পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

মড়ক:

  • 08 April, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 471 view(s)
  • লিখেছেন : উর্বা চৌধুরী
কেউ যদি বেশি খাও, খাওয়ার হিসেব নাও, কেননা অনেক লোক ভালো করে খায় না। এই সময়ে অনেকেই হয়তো খাচ্ছেন আবার অনেকেই পাচ্ছেন না, তাই তাঁদের জন্য আপনার খাবারের ছবিটা আর নাই বা দিলেন। ছবি কৃতজ্ঞতা ঃ শামিম আহমেদ

 

দপ্তরী তখন কাগজ কলমের কাজ করছে। ভর দুপুর। হাই তোলে আর কলম পেষে। এরই মধ্যে এক মহিলা কমলা ফুলছাপ সুতির কাপড় জড়িয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন তার টেবিলের সামনে।

"দিদি, আপনার সঙ্গে কথা আছে।"

মহিলাকে দেখেই দপ্তরীর ঝিমুনি কেটে গেছে। ভয়ানক জাঁদরেল। প্রত্যেকবার এসে তাঁর বাচ্চার হোস্টেল নিয়ে কিছু না কিছু অভিযোগ করে যান শুধু নয়, বিহিত করে তবে যান। কাজ করেন বাড়ি বাড়ি। বোধ করি কাজের বাড়িগুলিতেও তার নীতিশিক্ষার পাঠ বিলোন।

দপ্তরী গলা চড়িয়ে বলে "কী হয়েছে কী? বসে কথা বলুন।"

-বসার সময় নেই। দু বাড়ির কাজ বাকি।
-দিদি, আপনাকে খুব ভয় পাই। বসে একটু ঠাণ্ডা হয়ে কথা বলুন।

মহিলা চেয়ার টেনে বসেন, কথা শুরু করেন "আমার মেয়েটাকে কি আপনারা নষ্ট করে দেবেন? কাল বোডিং-এ মিটিং ছিল আমার মেয়ে আমায় বলেছে দুদিন আগে ওর খাবার বদলে দেওয়া হয়েছে৷"

দপ্তরী বলে "খাবার বদলে দেওয়া হয়েছে মানে?"

-বদলে দেওয়া হয়েছে মানে বদলে দেওয়া হয়েছে। বোডিং-এর ভাত না কি গলে গিয়েছিল। মেয়ে বলেছে- গলা ভাত খাব না। আর অমনি নাকি তাকে চাউমিন খেতে দেওয়া হয়েছে। শুনুন দিদি, আমি আমার মেয়েকে লেখাপড়া শেখাতে বোডিং-এ দিয়েছি, শুধু ভাল ভাল খাবারের জন্য নয়। ঘরটা প্রায় ভাঙা, আমায় কাজের বাড়ি যেতে হয়, তাই ঘরে রাখতে পারি না। এই যদি বোডিং-এর নিয়ম হয়, তালে হবে না। গলা ভাত না খেতে চাইলে না খাইয়ে রাখবে, চাউমিন দেবে? এর'ম করে বাচ্চা মানুষ হয় না। শরীরেও না স্বভাবচরিত্তিরেও না। এই আমি বলে রাখলাম, আপনারা বোডিং-এর আন্টিদের বলে দেবেন। আর আমার মেয়ের ব্যবস্থা তো আমি করব। ওর এত বড় নোলা যে বলে- গলা ভাত খাব না? পোড়ারমুখী খেতেই তো পেতিস না, এখন লম্বা লম্বা কথা হয়েছে!

দপ্তরী তোতলাতে তোতলাতে বলে "দিদি মেয়ের ব্যবস্থা ট্যাবস্থা করবেন বললে কিন্তু আমি আপনাকে এক্ষুনি পুলিশে দেব।"

-পুলিশে দেবেন? বাচ্চা মানুষ করতে পারছেন না আবার আমাকে পুলিশে দেবেন?

এরই মধ্যে হোস্টেলের এক মহিলাকর্মী বাচ্চা মেয়েটিকে নিয়ে মহিলার পিছনে এসে দাঁড়ায়। দপ্তরী তো ভয়ে কাঁটা। মেয়ের মা কি এখানেই পিটতে শুরু করবেন! করলে দপ্তরীকে রুদ্র মূর্তি ধরতেই হবে।

গপ্পো বরং ফুরিয়ে আনি। আর বাড়িয়ে লাভই বা কী। মহিলা এমনই। রুক্ষ শরীর নিয়ে হাজার নীতির কথা বলেই চলেন, বলেই চলেন, স্বভাবতই ওঁর স্বামী টেঁকে না, কাজের বাড়িতে নিত্যদিন বিরোধ লাগে, মেয়ের হোস্টেলে ধুন্ধুমার বেধে যায়। কালিদাসের লব্জে উদ্ভিন্নযৌবনা শকুন্তলা বা শ্রোণীভারাদলসগমনা দ্রৌপদীর অনেক অনেক পর যাঁরা আসেন, "নীরস তরুবর" আর কি!

