পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

অন্তরীক্ষের অদ্বিতীয় সম্বোধন ৯

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 201 view(s)
  • লিখেছেন : হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়
লখাই ভাবে, “আমার ফ্ল্যাটবাড়ির জন্য দাদার দুঃখ, নাকি হিংসা। ভালোই হোলো। দাদার মনের ভাবটা গিয়ে জেনেই আসবো।” তর সয় না লখাইয়ের। বলে, “দাদা। আজ রাত্তিরে তুমি কাজের থেকে ফিরে এলেই যাবো।”

রাম “ঠিক আছে” বলে বেরিয়ে যায়।

সেইদিনই রাত আটটা কি সাড়ে আটটা হবে, লখাই দাদার ঘরে গিয়ে হাজির। তখন সদর দরজাটা খোলাই ছিল। দাদা মনে হয় এইমাত্র দোকান থেকে এসেছে, লখাই অনুমান করে।

'দাদা' বলে ডাকতেই সৌদামিনী বেরিয়ে আসে, “কে! ঠাকুরপো! এসো, এসো। এইমাত্র তোমার দাদা এসে ঢুকলো। তোমার ঠিক আগে আগেই। তোমার দাদা চা খাচ্ছে। যাও । বোসো।”

লখাই কতদিন 'ঠাকুরপো' ডাকটা শোনেনি! সেই পুরানো, মানে, এই কিছুদিন আগের কথা তার হৃদয়কে নাড়া দিয়ে যায়।

সে সোজা দাদার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই দাদা সামনের চেয়ারটা দেখিয়ে বলে, 'বস'। লখাই বসে। ততক্ষণে সৌদামিনী আর এক কাপ চা এনে ঠাকুরপোর হাতে দিয়ে জানতে চায়, “আদু ভালো আছে তো?”

“আছে মোটামুটি। তোমার শরীর কেমন?’

কিছু রোগ-জ্বালা তো আছেই। থাকবেও। তা জানিয়ে তো কোনো সুরাহা হবে না। তাই সেসব আড়ালে রেখে সৌদামিনী বলে, “ভালো। তোমরা দাদা-ভাই কথা বলো।”–এই বলে সে রান্নাঘরে চলে যায়।

লখাই-ই শুরু করে, “দাদা! তুমি আমার ফ্ল্যাটের জন্য দুঃখ পেয়েছো—কথাটা তোমার কাছে শোনার পর থেকেই আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছে। তোমার চেয়ে নিকট-আত্মীয় আমার আর কে আছে, বলো। তুমিই যদি কষ্ট পাও, তবে কে আর খুশি হবে, বলো। আর সেইজন্যে আজ-ই আমি তোমার কাছে ছুটে এলাম। কেন কষ্ট পেয়েছো আমাকে বলতেই হবে।”

রামলাল চায়ের কাপটা নিচে নামিয়ে রেখে বললো, “কষ্ট পেয়েছি মানে! ভীষণ কষ্ট পেয়েছি। এখনো পাচ্ছি। আর কেন পেয়েছি সেটা বলবো বলেই তো তোকে আসতে বলেছিলাম। একটু বস। সদর দরজাটা বন্ধ করে আসি।”

সদর দরজাটা বন্ধ করে এসেই রামলাল শুরু করে, “দ্যাখ ভাই। তোকে আমরা কোলেপিঠে মানুষ করেছি। তোর ওপর আমাদের মায়া মমতা সন্তানের চেয়ে কখনই কম ছিল না। এখনও আছে। তোকে স্বনির্ভর হওয়ার জন্যই আলাদা থাকতে বলেছিলাম। আমার অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। অসুবিধা থাকলে আমাকে জানাতেও বলেছিলাম।

ভেবে দ্যাখ, জায়গাটা ভাগ করার সময় তোকে যে ঘরটা দিয়েছিলাম, সেজন্য বাড়তি এক ছটাক জমিও আমি নিইনি। মাঝখানে বাউন্ডারির দেয়াল দিতেও মানা করেছিলাম। আমি শুধু আমাদের থাকার জন্য এই বাড়িটা বানালাম। কিন্তু তুই কী করলি। প্রোমোটারকে জায়গাটা দিয়ে শুধু একটা ফ্ল্যাট পেলি। কী লাভ হলো তাতে। আমার একদমই সায় ছিল না। তুই সাময়িক একটা ফ্ল্যাটের মোহে সারাজীবনের জন্য বন্দী হয়ে গেলি।”

