঠাকে বোঝার জন্য কেবল প্রশংসা বা কেবল নিন্দা কোনোটাই যথেষ্ট নয়। তাঁকে সেই সময়ের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখতে হয়।
এখানেই ইতিহাস এবং স্মৃতির দ্বিতীয় বড় পার্থক্য স্পষ্ট হয়।
স্মৃতি নৈতিক বিচার চায়। স্মৃতি জানতে চায়—কে নায়ক, কে খলনায়ক।
ইতিহাস সাধারণত এত সহজ উত্তর দেয় না।
ইতিহাস প্রশ্ন করে—কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, যেখানে মানুষ নিজেদের রক্ষার জন্য রাষ্ট্রের বাইরে বিকল্প শক্তির দিকে তাকাতে বাধ্য হলো? কেন শহর কয়েক দিনের মধ্যে সভ্যতার আবরণ হারিয়ে ফেলল? কেন রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হলো? কেন প্রতিবেশী প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে দাঁড়াল?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা দেখতে পাই যে ১৯৪৬ সালের কলকাতা কেবল একটি শহর ছিল না; এটি ছিল ব্রিটিশ ভারতের সংকটের প্রতিচ্ছবি।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তখন বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মুসলিম লীগ পাকিস্তানের দাবিতে অনড়।
কংগ্রেস ক্ষমতা হস্তান্তরের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করছে।
সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলি নিজেদের সমর্থনভিত্তি সুসংহত করছে।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, যুদ্ধোত্তর সংকট এবং রাজনৈতিক উদ্বেগ সমাজকে অস্থির করে তুলেছে।
এই পরিস্থিতিতে কলকাতা এক বিস্ফোরক নগরীতে পরিণত হয়।
ফলে গোপাল পাঁঠা বা হুসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী—কাউকেই সেই বৃহত্তর সংকটের বাইরে বুঝতে পারা যায় না।
কিন্তু স্মৃতির রাজনীতি সাধারণত এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটকে সরিয়ে দেয়।
কারণ প্রেক্ষাপট জটিল।
প্রতীক সহজ।
এই কারণেই ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা আজও সমকালীন রাজনীতিতে ফিরে আসে। কখনও রাস্তার নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে। কখনও নির্বাচনী ভাষণে। কখনও সামাজিক মাধ্যমে। কখনও ইতিহাসের পুনর্ব্যাখ্যার মাধ্যমে।
অতীতের সেই রক্তাক্ত আগস্ট এখনও বর্তমানের রাজনৈতিক কল্পনাকে প্রভাবিত করে।
কিন্তু এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে।
১৯৪৬ সালের স্মৃতি কি কেবল হিন্দু ও মুসলমানের সংঘর্ষের স্মৃতি? নাকি এটি দেশভাগের রাজনৈতিক প্রকল্পেরও স্মৃতি?
কারণ কলকাতার দাঙ্গা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এর পরেই নোয়াখালি, বিহার, পাঞ্জাব এবং শেষ পর্যন্ত দেশভাগের রক্তক্ষয়ী অধ্যায় আসে। ১৯৪৬ আসলে ১৯৪৭-এর ভূমিকা।
আর এই বৃহত্তর দেশভাগের রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসেন আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি—শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।
গোপাল পাঁঠা জনস্মৃতির নায়ক হতে পারেন। কিন্তু দেশভাগ-পরবর্তী বাংলার রাজনৈতিক পুনর্গঠনের প্রশ্নে আরও গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। তাঁকে ঘিরে যে স্মৃতি নির্মিত হয়েছে, তা আজকের ভারতীয় রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
সুতরাং ১৯৪৬-এর রাস্তাঘাট থেকে আমাদের এখন প্রবেশ করতে হবে দেশভাগের উচ্চ রাজনীতির জগতে। কারণ বর্তমানের স্মৃতিযুদ্ধ বোঝার জন্য গোপাল পাঁঠার পরে যে নামটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তিনি হলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।

১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গার স্মৃতি কেবল কয়েক দিনের সহিংসতার স্মৃতি নয়। সেই স্মৃতির মধ্যে লুকিয়ে আছে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্ন—বাংলার ভবিষ্যৎ কী হবে?
গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং, নোয়াখালির হত্যালীলা, বিহারের প্রতিশোধমূলক দাঙ্গা এবং ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ বাংলার রাজনৈতিক সমাজকে এমন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়, যেখানে "একক বাংলা" ধারণাটি দ্রুত সংকটে পড়তে শুরু করে। এই সংকটের কেন্দ্রে উঠে আসেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।
আজকের রাজনৈতিক ভাষ্যে শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে দুটি বিপরীত বয়ান দেখা যায়।
প্রথম বয়ান তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের রক্ষাকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করে। এই বয়ানে তিনি সেই নেতা, যিনি পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে বাংলার একটি অংশকে রক্ষা করেছিলেন।
দ্বিতীয় বয়ান তাঁকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অন্যতম স্থপতি হিসেবে উপস্থাপন করে। এই বয়ানে তিনি বাংলার বিভাজনকে ত্বরান্বিত করেছিলেন এবং ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক সংগঠনের ভিত্তিতে পরিণত করেছিলেন।
ইতিহাসের বাস্তবতা এই দুই মেরুর মাঝখানে অবস্থিত।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে বোঝার জন্য প্রথমে একটি বিষয় স্বীকার করতে হবে। তিনি কোনো প্রান্তিক রাজনৈতিক চরিত্র ছিলেন না। বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে তিনি বাংলার অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। তিনি শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, প্রাক্তন উপাচার্য এবং সক্রিয় রাজনীতিক—সবকিছু একসঙ্গে ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে কেবল বর্তমানের আলোকে বিচার করলে ইতিহাসের প্রেক্ষাপট হারিয়ে যায়।
১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের পর পাকিস্তানের দাবি ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মুসলিম লীগ যুক্তি দিচ্ছিল যে মুসলমানরা একটি পৃথক জাতি এবং তাদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র প্রয়োজন। এই দাবির রাজনৈতিক অভিঘাত বাংলায় বিশেষভাবে তীব্র ছিল। কারণ বাংলা ছিল একটি মিশ্র জনসংখ্যার প্রদেশ। পূর্বাঞ্চলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল, পশ্চিমাঞ্চলে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। কলকাতা ছিল অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র, কিন্তু তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বাংলা বিভাজনের পক্ষে অবস্থান নেন।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সতর্কতা প্রয়োজন।
বাংলা বিভাজন তাঁর একক পরিকল্পনা ছিল না।
এটি ছিল বহু শক্তির সংঘর্ষের ফল। মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবি, কংগ্রেসের কৌশলগত অবস্থান, ব্রিটিশ সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তর পরিকল্পনা, ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উদ্বেগ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার অভিঘাত এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা—সবকিছু মিলে বাংলা বিভাজনের রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়।
শ্যামাপ্রসাদ এই প্রক্রিয়ার একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণকারী ছিলেন, কিন্তু একমাত্র নির্মাতা ছিলেন না।
এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সমকালীন রাজনৈতিক স্মৃতিতে ইতিহাস প্রায়শই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। জটিল সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে একজন নায়ক বা একজন খলনায়কের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়। ফলে যে বহুমাত্রিক বাস্তবতা ইতিহাসের বিষয়, তা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক পৌরাণিক কাহিনিতে রূপান্তরিত হয়।
