২
সংক্ষেপেই সারতে হবে আপাতত। ব্রিটিশ ভারত যখন ভেঙে গেল, বাংলাও ভাঙলো, তখন বেশী করে উদ্বাস্তু স্রোত কলকাতা শহরে আসতে শুরু করে। তার আগের পর্বে গ্রাম থেকে হুগলী নদীর দু'ধারের কল-কারখানায় কাজে আসার ইতিহাসও আছে, সাহিত্য-শিল্পের নজিরও আছে। কলকাতায় সরাসরি যারা আসতো এবং হকারি করতো তাদের সংখ্যাও কিন্তু কম ছিল না। সাধারণত তাত্ত্বিকভাবে একে এখন গ্রাম বা তার অনাগরিক বাসস্থান থেকে 'ধাক্কা' এবং নগরের দিকে জীবিকার জন্য 'টান' দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়। ব্রিটিশ কলকাতার হোয়াইট টাউন বা সাহেবি অঞ্চলে হকার খুব বেশী ছিল না।নিয়ন্ত্রিত হত কঠিন ভাবে নানা আইন দিয়ে। তাই ডালহৌসি স্কয়ার (বর্তমান বি.বি.ডি. বাগ), চৌরঙ্গি ও পার্ক স্ট্রিট এলাকায় হকাররা মূলত ইউরোপীয়দের পছন্দের জিনিসপত্র (যেমন—বিলাতি জুতো, জামাকাপড়, বিদেশি ফল, সংবাদপত্র) নিয়ে ঘুরতেন। কিন্তু ব্ল্যাক টাউনে বা কালা আদমিদের জায়গায় অতো কড়াকড়ি ছিল না। উত্তর ও মধ্য কলকাতার বড়বাজার, শোভাবাজার বা হাতিবাগান এলাকায় স্থানীয় বাঙালিদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং সস্তা খাবারদাবার হকাররা বিক্রি করতেন। সেখানে সমস্যা শুরু হতে সেখানকার জমিদারেরা নিজেদের বাজারে এঁদের ঠাঁইও দিয়েছিল একসময়। অর্থাৎ হোয়াইট টাউনে অস্থায়ী, ব্ল্যাক টাউনে স্থায়ী হকার বিভাজন ছিল একরকম।
১৯৪৭-এর খণ্ডিত স্বাধীনতার পর যে উদ্বাস্তু স্রোত তা কলকাতাতেও আছড়ে পড়েছিল। শিয়ালদা দিয়ে প্রবেশ করে বা সীমান্ত দিয়ে, ক্যাম্পে ক্যাম্পে বা অন্যান্য জায়গায় যাবার পাশাপাশিই কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চলে জীবন-জীবিকা নিয়ে ভাবতে হচ্ছিল তাঁদের। সরকারের এ বিষয় আদৌ পরিকল্পনা ছিল বললে হাস্যকর শোনায়। কলকাতায় এবং অন্যত্রও পতিত জমি, বাড়ি এসব দখল করে বসবাস শুরু হল। শুরু হলো জমিমালিক বাড়িমালিকের গুণ্ডা এবং পুলিশের সঙ্গে লড়াই। তাতে কালে কালে আইনি ও বেআইনি পদ্ধতিতে কিছুটা হলেও জয় এলো। কিন্তু পেট চলবে কেমন করে? কেউ কেউ চাকরি পেলেও, বৃহদাংশই পাননি। শিক্ষাগত যোগ্যতার রকমফেরও ঢের। গ্রামীণ শিক্ষিত শ্রেণীর সুবিধে কারিগর-কৃষক-জেলেদের নেই। গ্রামীণ শিক্ষিতরাও সকলেই যে কাজ পেলেন চাকরি জাতীয় তাও নয়। অতএব প্রথমে কলকাতার কেন্দ্রস্থল