রাম বলতেই থাকে, “একটু হাওয়া বাতাস খাবি, তার জায়গা নেই। দুটো সবজি লাগাবি, তার জায়গা নেই। ঐ জায়গাতে কলমের চারা এনে কিছু ফলের গাছ লাগালে তা থেকেই তোর অনেক রোজগার হতো।”

লখাই চুপচাপ শুনতে থাকে। রামের চোখ ছলছল করে। বলে, “আমার কষ্ট শুধু এজন্যই। তোর আর কোনো জমি রইলো না।”

রামলাল বলেই যায়, “কোঠাঘরটায় আমরা চারজন থাকতাম। তোরা দু’জন থাকতে পারতিস না! পরে কি দালান হতো না। চিরদিন কি একরকমই থাকবি। তোর মাথার উপর দাদা আছে, সে তোকে কি সাহায্য করতো না'!

লখাইয়ের বোধবুদ্ধি আর কতটুকু। অত ভূত ভবিষ্যৎ সে ভাবেনি। কিন্তু আদু। আদরিনী! তার মাথাতেও এ ভাবনাটা এলো না!

লখাই বললো, “দাদা! তখন অতশত ভাবিনি।”

“দাদার পরামর্শ তো নিতে পারতিস। যাক্ গে, যা হবার তা তো হয়ে গেছে। এবার একটু সমঝে চলিস। দাদাকে ভুল ভাবিস না। যখনই দরকার হবে, আসবি। আমি তোর সেই দাদা-ই আছি।”

লখাই বৌদিকে ডাকে। বৌদি সামনে আসতেই সে বৌদির পা দুটো ধরে বলে, “বৌদি। ভুল হয়ে গেছে। তুমি রাগ করে আমাদের দূরে সরিয়ে রেখো না। আমি ক্ষমা চাইছি।”

বৌদি লখাইয়ের হাতদুটো ধরে বলে, “পাগল কোথাকার। ক্ষমা কিসের। আমরা তেমনিই আছি। কিচ্ছু মনে করিনি। তুমি আদুকে নিয়ে একবার এসো।”

“তোমরা যাবে না?”

 

“আগে আদুকে নিয়ে এসো। তারপর যাবো ক্ষণ।”

লখাই দাদাকে প্রণাম করে বলে, “দাদা, আসছি। আদুকে নিয়ে একবার আসবো।”

“একবার কেন, যখন মনে হয় আসবি। আমাদের আর কে আছে।” বলেই অতবড় মানুষটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।

— “দাদা! কাঁদছো !”

— “তোর আর কোনো মাটি থাকলো না রে। আমাদের বাবার ভূমিটা অন্যের হাতে চলে গেল!”

লখাই আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। মাথাটা নীচু করে নিজেই সদর দরজাটা খুলে বেরিয়ে গেল নিঃশব্দে।

সব কথা শুনে আদরিনীও তাদের ভুলটা বুঝতে পারে। সাময়িক সুখের আশায় চিরদিনের একটা আফসোস থেকে গেল তাদের। উপেনের কাছে শোনা লোমশ মুনির গল্পটা আদরিনীর মনে পড়ে যায়।

লোমশ মুনির গায়ে যত লোম ছিল, তাঁর আয়ু ছিল তত কোটি বছর। অথচ তিনি একটা গাছের তলায় বাস করতেন। একদিন নারায়ণ তাঁকে বললেন, “এত কষ্ট করে না থেকে একটা ঝুপড়ি বানিয়েও তো থাকতে পারেন।”

উত্তরে লোমশ মুনি বলেছিলেন, “মাত্র তো কটা দিনের এই জীবন। এই ভালো আছি।”

আদরিনী ভাবে, “কোঠাঘরে তো সুন্দর থাকা যেতো। খামোখা ফ্ল্যাটের লোভে এতটা জায়গা চিরদিনের জন্য হাতছাড়া হয়ে গেলো। এখন ভেবে তো কিছু হবে না। তাই লখাইকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, “পিছন ফিরে তাকাবে না তো। কপালে থাকলে সব হবে।” তারপর বললো, “যাক্, দাদার রাগ কমেছে—এটাই আমাদের কাছে পরম আশীর্বাদ। এখন ঘুমাও। সকাল হতে না হতেই তো আবার কাজ।”

“কিন্তু রান্নার গ্যাস তো চাই, চোখ বন্ধ করে এই একটা কথা ভাবতে ভাবতেই আদরিনী কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ে।”

(৩৭)

পরের দিন ফ্ল্যাটে ঝাড়ু দেওয়ার সময় ফ্ল্যাটের এক মালিক বাঁশ্রীয়ারবাবু আদরিনীকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি আমার ফ্ল্যাটে কাজ করতে পারবে?”

