পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

নিঃশেষিত জলের ভান্ডার, বিপন্ন পৃথিবী

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 204 view(s)
  • লিখেছেন : দেবাশিস মিথিয়া
রাষ্ট্রপুঞ্জের এক বিশেষ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, যার শিরোনাম— 'Global Water Bankruptcy'। এর আক্ষরিক তর্জমা করলে দাঁড়ায়— 'বিশ্বব্যাপী জলের দেউলিয়াপনা'। এই রিপোর্ট এক কঠিন বাস্তবের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। পৃথিবী আজ এমন এক প্রান্তে পৌঁছে গেছে, যেখান থেকে ফেরার পথ প্রায় বন্ধ। জলের এই নিঃশেষ হয়ে যাওয়া শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়, এটি মানবসভ্যতার টিকে থাকার লড়াই।

সম্প্রতি রাষ্ট্রপুঞ্জের গবেষণামূলক শাখা ‘ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটি’ (UNU-INWEH) জল সংক্রান্ত একটি বিশেষ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, যার শিরোনাম— 'Global Water Bankruptcy'। এর আক্ষরিক তর্জমা করলে দাঁড়ায়— 'বিশ্বব্যাপী জলের দেউলিয়াপনা'। এই নামকরণের মধ্য দিয়েই এক ভয়াবহ ছবি ফুটে উঠেছে। এই গবেষণায় বলা হয়েছে, পৃথিবী দ্রুত ‘জলশূন্য’ হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে। প্রশ্ন উঠেছে, আমরা কি তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাপ্য জলটুকুও রেখে যেতে পারবো না? আসলে প্রকৃতি যতটুকু জল পুনরায় সঞ্চয় করতে পারে, তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি জল মানুষ খরচ করে ফেলছে। ফলে নদী, হ্রদ এবং ভূগর্ভস্থ জলস্তরের মতো অপরিহার্য সম্পদগুলোর এমন স্থায়ী ক্ষতি হয়েছে, যা মানুষের জীবদ্দশায় আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিকেই গবেষকরা ‘জলের দেউলিয়াপনা’ বা Water Bankruptcy বলে চিহ্নিত করেছেন। তাঁদের মতে, বিশ্ব এখন আর সাময়িক কোনো জল সংকটে নেই, বরং এক স্থায়ী সংকটের  যুগে প্রবেশ করে গেছে । বর্তমানে নজিরবিহীন খরা, অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ এবং বিধ্বংসী বন্যা এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বিশ্বজুড়ে আমাদের জীবনের ‘নিউ নর্মাল’ বা নতুন স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে। প্রকৃতির এই চরম রূপই জানান দিচ্ছে যে, পুরোনো সেই স্থিতিশীল আবহাওয়া হয়তো আর কখনোই ফিরে আসবে না।

​১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি বড় বড় হ্রদের জল শুকিয়ে গেছে , যার ফলে বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ যারা সরাসরি এই হ্রদগুলোর ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, তারা চরম সংকটে পড়েছেন। অতিরিক্ত জল উত্তোলন এবং যত্রতত্র বাঁধ নির্মাণের ফলে অনেক  নদী এখন আর সমুদ্র বা মোহনা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না। জলের এই সঙ্কট  পরিবেশগত বিপর্যয় এর পাশাপাশি, বিশ্ব জুড়ে বিশাল এক অর্থনৈতিক বিপর্যয়কে ডেকে এনেছে। গত পাঁচ দশকে বিশ্ব প্রায় ৪১ কোটি হেক্টর প্রাকৃতিক জলাভূমি হারিয়ে গেছে , যার বাস্তুসংস্থানগত ক্ষতির আর্থিক মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৫.১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর ছাড়াও, মানুষের তৈরি ভূমির অবক্ষয় এবং ভূগর্ভস্থ জলের অপরিকল্পিত ব্যবহারের ফলে যে খরা পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, তার কারণে বিশ্বজুড়ে বার্ষিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০৭ বিলিয়ন ডলার। এই বিপুল আর্থিক ক্ষতি বিশ্বের কোনো কোনো দেশের বার্ষিক জিডিপি-র চেয়েও বেশি৷

​বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৫০ শতাংশ পানীয় জল এবং ৪০ শতাংশের বেশি সেচের জল আসে মাটির নিচে  (ভূগর্ভস্থ)  থেকে।  ফলে বহু শহরের প্রয়োজনীয় পানীয় জল এবং কৃষিকাজে ব্যবহৃত জল সম্পূর্ণভাবে ভূগর্ভস্থ জলস্তর বা ‘অ্যাকুইফার’-এর ওপর নির্ভরশীল৷ কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এই জলস্তরগুলোতে যে গতিতে প্রাকৃতিকভাবে জল সঞ্চয় (Recharge) হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে জল তুলে নেওয়া হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ জলের এই ঘাটতি ক্রমাগত বাড়ছে এবং পৃথিবীর সঞ্চিত জলের ভাণ্ডার দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। বিশ্বের প্রধান প্রধান  অ্যাকুইফারগুলোর  মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই এখন নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার দিকে। এর মধ্যে অনেকগুলোকেই  আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয় (Irreversible), কারণ অতিরিক্ত জল তোলার ফলে এই অ্যাকুইফারগুলোর ভূগর্ভস্থ শিলাস্তর সংকুচিত হয়ে গেছে তাই সেগুলো জল ধারণের ক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে ফেলছে। ​এর পাশাপাশি, কৃষিকাজে ব্যবহৃত অতিরিক্ত সার (নাইট্রেট) ও কীটনাশক, শিল্পকারখানা ও খনি থেকে নির্গত দূষণ এবং লবণের উপস্থিতির কারণে ভূগর্ভস্থ জলের গুণমান মারাত্মকভাবে নষ্ট হচ্ছে । আবার মাটির অনেক গভীর থেকে পাম্প করে জল তোলার  ফলে প্রাকৃতিকভাবে থাকা আর্সেনিক ও ফ্লোরাইড জলের মূল ধারায় মিশে যাচ্ছে। এর ফলে অনেক জলস্তরে জল থাকা সত্ত্বেও তা অর্থনৈতিক বা পরিবেশগতভাবে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ছে।

​ভূগর্ভস্থ জলের এই অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের পরিণতি এখন শুধু ভূ-পৃষ্ঠের ‘সিঙ্কহোল’ বা ধসের মধ্যেই আটকে নেই, অতিরিক্ত জল উত্তোলনের ফলে মাটি বসে যাচ্ছে । কোনো কোনো স্থানে মাটি বছরে ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। বিশ্বজুড়ে এই বসে যাওয়া এলাকার পরিমাণ প্রায় ৬৩ লক্ষ বর্গকিলোমিটার — যার মধ্যে ২ লক্ষ ৩১ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা হলো অত্যন্ত জনবহুল শহর, যেখানে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ  বাস করেন। যা রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়ির মতো পরিকাঠামো ধ্বংস করছে, বন্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এবং উপকূলীয় শহর ও বদ্বীপ অঞ্চলগুলোকে বিপন্ন করে তুলছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে একবার নোনা জল ঢুকে পড়লে সেই ভূগর্ভস্থ জল প্রজন্মের পর প্রজন্ম, এমনকি চিরকালের জন্য ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে যেতে পারে।

বিশ্বের মোট কৃষি জমির ৫০ শতাংশেরও বেশি ইতিমধ্যেই গুরুতরভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে, যার ফলে মাটির জল ধারণ ক্ষমতা হারিয়ে গেছে এবং শুষ্ক অঞ্চলগুলোকে দ্রুত মরুভূমির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জলের এই সংকটের সমান্তরালে বিষফোড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা। এই সমস্যার কারণে বিশ্বে ইতিমধ্যেই প্রায় ১০ কোটি হেক্টরেরও বেশি ফসলি জমির উৎপাদন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রায় ৮ কোটি ২০ লক্ষ হেক্টর বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল আবাদি জমি এবং ২ কোটি ৪০ লক্ষ হেক্টর সেচযোগ্য জমি। এই লবণাক্ততা কেবল মাটির উর্বরতা কমিয়ে দিচ্ছে না, বরং স্থানীয় জলকে দূষিত করে বিশ্বের প্রধান প্রধান খাদ্য উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে ফসল উৎপাদনকে এক চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