শ্যামাপ্রসাদকে ঘিরে এই পৌরাণিকীকরণ স্বাধীনতার পর আরও শক্তিশালী হয়।
স্বাধীন ভারতের প্রথম কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় তিনি শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন। পরে নেহরু-লিয়াকত চুক্তির বিরোধিতা করে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৫১ সালে তিনি ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে জনসংঘ থেকেই ভারতীয় জনতা পার্টির রাজনৈতিক ধারার বিকাশ ঘটে।
এই কারণেই সমকালীন ভারতীয় ডানপন্থী রাজনীতির কাছে শ্যামাপ্রসাদ কেবল একটি ঐতিহাসিক চরিত্র নন। তিনি রাজনৈতিক বংশপরিচয়ের একটি কেন্দ্রীয় প্রতীক।
এখানে ইতিহাসের সঙ্গে স্মৃতির আরেকটি সংঘর্ষ দেখা যায়।
একজন ইতিহাসবিদ যখন শ্যামাপ্রসাদকে দেখেন, তখন তিনি ১৯৪০-এর দশকের রাজনৈতিক সংকট, দেশভাগের বাস্তবতা, হিন্দু মহাসভার ভূমিকা, কংগ্রেসের সঙ্গে মতবিরোধ এবং স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়া—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করেন।
কিন্তু রাজনৈতিক স্মৃতি সাধারণত এত ধৈর্যশীল নয়।
স্মৃতি বেছে নেয়।
কিছু ঘটনাকে উজ্জ্বল করে।
কিছু ঘটনাকে অদৃশ্য করে।
ফলে শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আজ প্রায়শই দুটি বিপরীত প্রতীকে বিভক্ত।
একদিকে তিনি "পশ্চিমবঙ্গের রক্ষক"।
অন্যদিকে তিনি "সাম্প্রদায়িক বিভাজনের প্রতিনিধি"।
ইতিহাসের সমস্যা হলো, সে এই দুই সরলীকরণকেই পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারে না।
কারণ ইতিহাসে একই ব্যক্তি একই সঙ্গে একাধিক ভূমিকায় উপস্থিত থাকতে পারেন।
তিনি একটি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারেন।
তিনি একই সঙ্গে পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতিকও হতে পারেন।
তিনি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগঠনের অংশ হতে পারেন।
তিনি একই সঙ্গে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের প্রবক্তাও হতে পারেন।
এই জটিলতাই ইতিহাসের স্বাভাবিক অবস্থা।
কিন্তু এখানেই একটি বৃহত্তর প্রশ্ন উঠে আসে।
শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আসলে কোথা থেকে এসেছে?
তিনি কোন বৃহত্তর আদর্শিক ধারার অংশ?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের শ্যামাপ্রসাদকে তাঁর রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে স্থাপন করতে হবে। কারণ তিনি একা ছিলেন না। তাঁর পাশে ছিল হিন্দু মহাসভা। তাঁর রাজনৈতিক যুগে সমান্তরালভাবে বেড়ে উঠছিল আরেকটি সংগঠন—রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা RSS।
বর্তমান ভারতীয় রাজনীতিতে RSS-এর প্রভাব এত গভীর যে অনেক সময় মনে হয় সংগঠনটি স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল। কিন্তু ইতিহাসের দলিল একটি ভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করে।
স্বাধীনতা সংগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গণআন্দোলনগুলিতে RSS-এর ভূমিকা কী ছিল?
কেন সংগঠনটি গণ-অভ্যুত্থানের পরিবর্তে সাংগঠনিক নির্মাণকে অগ্রাধিকার দিল?
কেন স্বাধীনতার ইতিহাসে তার উপস্থিতি এবং স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের রাজনীতিতে তার প্রভাবের মধ্যে এত বড় পার্থক্য দেখা যায়?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের এখন প্রবেশ করতে হবে RSS-এর ইতিহাসে। কারণ সোহরাওয়ার্দী থেকে গোপাল পাঁঠা, গোপাল পাঁঠা থেকে শ্যামাপ্রসাদ—এই যে ধারাবাহিকতা আমরা দেখলাম, তার পরবর্তী যৌক্তিক গন্তব্য হলো সেই সংগঠন, যা আজকের ভারতীয় ডানপন্থী রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আদর্শিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি।

 

0 Comments

Post Comment