বাঁশ্রীয়ারবাবু বিপত্নীক। একটা পাঁচ বছরের মেয়ে আছে। তাকে সঙ্গে নিয়েই তিনি কোর্টে কাজ করতে যান। সঙ্গে নিয়েই ফিরে আসেন। দুপুরে হোটেলে খান আর রাত্রে রান্না করেন।

কাজের কথা শুনে এবং ঘরে দুজন থাকেন এটা জেনে আদরিনী একটু থমকে যায়। তারপর বলে, “ঘরে কথা বলে দেখি। বিকেলে কিম্বা কালকে আপনাকে জানাবো।”

লখাই সম্মতি জানানোয়, পরেরদিন সকালে আদরিনী বাঁশ্রীয়ারবাবুকে জানায় যে সে একবেলা করে কাজে আসতে পারবে।

বাঁশ্রীয়ারবাবু তাতেই রাজি হয়ে যান। এবং মাসে এক হাজার টাকা মাইনে দেওয়ার কথা পাকাপাকি হয়।

আদরিনী দু-চার দিন পরে কাজে আসবে বলে জানায়।

“কেন। দু-চার দিন পরে কেন!”—জানতে চান বাঁশ্রীয়ারবাবু।

আদরিনী তার অসুবিধার কথা বলে। বলে, “আমিও তো নতুন ফ্ল্যাটে এসেছি। কিছু কেনাকাটা করতে হবে। বিশেষ করে আমার গ্যাস নেই। ফ্ল্যাটে তো আর কাঠের উনানে রান্না করা যাবে না। আবার গ্যাসের কানেকশনও সঙ্গে সঙ্গে পাবো না। খোঁজ করে দেখি, কারো যদি ডবল কানেকশন থেকে থাকে, তবে একটা যদি ম্যানেজ করা যায়।”

“সে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আমি তো দুপুরে রান্নাবান্না করি না। সকালে চা বানাই শুধু। সেটা হিটারেই করে নেবো। সমস্যা একটু রাতে রান্নার। রান্না মানে, গোটা ছয়েক রুটি আর একটু সবজি। তো, বলছিলাম কী, তুমি যদি আমাদের রাতের খাবারটুকু বানিয়ে দিতে পারতে তাহলে গ্যাস-ওভেন, সিলিন্ডার আমার ঘর থেকেই নিয়ে যেতে পারো। কোনো টাকা পয়সা লাগবে না। শুধু গ্যাস ফুরিয়ে গেলে তা তোমাকেই ভরিয়ে নিতে হবে।'

ঠিক হয় তাঁর ডবল-সিলিন্ডার আছে। দুটোই দিয়ে দেবেন। এবং এ-ও ঠিক হয়, রাতের খাবার সাপ্লাই দেওয়ার জন্য মাসে মাসে যা লাগবে, সেটাও দিয়ে দেবেন।

আদরিনী তো মেঘ না চাইতেই যেন জল পেয়ে গেল। এবং পরের দিন নয়, আজ থেকেই কাজে লেগে গেলো সে। ওভেন আর সিলিন্ডার নিয়ে গেল নিজের ফ্ল্যাটে।

সিলিন্ডারে তখনও বেশ কিছুটা গ্যাস আছে, নাড়িয়েই বোঝা গেল। অর্থাৎ আজ থেকেই আদরিনীর ঘরে গ্যাসে রান্না হবে।

লখাইতো তখনো পর্যন্ত এসব কিছুই জানে না।

ডিউটি থেকে ফিরে গ্যাসে রান্না হচ্ছে দেখে ফ্ল্যাটের মধ্যেই বারকয়েক লাফিয়ে আদরিনীকে জড়িয়ে ধরে বলে, “কোথায় পেলি লো আদু। এ যে দেখছি তুই পিসি সরকারের ম্যাজিক জানিস!”

