পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

করোনা-উত্তর পৃথিবী কেমন হবে?

  • 26 March, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 897 view(s)
  • লিখেছেন : শুভপ্রসাদ নন্দীমজুমদার
করোনা-উত্তর পৃথিবীতে ওই ভেতরের মানুষের কি অভিষেক হবে এক সীমান্তহীন পৃথিবীতে? মানুষ কি আপন থেকে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে বিশ্বলোকের সাড়া পাবে বুকের মাঝে? ‘যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন’, আচারের কারাগার ভেঙে সেখানেই কি ঈশ্বরের সন্ধান করবে ধর্ম? ‘আমার মুক্তি সর্বজনের মনের মাঝে, দুঃখবিপদ তুচ্ছ করা কঠিন কাজে’ এই মন্ত্রে প্রত্যাবর্তন হবে কি মতাদর্শের এই অন্তঃসারশূন্য পৃথিবীতে?

 

 

একটা বিভীষিকা এসেছে পৃথিবীতে। প্রথমে প্রায় সকলেই একে ছোট করে দেখছিলেন। যত সময় যাচ্ছে, প্রকৃতির এই রোষ দেখে মানচিত্রের সীমারেখা, সমাজের শ্রেণিভেদকে তুচ্ছ করে সকল মানুষই এই বিভীষিকার মুখে চরম আতঙ্কের গর্ভে নিক্ষিপ্ত হচ্ছেন। যত সময় যাচ্ছে, সবটাই ক্রমে অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। সরকারি ঘোষণায় বলা হচ্ছে, একপক্ষ কাল সময় মানুষ গৃহবন্দী হয়ে থাকুক। প্রায় প্রতিটি দেশেই এই গৃহবন্দীত্ব ঘোষিত হয়েছে। কিন্তু কোথাও এখনো সংকট কেটে গিয়ে মানুষ অবারিত জীবনে ফেরে নি। চীনে প্রাথমিকভাবে ভাবা গিয়েছিল সংকট কেটে গেছে। সংবাদে প্রকাশ, বর্হিদেশ থেকে আসা স্বদেশীয় মানুষের দৌলতেই হোক, আর স্থানীয়ভাবেই হোক, চীনে আবার নতুন করে সংক্রমণের খবর এসেছে। ফলে গৃহবন্দীত্ব এক্ষুনি সার্বিকভাবে উঠে যাচ্ছে না সে দেশে। তার মানে দাঁড়ালো, পৃথিবী এখন ক্রমেই বেশি বেশি করে ঘরবন্দী হচ্ছে। উল্টোটা এখনও দৃশ্যমান হয় নি।

