পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

~করোনানামা~ গোরা এবং আমার ভূতনাথ স্যার

  • 15 April, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 316 view(s)
  • লিখেছেন : নীহারুল ইসলাম
আপনার ঘরে মুসলমানের ছেলে ঠাঁই পায় কী করে?’ উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘কে হিন্দু আর কে মুসলমান- আমি তার কী জানি! আমি তো ঠাঁই দিই আমার স্নেহকে, আমার ভালবাসাকে ...।’

 


 

গোরা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’। প্রকাশিত হয় ১৯১০ সালে। অনেকের মতে এটি বাংলা সাহিত্যের একটি সেরা উপন্যাস। নাম চরিত্র গোরাকে ঘিরে এই উপন্যাস যেভাবে আবর্তিত হয় তাতেই স্বার্থক ওই ‘গোরা’ চরিত্রটি। খালি চোখে দেখলে গোরাকে মনে হবে চরম এক গোঁড়া যুবক। সমাজের কুসংস্কার, জাতিভেদ প্রথাকে টিকিয়ে রাখতে যে প্রাণপণ লড়াই করছে। কিন্তু গভীরভাবে ভাবতে গেলে দেখব এই চরিত্র থেকে এক বিস্ময়কর ভাবাদর্শ বেরিয়ে আসছে।

গোরা সব ধরনের দুঃখকষ্ট, ত্যাগ স্বীকার করে নিজেকে একজন ভারত-সন্তান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। ভারতবর্ষের চলমান সকল ধর্মীয় আচার, কুসংস্কার, জাতিভেদ প্রথা সবকিছুই তার কাছে যেন পবিত্র এবং স্বর্গীয় ব্যাপার। এসবকে সে তার দেশপ্রেম হিসেবে গণ্য করছে। সে ভারতবর্ষের প্রচলিত রীতিনীতি, সংস্কৃতির বিরোধিতা না করে ইংরেজ শাসনের অপসংস্কৃতির মূলে আঘাত করতে চাইছে। ইংরেজদের দুঃশাসন মেনে নিয়ে যেসব ভারতীয় নিজেদেরকে কৃত্রিমভাবে ইংরেজ চরিত্রের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করছে, গোরা তাদের সঙ্গে তর্ক করছে। ঝগড়া করছে। ইংরেজ ও তাদের তাবেদারদের অত্যাচরে নির্যাতিত, সব হারানো মানুষের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেটকে হুমকি দিয়ে বসছে। এমনকি জেল পর্যন্ত খাটছে।

এ হেন যুবকটি নিজেকে খাঁটি ভারতীয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পাগলের মতো ভারতবর্ষের এপাশ থেকে ওপাশ ঘুরে বেড়াচ্ছে। গ্রামে গ্রামে মানুষের অগাধ শ্রদ্ধা অর্জন করছে। মানুষের অধিকার আদায়ে ভারতবর্ষের প্রচলিত রীতিনীতি, প্রথা, ধর্ম, সংস্কৃতিকে অক্ষুণ্ণ রাখতে নিজের প্রাণের বন্ধু বিনয়কে পর্যন্ত অস্বীকার করছে। 

কিন্তু নিয়তির এমনই পরিহাস যে, সে-ই গোরা শেষপর্যন্ত একদিন জানতে পারছে যে আসলে সে নিজেই ভারতীয় নয়। সে আসলে একজন আইরিশ সন্তান। কৃষ্ণদয়াল আর আনন্দময়ী তাকে শুধু লালনপালন করেছেন মাত্র।

 

ভূতনাথ স্যার

খুব মনে পড়ে সেইসব দিনগুলি। যখন আমি ছোট ছিলাম। থাকাতাম মাতুলালয়ে। মুসলিম প্রধান গ্রাম। মাত্র কয়েক ঘর হিন্দুর বাস। কিন্তু কখনোই মনে হয়নি, ‘ওরা’ বা ‘আমরা’। তখন যেমন রামকে চিনতাম-কৃষ্ণকে চিনতাম-অর্জুনকে চিনতাম, তেমনি ইব্রাহিম-ঈশা-মুসা-বেলালকেও চিনতাম।

আমার সহপাঠী রেখার আমন্ত্রণে দু-ক্রোস দূরের গ্রামে গিয়ে সরস্বতী পূজার প্রসাদ খেয়ে আসতাম। স্বাধীনতা দিবসে পরণে পাজামা-পাঞ্জাবি ও মাথায় গান্ধী টুপি পরে ভোর ভোর ভোর ভোর গ্রাম পরিক্রমা করতাম। বড়দের  সঙ্গে গলা মিলিয়ে স্লোগান দিতাম। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জয়! মহাত্মা গান্ধীর জয়! ক্ষুদিরাম বসুর জয়! মাতঙ্গিনী হাজরার জয়!  

আমার মাস্টারমশাই ভূতনাথ স্যার, যে এক সূর্যে একবার ভাত খেতেন। কেউ তাঁর ছায়া মাড়ালে স্নান না করে স্বস্তি পেতেন না। অথচ অংক শেখার বাহানায় তাঁর ঘরটি হয়ে উঠেছিল আমার অতি প্রিয় জায়গা। তাঁর ঘরের বইগুলি হয়ে উঠেছিল আমার বন্ধু।

তা দেখে একবার কেউ ভূতনাথবাবুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনার ঘরে মুসলমানের ছেলে ঠাঁই পায় কী করে?’

উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘কে হিন্দু আর কে মুসলমান- আমি তার কী জানি! আমি তো ঠাঁই দিই আমার স্নেহকে, আমার ভালবাসাকে ...।’

 

 

 

 

 

 

0 Comments

Post Comment