পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

অর্ধেক ফাগুন

  • 08 March, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 381 view(s)
  • লিখেছেন : রাজকুমার শেখ
শীতের কমলা রঙা রোদে ধান মেলতে মেলতে আদিনাবানু ভাবছিল মুকার কথা। শীত এখন শেষের দিকে। রোদের তাপ বাড়ছে ক্রমশ। এখন বেলা হলে রোদ আর নিতে পারে না গায়ে আদিনাবানু।তার ছোট্ট বাড়িটার এক চিলতে মাটির দাওয়ায় বসে ধান আগলায়।ঝাঁকে ঝাঁকে পায়রারা এসে বসে ধান খেতে লাগে।

আদিনাবানু  খুবউ  যত্ন করে ধান গুলো নেড়ে দেয়।  যাতে তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়।
কিন্তু বেশ ক'দিন হলো মানুষটি কেন আর আসছে না? ওর বাড়ি থেকে কিছুটা দূরেই বাংলাদেশ বর্ডার। শেখপাড়াতে ওপারের মানুষজন আসে সকালে বাজার করতে। আবার সময় মত তারা চলে যায় ওপারে।তেমনি মুকাও আসত এপারে।  
একদিন হলো কি সে ঘুরপথে বাজার করে নিয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় হঠাৎ বর্ডার শীল হয়ে যায়। মুকা ফিরতে পারে না ও পারে। আদিনাবানু ওকে জায়গা দিয়েছিল থাকবার জন্য। যদিও আদিনার কেউ নেই। সে একাই থাকে। তবে তার এক সময় ভরা সংসার ছিল। একটি সন্তান ছিল। তার মরদ ছিল দেখবার মতো। কিন্তু একদিন রাতে হঠাৎ পদ্মার ভাঙ্গনে সব কেড়ে নিল। ছাড়তে হলো  আখেরীগঞ্জ। তার বাপের এইটুকু ভিটে না থাকলে সে আজ কোথায় দাঁড়াতে?
পদ্মা গিলে নিয়েছে তার সন্তান, স্বামী,সুখ, সব কিছু। সে রাতের শোক এখনো সে ভুলতে পারেনি। বুকের ভেতর এখনো তোলপাড় করে ওঠে পদ্মা। পাথর হয়ে গেছিল আদিনা।
এখন সে ধানের ব্যবসা করে। ধান থেকে চাল করে বেচে। কোন রকমে দুখ ধান্দা করে বেঁচে আছে। ধান এক দিনে না শুকালে সেদিন আর তার হাঁড়ি চাপে না উনানে ।
পেটের জ্বালা বড় জ্বালা গো!
তার মরদ সুখচাঁদ বলত।

সে সব কথা আজও সে ভুলে যায়নি। তার ছেলেটা বেঁচে থাকলে আজ অনেক বড় হয়ে যেত। তাকে স্কুলে পড়ানোর খুউব সাধ ছিল আদিনাবানুর। তার  কলিজার টুকরা চলে যাওয়াতে সে যেন মরে বেঁচে আছে।
মুকা ভাই, সন্তান না থাকলি কি যে বুকের জ্বালা একমাত্র সন্তান হারা মা ছাড়া সে ব্যথা কে বুঝবি বলো?
তার ভরাট বুকের সুধা এখন পানি হয়ে গেছে । চোখ দিয়ে তার আর অশ্রু গড়িয়ে পড়ে না। সে যেন একটি জগদ্দল পাথরের মতো হয়ে গেছে। চোখ-কান বন্ধ করলেই পদ্মার ভয়ংকর সে ডাক আজও সে শুনতে পায়। রাতে ধড়পড় করে উঠে বসে বিছানায়। তার আর ঘুম আসে না। কোথায় যেন শিয়ালরা  ডেকে ওঠে একসাথে। বুক হিম হয়ে যায়। বাতাসে কার কান্না যেন ভেসে আসে। সে কান্না যেন তার সেই ছোট কোলের শিশুটির। রাত বয়ে যায় আপন খেয়ালে।
আদিনাবানু চুপ করে বসে থাকে একা।বুকের ব্যথাটা আবারও বাড়তে থাকে।ধান মেলতে মেলতে ভাবছিল সে। মুকা না আসাতে তার আরও বেশি চিন্তাটা বাড়তে থাকে।মানুষটা এলে তার বেশ ভালো লাগে।বড় আপন মনে হয়। যেন তার সমস্ত  সুখ নিংড়ে দিয়ে যায়।আর সেই সুখে আদিনা ডুবে যায় একটু একটু করে।