দেশে মড়ক লাগলে এইসব মহিলাদের কথা বারবার মনে পড়ে। গোটা জীবনটাই কেমন কেটে যায় প্রতিরোধ বন্দোবস্তে।

"পাতে পড়া খাবার নিয়ে যাত্রাপালা করতে নেই" বলে তিনি গপ্পো শোনান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার "আমি জানেন দিদি কাজে বেরোনোর আগে মেয়ের হাতে রোজ পাঁচটা টাকা দিয়ে বলে যেতাম একটা করে ডিমসেদ্ধ, বনরুটি এসব কিনে খেতে। ও না ওই টাকায় আলুচিপস্ কিনে খেয়ে ফেলত। শরীর টিঁকবে বলুন! আমাদের মানুষের শরীর, রোগ ঢুকতে দেওয়ার আগে নজর রাখব না!"...

দপ্তরী ভাবে ঠিক করিয়ে দিয়ে বলে "বলুন, গরীব মানুষের শরীর" কিন্তু বলে না, হতেই পারে মহিলার হৃদয়ের অন্তস্তলে বিশ্বাস আছে যে, বড়লোকের দেবতার মতো শরীর বা শয়তানের মতো!

..."আপনারা তো আলুচিপস খেয়েও ফের ডিমসেদ্ধ খেতে পাবেন। আমরা তো পাব না। আমাদের তো শরীরে রোগ-লড়াইয়ের শক্তি রাখতে হবে।"

দপ্তরী সোজা হয়ে বসেন, জনস্বাস্থ্যের ভাষণ শুরু হয়েছে। মহিলা কোন কথা কোথায় নিয়ে গিয়ে ফেলবেন কেউ জানে না। খানিক মশকরা না করলে এই পর্ব অনন্ত হয়ে উঠতে পারে বুঝে দপ্তরী শুধায় "তাহলে গলাভাতটার কেসটা কী দাঁড়াল?"

মহিলা ফের মেয়ের দিকে তাকান "স্বভাবচরিত্তিরকেও তো ঠিক রাখতে হবে। ভাত গলে গেছে বলে মুখে তুলবি না? গরীবের মেয়ে বলে বলছি না দিদি, খাবারদাবার নিয়ে ওইর'ম নক্সা করলে না বড়লোকও কাঙাল হয়ে যায়। বড়লোকে বেগুন ভেজে ভাত দিয়ে খেয়ে বলে-বাজারে নাকি আগুন! এত কষ্ট যখন ডুবো তেলে ভাজছিস কেন, বেগুনে কত তেল টানে! ভাতে জল ঢালবি, পান্তা খাবি। দুধ খাবে, খেয়ে বলবে "সারাদিন এক গেলাস দুধ খেয়ে আছি"। আমার মেয়েরও ওসব অলুক্কুনে স্বভাব হবে! আপনারা যা পারেন..."

দপ্তরী বোঝে মহিলা পুরোপুরি মনস্তত্ত্বে ঢুকে পড়ছেন "অ্যাই যে, কথায় কথায় "আপনারা আপনারা" করবেন না।"

ভাষণ চলতে থাকে "কিছু মনে করবেন না দিদি, আজ যদি দেশে ঢেলে কোনো রোগভোগ হয় না, বড়লোকদের খালি দেখবেন। পড়বে আর মরবে। শরীরে যে একটা, যাকে বলে একটা যে জোর থাকবে, তা নেই তো। কত খায় তবু..."

দপ্তরী মহিলাকে বাগে পেলেই বড় খোঁচাখুঁচি করে। খোঁচালেই নতুন ভাষণ শোনা যায় "আপনার শরীরে রক্ত ঠিকঠাক আছে? আপনি নিজে একটা করে ডিম খান?"

মহিলা ঠোঁট বেঁকিয়ে চোখ উল্টে বলে "আমরা তো টিটমেন না পেয়েই মরে যাব, সেটা বড় কথা না। গতর খাটাতে যতটা রক্ত লাগে, আছে।"

কখনো সখনো এইসব জাদুময় জীবনদৃষ্টি বিলোনো মহিলাদের কথা মনে পড়ে। মড়কের সময় এই মহিলাও ভ্যানিশ হয়ে যাবেন, চিকিৎসাই পাবেন না হয়তো! তবে লড়বেন। যতটা খেতে পেয়েছেন তার চেয়ে অনেকটা বেশি লড়বেন।

দেশে মড়ক লাগলে রাতদিন কানের কাছে যেন শুনতে পাওয়া যায় "পাতে পড়া খাবার নিয়ে যাত্রাপালা করতে নেই...ভাতে জল ঢালবি, পান্তা খাবি"...

0 Comments

Post Comment