পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

তা বলে কি উন্নয়ন হবে না?

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 200 view(s)
  • লিখেছেন : অংশুমান দাশ
পরিবেশ আন্দোলন আসলে সরব হয়েছে উন্নয়নের বিরূদ্ধে নয় – তাঁরা বিরোধ করে এসেছেন উন্নয়নের সেই রাজনীতিকে, যা জংগল, পাহাড়, নদীর মত সামুদায়িক সম্পদকে ইচ্ছে মত ব্যবহারের ছাড়পত্র দিয়েছে দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে মত। পুনর্বাসনের পরিকল্পনা না করে বড় বাঁধ, স্থনীয় মানুষের সঙ্গে আলাপ আলোচনায় না গিয়ে কয়লা খনি, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চওড়া হাইওয়ে – এই সবই আসলে অপরিণামদর্শীতা।

সারা দেশের অনেকগুলো শহর কিছুদিন আগেও জলের অভাবে ধুঁকছিল। প্রচন্ড তাপমাত্রা, এল নিনোর জন্য বৃষ্টি কমের সম্ভাবনা, মাটির তলার জলের সঞ্চয় তলানিতে। এ অবস্থা একদিনে হয়নি। সম্প্রতি বোঝা যাচ্ছে ডাক্তারবাবুরা কখনও রোগ শনাক্ত করার জন্য রক্ত পরীক্ষার সময় কীটনাশকের পরীক্ষা করতে দিতেন না – এবং সেই সংক্রান্ত পরীক্ষা কোনও ডাক্তারি পরীক্ষাগারে করাও হয় না। অথচ কর্কট রোগ আক্রান্ত কোষে কীটনাশকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। বিশুদ্ধতম পানীয় মাতৃদুগ্ধেও পাওয়া যাচ্ছে – সে খবর তো পুরোনো বটেই। এ অবস্থাও একদিনে হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে কীটনাশক, আগাছানাশক ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ না আনা এবং অন্যদিকে এর ফলাফল সম্পর্কে চোখ বন্ধ করে থাকা, আসলে আমাদের ভবিষ্যৎ বিপদের সম্ভাবনার কথা অস্বীকার করে বালিতে মুখ গুঁজে থাকার শামিল। এই সব পরিবেশগত বিপদ ঘরে ঢুকে আসার আরও অনেক উদাহরণই দেওয়া যায়। এই সব বিপদের সূত্রপাতই আসলে আমাদের কেবলমাত্র মুনাফামুখী, জিডিপিমুখী উন্নয়নের ফলাফল। এ কথা স্বীকার করার থেকে মানতে না চাওয়া করার মানুষের সংখ্যা যে অনেক বেশি – সে কথা বলাই বাহুল্য। পরিবেশের ক্ষতি হবে বলে কি উন্নয়ন বন্ধ থাকবে?  

মহামান্য প্রধান বিচারপতিও প্রায় একই ধরণের একটি প্রশ্ন তুলেছেন। যশোর রোডের গাছ কাটার সময়েও আদালত থেকে শুনতে হয়েছিল – গাছ কাটা কোল্যাটারাল ড্যামেজ, উন্নয়ন তো করতে হবে! যখন দেশের বিচার ব্যবস্থার কর্ণধারদের কাছ থেকে এ কথা আসে – তখন তা কেবল একটি আলগা উক্তি হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। বরং তাকে পরিবেশ বিমুখ উন্নয়নের ধারাটিকে মেনে চলার এক সার্বিক স্বীকৃতি বলেই মেনে নিতে হয়। এর উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নও করতে ইচ্ছে করে – আমাদের দেশের সমস্ত গাছ কেটে বেচে দিলে আমাদের জিডিপি আকাশছোঁয়া হয়ে যাবে – সেই উন্নয়ন কি আমরা চাই?

এই সব প্রশ্নের প্রেক্ষিতেই পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীদের উন্নয়নবিরোধী বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ প্রাকৃতিক কৃষি, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি, জল সংরক্ষণ, জৈববৈচিত্র সংরক্ষণ ও যৌথ বন ব্যবস্থাপণার মত সরকারি প্রকল্পে পরিবেশকর্মীরা অকুন্ঠ সহায়তা করেছেন। পরিবেশ আন্দোলন আসলে সরব হয়েছে উন্নয়নের বিরূদ্ধে নয় – তাঁরা বিরোধ করে এসেছেন উন্নয়নের সেই রাজনীতিকে, যা জংগল, পাহাড়, নদীর মত সামুদায়িক সম্পদকে ইচ্ছে মত ব্যবহারের ছাড়পত্র দিয়েছে দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে মত। পুনর্বাসনের পরিকল্পনা না করে বড় বাঁধ, স্থনীয় মানুষের সঙ্গে আলাপ আলোচনায় না গিয়ে কয়লা খনি, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চওড়া হাইওয়ে – এই সবই আসলে অপরিণামদর্শীতা। এ সব ক্ষেত্রেই সরব হয়ে এসেছেন আন্দোলনকারীরা। গণতন্ত্রে এটাই তো স্বাভাবিক – রাস্ট্রের কাছে জবাব চাওয়া, ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা। পরিবেশ কর্মীদের উন্নয়ন বিরোধী তকমা দেওয়া আসলে এই সব ভুল পরিকল্পনা, পরিবেশের উপর প্রভাবের মূল্যায়ন না করা,  দুর্নীতি এবং দায়বদ্ধতার অভাবের থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার সহজ উপায়। সাম্প্রতিক কালে পরিবেশ বা মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনের উপর নানা ভাবে খাঁড়া নেমে আসার কারণ সহজেই অনুমেয়।