সে স্বামীর সুখ বেশি দিন পায়নি। সে যে টুকু সুখ পেয়েছিল তা ভাঙনে কেড়ে নিয়েছে।সে কখনও হ্মমা করতে পারবে না পদ্মাকে। তার গর্ভে' কত মানুষের সুখ তলিয়ে গেছে। নিরুপায় মানুষ তার কিছুই করতে পারেনি। তলিয়ে যাবার  জ্বালা মানুষ আজও ভুলতে পারেনি।কত খেতি জমি,বাড়ি ঘর সব তলিয়ে গেছে।মানুষ জন ভয়ে পালিয়ে গেছে অন্য জায়গায়।
আশ্রয় নিয়েছে গাছ তলায়।
আদিনাবানু যেদিন এখানে চলে আসে সেদিন তার খুউব মন খারাপ হয়েছিল।সে ফু্ঁসে উঠতে চেয়েছিল কিন্তু প্রকৃতির খেয়াল খুশিকে কোনো মানুষই দমন করতে পারেনা।মেনে নিতে হয়ে ছিল সব।আস্তে আস্তে সব ভুলতে বসেছে সে। কিন্তু নতুন করে আবার বুকের ভেতরটা ঢিপ ঢিপ করছে মুকার জন্য।
মানুষটা প্রতি দিনই আসে সেখপাড়াতে বাজার করতে।চর পেরিয়ে ফিরেও যায় ওপারে, কখনও সখনও আদিনার জন্য এটা সেটা নিয়ে আসে। আদিনার সঙ্গে বসে গল্প করে।একটু একটু করে ভাঙা   স্বপ্নটা জোড়া লাগাতে চায় মুকা।আদিনাবানুকে নিয়ে সে ভাসতে চায় সুখ সুখ নদীতে। আদিনাবানু মানুষটি কে  পছন্দ। সামনে ফাগুনে মুকাকে নতুন করে গ্রহণ করবে বলে মনে মনে ঠিক করে সে।কিন্তু বাধা হল বডা'রের তার কাঁটা।অবশ্য মুকা এ সব তোয়াক্কা করেনা।

মাটি আবার ভাগ করা যায় নাকি?তার কাঁটা দিয়ে গরু মোষ আটকানো যায় কিন্তু মানুষ আটকানো যায় না।
মুকা বলেছিল।
আদিনাবানুর মনে পড়ে সে সব কথা।
আদিনার কোলে মাথা রেখে মুকা বলে ,এবার ফাগুনে এসে তোমাকে নেকাহ্ করব।আদিনা তুমি যে আমার গোটা চাঁদ গো।
আদিনা মুখ টিপে হাসে।
মানুষটির মাথায় সে আলতো করে হাত রাখে।আদিনার আঙুল গুলো নিয়ে সে নাড়াচাড়া করে।তার পর রাত গভীর হলে সে রাতের অঅন্ধকারে ওপারে চলে যায়।আদিনাবানু তার চলে যাওয়া দেখে।আদিনার শরীরময় মুকা মুকা গন্ধটা তখনও লেগে থাকে। রাত গভীর থেকে গভীরতর হয়।
আদিনাবানু মাটির দাওয়ায় বসে বসে ভাবছিল মুকার কথা।ওদের শিমুল গাছের ডালে বসে একটি পাখি ডেকে উঠল ক্যাক ক্যাক করে।শিমুলের ডালে ডালে লাল হয়ে ফুটছে শিমুল।তবে কি ফাগুন এসে গেল?
আদিনাবানু কেমন চঞ্চল হয়ে ওঠে।সে বার বার তাকায় দূরের খেতের দিকে।যে পথ দিয়ে উঠে আসে মুকা।


