পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

উচ্ছেদের আয়নায় বিত্তের মুখ ১

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 200 view(s)
  • লিখেছেন : শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ
এই উচ্ছেদের আয়নায় বিত্তের মুখ লেখাটি চার পর্বে প্রকাশিত হবে। চারিদিকে যে ভাবে বুলডোজারের হুঙ্কার দেখা যাচ্ছে, সেই সময়ে প্রাসঙ্গিক এই কথাগুলো। আজ প্রথম পর্ব।

আজকে হেনরি মেহিউ-এর কথা একমাত্র নির্দিষ্ট কিছু শাখার বিশেষজ্ঞ ছাড়া কারোর মনে পড়বে না সম্ভবত। ইনি ১৮৪০-এর ভিক্টোরিয়ান লন্ডনের 'নীচের তলা'কে ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছিলেন। মর্নিং ক্রনিকলের সাংবাদিক হয়ে ঘুরে বেড়াতেন এই তথাকথিত নীচের তলার বাসিন্দাদের সাক্ষাৎকার নিতে। সংবাদপত্রে প্রকাশের পরে চারটি খণ্ডে এই বিপুল কাজটি বই হয়েছিল। হঠাৎ হেনরির কথা বলছি কেন তার কারণ লিখছি। আপাতত, দুটি বিষয় নিয়ে লিখে নিই। প্রথমত, হেনরি দোকানদার, যৌনকর্মী, ঠেলাওয়ালা, ঝুড়িওয়ালা এঁদের সবার সঙ্গেই এমন এমন সব জীবিকার কথা জানিয়েছেন যা আমরা চট করে ভেবেই উঠতে পারি না। যেমন কুকুরের গু সংগ্রাহকদের জীবিকা, যা চামড়ার কারখানায় কাজে লাগতো। দ্বিতীয়ত, হেনরির সেই লন্ডন শহর আজকের এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ইত্যাদিদের মেগাসিটিদের মত ছিল। উনিশ শতকের ইউরোপিয় নগরের চরিত্র সে হারিয়ে ফেলেছিল - একদিকে শিল্পায়ন অন্যদিকে সাম্রাজ্যবিস্তারের ফলে নানা জায়গা থেকে আগত লোকদের জন্য। সেই লন্ডনে দারিদ্রের শেষ পর্যায় আর তৎকালে সম্পদের চূড়ান্ত পর্যায় দুই-ই উপস্থিত ছিল।

হেনরি আমাদের লেখায় গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে, যে তিনি ঐ লন্ডনের বাসিন্দাদের তিনভাগে ভাগ করেছিলেন। যারা কাজ করবে, যারা কাজ করতে পারছে না এবং যারা কাজ করতেই চায় না। তিন নম্বর ভাগটা তার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই তথাকথিত সাম্রাজ্যবাদী সভ্যতার কাছে সমস্যাজনক হয়ে উঠেছিল। আমরা এখানে বহু প্রাচীন ভবঘুরে জিপসিদের কথা আলোচনা করছি না। বাকীদের কথা বলছি। সামান্য ভেঙে নিই বিষয়টিকে। বেঁচে থাকাটাই তো একটা বড় কাজ। খেতে হয়, পরতে হয়, আরো নানানটা আছে। তাহলে কাজ না করলে খাবে বা বাঁচবে কেমন করে? হেনরির সাক্ষ্য থেকেই জানতে পারা যায় কাজ করতেই না চাওয়া অংশটি ভিক্ষা, যৌনকর্মী হওয়া, ঠকানো, চুরি-ডাকাতি করার মাধ্যমে বাঁচতো। অর্থাৎ একরকমের কাজ করতই। সঙ্গে ছিল কখনো কখনো কৃষিশ্রমের কাজ থেকে রেলের লাইন পাতা মজুরের কাজও। তার মানে, হেনরির কিছুতেই কাজ করবে না বিভাগটা আসলে একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য-প্রণোদিত বিভাগ। তাদের নীতি-নৈতিকতাও হেনরি নিজের মধ্যবিত্ত সুলভ নীতি-নৈতিকতা দিয়েই যাচাই করেছেন।

হেনরির রাজনীতি কীভাবে তৈরী হয়েছে? আরেকটু প্রাচীন সময় আমাদের ফিরতে হবে সেক্ষেত্রে। ১৩৪৮-এ ইংল্যান্ড বিউবনিক প্লেগের শিকার হল। ব্ল্যাক ডেথ। বিপুল জনসংখ্যা মৃত। তার আগে কৃষক জমির সম্পর্কে সামন্তমালিকের সঙ্গে খুব কম পারিশ্রমিকে যুক্ত ছিল। বেশীরভাগটাই ভূমিদাস, যাদের শুধু শ্রম নয়, জীবন-মৃত্যুও নির্ধারিত হতো সামন্ত ভূমি মালিকের ইচ্ছেতে। কিন্তু ৩০-৫০% মানুষের মৃত্যুতে কৃষিশ্রম আচমকাই মূল্যবান হয়ে উঠলো। কারণ মালিক তো নিজে চাষ করে না। সবদিকেই লোকের আকাল বলে অন্যান্য সামন্তমালিকেরা নিজের কাজের জন্য লোক ভাগিয়ে আনার চেষ্টা করল। কৃষকও বুঝলো সে তার শ্রম আরো উচ্চমূল্যে বিক্রি করতে পারে। ফলে সে এক মালিকের জায়গা ছেড়ে পালিয়ে অন্য মালিকের জায়গায় চলে যাচ্ছিল। এই অবস্থায় রাষ্ট্রবিপ্লব উপস্থিত হয় হয়। তাকে সামাল দিতে আনা হল ভ্যাগর‍্যান্সি আইন বা ভবঘুরে আইন।