উন্নয়নের হু হু জোয়ারে পরিবেশ ও মানবাধিকার রক্ষা করা মানুষ জন আসলে একরকম বাঁধের মত, যদিও তা নানা কারণে বার বার বালির বাঁধই হয়ে উঠছে। মনে করিয়ে দেয় ‘আর্থ ওভারশুট ডে’ বা পৃথিবীর সীমা অতিক্রম করে যাওয়ার দিন– এ বছর ৩০ জুলাই। মানে আমরা ২০২৬ এর ডিসেম্বর অবধি যা উৎপাদন করতে পারতাম, তা আমরা ৩০ জুলাইয়ের মধ্যেই শেষ করে ফেলব। অর্থাৎ বাকি পাঁচ মাস আমাকে ভবিষ্যতের থেকে ধার নিয়ে চলতে হবে। আরও মনে করিয়ে দেয় – জলবায়ু পরিবর্তন, জলের ব্যবহার, জৈব বৈচিত্র সহ মোট নটি বিষয়ের ‘প্ল্যানেটরি বাউন্ডারি’ অর্থাৎ পার্থিব সীমা আমরা পেরিয়ে গেছি। এই সব সীমা অতিক্রমের অর্থ আমরা জমানো সম্পদ ভাঙ্গিয়ে খাচ্ছি। ভবিষ্যতের জল, জমি, জঙ্গল, জৈব বৈচিত্র এইসব পুঁজির উপর হাত পড়েছে। এই সব কিছু এখন আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে তা কি আমরা এখনও বুঝতে পারছি না? ভারত এখনই একটা বাস্তুতান্ত্রিক সংকটের মধ্যে ঢুকে গেছে – তাপমাত্রা বাড়ছে, জলস্তর কমে যাচ্ছে, দূষণ মাত্রাছাড়া, খাদ্য শৃংখলে বিষ। এ সব তো আমরা অনুভব করতে পারছি, নাকি পারছি না? যা দেখতে পাচ্ছি না তা হল – ছোট ছোট নদীতে কারখানার বর্জ্য নিঃসরণ, তা গিয়ে বড় নদী, সমুদ্রে, আমাদের খাবারে, শরীরে। বর্জ্য পরিশোধনের আইন কানুনের দুর্নীতি আটকানোয় মন না দিয়ে কোটি টাকার নমামী গঙ্গে প্রকল্পের ঢাক বাজানো আসলে দ্বিচারিতা। ছোট নদী নালা খাল বিলের জলেই নদী পুষ্ট হয় – তাদের বদল না হলে বড় নদী আরও খারাপ বই ভালো হবে না। রাস্তা ঘাট, পার্ক, জমিতে যথেচ্ছ ঘাস মারা বিষ প্রয়োগে কোনও নিয়ন্ত্রণ না আনা, নিষিদ্ধ কীটনাশক এখনও বাজারে পাওয়া যাওয়া – এইসবই আমাদের ঠুলি পরে থাকার উদাহরণ। একদিকে আমরা বলছি আমরা কার্বন নিঃসরণ কমাব, অন্যদিকে কয়লা তোলার জন্য জঙ্গল কাটছি, জমির গঠন পরিবর্তন করছি – তাও আবার কেবলমাত্র একটি কি দুটি কোম্পানির পক্ষে – এর থেকে বড় দ্বিচারিতা আর কী হতে পারে। কিছু চাকরি হবে, কিছু মানুষ জমি বিক্রি করে শ্রমিক হবেন – অথচ তার থেকে অনেক অনেক বেশি মানুষ ঘর ছাড়া হবেন, তাদের জীবিকা চলে যাবে, জঙ্গল নির্ভর পুষ্টিকর খাবারের অভাব হবে … এবং আরও সাঙ্ঘাতিক, যে প্রজন্ম এখনও আসেনি তাদের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-নিঃশ্বাস আমরা কেড়ে নেব।     

পরিবেশবাদকে উন্নয়নের পরিপন্থী মনে করার ধারণাটি এখন পুরোপুরি সেকেলে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবেশের স্থিতিশীলতাই এখন অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন জলাভূমি ধ্বংস করে গড়ে ওঠা কোনও প্রকল্প হয়ত স্বল্পমেয়াদে মুনাফা দিতে পারে, কিন্তু তা বন্যা ও তীব্র তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। পরিবেশের সুরক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এগুলো ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ প্রতিরোধ এবং জনস্বাস্থ্য নীতির অংশ। ঠিক যে কারণে আমরা টাকা জমাই, ভবিষ্যতের সুরক্ষার জন্য – সে কারণেই জল-জঙ্গল-জমি ও তার সঙ্গে জুড়ে থাকা জনমানুষের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা দরকার। পরিবেশের ভেঙ্গে পড়া ভিতের উপর দাঁড়িয়ে প্রকৃত সুস্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়।

মাননীয় প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের মধ্য দিয়ে যে গভীর প্রশ্ন উঠে এসেছে, তা আসলে পরিবেশ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ভিন্নমত বা দ্বিমতের ভূমিকা কী—তা নিয়েই সেই প্রশ্ন। পরিবেশগত আপত্তিগুলোকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আদালত ও নাগরিকরা যদি নিছক উপদ্রব হিসেবে গণ্য করেন তাহলে আমরা অস্বীকার করছি যে উন্নয়ন অবশ্যই আইনসম্মত, বিজ্ঞানসম্মত এবং সামাজিকভাবে ন্যায়সংগত হতে হবে। পরিবেশ আন্দোলন আসলে এই দূরদর্শী চশমা – মুনাফার লোভে ঠুলি পরা চোখের জন্য এই চশমাটা এখন ভীষণ জরুরী।  

0 Comments

Post Comment