এমন একটি বাস্তবতা আমাদের জীবদ্দশায় আসবে, তা কোনো দেশের, কোন স্তরের মানুষই কখনো কল্পনা করেন নি। ফলে এই প্রাকৃতিক দুর্বিপাকের সাড়া কী ভাবে দেবেন তা নিয়ে প্রথম অবস্থায় ভীষণ রকমের সংশয় ছিল সকলেরই। রাষ্ট্রনায়ক থেকে রাজনৈতিক কর্মী, শিল্পী বুদ্ধিজীবী থেকে সাধারণ শ্রমজীবী, সন্ন্যাসী মোল্লা পাদ্রী থেকে কেঠো নাস্তিক অবধি কেউই বুঝে উঠতে পারেন নি, কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন এই বিভীষিকার। প্রবলভাবে ধার্মিক মানুষেরা সকলেই নিজ নিজ ধর্মতত্ত্বের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এক ধরনের মহাপ্রলয়, কেয়ামত, গজব বা ডুমস্ ডে’র ধারণার সাথে পরিচিত। ফলে করোনার বিভীষিকা যত স্পষ্ট হয়েছে, ততই তাঁরা নিজ নিজ ধর্মের ওই দুর্বিপাকের দিন সমাগত ভেবে ধর্মের কাছে আশ্রয় খুঁজতে গেছে প্রতিকারের সন্ধান করতে গিয়ে। ভক্তদের এই আকুলতায় ভেসে গিয়ে প্রথমদিকে ধর্মগুরু ও ধর্মীয় রাজনীতির পাণ্ডারা মানুষকে অভয় দেওয়ার চেষ্টা করেছেন ধর্মের অবস্থান থেকে দাঁড়িয়ে। বিচিত্র সব ‘সুবচন’ শোনা গেছে নানা ধর্মগুরু ও ধর্ম-রাজনীতির নেতাদের মুখে। কেউ বলেছেন, চারশ টাকা দিয়ে মুখোস না কিনে চল্লিশ টাকা দিয়ে টুপি কিনে মসজিদের কাতারে দাঁড়িয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লেই করোনা দূরে চলে যাবে। কেউ বলেছেন, গায়ে গোবর মাখলে বা গরুর প্রস্রাব পান করলেই করোনার ভাইরাস দূর হয়ে যাবে। ঘটা করে গরুর প্রস্রাব পান করাবার উৎসব হয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশে গ্রামাঞ্চলে ওয়াজ মহফিলগুলিতে আজগুবি কথাবার্তার ফুলঝুরি ছুটেছে। একজন বলেছেন, স্বপ্নে করোনা ভাইরাসের সাথে দু’বার সাক্ষাৎকার হয়েছে। করোনা তাঁকে নিশ্চিন্ত করে বলেছে, ইসলাম বিরোধী চীন, ইউরোপ, আমেরিকা, ভারত ও ইসলামের ‘বিকুত ব্যাখ্যাদানকারী’ ইরানেই একমাত্র করোনার প্রকোপ হবে। এবং সেটা হবে ঈশ্বরের ‘গজব’ হিসাবে। ধর্মপ্রাণ বাংলাদেশের ‘সহি’ মুসলমানদের এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। একজন বলেছেন, করোনার ক মানে কোরান, র মানে রোজা, ন মানে নামাজ অর্থাৎ রোজাদার নামাজী মুসলিম যে কোরান অধ্যয়ন করে তার ওপর করোনার বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়বে না। ভারতে বিজেপি নেতা কৈলাস বিজয়বর্গীয় বলেছেন, হিন্দুরা ৩৩ কোটি দেবতার পূজা করে, সুতরাং হিন্দুদের করোনা থেকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেছেন, শণির প্রকোপেই করোনার মত ভাইরাসের জন্ম হয়। এর থেকে রক্ষা পাওয়ার বিধান হিন্দু ধর্মে রয়েছে। কিছুদিন আগে তিনি বলেছিলেন, ঠাকুরের ভোগ বা প্রসাদ খেলে সংক্রমণ ছড়ায় না। রাজনৈতিক নেতারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অত্যুৎসাহী কথা বলারও এক ধরনের প্রতিযোগিতায় যেন নেমেছেন। বাংলাদেশের একজন শাসকদলের নেতা বলেছেন যে, শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে করোনা বাংলাদেশের ত্রিসীমানায় পা রাখতে পারবে না। ভারতের শাসকদলের এক নেতা পাকিস্তানকে ‘টাইট’ দেওয়ার জন্যে করোনার ভাইরাস সীমান্তের ওপারে ছড়িয়ে দেওয়ার নিদান দিয়েছিলেন। সরকারি স্তর থেকে ‘সামাজিক দূরত্ব’-র যত আবেদনই আসুক, নানা জায়গায় সরকারি দলের লোকেদের উদ্যোগেই নানা ধরণের মেলা, পূজা বা ওয়াজ মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে। ওলাওঠা বা বসন্ত হলে স্থানীয় স্তরে মোমবাতি জ্বালানো বা এ ধরনের নানাবিধ কুসংস্কার রয়েছে, তাও পালিতহচ্ছে মহা ধুমধামে। ফেসবুকে দেখা গেল, বাংলাদেশের একটি গ্রামাঞ্চলে একদল মানুষ মধ্যরাতের অন্ধকারে নদীর চরে, পুকুর পারে একটি বিশেষ ধরনের পাতা খুঁজছেন। কারণ জিজ্ঞেস করলে ওরা বলেছেন, ওয়াটসআপে ওরা এ ধরনের একটি মেসেজ পেয়েছেন।এগুলো শুধু ভারত পাকিস্তান বাংলাদেশে নয়, প্রথম দিকে করোনা থেকে মুক্তি পেতে চীনেও নাকি কোনো কোনো মানুষ মাথায় মোষের শিঙ পরে ঘুরে বেরিয়েছিল

রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিক্রিয়াও বেশ অভিনব। বিরোধী রাজনীতির লোকেরা প্রথমে বলাবলি করেছেন, করোনা নিয়ে হৈচৈ প্রকৃতপক্ষে মৌলিক সমস্যা থেকে মানুষের নজর ঘোরানোর একটা সরকারি কৌশল। বামপন্থী কর্মী নেতাদের কেউকেউ প্রথম দিকে সামাজিক গণমাধ্যমে এ ধরনের বার্তায় ভরিয়ে দিয়েছেন যে অনাহারে, দারিদ্র্যে অনেক বেশি মানুষ মারা যায়। সুতরাং করোনা শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষের জন্য কোনো সমস্যা নয়। এই হৈচৈগুলি আসলে অর্থহীন। এটা বড়লোক দেশ ও বড়লোক মানুষের জন্য মহামারী। সাধারণ মানুষ এর চেয়ে বেশি মহামারী নিয়ে প্রতিদিন বাঁচে। করোনার শুরু যেহেতু চীনে সেজন্যে এক ধরনের রাজনীতিবিদ ও তাদের অনুগামীরা চীনবিরোধী প্রচারে সামাজিক গণমাধ্যম ভরিয়ে দিয়েছেন। প্রথমদিকে ট্রেনে বাসে চায়ের ঠেকে মানুষ এটাই বলাবলি করেছে, এটা চীনের চক্রান্ত। নিজেদের দেশের পরীক্ষাগারে জৈব রাসায়নিক অস্ত্র তৈরি করছিল। সেখানে এক দুর্ঘটনা হয়েছে বলেই সেখানে এই রোগ ছড়িয়েছে। অবিলম্বে চীনকে বর্জন করতে হবে। এই চীন বিরোধিতায় সামিল হয়েছেন চীন-বিরোধী বাম দক্ষিণ সকলপক্ষই।

সমস্ত বিভ্রান্তিই এখন ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসছে। ধনী গরিব উন্নয়নশীল, সমস্ত দেশই এখন লকডাউনের অধীনে আসছে।মন্দির মসজিদ গির্জা গুরুদ্বার, কেউ আগে কেউ পরে ধীরে ধীরে সব বন্ধ হয়ে আসছে। কাবায় তালা পড়েছে। তালা পড়েছে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে. বিশ্বব্যাপী অগুনতি গির্জা প্যাগোডায়। শাসকদলের পক্ষে বিরোধীদের চক্রান্ত খোঁজা, বিরোধী দলের তরফে শাসকদলের সর্বাত্মক বিরোধিতা, ধর্ম ভাষা জাতপাতের বিদ্বেষ, দেশপ্রেম-দেশদ্রোহিতা, ভারত-পাকিস্তান, ইসলামি সন্ত্রাসবাদ-হিন্দুত্ব ইত্যাকার নানা রাজনীতি এখন থমকে দাঁড়িয়েছে। আসমুদ্র হিমাচল গৃহবন্দী, এমন বাস্তবতা আগে কখনো আসে নি। মানুষকে দলবদ্ধভাবে বাইরে চলাফেরা করতে দেওয়া যাবে না। আবার মানুষের জরুরি প্রয়োজনের জিনিষপত্র মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার মত সরকারি ব্যবস্থা বা সাংগঠনিক কাঠামোও নেই। ফলে বাজার খোলা রাখতে হবে, জরুরি কাজে নিয়োজিত লোকেদের কাজের জায়গায় নিয়মিত যেতেও হবে। একই সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ রাখতে হবে। আবার দৈনিক মজুরি বা অনিয়মিত রোজগারে নিয়োজিত মানুষেরা কীভাবে এই সংকটের সময়ে বাঁচবেন, তাও ভাবতে হবে। সামগ্রিক বিষয়টি সামাল দিতে গিয়ে বিপত্তিও ঘটছে। পুলিশ না নামলে রাস্তাঘাট থেকে ভিড় সরছে না, আবার পুলিশ নামলে পুলিশী জুলুমের ঘটনাও ঘটছে। সব মিলিয়ে একটা অভূতপূর্ব অচলাবস্থা। হাতের কাছে কোনো পূর্বদৃষ্টান্ত নেই যে যার হুবহু অনুকরণ করা যাবে। এই নিয়ে রাজনৈতিক চাপান উতোর খানিকটা হলেও সেটা স্বাভাবিকই এবং যথেষ্টই ন্যায়সঙ্গতও। কিন্তু সকলেই বুঝতে পারছেন, এই নিয়ে একটা সর্বাত্মক রাজনৈতিক যুদ্ধ বাঁধাবার এটা সময় নয়।