 

আদু ওকে গা থেকে সরিয়ে দিয়ে বলে, “আমার কাছে আলাদিনের প্রদীপ আছে বুঝলে!”

— “তা তো ভালোভাবেই জানি। কিন্তু কোথায় পেলি, বলবি তো!”

সব শুনে লখাই বলে, “ভালোই হলো। রাত্রে গোটা ছয়েক রুটি আর সবজি বানিয়ে দেওয়াটা কী আর এমন! বরং মাসে মাসে আরও কিছু ইনকাম হবে। তারপর লখাই হিসেব করে, “আমার ৭,০০০/-, আদুর ৩,৫০০/- সাহাবাবুর কাছে ১,৫০০/- আর বাঁশ্রীয়ারবাবুর কাছে ১,০০০/- টাকা নিয়ে মোট দাঁড়াচ্ছে তেরো হাজার টাকা। এরপর রুটি তরকারির দরুণ আরও কিছু।”

লখাই মনে মনে খুব খুশি হয়। আদরিনীকে বলে, “ভাগ্যিস তোকে বিয়ে করেছিলাম।”

 

“বিয়ে করেছিলে, নাকি নিয়ে পালিয়ে এসেছিলে! রাবণ কোথাকার!”

 

— “তুমি কি সীতা!”

— “ওরকম বোলোনা। তোমার দাদার নাম কী, জান তো!”

লখাই হাসে।

 

(৩৮)

চাহিদা ক্রমশ বাড়তে থাকে দুজনেরই। লখাই চাইছে একটা পেন্ডুলামওয়ালা দেয়ালঘড়ি যাতে এক এক ঘন্টায় এক এক রকমের মিউজিক বাজবে। আর আদরিনী চায় একটা ফ্রিজ।

কিন্তু এই মুহূর্তে টাকা কোথায়! সব চাহিদা কি পূরণ হয়। এখনো একমাস হয়নি। একবারও বেতন পায়নি কেউ। কিছুদিন সবুর তো করতেই হবে।

লখাই ভাবে, “তেরো হাজার নয়, চৌদ্দ হাজার। লক্ষ্মীর ভান্ডারের এক হাজার টাকা তো ভুলেই গিয়েছিলাম। সেইসাথে ফ্রি রেশন আর বাঁশ্রীয়ারবাবুর খাবারের টাকাও তো যোগ হবে। ঘর-খরচা ছাড়া বেশকিছু টাকা বাঁচবে প্রতিমাসে।”

এই ভেবে সে আদরিনীকে বলে “একমাস অপেক্ষা কর। প্রথম মাসের টাকায় ঘড়িটা কিনবো। আর কিস্তিতে যদি পাই, তখন ফ্রিজটাও নিয়ে নেবো।”

আদরিনী হাসতে হাসতে বলে, “আর তারপর। আর কী কী বাকি থাকলো।”

লখাই বলে, “আকাশের চাঁদ!”

এদিকে বাঁশ্রীয়ারবাবুর মেয়ের জন্য আদরিনীর খুব কষ্ট হয়। এইটুকু মেয়ে। ওদের ফ্ল্যাটে গেলেই কেমন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। আদরিনী জিজ্ঞেস করে, “কী নাম তোমার?”

মেয়েটি আদরিনীর সামনে গিয়ে কানে কানে বলে, 'বেদনা'।

আহা রে! নামটা শুনেই আদরিনীর মনখারাপ হয়ে যায়। সে মেয়েটিকে বলে, “আমি তোমাকে 'সাধনা' বলে ডাকবো।”

মেয়েটি আপত্তি জানায়। বলে, “ও নামে ডাকলে আমি সাড়াই দেবো না!”

'কেন'!

মেয়েটি বলে, “মা আমাকে 'বেদনা' বলে ডাকতো। আমি অন্য নামে সাড়া দেবোই না। তুমি কি আমার মা? তুমি তো আমার পিসি। তুমি অন্য নাম দেবে কেন!”

তারপর তর্জনীটা দেখিয়ে বলে, “মা কে বলে দেবো, তুমি আমাকে আজেবাজে বলো।”

আদরিনীর ভেতরটা যেন ফেটে যায়। জিজ্ঞেস করে, “তোমার মা কোথায় গেছে?”