থেকে দূরের অঞ্চলের নানা খাটাল বা জঙ্গুলে জমি ইত্যাদিতে তাঁরা ব্যবসা শুরু করলেন। অস্থায়ী ঝুড়ি, ডালা ইত্যাদি নিয়ে বসলেন। বা অঞ্চলে আরো ফেরিওলার দলে যুক্ত হলেন। আস্তে আস্তে ব্যবসার সুবিধের জন্য, বিশেষ করে সামাজিক আত্মীয়তার সূত্র ধরে কলকাতার আর্থিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দিকে চলে এলেন। সেসব বাজারে বসলেন ফুটপাথে বা রাস্তার একাংশে।
এরপরের দীর্ঘ সময় তাঁরা অঞ্চলের মস্তান, প্রশাসনের একাংশ, রাজনৈতিক লোকদের নানাবিদ্যায় সন্তুষ্ট করে টিকে থেকেছেন। কখনো তাড়া খেয়েছেন, আবার ফেরত এসেছেন। ব্রিটিশ আমলের আইন তখনো চলেছে। তার মধ্যেই কলকাতা এবং বাংলা রাজনৈতিক নানা বিপুল আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে, যেখানে এঁদের আত্মীয়দের বড় অংশই জড়িয়ে থেকেছে। বিশেষ করে বামপন্থী আন্দোলনে উদ্বাস্তুরা অন্যতম বড় শক্তি হয়ে উঠেছিলেন। অথচ সেই সব আন্দোলনের ফলে আসা বাম সরকার আবার ১৯৯০-তের মনমোহন-প্রণব-চিদাম্বরম-নরসিম্হার উদারনীতির মিথ্যে স্বপ্নের প্রথমে মৌখিক ও দলীয় বিরোধিতা করলেও পরে তাতেই প্রবলভাবে প্রভাবিত হতে শুরু করে। মেট্রোপলিসকে, প্রাইমেট সিটি বানাবার ভাবনায় মশগুল হতে থাকা শুরু। তার কারণও ছিল।
অন্যত্র একটি লেখায় তার বিস্তারিত আলোচনা করেছি বলে এখানে সে প্রসঙ্গকে সংক্ষেপ করি। অপারেশন বর্গা যা কাজ করার তা করেনি। লাঙল যার জমি তার হয়নি শেষত। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের যথাযথ বিকাশ হয়নি। যাকে ইনফ্রাস্ট্রাকচার বলে তারও বিকাশ ঘটেনি। কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যের সমস্যা অবশ্যই ছিল। কিন্তু ঋণ তো বাম শাসিত রাজ্য বিশ্বব্যাঙ্ক থেকে নিচ্ছে ১৯৭৭ থেকেই। অতএব চাইলে কিছু করার ছিল না এমন নয়। কিন্তু করার দিকটা ক্রমেই চীনের রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের মডেলের দিকে সরতে শুরু করেছিল। কিন্তু চীনের সুবিধে এখানে তো মিলবে না। চীন, একসময় পুঁজিবাদের পেটেন্ট নীতির তোয়াক্কা না করে নিজের মতো সব আস্তে আস্তে বানিয়ে নিয়েছে। কৃষি থেকে শিল্পে বেড়েছে, নতুন নতুন বাজার বানিয়েছে। আর চীনে রাষ্ট্রের হুকুমই সব। এসব এখানে কেমন করে জুটবে? জুটলেও, বিশেষ করে স্বাধীন চিন্তার প্রশ্নে তা ভাল কিনা তাও বিবেচ্য!
