পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

বঙ্গ রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ: বাম ও বিজেপি?

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 200 view(s)
  • লিখেছেন : দেবাশিস মিথিয়া
তৃণমূল যখন বামপন্থীদের ‘অস্তিত্বহীন’ করতে এইভাবে মরিয়া ছিল, তারা ভুলে গিয়েছিল যে রাজনীতিতে শূন্যস্থান কখনও স্থায়ী থাকে না। সেই দখল হওয়া এবং অবরুদ্ধ রাজনৈতিক পরিসরটিকেই সুকৌশলে গ্রাস করেছে বিজেপি। তৃণমূল যে গর্তটি বামপন্থীদের জন্য খুঁড়েছিল, আজ সেই গর্তেই তারা নিজেরা তলিয়ে গেল। এবার কি তবে বামেরা রাস্তায় নেমে, ফেসবুক বা সামাজিক মাধ্যমের নিরাপদ স্থান থেকে বেরিয়ে, মধ্যবিত্ততার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে?

২০২৬ এর বিধানসভা নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই নির্বাচনে একদিকে যেমন ক্ষমতার হাতবদল ঘটেছে, অন্যদিকে তেমনই একটি পচে যাওয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে মানুষ মুক্তি পেয়েছে। কতটা মুক্তি, তা অবশ্য সময় বলবে। কারণ অন্যান্য রাজ্যে বিজেপি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়, মানুষের অবস্থা দেখে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় কি না, তা বলা মুশকিল। দীর্ঘ দেড় দশকের একছত্র শাসনের পর তৃণমূল কংগ্রেসের সিংহাসন আজ ধূলিসাৎ। কিন্তু এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আজ যারা রাজদণ্ড হাতে নিয়েছে, সেই বিজেপির উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এই ঐতিহাসিক পালাবদলের নেপথ্যে রয়েছে এক গভীর রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি। বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে আজ যে গেরুয়া শিবিরের দাপট দেখা যাচ্ছে, তার আসল পরিকল্পনা ও জমি কিন্তু তৈরি হয়েছিল তৃণমূলের অন্দরমহলেই। নিজেদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে গিয়ে শাসকদল যেভাবে বিরোধী শূন্য রাজ্য গড়ার এক স্বৈরাচারী খেলায় মেতে উঠেছিল, আজ তারই চরম মূল্য চোকাতে হলো তাদের। মূলত, বিরোধীদের স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে তারা এমন এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়ে তাদের নিজেদের অস্তিত্বকেই গ্রাস করে নিল।

 

 রাজনৈতিক শূন্যস্থান ও দমনের নীতি

 

এই শূন্যস্থান কোনো প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে তৈরি হয়নি, বরং তৈরি করা হয়েছিল বামপন্থীদের ওপর নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় ও দলীয় সন্ত্রাস নামিয়ে এনে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় বামপন্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা ছিল মধ্যযুগীয় বর্বরতার শামিল। গ্রাম থেকে শহর—হাজার হাজার লাল ঝাণ্ডার কর্মীকে ভিটেমাটি ছাড়া করা হয়েছে, তাঁদের চাষের জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছে, এমনকি অসংখ্য বামপন্থী পরিবারকে সামাজিকভাবে বয়কট করা হয়েছে ।

 

বামপন্থীদের শত-শত পার্টি অফিস হয় গায়ের জোরে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, নয়তো নীল-সাদা রঙ চড়িয়ে তৃণমূলের কার্যালয়ে পরিণত করা হয়েছে। প্রতিটি পঞ্চায়েত নির্বাচনে বাম প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দিতে বাধা দেওয়া, স্ক্রুটিনির সময় অপহরণ করা এবং ভোটের দিন বুথ থেকে বাম কর্মীদের রক্তাক্ত অবস্থায় ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার যে অপসংস্কৃতি তৃণমূল কায়েম করেছিল, তা বাংলার সুস্থ রাজনীতির কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দিয়েছিল।

তৃণমূল যখন বামপন্থীদের ‘অস্তিত্বহীন’ করতে এইভাবে মরিয়া ছিল, তারা ভুলে গিয়েছিল যে রাজনীতিতে শূন্যস্থান কখনও স্থায়ী থাকে না। সেই দখল হওয়া এবং অবরুদ্ধ রাজনৈতিক পরিসরটিকেই সুকৌশলে গ্রাস করেছে বিজেপি। তৃণমূল যে গর্তটি বামপন্থীদের জন্য খুঁড়েছিল, আজ সেই গর্তেই তারা নিজেরা তলিয়ে গেল।

 

 ক্ষোভের প্রকাশ ও ‘নতুন প্ল্যাটফর্ম

 