— “কী জানি! আমাকে না বলেই কোথায় চলে গেছে। জানো পিসি। মা আমাকে কোলে তুলে কত চুমু খেতো। তুমি তো একটাও চুমু খাও না। মা না হলে চুমু খেতে নেই বুঝি।”

একদিন তো বেদনা নাছোড়বান্দা, “পিসি, তোমার বাড়ি যাবো।”

ভীষণ মুসকিল। কী করে নিয়ে যাবে আদরিনী! ঘরে সে আর কতক্ষন থাকে। মেয়েটাকে সারাদিন কোথায় নিয়ে নিয়ে ঘুরবে। বলে, “আজ না মা। অন্যদিন নিয়ে যাবো।”

বেদনা কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে থাকে। একা একা ওর মন আর ঘরে আটকে থাকতে চায় না। আদরিনী ওর মনের কষ্টটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। মেয়েটাকে বলে,”মন খারাপ হয়ে গেল সোনামণি। নিয়ে যাবো। আজ বাবার সঙ্গে যাও। পরে একদিন ঠিক নিয়ে যাব তোমাকে।”

আদরিনী ঠিক করে, আজই লখাইকে নিয়ে ওর জা-এর ঘরে গিয়ে মেয়েটার কথা বলবে। দিদির তো বাচ্চাকাচ্চা নেই। এই মেয়েটাকে যদি সারাদিন তার কাছে রাখে তবে মেয়েটাও আনন্দে থাকবে আর দিদিও তার সন্তান না থাকার দুঃখ কিছুটা ভুলে থাকবে। অবশ্য বাঁশ্রীয়ারবাবু রাজি থাকলে তবেই।

এইসব ভেবে লখাইকে নিয়ে সন্ধ্যের সময় সৌদামিনীর কাছে যায় আদরিনী। দেখে, দিদি সেই আগের মতই আছেন। আদরিনীর বিয়ের পর যেমন ছিলেন, ঠিক তেমনিই।

একথা সেকথার পর আদরিনী সেই মেয়েটির কথা তোলে। সব শুনে সৌদামিনী বলে, তার কোনো অসুবিধা নেই এবং রামেরও কোনো আপত্তি হবে না। মেয়েটার বাবা রাজি থাকলে ওরা ওকে রেখে নেবে।

আদরিনী বলে, “কাজ থেকে ফেরার সময় তখন না হয় বাঁশ্রীয়ারবাবু ওর মেয়েকে আপনার কাছ থেকে নিয়ে যাবেন।”

“না নিয়ে গেলেও ক্ষতি নেই। আমরা মেয়েটার সব দায়িত্ব নিতেও রাজি”,সৌদামিনী জানায়।

 

এসব আদরিনী সৌদামিনীর মনের কথা। বাঁশ্রীয়ারবাবু কী করবেন তার ওপর নির্ভর করছে সবকিছুই।

(৩৯)

পরেরদিন সকালেও সেই একই ঘটনা। মেয়েটি জেদ ধরেছে, আদরিনীর কাছে আজ তাকে নিয়ে যেতেই হবে।

মহা মুশকিল। কী করা যায়। আদরিনী বলে, “আচ্ছা নিয়ে যাবো, তোমার বাবাকে ডাকো।”

একথা বলতে না বলতেই বেদনা ছুটে গিয়ে বাবাকে ডেকে আনে।

আদরিনী তার জা-য়ের সাথে গতকাল যা যা কথা হয়েছে বেদনাকে নিয়ে, সেইসব খুলে বলে বাঁশ্রীয়ারবাবুকে।

বাঁশ্রীয়ারবাবু মাথার উপরে যেন একটা ছাতা দেখতে পেলেন। বললেন, “তবে তো আমার খুব উপকারই হয়। কিন্তু আমাকে তো ওঁদের সাথে কথা বলতে হবে।”

আদরিনী বলে, “সেকথা না হয় পরে বলবেন। আপনার মেয়ে তো নাছোড়বান্দা। ও আমার সাথে যাবেই। কোনো কথা শুনতে চাইছে না। আমি আজই ওকে নিয়ে যাচ্ছি আমার জা-এর ঘরে। আপনি ফিরবার সময় ওকে নিয়ে আসবেন। আর দাদা থাকলে তখন কথাও বলে নেবেন।”

বাঁশ্রীয়ারবাবু সায় দিলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে বেদনা পোশাক পাল্টে খুশিতে আদরিনীর কাছে এসে বলে, “চলো পিসি। আমি রেডি হয়ে গেছি।”