এই আইনে কৃষক যদি একজায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিজ শ্রম বিক্রি করতে যায় তাহলে তাকে চাবকিয়ে ঠিক করে দেবার ব্যবস্থা হল। রাজা এডোয়ার্ডের এই ব্যবস্থা টিউডোরদের আমলে আরো জঘন্য হল। কারণ, তদ্দিনে ইংলিশ ভেড়ার উল এবং তার থেকে উৎপাদিত পণ্যের বিদেশের বাজার গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। অতএব, সামন্তমালিকেরা ভূমিদাস, যারা বাধ্যত আবার আটকেছিল জমির সঙ্গে, তাদের গ্রাম কে গ্রাম উজাড় করে দিতে শুরু করল, ভেড়ার চারণভূমি বাড়াতে। এইভাবে যারা উচ্ছিন্ন হল তারা কী করবে এবারে? আবার ভবঘুরে হল। আবার আইন আরো কড়া হল। চাবুকপেটা আর থেঁতলে দেওয়ার মাধ্যমে অবস্থা সামাল দিতে চাইল শাসকেরা। তাতে পরের পর এমন কৃষক বিদ্রোহ হল পরের একশো বছর জুড়ে যে সামন্ততন্ত্রই শেষে ভেঙে গেল। এবং হেনরির সময়কালে ১৮৪২ সালে আগের সব ভবঘুরেদের জন্য আইনকে একত্র করে, শক্তিশালী করে, নতুন আইন হল। অথচ হেনরি অবস্থা বোঝার অনেক দুর্বলতা সত্ত্বেও কিন্তু এইটা বুঝেছিলেন যে এই তথাকথিত ভবঘুরেদের সমস্যাটা সামাজিক কারণ সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কারণে সৃষ্টিটা আর হেনরি বা তাঁর চতুর্থখণ্ডের সহলেখকরা বলে উঠতে সাহস করেননি বলেই মনে হয়।

কিন্তু যেটা ঘটলো, তা হচ্ছে হেনরি বা তাঁর মতন নানান লোকদের এইভাবে দাগিয়ে দেওয়া অপরাধীকে, আমাদের তথাকথিত আধুনিক আইন-কানুনকে কাঠামোবদ্ধ করেছে অনেকটাই। হামুরাবির চোখের বদলে চোখ জাতীয় আইন থেকে রোমানদের টুয়েলভ টেবল্‌স হয়ে আঠারো শতকের উইলিয়াম ব্ল্যাকস্টোন 'অপরাধ' শব্দটির একটি ব্যাখ্যা দিয়ে গিয়েছেন আইনি ভাষায়। এর সঙ্গেই আছে একেবারে পরস্পরবিরোধী দুটি ধারার দুই ইতালিয় জনক। একজন চেজারে বোনেশানা (মারকুইস অব বেকারিয়া), যিনি মনে করতেন মানুষের "স্বাধীন ইচ্ছা" আছে। মানুষ হিসাব-নিকাশ করেই অপরাধ করে। তাই তিনি অপরাধের চেয়ে শাস্তি ব্যবস্থার সংস্কার এবং নির্যাতন ও মৃত্যুদণ্ড বন্ধের পক্ষে লড়াই করেছিলেন। তিনি অপরাধের ধ্রুপদী তত্ত্বের জনক। অন্যজন চেজারে লোমব্রোজো, তিনি অপরাধের পজিটিভিষ্ট তত্ত্বের জনক। বেকারিয়ার বিপরীত মেরুতে গিয়ে তিনি দাবি করেন, মানুষের সবসময় স্বাধীন ইচ্ছা থাকে না। কিছু মানুষ জন্মগতভাবেই অপরাধী এবং তাদের শারীরিক ও জৈবিক গঠনই তাদের অপরাধ করতে বাধ্য করে। এই দুই তত্ত্বের লড়াই, সংমিশ্রণ এবং এদের নানা অবস্থান্তর ইউরোপ ও আমেরিকার আইনি কাঠামো গড়েছে। উপনিবেশরূপে আমাদের কাঠামোকেও গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে।

এই কাঠামো আমাদের মধ্যবিত্তদের দীর্ঘ ঔপনিবেশিক দাসত্ব এবং স্বাধীনতা পরের কালের পাশ্চাত্যধারায় পুষ্ট হয়েছে। এমন নয় যে আমাদের নিজেদের ধারায় এর ভাল বিকল্প কিছু ছিল বা হয়ে উঠেছে। সে পৃথক কোনো আলোচনার বিষয়। আপাতত আমরা দেখি আমাদের মাথায় এই সব অপরাধতত্ত্ব কেমন ছাপ ফেলেছে 'বৈধ' ও 'অবৈধ' ভাবনায়। তারই সঙ্গে আইনি, বেআইনি এবং আধা-আইনি ব্যবস্থাও দেখে নেব।

0 Comments

Post Comment