দুই -------

সেখপাড়া জুড়ে বি,এস,এফের টহলদারি বেড়েছে।মানুষজন রাত বিরেত বেরোতে পারছে না।কোনো গরু পাচারকারীরাও আর এ-মুখো হচ্ছে না।সব জনশূন্য।আদিনা তবু লুকিয়ে তার কাঁটার কাছে যায়।যদি মুকা তার জন্য এখানে লুকিয়ে থাকে।অথবা তারকাঁটার কাছে বসে থাকে যদি আদিনার জন্য।সে তো এখন আসতেই পারবেনা এপারে।
রাতে শুয়ে আদিনার ঘুম আসেনা।বড় চিন্তায় আছে সে।তার বাড়ির সামনে দিয়ে বি,এস,এফ-রা ভারী পায়ে হেঁটে যায়।আদিনা বিছানা ছেড়ে ধড়ফড় করে উঠে পড়ে।বিছানাতে কে যেন কাঁটা রেখে গেছে।সে কিছুতেই ঘুমাতে পারে না।
এমনিতেই তার মন থেকে মুকার চিন্তাটা যাচ্ছে না।মানুযটির কোনো খবর নেই। মানুষটির কি হল কে জানে।সে আর কিছুতেই ঘুমোতে পারে না।
রাতের অন্ধকারে কাদের চিৎকার  শোনা যায়।আদিনা কান পেতে শোনে।তার বুকের ভেতর আবার পদ্মার সেই ভয়ংকর ডাক জেগে ওঠে।সে বিছানা ছেড়ে ছুটে যায় বাইরে।তার সন্তান যেন আবার তলিয়ে যাচ্ছে পদ্মায়।আদিনা চিৎকার করে কেঁদে ওঠে।
বাপরে -আমার, তু কোথারে!
আদিনাকে সারারাত ঘুমোতে দেয়না পদ্মার ভাঙনের শব্দটা। সে বসে থাকে মাটির দাওয়ায়।তার চোখ দুটোতে এক গভীর ভীতি লেপটে।
সেখপাড়াতে আরও টহল দারি বেড়েছে।জোয়ানরা রাত কে খানখান করে ভেঙে এগিয়ে যাচ্ছে। ঠিক আদিনার বুকে পাঁজরার হাড় ভাঙা শব্দর মতো।


তিন---


  আজ পাগলের মতো কোকিলটা ডেকেই চলেছে। গোটা শিমুল গাছ লাল হয়ে ভরে গেছে ফুলে। বাতাসে বাতাসে ভেসে আসছে মিশ্র ফুলের গন্ধ। পাগল করা বাতাস। ফাগুনে ফাগুনে ভরে গেছে গোটা পৃথিবীর।ঢলে পড়েছে ফুলের বাহার। শুধু একজনের মনে শান্তি নেই। আজ অনেক দিন হলো মুকা আর ফেরেনি। আদিনা আর ভাবতে পারছেনা। সে মুকার আশা ছেড়ে দিয়েছে।তার মন থেকে ফাগুনের রং মুছে যাচ্ছে একটু একটু করে।মুকা তাকে স্বপ্ন দেখিয়ে ছিল।  সেই মুকা আজ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
না,সে আর ভাববে না মুকার কথা।

উঠোনময় সে আজ ধান মেলে দিয়েছে।ফাগুনের রোদ খেলা করছে।সে দিকে এক দৃষ্টিতে আদিনা তাকিয়ে আছে।এমন সময় হটাৎ মানুষজনের দৌড়ে যাওয়ার শব্দ।  আদিনা ছুটে গিয়ে বার দরজা লাগিয়ে দেয়।
ও জানে বি,এস,এফ-রা তাড়াচ্ছে। দরজা লাগিয়ে ফিরতেই হঠাৎ গুলির শব্দ। পর পর দুটি গুলির শব্দ।আদিনা চমকে ওঠে।বুকটায় যেন আবার পদ্মার ভাঙ্গনের শব্দ হতে থাকে। দরজার কাছে কে যেন শব্দ করে পড়ে গেল। আদিনা ছুটে গিয়ে দরজা খোলে। দরজা খুলেই সে দেখতে পায় তার বাড়ির সামনে কে যেন পড়ে। সারা শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে।ও ছুটে যায় কাছে। দেখে মুকা।  আদিনার মুখ দিয়ে কথা বের হয় না।মুকার শরীরময় রক্ততে ভেসে যাচ্ছে। আদিনার শরীর থর থর করে কাঁপছে। মুকা পড়ে আছে মাটিতে।মুকার কোন শব্দ নেই । আদিনাবানু দেখছে অদূরে একটি কানের ঝুমকো পড়ে। তাতে ফাগুনের রোদ পড়ে চিকচিক করছে।তাকে রাজশাহী বাজার থেকে দুটো ঝুমকো এনে দিবার কথা ছিল মুকার।  তবে কি সেই দুল? আদিনার চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে আসে। মুকা এখন এক নামহীন গরু পাচারকারীর লাশ।

0 Comments

Post Comment