ভূমিক্ষয় এবং বনভূমি ধ্বংস কেবল  মাটির জল ধরে রাখার ক্ষমতাকেই কেড়ে নেয় না, বরং বৃষ্টির স্বাভাবিক আচরণকেও আমূল বদলে দেয়। যখন অতিরিক্ত চাপে মাটি জমাট বেঁধে যায় বা উপরিভাগে শক্ত আস্তরণ তৈরি হয়, তখন মাটির জল শোষণ করার ক্ষমতা (Infiltration capacity) প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। ফলে মাঝারি বৃষ্টিপাতও মাটিতে থিতু হওয়ার সুযোগ পায় না; বরং দ্রুত প্রবল জলোচ্ছ্বাস বা আকস্মিক বন্যায় (Flash flooding) রূপ নিয়ে জমির উর্বর পলি ধুয়ে নিয়ে চলে যায় নদীর তলদেশের দিকে। অথচ মাটির গভীরে, যেখানে গাছের শিকড় রয়েছে , সেই অংশটি তৃষ্ণার্তই থেকে যায়। এর পরিণতি অত্যন্ত অদ্ভুত—বৃষ্টির ঠিক পরেই ফসলের মাঠ আবার শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। বর্তমান  যুগে এই 'খরা-বন্যা বৈপরীত্য' (Drought-flood paradox) কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় - এটিই এখনকার রূঢ় বাস্তবতা।যেখানে দীর্ঘস্থায়ী খরার কঙ্কালসার জমির ওপর দিয়েই বয়ে যায় বিধ্বংসী জলোচ্ছ্বাস, কিন্তু তৃষ্ণার্ত মাটি সেই জলটুকু পান করার সুযোগ পায় না।

প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনা এবং জলের হাহাকার আজ সরাসরি আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর আঘাত হেনেছে। বিশ্বের মোট পরিশ্রুত জলের  প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যয় হয় কৃষিকাজে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক খাদ্য উৎপাদন হয় এমন সব ভৌগোলিক এলাকায়, যেখানে জলস্তর হয় আশঙ্কাজনকভাবে নেমে গেছে নতুবা চরম অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। বিশ্বের প্রায় ১৭ কোটি হেক্টর সেচযোগ্য জমি এখন  জল-সংকটের কবলে। জলের এই অভাব সরাসরি বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলকে (Supply Chain) ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। ধান, গম এবং ভুট্টার মতো প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে খাদ্যের দাম বাড়ছে। কৃষির ওপর নির্ভরশীল কোটি কোটি ক্ষুদ্র কৃষক ও প্রান্তিক কৃষি শ্রমিক আজ বিপন্ন। ফসল নষ্ট হওয়া বা চাষ অলাভজনক হয়ে পড়ার কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে; ফলে কৃষকরা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন এবং বাধ্য হয়ে পৈতৃক ভিটে ছেড়ে কাজের সন্ধানে শহরে বা ভিনরাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন (Distress Migration)।

​মাটি আর জলের এই লড়াইয়ে শেষমেশ হারছে আমাদের প্রকৃতি। যখন গাছপালা কমে যায় আর মাটি তার প্রাণশক্তি বা জৈব উপাদান হারায়, তখন প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলেই মরুভূমি আরও বাড়ছে এবং ধুলোঝড়ের দাপটও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ২০২২-২৩ সালের মধ্যেই বিশ্বের ১৮০ কোটিরও বেশি মানুষ চরম খরার মুখে পড়েছিলেন। এই খরা কিন্তু শুধু বৃষ্টির অভাবে হয়নি; বরং আমরা যেভাবে জমি নষ্ট করেছি আর জলের অপচয় করেছি, এটি তারই ফল। জলের অভাব মানে শুধু জল কমে যাওয়া নয়, জলের মান নষ্ট হওয়াও বটে।  কৃষি বর্জ্য, অপরিশোধিত নর্দমার জল এবং শিল্প-কারখানার দূষণের কারণে অনেক জায়গায় জল থাকলেও তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। 

​সব মিলিয়ে, রাষ্ট্রপুঞ্জের এই রিপোর্ট এক কঠিন বাস্তবের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। পৃথিবী আজ এমন এক প্রান্তে পৌঁছে গেছে, যেখান থেকে ফেরার পথ প্রায় বন্ধ। একবার মাটির নিচের শিলাস্তর বসে গেলে বা হিমবাহ পুরোপুরি গলে গেলে, তা আর কোনোদিন আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। জলের এই নিঃশেষ হয়ে যাওয়া শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়, এটি মানবসভ্যতার টিকে থাকার লড়াই। জল ব্যবহারে এখনই সচেতনতা না ফিরলে কিংবা চাষের পদ্ধতিতে বদল না আনলে, আগামী প্রজন্মের জন্য এক চিরস্থায়ী দুর্ভিক্ষ অনিবার্য। সময় প্রায় ফুরিয়ে এসেছে, যা করার এখনই করতে হবে।

0 Comments

Post Comment