কিন্তু পুঁজি আনতে হলে নতুন নন্দনতত্ত্ব লাগবে এটাই মাথায় বেশী করে বসে গেছিল বামেদেরও। দারিদ্রের ছবি দেখানো যাবে না বলে 'সিটি অব জয়' বিরোধিতায় তার একরকম প্রকাশ ধীরে বেশ প্রগাঢ় জায়গা নিয়ে নিয়েছে। এই করতে গিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্তের যে জন্ম হয়েছে তাকে সন্তুষ্ট করার কথাও ভেবেছে তারা। অপারেশন সানসাইন এসেছে হকার উচ্ছেদে। বিকল্প জায়গার সংস্থান যেমন-তেমন হলেই হয় না। যেখানে জনসমাগম বেশী সেখানেই হকার বা দোকানদারের বিক্রি বেশী। সেখান থেকে জনহীন জায়গায় ঠেলে দিলে তার চলবে কেমন করে? লেখক প্রত্যক্ষদর্শী সেই সময়ের। অতএব এসব প্রশ্নকে সামনে থেকেই উঠতে দেখেছে। কিন্তু উত্তর মেলেনি। উল্টে তৎকালীন বিরোধী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হকার উচ্ছেদ থেকে রেলের জমিতে বাসস্থান উচ্ছেদের বিরোধীরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। আবার মমতাও যখন ক্ষমতায় এসেছেন, মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন এখানে এবং অন্য সকল সমস্যার সমাধান করতে পারছেন না, বিশেষ করে মধ্যবিত্তের পশ্চিমবঙ্গেই উচ্চমাইনের চাকরির উচ্চাকাঙ্ক্ষার ব্যবস্থা করতে পারছেন না, তখন হকার উচ্ছেদ শুরু করেছিলেন। যদিও ভোটের কথা ভেবে তা গুটিয়েও নিয়েছিলেন কিছুদিনেই। যদিও তারও আগে রেলমন্ত্রী থাকাকালীন রেলওয়ে স্টেশনের হকারদের উচ্ছেদের বিরোধীই ছিলেন। আর আজ যখন বিজেপি সরকার রেলস্টেশনের হকারদের উচ্ছেদ করছেন, বামেরা প্রত্যক্ষ বিরোধ করছেন। মমতা, শক্তিক্ষয়িত হওয়ার ফলে বিবৃতি দিয়েই দায় সারছেন। এইসব ভূমিকা কী দ্রুত পাল্টায় এও দেখার বিষয়!
এখন কথা হচ্ছে হকাররা বৈধ না অবৈধ? নাকি আধা-অবৈধ? সুপ্রিম কোর্ট ১৯(১)(জি) ধারায় হকিংকে অধিকার বলে মেনেছে। কিন্তু নির্ধারিত এলাকার মধ্যে। আর রাজ্যে রাজ্যে বা সংস্থারও আলাদা নিয়ম থাকতে পারে। যেমন রেলের আছে। স্ট্রিট ভেন্ডরস অ্যাক্ট, ২০১৪ আইনটি সাধারণ ফুটপাথের হকারদের উচ্ছেদ থেকে রক্ষা করলেও, রেলের জমির ওপর এটি প্রযোজ্য নয়। সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন নির্দেশিকা অনুযায়ী, রেলের নিজস্ব আইন, থাকতে পারে। যেমন রেলওয়ে অ্যাক্ট, ১৯৮৯-এর ধারা ১৪৪ অনুযায়ী, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের নির্দিষ্ট অনুমতি বা লাইসেন্স ছাড়া কোনো ট্রেন বা রেলের জমিতে (প্ল্যাটফর্ম, ফুট-ওভার ব্রিজ) যেকোনো ধরণের ফেরি বা হকারি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডই হতে পারে। এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা ও ট্রেন চলাচলের স্বার্থে রেলের জমিতে স্ট্রিট ভেন্ডরস অ্যাক্ট দেখিয়ে হকাররা আইনি অধিকার দাবি করতে পারে না।