আদরিনী বেদনাকে নিয়ে প্রথমে নিজের ফ্ল্যাটে, আর তারপর সৌদামিনীর ঘরে কোনো খবর না দিয়েই গিয়ে হাজির। রাম দোকানে গেছে। সৌদামিনী আদরিনীর সঙ্গে মেয়েটিকে দেখে আনন্দে আটখানা, “ওমা। তুমি এলে।”

মেয়েটির তার মায়ের মুখ মনে পড়ে না। ভাবে, এ-ই বুঝি তার মা। সে কিছুক্ষন ফ্যালফ্যালিয়ে তাকিয়ে থাকে সৌদামিনীর দিকে। তারপর তাকে তার মা মনে করে হঠাৎ ছুটে গিয়ে সৌদামিনীকে জড়িয়ে ধরে বলে, 'মা'।

সৌদামিনী সঙ্গে সঙ্গে কোলে তুলে নিয়ে একটা চুমু খেয়ে বলে, “লক্ষ্মী মেয়ে।”

 

বেদনা অভিমানের সুরে বলে, “তুমি আমাকে না বলে চলে এসেছো কেন!”

সৌদামিনী সমস্ত ব্যপারটাই এক লহমায় বুঝতে পারে। সে বুঝে যায়, মেয়েটি তার মায়ের মুখ মনে করতে পারছে না। সৌদামিনীকেই ভাবছে ওর মা। বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে সৌদামিনীর। আদরিনীর চোখেও জল এসে যায়। সৌদামিনী মেয়েটিকে ঘরে নিয়ে গিয়ে বসায়। দুটো বিস্কুট হাতে দেয়।

মেয়েটি বলে, “হরলিক্স কই!”

সৌদামিনীর ঘরে তো হরলিক্স নেই। কী করে।

আদরিনী ওর পিঠে হাত দিয়ে বলে, “এখন বিস্কুট খাও সোনা! পরে হরলিক্স খাবে।”

 

তারপর বলে, “তুমি মায়ের কাছে থাকো। আমি আসছি। কেমন!”

বেদনা ওর খেলনাগুলো খোঁজে। আদরিনী বেদনাকে বোঝায়, “তুমিই তো খেলনাগুলো রেখে এসেছো। এখন মায়ের সাথেই খেলা করো। আমি পরে এনে দেবো”–এই বলে আদরিনী বেরিয়ে গেল। সৌদামিনীর সাথে বেশি কথা হলো না। শুধু বলে গেলো, “বিকেলে ওর বাবা এসে নিয়ে যাবে।”

 

(৪০)

রোববার। বাঁশ্রীয়ারবাবুর ছুটি। রামেরও ছুটি। ছুটির দিন মেয়েটা বাঁশ্রীয়ারবাবুর কাছেই থাকে। সেদিন তিনি মেয়েকে রামলালের কাছে পাঠান না। সেদিন হিটারেই রান্না বান্না করেন তিনি। লখাই-আদরিনীর কিন্তু কোনো ছুটি নেই। বারোমাসই কাজ।

 

আজ রোববার সময় ঠিক করে লখাইয়ের ফ্ল্যাটে এসে হাজির হন বাঁশ্রীয়ারবাবু, রামলাল আর সৌদামিনী। সঙ্গে বেদনাও।

সেখানে আলোচনায় ঠিক হয়, বাঁশ্রীয়ারবাবু প্রতিমাসে পাঁচ হাজার করে টাকা দেবেন মেয়েটির দেখভাল ও খাওয়া দাওয়া বাবদ। যদিও রামলাল টাকা নিতে অস্বীকার করেছিল কিন্তু বাঁশ্রীয়ারবাবু কোনোমতেই রাজি হচ্ছিলেন না। ফলে পাঁচ হাজার টাকা নিতে রাজি হতেই হল রামলালকে।

আর তখুনি আদরিনীর সঙ্গেও রফা করেন রাত্রে খাবারের জন্য মাসিক দুহাজার টাকায়। মোটামুটি মেয়েটাকে নিয়ে আপাতত একটু নিশ্চিন্ত হলেন ভদ্রলোক।