যে কোনো সুস্থ গণতন্ত্রে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের প্রয়োজন হয়, যারা মানুষের ক্ষোভকে আন্দোলনের ভাষায় প্রকাশ করবে। তৃণমূল যখন গায়ের জোরে বামপন্থীদের সেই প্রতিবাদের রাস্তা বন্ধ করে দিল, তখন সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশের জন্য একটি ‘নতুন প্ল্যাটফর্ম’ খুঁজতে শুরু করল। বামপন্থীরা দুর্বল হয়ে পড়ায়, তৃণমূলের বিরুদ্ধে মানুষের মনে জমে থাকা সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও জনরোষ প্রকাশের একমাত্র অবলম্বন হয়ে উঠল বিজেপি; ফলে জনসমর্থন অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই বিজেপির দিকে প্রবাহিত হলো।

 

এর পিছনে যথেষ্ট কারণও আছে। ২০১৮-এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’  জিতে নেওয়ার যে অগণতান্ত্রিক অপসংস্কৃতি তৃণমূল শুরু করেছিল, তা গ্রামীণ মানুষকে প্রবলভাবে আতঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ করেছিল। তৃণমূলের এই নজিরবিহীন প্রশাসনিক অত্যাচার ও পেশিবলের মুখে বামপন্থীদের সংগঠন যখন সাময়িকভাবে থমকে দাঁড়িয়েছিল, তখন গ্রামের সাধারণ মানুষ এক চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে তারা মনে করতে শুরু করেন—রাজ্য প্রশাসনের এই গুন্ডামির মোকাবিলা করতে পারে একমাত্র কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপি-ই। অর্থাৎ তৃণমূল কংগ্রেসের তৈরি করা  ভয় ও নিরাপত্তাহীনতাই শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে নিজেদের পিঠ বাঁচাতে এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বিজেপির পতাকাতলে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছিল।

 

তবে বামপন্থীরা ময়দানে থাকলে লড়াই হয় শ্রেণিভিত্তিক বা অর্থনৈতিক ইস্যুতে। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস বামপন্থীদের কোণঠাসা করে  ‘শ্রেণিসংগ্রাম’কে হটিয়ে সেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতিকে ডেকে আনল । তৃণমূল কংগ্রেস  চেয়েছিল বাংলার রাজনীতিকে ‘মমতা বনাম মোদী’—এই দুই মেরুতে ভাগ করতে, যাতে বামপন্থীদের আর কোনো অস্তিত্ব না থাকে। তারা ভেবেছিল বিজেপির জুজু দেখিয়ে বামপন্থী বা ধর্মনিরপেক্ষ ভোটগুলো তারা চিরকাল নিজেদের পকেটে রাখবে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, এই মেরুকরণ আসলে বিজেপির মতো একটি সর্বভারতীয় শক্তির জন্য ‘রেড কার্পেট’ বিছিয়ে দেওয়া।

 

 মতাদর্শগত লড়াই

 

তবে বিজেপির এই বিপুল রাজনৈতিক উত্থানকে কেবলই তৃণমূলের পাপের ফসল বা একটি আকস্মিক প্রশাসনিক শূন্যতার ফল হিসেবে দেখলে আসল সত্যটাকে এড়িয়ে যাওয়া হবে। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের নেপথ্যে ছিল গেরুয়া শিবিরের নিজস্ব এক সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি মতাদর্শগত লড়াই। গত এক দশকে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (RSS) বাংলার প্রান্তিক স্তরে, বিশেষত জঙ্গলমহল থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গের রাজবংশী বা মতুয়া সম্প্রদায়ের মতো সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে নিঃশব্দে তাদের বুথ স্তরের সাংগঠনিক জাল বিস্তার করেছে। বামপন্থীদের ‘শ্রেণিসংগ্রাম’ এবং তৃণমূলের ‘প্রশাসনিক তোষণ’-এর বিপরীতে বিজেপি অত্যন্ত চতুরতার সাথে এক তীব্র ‘হিন্দুত্ববাদী ভাবাদর্শ’ এবং সাংস্কৃতিক মেরুকরণের সামাজিক জমি তৈরি করতে সফল হয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয় মোদী-কেন্দ্রিক উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রচারের সুতীব্র হাওয়া, যা বাংলার মধ্যবিত্ত ও যুবমানসের একাংশকে এক নতুন রাজনৈতিক স্বপ্নের মোহে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। ফলে, তৃণমূলের তৈরি করা শূন্যস্থানটি বিজেপি কেবলই কুড়িয়ে পায়নি, বরং তাদের দীর্ঘদিনের  প্রস্তুতি ও ক্যাডারভিত্তিক সক্রিয়তা দিয়েই তারা সেই রাজনৈতিক সুযোগটিকে পুরোপুরি নিজেদের অনুকূলে আনতে পেরেছে।

