পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

মব, ক্রাউড ও ডিম ইতিবৃত্ত

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 200 view(s)
  • লিখেছেন : মৌমিতা আলম
মব ভায়োলেন্সের শিকার হয় আর্থিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও লিঙ্গ রাজনীতির প্রান্তিক লোকজনেরা। ভারতে ডাইনি সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা নতুন কোনও বিষয় নয়। কোনো নারী একটু নিয়মের বাইরে গিয়ে বিরুদ্ধাচরণ করলেই তাকে দাগিয়ে দাও চরিত্রহীন বলে আর সেই নারীর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলো উন্মত্ত জনতাকে। রাজনৈতিক নেতাদের মদতে বাড়তে থাকা ঘৃণার আবহে ডিম ছুঁড়ে মারা, কাউকে কোমরে দড়ি বেঁধে ঘোরানোর স্বাভাবিক বলে মান্যতা পেলে তার ফল ভুগতে হবে কিন্তু সবাইকেই।

ইংরেজিতে মব(মব) ও ক্রাউড(ক্রাউড) দুটো ভিন্ন শব্দ। ক্রাউড মানে একদল জনতা। সেই জনতা যাঁদের আমরা নানানরকম লাইনে দেখি। তাপ উত্তাপহীন, যা হচ্ছে মেনে নাও টাইপের জনতা। রেশন লাইনে দাঁড়িয়ে, বাসে দাঁড়িয়ে, হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে। নুইয়ে পড়া কাঁধ, ন্যুব্জ শরীর, ময়লা জামাকাপড় যাদের দেখলে নাক সিটকিয়ে চলে যায় ভদ্রলোক বাবু। আর চেয়ারে বসা যে কেউ যাঁদের দেখলে সরাসরি “তুই” এ নেমে আসতে দ্বিধা করে না। অবহেলা, বঞ্চনা, উপহাস ও নিঃশব্দে একদিন ঢলে পড়া মৃত্যুর কোলে। এই রকম ক্রাউড ও জনতা দেখতে দেখতে আমাদের চোখ, গা দুটোই সইয়ে গেছে। যাঁরা হাতজোড় করতেই অভ্যস্ত। মনে পড়ে গোধরা দাঙ্গা পরবর্তী কুতুবউদ্দিন আনসারির ছবি। যে ছবিটি তুলেছিলেন রয়টার্সের সাংবাদিক অর্ক দত্ত।

 

কিন্তু মব? মনে পড়ে গোধরা দাঙ্গার সময় অশোক পারমারের ছবি।  মাথায় ফেট্টি বাঁধা। হাত উঁচিয়ে ধরে আছে তলোয়ার। চোখ ভর্তি বিদ্বেষ আর ঘৃণা। কুতুবউদ্দিন আনসারি যদি হয় সাধারণ জনতার ছবি। তবে মব বা উন্মত্ত জনতার ছবির পোস্টার বয় হবেন নিঃসন্দেহে অশোক পারমার।

ক্রাউড বা জনতা যখন উন্মত্ত হয়ে ক্রুদ্ধ, উত্তেজিত জনতা হয়ে যায় তখন সেই জনতা মারতে আর মরতে কোনোটাতেই আর দ্বিধা করে না। ভারতবর্ষের মতন একটি দেশে যেখানে এখনও না খেয়ে মানুষ মারা যায়, সেখানে একটি বিশাল অংশের জনতাকে তাঁর দরিদ্রতা, অশিক্ষা ও অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে খুব সহজেই জনতা বা ক্রাউড থেকে মব বানিয়ে ফেলে লাভ তোলে রাজনৈতিক নেতা, সমাজ, পরিবার ও পিতৃতন্ত্র।