আদরিনীকে তাঁর ফ্ল্যাটে আর কাজে আসতে হবেনা বলেও কারণটা জানিয়ে দিলেন বাঁশ্রীয়ারবাবু। কারণ তেমন কিছুই নয়, যে কাজ আদরিনী করতো, সেটা তিনিই করে নিতে পারবেন বলে জানালেন। এতদিন মেয়েটার জন্য তার কাজে মন বসাতো না। এখন অনেকটা স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করছেন তিনি। তাতে অবশ্য আদরিনীর কোনো দুঃখ নেই। বরং সে মনে মনে ভীষন খুশি হয়। সে যে এক বিপাকে পড়া ভদ্রলোকের কিছুটা উপকার করতে পেরেছে, তাতে আত্মতৃপ্তি তাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে।

(৪১)

প্রথম বেতন পেয়ে কিস্তিতে একটা ফ্রিজ কিনে আনলো লখাই আর আদরিনী। সেদিনটা কত রোমান্টিকতায় ভরিয়ে দিয়েছিলো তারা, মাঝেমাঝে ভাবে আর মনটাকে একটু ঝালিয়ে নেয়, দুজনেই। একে অন্যের অন্তরালে।

ঘরে ডিম ছিল না। ফ্রিজে রাখবে বলেই কিনে এনেছিল লখাই। ফ্রিজের ভেতরটা খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। আর কী এনে রাখা যায়—আদরিনী ভাবে।

আর ঐ দিনই 'বেহুলা-লখিন্দর' ঘরটার জন্য একজন ভাড়াটিয়া এসে হাজির। সে গৃহশিক্ষক। দু-তিনটে ব্যাচ পড়াবে বাড়িটিতে। মাসিক দুহাজার টাকা ভাড়ায় বন্ডে সই করে গৃহশিক্ষক অগ্রিম দু’হাজার টাকা দিয়ে ঘরটি বুক করে যায়। লখাই-আদরিনীর আয় বাড়তেই থাকে।

ক্রমে এগিয়ে আসে পঁচিশে বৈশাখ। কবিগুরুর জন্মদিন। এই দিনটিতে প্রতিবছরই তন্ময়দের ঘরে কবিতা পাঠের আসর বসে। এবছরও বসবে। শহরে যেসমস্ত কবি-সাহিত্যিকরা থাকেন মূলত তাদের উপস্থিতিতেই বসে এই আসর। মন্দ হয় না।

ফুলের মালা, দীপের আলো আর ধুপের গন্ধে এদিনের সন্ধ্যাটা সাহাপরিবারে এক অনন্য পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। রবীন্দ্রসঙ্গীত, শিশুনৃত্য, রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও ছড়া আবৃত্তি এবং স্বরচিত কবিতা পাঠের মধ্য দিয়ে এক মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান উপহার দিয়েছিল তন্ময় সাহার ব্যবস্থাপনা।

প্রচন্ড দাবদাহে অনুষ্ঠানের স্বল্পবিরতিতে চায়ের পরিবর্তে প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল এক একটি পেপসির বোতল। তন্ময়ের অর্থানুকূল্যে।

পরেরদিন আদরিনী তাদের বাড়ি কাজে যেতেই কাজ শেষ হওয়ার পর বিউটি গতকালের বেঁচে যাওয়া পেপসির একটা বোতল এনে তার হাতে দেয়, বলে “নাও পিসি। কালকের অনুষ্ঠানের পেপসি।”

আদরিনী খুশি হয়ে বলে, “ওরে বাবা। আমার জন্যও রেখে দিয়েছো।”

— “রাখবো না।”

এবার আদরিনী বলে, “আচ্ছা দিদিমণি। এই ভ্যাপসা গরমে তোমরা কেন এইসব করো। শীতকালে বা ফাগুন মাসে তো করতে পারো। কত সুন্দর আবহাওয়া সেই সময়।”

বিউটি হাসে। বলে, “রবি ঠাকুর তো মাঘ-ফাল্গুনে জন্মালেন না। পঁচিশে বৈশাখ জন্মেছিলেন। তার জন্মদিনেই তো অনুষ্ঠান করতে হবে, বুঝলে পিসি।”

পিসি রবি ঠাকুরের নাম জানে। পাঠশালায় রবি ঠাকুরের লেখা পড়েছে। ওই পর্যন্তই। আর কিছু জানে না। এই প্রথম সে জানলো রবি ঠাকুরের জন্ম পঁচিশে বৈশাখ।