ফলে ব্যক্তি ও সমাজে একটা বদলের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সংকট যত বাড়বে এই বদলও হয়ত আরো স্পষ্টতর হবে। অনেকেই বলছেন, যেদিন সংকট কাটবে সেদিন এই পৃথিবীটার বাস্তব চেহারাটা অনেকটাই পাল্টে যাবে। এটা যেহেতু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভাষায় অতিমারী, মহামারীর চেয়েও ভয়ঙ্কর। ফলে এর ক্ষতির আকারও হবে অপরিসীম। মৃত্যু পৃথিবীর বুক থেকে এক বড় সংখ্যার মানুষকে কেড়ে নেবে। হয়ত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ বা মহাযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে যুদ্ধ ও মারীতে যত মানুষ প্রাণ দিয়েছেন তার চেয়েও বেশি সংখ্যায় মানুষ মৃত্যুর মুখে পড়বে এই অতিমারীর ফলে। এই বিভীষিকার সামনে প্রাচ্য পাশ্চাত্য, ধনী দেশ গরিব দেশ, সমাজের উচ্চশ্রেণি নিম্নআয়ের মানুষ সব একাকার হয়ে যাবে। পৃথিবীর সবচাইতে শক্তিধর রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন করোনার মারণকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। ইতালী স্পেন ইতিমধ্যেই মৃত্যুপুরী হয়ে উঠেছে। ব্রিটেনের যুবরাজ ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি আর দমদমের প্রৌঢ় এখন একাসনে। এখন নরেন্দ্র মোদীকেও তার পরিচিত পোষাক ছেড়ে বলতে হচ্ছে, কোনোভাবেই গুজব বা অন্ধ কুসংস্কারের দ্বারা চালিত হবেন না। ডাক্তারের পরামর্শ ও সরকারের নির্দেশ ছাড়া আর কোনো কিছুই শুনবেন না। নাখোদা মসজিদের ইমাম বলছেন, মানুষ বাঁচলে তবেই ধর্ম। তবেই মন্দির মসজিদ গির্জা গুরুদ্বার। মানুষই যদি না বাঁচে তবে মন্দির মসজিদ গির্জা গুরুদ্বার দিয়ে কী হবে? এই কথাগুলিই এতদিন বলে এসেছেন বিজ্ঞানকর্মীরা, ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি ও সমাজচিন্তকরা। এই কথাগুলি বলতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন জিয়োর্দানো ব্রুনো থেকে দাভোলকার।পাকিস্তানকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে যারা রাজনীতি করেন, তাদের শিরোমনি নরেন্দ্র মোদী পাকিস্তান সমেত সমস্ত সার্কভুক্ত দেশগুলির রাষ্ট্রনায়কদের নিয়ে ভিডিও কনফারেন্স করতে চান। অথচ এতদিন ধরে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন বারবার মুলতুবি হয়ে চলেছে, কারণ ভারত পাকিস্তানে শীর্ষবৈঠকে যেতে রাজী নয়। আজ অতিমারী এসে ওই রাজনীতিকেও পেছনে ঠেলেছে। এন-পি-আর, এন-আর-সি স্থগিত। শাহীনবাগ ও পার্ক সার্কাস এখন আপাতত বাড়ি ফিরে গেছে।

মানুষ এখন গৃহবন্দী। এখন বাইরের উচ্ছলতা, উদযাপন ছেড়ে মানুষ ভাবছে, কী হবে? কোথায় যাবো? কোথায় আমাদের প্রতিকার এই পরাভব থেকে? সারা বিশ্ব জুড়ে মানুষ তাকিয়ে আছে বিজ্ঞান আর গবেষনাগারগুলির দিকে। কবে এই ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হবে? কবে করোনা আক্রান্ত রুগির জন্যে ওষুধের সন্ধান দেবে বিজ্ঞান? উনবিংশ শতকে সংস্কারের আন্দোলন করতে গিয়ে বিদ্যাসাগর প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ খুঁজে সংস্কারের পক্ষে যুক্তি খুঁজেছেন মানুষকে বোঝাতে। এখন নিজেকে টিঁকিয়ে রাখতে ধর্মকে বিজ্ঞানের অনুগামী হতে হচ্ছে। এতদিন বিজ্ঞানকে ধর্মের সাথে সহাবস্থান করতে হয়েছে, মানিয়ে চলতে হয়েছে। এর ব্যত্যয় হলেই বিজ্ঞানীদের ওপর, বিজ্ঞানের আদর্শ ও রাজনীতির কথা যারা বলেছেন তাদের ওপর নেমে এসেছে প্রাণঘাতী আক্রমণ। এখন করোনা এমন এক পৃথিবীকে নিয়ে এসেছে যখন ধর্মকে বিজ্ঞানের সাথে মানিয়ে নিতে হচ্ছে। ধর্মের যৌক্তিকতা দিতে হচ্ছে বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে। একটা সময়ে ধর্মকে ছদ্মঢাল করে এগিয়েছে বিজ্ঞান। এখন বিজ্ঞানকে ছদ্মঢাল করতে উদ্যত হয়েছে ধর্ম। বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে ধর্ম নিজের গ্রহণযোগ্যতা হারাবে এই মর্মান্তিক সত্যটি বুঝতে পারছেন ধর্মগুরুরা।এভাবে একটু একটু করে ঈশ্বরের চেয়ে উচ্চতর হয়ে উঠছে প্রকৃতি। আর প্রকৃতির সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাকার হিসেবে মানুষের সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে বিজ্ঞান।