মব ভায়োলেন্সের শিকার হয় আর্থিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও লিঙ্গ রাজনীতির প্রান্তিক লোকজনেরা। ভারতে ডাইনি সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা নতুন কোনও বিষয় নয়। কোনো নারী একটু নিয়মের বাইরে গিয়ে বিরুদ্ধাচরণ করলেই তাকে দাগিয়ে দাও চরিত্রহীন বলে আর সেই নারীর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলো উন্মত্ত জনতাকে। ক্রাউড বা জনতা খেপে গেলেই হলো, সেই নারীকে সাইজে নিয়ে আসতে তাঁর বেশিক্ষণ লাগে না। সেই একইরকম ভাবে কোনো নারীকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতে কিংবা গ্রাম থেকে উচ্ছেদ করতে পিতৃতন্ত্র, পরিবার ও সমাজের কাছে এক মোক্ষম অস্ত্র হলো স্লাট শেমিং এর রটনা। রটিয়ে দাও মহিলাটি ডাইনী, মহিলাটি চরিত্রহীন উন্মত্ত জনতার কানে। ব্যস। তারপর দফা রফা হয়ে যাবে। লাভ লুটবে এই উন্মত্ত জনতার পিছনে থাকা কোনো পরিবার, সমাজ বা পিতৃতন্ত্র। NCRB(ন্যাশনাল ক্রাইম রিপোর্টস ব্যুরো) এর তথ্য অনুযায়ী ২০০০ সাল থেকে ডাইনী সন্দেহে পিটিয়ে মারা হয়েছে প্রায় ২৫০০ জনকে। এদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মহিলা। সর্বভারতীয় স্তরে প্রকাশিত ম্যাগাজিন ফ্রন্টলাইন এ প্রকাশিত একটি রিপোর্ট অনুযায়ী,

নিরন্তর ট্রাস্ট এর(২০২৩-২৪) একটি সার্ভে রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতে ডাইনী শিকার চলছেই ১৯৯৯ সালে পাস হওয়া ডাইনি শিকার বিরোধী আইন এর ২৫ বছর পরও। সেই সংস্থার দীপ্তা ভোগ জানান যে বিহারে প্রায় ৭৫০০০ জন মহিলা যা সম্ভবত গ্রাম প্রতি দুই বা তার বেশি প্রতিনিয়ত ডাইনী সন্দেহের ভয়ে ভয়ে থাকে। কোনো মহিলা ডায়েন শুনলেই যে উন্মত্ত বিদ্বেষ শুরু হয়, ভয় ও ঘৃণা মিশ্রিত সেই বিদ্বেষ থেকেই তৈরি হয় মব। যাদের এক অপরিসীম, ঘৃণা মিশ্রিত ক্ষোভ এর নিষ্ক্রমণ ঘটে সেই নারীটিকে লিঞ্চ বা খুনের মাধ্যমে। আইন বা বিচারের তোয়াক্কা এই উন্মত্ত জনতা করে না। জানে না। তাই রক্ষা পায় না মব লিঞ্চিং এর শিকার আখলাখ থেকে জুনেইদ।

 

ক্রাউড বা জনতা থেকে মব হতে কখনও সময় লাগে মাত্র দেড় ঘণ্টা যেমনটি মালায়ালি লেখক সাহারু নুসাইবা কান্নানারী এর উপন্যাস ক্রনিকলস অফ আওয়ার এন্ড হাফ এ দেখতে পাই। চল্লিশ এর রিহানা আর পঁচিশ বছর বয়সী বুরহান এর প্রেম ক্ষেপিয়ে তোলে জনতাকে এবং শেষে মব লঞ্চিং এ ভয়ানক ভাবে খতম করে দেওয়া হয় বুরহান কে। উপন্যাসটি যদিও একটি ঝড়ের দিনের মাত্র দেড় ঘণ্টার কাহানি। কিন্তু সেই দেড় ঘণ্টা দেখিয়ে দেয় কিভাবে সমাজে আসলে বিদ্যমান সবসময় মব, শুধুই ক্ষেপিয়ে দেওয়ার অপেক্ষায়।

 

৪ঠা মে রাজ্যে পালাবদলের পর এসেছে নতুন এক সরকার। এই গত মাস খানেকের মধ্যেই পাল্টে গেছে রাজনৈতিক সমীকরণ। এসেছে নতুন ভাষা, নতুন জিনিস নিয়ে আলোচনা। সেরকমই রাজ্য রাজনীতির বাজার কাঁপাচ্ছে, আপাত নিরীহ বাঙালির পছন্দের—ডিম। তবে বাঙালির এখন ডিম আর পছন্দের খাওয়ার কি না তা নিয়ে  তর্ক হতে পারে তবে নেতাদের শায়েস্তা করতে এক শ্রেণীর লোকের একমাত্র মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে ডিম এই পশ্চিমবঙ্গে। আর তা নিয়ে চলছে হাসাহাসি, খিল্লি।