তাহলে রেলে কারা লাইসেন্সপ্রাপ্ত হকার? রেল শুধুমাত্র আইআরসিটিসি অনুমোদিত স্ট্যাটিক ক্যাটারিং ইউনিট (যেমন ফুড স্টল বা বুক স্টল) এবং নির্দিষ্ট এজেন্সির মাধ্যমে নিযুক্ত ভেন্ডরদের আইনি অনুমতি বা পরিচয়পত্র দেয়। এছাড়া রেলে স্থানীয় শিল্পীদের জন্য 'এক স্টেশন এক পণ্য' স্কিমের আওতায় ১৫ বা ৩০ দিনের জন্য বিশেষ ভেন্ডিং স্টলের লাইসেন্স দেওয়া হয়, যা দমদম বা শিয়ালদহ ডিভিশনের কিছু স্টেশনে রয়েছে।
তাহলে তো মিটেই গেল। রেলের হকারের অবৈধ। অতএব যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত এঁদের উচ্ছেদ সমর্থন করছেন তাঁরা ঠিকই তো বলছেন। তাই কি? আবার একটু পেছনের দিকে চলে যেতে হবে সময়ের।
নিয়মতান্ত্রিক অর্থে মুঘল আমলে আধুনিক কালের মতো জমির পূর্ণাঙ্গ বা চূড়ান্ত ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল না। তবে কৃষকদের ভোগাধিকার এবং জমিদারদের স্বত্বাধিকারের ক্ষেত্রে এক ধরণের সীমিত ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ বজায় ছিল।
কৃষকদের অধিকার (ভোগস্বত্ব) বংশানুক্রমিক অধিকার। কৃষকরা যুগের পর যুগ একই জমিতে চাষাবাদ করতেন। বাবা মারা গেলে সন্তান সেই জমি পেত। কিছু ক্ষেত্রে কৃষকরা জমি হস্তান্তর বা বিক্রিও করতে পারতেন। যতদিন কৃষক নিয়মিত সরকারকে খাজনা বা রাজস্ব দিতেন, ততদিন তাঁকে জমি থেকে উচ্ছেদ করা হতো না। খাজনা না দিলে জমি কেড়ে নেওয়া হতো।
জায়গিরদারেরা ছিলেন। সম্রাটের সামরিক বা বেসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের (মনসবদার) বেতন বা ভাতা হিসেবে জমির রাজস্ব সংগ্রহের অধিকার দেওয়া হতো। এই জমিগুলোকে 'জাগির' বলা হতো এবং যিনি এই জমির অধিকারী হতেন, তিনি জায়গিরদার নামে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু চিরকালের সত্ত্ব ছিল না। বাদশার ইচ্ছেতে জাগির পাল্টেও যেতো বহুসময়।
জমিদাররা তুলনামূলক বংশানুক্রমিকভাবে নির্দিষ্ট এলাকার রাজস্ব আদায়ের অধিকার ভোগ করতেন। জমিদাররা তাঁদের জমিদারির অংশ বিশেষ বিক্রি, দান বা বন্ধক রাখতে পারতেন। জমিদাররা জমির প্রকৃত মালিক ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন মূলত রাজস্ব আদায়কারী মধ্যস্বত্বভোগী। এরই সঙ্গে মুঘল আমলে হিন্দুদের দেবোত্তর বা ব্রহ্মোত্তর সম্পত্তির মতোই মুসলমানদের ধর্মীয়, শিক্ষামূলক ও দাতব্য কাজের জন্য মূলত ‘ওয়াকফ’ এবং ‘মদদ-ই-মাশ’ বা ‘সুয়ুরঘাল’ ইত্যাদি নামক নিষ্কর বা রাজস্ব-মুক্ত জমি দান করা হতো।