ধ্বংস ও মৃত্যুর এই অভূতপূর্ববিশ্বলীলার পর যেদিন পৃথিবী এই রোগমুক্ত হবে, তখন কেমন হবে পৃথিবী? মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক কি অপরিবর্তিত থেকে যাবে? রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক থাকবে একই রকম? জাতি ধর্ম ভাষা সীমান্ত রাষ্ট্র, এগুলি যখন অর্থহীন প্রতিপন্ন হয়ে যাবে অতিমারীর মুখে, তখন অপরিবর্তিত চেহারায় টিঁকে থাকবে কি এই প্রতিষ্ঠানগুলি করোনা-উত্তর পৃথিবীতে? প্রতিটি মানুষের মধ্যেই রয়েছে দু’টি মানুষ। একটি ভেতরের, আরেকটি বাইরের। বাইরের আমি নিজেকে দেখে নিজের জন্ম থেকে মৃত্যুর সংকীর্ণ সময়সীমার মধ্যেই। এই সময়সীমায় তার শ্রেষ্ঠ বেঁচে থাকাটাই তার একমাত্র উপজীব্য বিষয়। এই বাঁচায় যে পাশের মানুষটিকে ছাপিয়ে যেতে চায়। পাশের মানুষটিকে সে ভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী। আর তার ভেতরের মানুষটা নিজের মধ্যে সমগ্র মানবকে দেখতে পায়, যা তার ব্যক্তিমানুষের জন্মমৃত্যুর সীমা ছাড়িয়ে বেঁচে থাকে। এই সমগ্রের সন্ধান করতে গিয়েই সে পাশের মানুষের দিকে হাত বাড়ায়, সে তার সহ-পথিক হয়ে ওঠে। সকলের বাঁচার মধ্যে নিজের বাঁচাকে আবিষ্কার করে সে বাইরের আমির হিসেবে যা ক্ষতি সেই মহা-লাভের জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ‘মানুষের ধর্ম’ নিবন্ধের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ এই বাইরের আমির মধ্যে দেখেছেন মানুষের পশুরূপ। আর ভেতরের আমির মধ্যেই দেখেছেন তার মানবরূপ। বলতে দ্বিধা নেই, নয়া উদারবাদের ‘ভুবনমোহন-বিজ্ঞাপন-বিমোহিত-মন’ করোনা-পূর্ব পৃথিবীর মানুষ ‘আমাকে আমার মত থাকতে দাও’-এর জীবনে ইট-ড্রিঙ্ক-বি মেরি আদর্শকে সর্বস্বজ্ঞান করে এই ভূপ্রকৃতির ধ্বংসলীলায় মেতে উঠেছিল। তার কাছে আমাজনের বৃষ্টিঅরণ্যের বেঁচে থাকার কোনো মূল্য ছিল না, তাই বোলসানেরোরা মানুষের পছন্দে নির্বাচিত হয়েছে ব্রাজিল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড থেকে ভারতে। উত্তর আধুনিকতা ও তার সঙ্গী দর্শনেরা মানুষকে চালিত করেছে বৃহৎ থেকে ক্ষুদ্রতায়, মানবপ্রেমের আদর্শ থেকে মতাদর্শহীনতায়, সমগ্রের মুক্তিসংগ্রাম থেকে ব্যক্তির ইঁদুরদৌড়ে। ভোগসর্বস্ব এই মানুষ আসলে রবীন্দ্রনাথ কথিত বাইরের মানুষ।

করোনা-উত্তর পৃথিবীতে ওই ভেতরের মানুষের কি অভিষেক হবে এক সীমান্তহীন পৃথিবীতে? মানুষ কি আপন থেকে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে বিশ্বলোকের সাড়া পাবে বুকের মাঝে? ‘যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন’, আচারের কারাগার ভেঙে সেখানেই কি ঈশ্বরের সন্ধান করবে ধর্ম? ‘আমার মুক্তি সর্বজনের মনের মাঝে, দুঃখবিপদ তুচ্ছ করা কঠিন কাজে’ এই মন্ত্রে প্রত্যাবর্তন হবে কি মতাদর্শের এই অন্তঃসারশূন্য পৃথিবীতে? অসংখ্য মানুষের প্রাণসংহারি লাভাস্রোত শীতল হয়ে এলে তার ভেতর থেকে জেগে উঠবে কি সবুজের কচি চারা? 

 

 

0 Comments

Post Comment