 

 কেন্দ্রের শক্তি ও তৃণমূলীদের চরিত্র

 

বিজেপির এই উত্থানের নেপথ্যে অপর যে জিনিসটি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে, তা হলো কেন্দ্রীয় সরকারের শক্তির অপপ্রয়োগ। তৃণমূল কংগ্রেস যখন রাজ্যের প্রশাসনকে দলীয় দাসে পরিণত করেছিল, বিজেপি তখন কেন্দ্রের ইডি, সিবিআই এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। এই প্রশাসনিক সুরক্ষা বিজেপির নিচুতলার কর্মীদের মনে সেই হারানো ‘নিরাপত্তা’ফিরিয়ে দিয়েছিল, যে সুযোগ বা প্রশাসনিক সুবিধা বামপন্থীদের কাছে ছিল না।

 

তবে বিজেপির এই ক্ষমতা দখলে যে বাস্তব সত্যটি সামনে এসেছে, তা হলো তৃণমূল কর্মীদের চরিত্র। এদের কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ বা নীতি ছিল না; এরা শুধুই ক্ষমতা আর মুনাফার পিছনে ছুটেছে। আজ তৃণমূলের নৌকা ডুবতেই এই মতাদর্শহীন ক্যাডার বাহিনী পিলপিল করে বিজেপিতে গিয়ে মিশছে। গতকাল যারা তৃণমূলের নামে তোলাবাজি করত, আজ তারা গেরুয়া উত্তরীয় পরে সাধু সাজার চেষ্টা করছে ।

 

 তৃণমূল কংগ্রেসের অবলুপ্তি

 

মতাদর্শহীন ক্যাডারদের এই দলবদল এবং শীর্ষ নেতৃত্বের ক্ষমতা চলে যাওয়া - তৃণমূল কংগ্রেসের শেষ হওয়া এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা। কেন তা একটু বিস্তারিত দেখে নেওয়া যাক:

 

● 'ক্যারিশমা' ভেঙে চুরমার: তৃণমূল কংগ্রেস শুরু থেকেই একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক দল হিসেবে পরিচিত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাই ছিল দলের প্রধান চালিকাশক্তি। ২০২৬-এর নির্বাচনে তাঁর অপরাজেয় ভাবমূর্তি একবারে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। খোদ শীর্ষ নেতৃত্বের এই রাজনৈতিক বিপর্যয় দলের নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে এমন এক গভীর 'মনস্তাত্ত্বিক ভাঙন' তৈরি করেছে, যা থেকে এই ক্ষণস্থায়ী দলটির পক্ষে পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব।

 

● মাস মাইগ্রেশন: এখন রাজ্য ও কেন্দ্র দু'জায়গায় ক্ষমতায় আছে বিজেপি। ফলে এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তৃণমূলের সুবিধাবাদী অংশ নিজেদের পিঠ বাঁচাতে এবং আখের গোছাতে মরিয়া হয়ে গেরুয়া শিবিরের দিকে ঝুঁকবে। নিচুতলার এই 'মাস মাইগ্রেশন' বা ব্যাপক দলবদলের হিড়িক ও সাংগঠনিক ভাঙন তৃণমূলকে ভেতর থেকে একেবারে ফাঁপা ও দেউলিয়া করে দেবে।

 

● অভ্যন্তরীণ আক্রোশ: ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসকে ক্ষমতায় আনার পেছনে শুভেন্দু অধিকারীর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য; অথচ সেই অবদানকে মর্যাদা না দিয়ে একসময় দল তাঁকে চরম অপমান করে এবং দল ছাড়তে বাধ্য করে। আজ সেই তৃণমূলকে হারিয়ে তিনিই রাজ্যের প্রশাসনিক ক্ষমতার শীর্ষে। তিনি, তৃণমূলের ভেতরের নাড়ি-নক্ষত্র, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং ক্ষমতার চোরাগুপ্তা স্রোত—সবই জানেন। ফলে, সেই পুরনো ক্ষোভ আর রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থেকে তৃণমূলকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করতে তিনি প্রশাসনিক এবং সাংগঠনিক—উভয় ধরনের আক্রমণই চালাবেন এটা বলাই যায়; যার জেরে দলটির অবলুপ্তির গতি আরও কয়েক গুণ বাড়বে।

 