১৬৯৮ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের কাছ থেকে সুতানুটি, ডিহি কলকাতা এবং গোবিন্দপুর - এই তিন গ্রামের জমিদারির অধিকার (বা 'বায়নামা') কিনে নেয়। মুঘল ব্যবস্থার অধীনে জমিদারি পেলেও ইংরেজরা নিজেদের মতো করে জমি কেনাবেচা ও লিজ দেওয়ার একটি সম্পূর্ণ নতুন বাণিজ্যিক ব্যবস্থা তৈরি করে। ইংরেজরা জমিকে একটি স্থাবর পণ্য বা ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করে। তারা জমি পরিমাপ করে সীমানা নির্ধারণ করে এবং দলিলের মাধ্যমে মালিকানা হস্তান্তরের আইনি নিয়ম চালু করে। কোনো ব্যক্তি জমি কিনলে বা লিজ নিলে কোম্পানি তাকে একটি সরকারি ‘পত্তন’ বা পাট্টা বা সার্টিফিকেট দিত। এর মাধ্যমে ক্রেতা ওই জমির আইনগত ও স্থায়ী ভোগাধিকার পেতেন। জমি বিক্রির পরও ক্রেতাকে প্রতি বছর কোম্পানিকে একটি নির্দিষ্ট হারে জমির খাজনা দিতে হতো।
এর বাইরে ছিল নিলাম ব্যবস্থাও। কোনো ব্যক্তি বা স্থানীয় ছোট জমিদার যদি সময়মতো কোম্পানির নির্ধারিত খাজনা দিতে ব্যর্থ হতেন, তবে কোম্পানি সেই জমি বাজেয়াপ্ত করত। এরপর সেই জমি কলকাতার বড় বাজার বা জনসমক্ষে উন্মুক্ত নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে বিক্রি করে দেওয়া হতো। কলকাতায় ব্যবসা বৃদ্ধির সাথে সাথে একদল ধনী বাঙালি ব্যবসায়ী, দালাল এবং মহাজন (যাদের ‘বেনিয়ান’ বা ‘মুতসুদ্দি’ বলা হতো) তৈরি হয়। ইংরেজরা কলকাতার বড় বড় ভূখণ্ড বা প্লট এই ধনী পরিবারগুলোর (যেমন শোভাবাজার রাজবাড়ি বা জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার) কাছে বিক্রি ও লিজ দেয়। এই দেশীয় ধনীরা পরে জমিগুলো ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে সাধারণ প্রজাদের কাছে চড়া দামে ভাড়া বা উপ-লিজ দিত। এভাবে ইংরেজরা কলকাতার জমিকে মুঘল আমলের প্রথাগত নিয়ম থেকে বের করে এনে দলিল, লিজ ও উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ইউরোপীয় পুঁজিবাদী কায়দায় কেনাবেচা শুরু করে, যা পরবর্তীতে ১৭৯৩ সালের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ আইনের ভিত্তি তৈরি করেছিল। এই আইন রদ হয় ১৯৫০-এ। জমিদারী যায় তারপরে।
কিন্তু এই অবধিই এই আলোচনাটা করে, আসল প্রসঙ্গে আসি। উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তের যে সম্পদ আজ ব্যক্তিমালিকানায় তা ব্রিটিশদের ব্যবস্থা থেকে এসেছে। মুঘল আমলের জমির উপর মানুষের অধিকার ছিল শর্তাধীন। রাষ্ট্রের পাওনা রাজস্ব পরিশোধ করা সাপেক্ষেই কেবল জমিতে ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা যেত। তার বদলে আজ এঁরা ব্যক্তিগত মালিকানার নিশ্চিন্ত সুখভোগ করছেন। এই অংশের মধ্যে অনেকের পূর্বজই মুঘল আমলের দেবোত্তর, ব্রহ্মোত্তর থেকে প্রতিপালিত। আবার চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদারের নীচে যে কৃষক-কারিগরাদি ব্যতীত বিরাট অধস্তনকূল তৈরী হয়েছিল তাঁদের বংশধরও অনেকেই। তাঁদেরই একাংশ উচ্ছেদের আনন্দে মশগুল। যেমন কৃষকের ঘাম-শ্রম-রক্তে তাঁদের বেদনা হত না, এও তেমনি। এরপরে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিয়ে আরেকটু লিখতে হবে।