ডিম বা অন্য পেরিশেবেল খাবার ছুঁড়ে প্রতিবাদ কিন্তু নতুন নয়। ৬৩ খ্রিস্টাব্দে রোমান গভর্ণর ভেসপাসিয়ান কে ওলকপি ছুঁড়ে মেরেছিল উত্তেজিত জনতা। রানী এলিজাবেথ এর সময় নাটকে খারাপ অভিনয় করলে ডিম ছুঁড়ে মারত দর্শক। বিখ্যাত লেখক জর্জ এলিয়ট এর উপন্যাস মিডলমার্চ এও ডিম ছুঁড়ে মারার ঘটনার উল্লেখ আছে।

 

পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ডিম ছুঁড়ে মারা নিয়ে খিল্লি চলতেই পারে কিন্ত গত কয়েক বছর ধরে বাড়তে থাকা মব লিনচিং কিন্তু খুবই উদ্বেগ এর জন্ম দেয়। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে জনতা উন্মত্ত হয়ে উঠলে তার হাত থেকে কিন্তু রক্ষা পাবে না সাধারণ মানুষ। একবার এই ফ্রাঙ্কেনস্টাইন তৈরি হলে সেই দৈত্য গিলে ফেলতে চাইবে সমস্ত আইনের শাসনকে। রাজনৈতিক নেতাদের মদতে বাড়তে থাকা ঘৃণার আবহে ডিম ছুঁড়ে মারা, কাউকে কোমরে দড়ি বেঁধে ঘোরানোর স্বাভাবিক বলে মান্যতা পেলে তার ফল ভুগতে হবে সবাইকেই। এক সভ্য দেশের উন্নতির কোনো মাপকাঠিতে জায়গা পেতে পারেনা মব লিনচিং। আর মব কিন্তু সবসমযই শাসকের পক্ষে। তাই আজকে যারা ক্ষমতায় পেয়ে হাসছি অন্যকে ডিম ছুঁড়ে মারছে বা গলায় জুতো পরিয়ে ঘোরাচ্ছে বলে। কালকে কিন্তু চেয়ারে অন্য কেউ বসবে। চেয়ার কারও চিরদিন থাকেনা। এই লেখাটি লেখার সমযই নানারকম সামাজিক মাধ্যমে ভেসে আসছে কৃষ্ণনগর দক্ষিণ এর মহিলা সাংসদ মহুয়া মৈত্রর আর্তনাদ। একজন মহিলা সাংসাদ মিটিং করছেন আর তাকে ঘিরে ধরে তার দিকে ছুঁড়ে মারা হচ্ছে ডিম। আর যারা ছুঁড়ছে তাদের তীব্র উল্লাস। খেয়াল করলেই দেখা যাবে সেই মব এর লিঙ্গ কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ পুরুষ। মব এর লিঙ্গ সবসময়ই পুরুষতান্ত্রিক। শুধুই কি বিরোধী নেত্রী বলে নাকি একজন নারীকে আঘাত করতে পারা, নানারকম ইস্যুতে সবসময় সোচ্চার একজন নারী মহুয়া মৈত্র কে পর্যদুস্ত করতে পারার মধ্যে এক চরম পিতৃতান্ত্রিক দমন ও আধিপত্যের বহিঃপ্রকাশ? এই লেখাটি লেখার সময় খবর আসছে মব সংস্কৃতির শিকার হয়েছেন মিনাক্ষী মুখার্জি। কোচবিহারের শিতলকুচিতে তাঁর গাড়ি ঘিরে ছোঁড়া হয়েছে ডিম।

 

আজকে এই মবকে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে, সাহারু নুসাইবা কান্নানারী এর উপন্যাস এর মতন দেড় ঘণ্টায় ঘটে যেতে পারে যে কোনো পিটিয়ে মারার মতন ঘটনা। এই পোস্ট ট্রুথ যুগে যেখানে মিথ্যে ছড়ানো খুবই সোজা সেখানে ডিম ছোঁড়া কে শুধু এক খিল্লির বিষয় হিসেবে নিলে কখন ক্রাউড , মব হয়ে পিটিয়ে মারবে মানুষকে আমরা বুঝতেই পারব না। বারুইপুরের গণধর্ষণ কাণ্ডের অভিযুক্ত একজনকে পিটিয়ে মেরেছে মব। আমাদের সামনে উদাহরণ প্রচুর…তাবরেজ আনসারি, মোহাম্মদ আখলাক, পেহলু খান, সুবোধ কুমার…তালিকা টা দীর্ঘ হচ্ছে কিন্তু। এখনই আওয়াজ না তুললে চোখের সামনে আমাদের প্রিয় বাংলার দখল নিবে উন্মত্ত জনতা। তখন কিছুই আর করার থাকবে না।

 

0 Comments

Post Comment