ইতিমধ্যেই তাঁর সুনিপুণ রাজনৈতিক চাল ও রণকৌশলে তৃণমূলের সংসদীয় দল ও পরিষদীয় দলে এক বড়ো ধরনের ভাঙন ধরেছে। দুই জায়গাতেই এক বিশাল অংশের জনপ্রতিনিধিদের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল দল থেকে সুকৌশলে আলাদা করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে আইনি ও সাংগঠনিকভাবে খোদ শীর্ষ নেতৃত্ব আজ পুরোপুরি কোণঠাসা। এই নজিরবিহীন ও পরিকল্পিত ভাঙনের জেরে কার্যত মূল তৃণমূল কংগ্রেস আজ অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে এবং সম্পূর্ণ ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলেছে।

 

এর পাশাপাশি, অবশ্যই ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনী করা এবং তার মধ্যে দিয়ে ২৭ লক্ষ ভোটারদের বাদ দেওয়া এবং নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতপাতদুষ্ট ভূমিকার কথা বলতে হবে। লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সির নামে মানুষকে বাদ দেওয়া এবং হয়রানির বিষয়ে কোনও কথা না বলা, অন্যতম একটা কারণ হিসেবে থাকবে।

 

 নতুন মেরুকরণ

 

২০২৬-এর নতুন ‘দ্বি-মেরু’ লড়াই ২০২১-এর চেয়ে গুণগতভাবে আলাদা। ২০২১-এ মানুষ ‘বিজেপি-কে রোখার’ ভয়ে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু ২০২৬-এ মানুষ তৃণমূলের দুর্নীতি আর আপসকামী রাজনীতির হাত থেকে বাংলাকে মুক্ত করতে বিজেপি-কে বেছে নিয়েছে। এটি কোনো আদর্শগত পরিবর্তন নয়, বরং এক চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে মানুষের তীব্র আক্রোশ।

 

তৃণমূলের ভরাডুবির পর বাংলার রাজনীতির সেই ‘সুবিধাবাদী’ বা ‘আদর্শহীন’ মধ্যবর্তী পরিসরটি আজ কার্যত বিলীন হতে বসেছে। এখন লড়াইটা হবে সরাসরি বিজেপির  'ধর্মের রাজনীতি' আর  বামপন্থীদের 'মানুষের রুটি-রুজির রাজনীতি'- র মধ্যে । এতদিন মিডিয়া ‘দিদি বনাম মোদী’ লড়াই দেখিয়ে বামেদের আড়াল করে রেখেছিল, কিন্তু এখন মিডিয়ার কাছেও আর কোনো রাস্তা থাকবে না। আগামী ১০ বছরে বাংলার বুকে লড়াই হবে সরাসরি ‘গেরুয়া বনাম লাল’। আর এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নিজেদের জমি পুনরুদ্ধার করতে পরবর্তী এক দশক বামপন্থীদের লড়াই হতে হবে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও সুদূরপ্রসারী।

 

 বুর্জোয়া পুঁজির চাল ও তৃণমূলকে 'অক্সিজেন'

 

তবে প্রশ্ন হল, তৃণমূলের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি কি এতটাই সহজ? এখানেই লুকিয়ে আছে বুর্জোয়া রাজনীতির সবচেয়ে জটিল ও কুৎসিত একটা অংক। কর্পোরেট পুঁজি খুব ভালো করেই জানে যে, তৃণমূলের এই ধ্বংসস্তূপ যদি পুরোপুরি সাফ হয়ে যায়, তবে আগামী দিনে বিজেপির একাধিপত্যের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের আর কোনো মধ্যবর্তী পথ থাকবে না; রাজনীতিতে তৈরি হবে এক চরম শ্রেণী-মেরুকরণ। তাই বামেদের এই অবশ্যম্ভাবী পুনরুত্থানকে রুখতে এবং বাংলার বুকে একটি বিকল্প প্রগতিশীল শক্তির উত্থান আটকাতে বুর্জোয়া মহল এবং কর্পোরেট মিডিয়া কখনোই তৃণমূলকে রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ মরতে দেবে না।

 

কেন বুর্জোয়ারা বাম রাজনীতিকে এত ভয় পায়? কারণ বামপন্থা কর্পোরেট পুঁজির একচেটিয়া মুনাফা ও শোষণের সাম্রাজ্যকে ভেঙে দিয়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং অর্থনৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়; যা বুর্জোয়াদের অস্তিত্বেরই পরিপন্থী। তাই তারা চায়, ভবিষ্যতে কোনোদিন যদি এই নতুন জমানার বিরুদ্ধে তীব্র গণবিক্ষোভ তৈরি হয়, তবে মানুষ যেন বিকল্প হিসেবে আবার কোনো 'বামপন্থা' বা বৈপ্লবিক পরিবর্তনের দিকে না ঝুঁকে, বরং ওই পুরনো, আপসকামী অ-বামপন্থী তৃণমূলের দিকেই ফিরে যায়। অর্থাৎ, বাংলায় সাচ্চা বামপন্থার পুনরুত্থান আটকাতে তারা তৃণমূলকে এক ধরণের রাজনৈতিক 'অক্সিজেন' বা কৃত্রিম লাইফ-সাপোর্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করবেই। ক্ষমতার অলিন্দ থেকে ছিটকে গেলেও, এই ক্ষয়ে যাওয়া দলটিকে পুঁজিবাদের একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ঢাল হিসেবেই আগামী দিনে ব্যবহার করা হবে, যা বামপন্থীদের সামনে এক নতুন ও কঠিন চ্যালেঞ্জ।

 

 ১০ বছরের পরিকল্পনা ও বামেদের প্রত্যাবর্তন

 

পুঁজিবাদের এই সুদূরপ্রসারী চক্রান্তের মুখে দাঁড়িয়ে বামপন্থীদের প্রথম কাজ হবে অবাস্তব রোমান্টিকতা থেকে মুক্ত হওয়া। কেবল মাঠের লড়াই বা স্লোগানের জোরে এই হারানো জমি রাতারাতি ফিরে আসবে—এমন ভাবনায় মজে থাকলে বুর্জোয়াদের পাতা ফাঁদেই পা দেওয়া হবে। গত দেড় দশকে বামেদের ভোটব্যাংক যেভাবে গণহারে গেরুয়া শিবিরের দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে, তার পেছনে কেবল তৃণমূলের সন্ত্রাস ছিল না, ছিল বামেদের নিজস্ব সাংগঠনিক জড়তা এবং সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার এক রূঢ় বাস্তবতা। তাই আগামী এক দশকের এই পরিকল্পনাকে সফল করতে হলে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি বামপন্থীদের এক সুগভীর সাংগঠনিক আত্মসমীক্ষা ও নিচুতলার নেতৃত্ব পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

 

বামপন্থীদের কাজ হবে এই সুযোগে সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির মৌলিক লড়াইগুলোকে প্রধান রাজনৈতিক কর্মসূচি করে তোলা। ‘সাচ্চা বিকল্প’ হিসেবে বামপন্থীদের সততা, নীতি এবং স্বচ্ছ ভাবমূর্তিকে মানুষের সামনে একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য ঢাল হিসেবে তুলে ধরা। পাড়ায় পাড়ায় প্রচার করা—"তৃণমূলের পাপেই বাংলায় বিজেপির আগমন।" তৃণমূল কংগ্রেস যদি বামপন্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে না নিত, তাহলে বিজেপি আজ বাংলার ক্ষমতায় আসতে পারত না—এই বার্তা পৌঁছে দিতে হবে প্রতিটি ঘরে।

 

 পরিশেষে

 

ইতিহাসের কী বিচিত্র পরিহাস —যারা একদিন পেশিবলে বিরোধীদের গণনা কেন্দ্র থেকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দিত, আজ তাদেরই দেখা গেল স্ট্রং রুমের সামনে ইভিএম পাহারা দিতে ! যে গণতন্ত্রকে তারা একদিন ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল, মানুষকে ভয় দেখিয়েছিল, সেই ভয়ই  আজ তাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। তবে মনে রাখতে হবে, ২০২৬-এর এই নির্বাচনী ফলাফলই শেষ নয়; এটি আসলে এক দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের সূচনা মাত্র। ২০৩১ এবং ২০৩৬ সালের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য  নিয়ে এখন থেকেই বামপন্থীদের ময়দানে নামতে হবে। ইতিহাস সাক্ষী, দিল্লির মসনদ কিংবা রাজভবনের ছায়ায় থেকে বাংলার মানুষের হৃদয় জয় করা যায় না। তৃণমূলের তৈরি করে যাওয়া এই রাজনৈতিক নরক থেকেই আমাদের আগামীর এক উন্নত, প্রগতিশীল বাংলা গড়ে তোলার দায়িত্ব নিতে হবে। যে ধর্মীয় বিভাজনের পথ ধরে আজ বিজেপি বাংলার ক্ষমতায় এসেছে, সেই পথ দিয়েই তাদের বিদায় করার শপথ নিতে হবে । আগামী দিনে বামেদের জয় নিশ্চিত, কারণ তাদের লড়াই —আদর্শের জন্যে, তাদের লড়াই - মানুষকে নিয়ে মানুষের জন্যে।

0 Comments

Post Comment