 

কাজ শেষ করে আঁচলে পেপসির বোতলটা বেঁধে ঘরে গিয়ে চুপচাপ তাদের নতুন ফ্রিজে রেখে দেয় আদরিনী। লখাইকে জানায় না, ইচ্ছে করেই।

(৪২)

বৈশাখ প্রায় শেষ। জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় আর শ্রাবণ—মোটামুটি তিনমাস বাকি। শ্রাবণ-সংক্রান্তিতে মনসা পূজা। বটব্যালবাবুর মাথায় আছে, পূজার  আগেই মনসা মেলা তৈরি করতে হবে। বটব্যালবাবু হিসেব করেন, “আষাঢ়-শ্রাবণ বর্ষা। ঐ সময় বাড়ি বানানোর নানান অসুবিধা। ইট-সিমেন্টের দামও সচরাচর এইসময় বাড়ে।” এইসব সাত-পাঁচ ভেবে তিনি একজন রাজমিস্ত্রি আর দুজন শ্রমিক পাঠিয়ে দিলেন লখাইয়ের ঘরে। কোঠাঘর সংলগ্ন মনসা মেলার ভিত খোঁড়া ও গাঁথুনির কাজ শুরু হলো জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রথম সপ্তাহেই।

কাজ চললো দ্রুতগতিতে। বটব্যালবাবু খুব যত্নসহকারেই মেলা তৈরির কাজে নেমে পড়লেন।

মেলার মেঝেতে বসালেন মার্বেল। আর দরজার ওপরে মার্বেলপাথরে খোদাই করা একটা ফলক- “মা মনসা মন্দির।”

কাজটা এত দ্রুত শেষ হবে, লখাই-আদরিনী ভাবতেই পারেনি।

 

বটব্যালবাবু মন্দিরের ভেতরে মা মনসার বেদীর প্রায় ছ'ফুট ওপরে চিনেমাটির একটা প্রকান্ড মনসা দেবীর মূর্তি বসালেন। সেইসঙ্গে ইলেকট্রিক লাইট ও ফ্যানের এবং একটা জল-কলের ব্যবস্থা করে মেলাটাকে বেশ দর্শনীয় করে তুললেন।

(৪৩)

তখনো আষাঢ় আসেনি।

জ্যৈষ্ঠ মাস চলছে। বিয়ের পর থেকে সৌদামিনীর পরামর্শে আদরিনী জ্যৈষ্ঠ মাসের মঙ্গলবার মা মঙ্গলচণ্ডীর ব্রত পালন করে।  নিরামিষ আহার। ভাত খাওয়া নিষেধ। দুপুরে মুড়ি চিঁড়া আর রাত্রে লুচি তরকারি। আর থাকলে কিছু ফল খাওয়া।

আজ জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ মঙ্গলবার। লখাই বাজার থেকে নানারকমের ফল কিনে এনে আদরিনীর হাতে ব্যাগটা ধরিয়ে সোজা তাদের কোঠাঘরের গলিতে পেঁপে গাছটার কাছে গিয়ে দেখে, বেশ কিছু পাকা পেঁপে ঝুলে আছে। সঙ্গে অগুন্তি বড় বড় সবুজ সবুজ পেঁপে।

তখন বেলা বারোটা। প্রচন্ড রোদ। জামা খুলে কাঠের সিঁড়িটা এনে পেঁপে গাছে ঠেসিয়ে তরতরিয়ে উঠে পড়ে লখাই। ছোটো একটা আঁকশি দিয়ে ছোটো ছোটো পেঁপে বাদ দিয়ে বাকি সমস্ত পেঁপে পেড়ে নেয়। এবার ফ্ল্যাট থেকে আদরিনীকে না জানিয়ে একটা চটের বস্তা নিয়ে আসে। সমস্ত পেঁপে সেই বস্তায় ভরে বস্তার মুখটা হাত দিয়ে আটকে ধরে পিঠে চাপিয়ে নেয়। গা বেয়ে তখন দরদর ঘাম ঝরছে। ঐ অবস্থাতেই পেঁপের বস্তা নিয়ে সে যখন ফ্ল্যাটে এসে হাজির হয়, তখন আদরিনী সবেমাত্র পুজো করিয়ে এসেছে। প্রসাদের থালাটা ঠাকুরের সামনে নামিয়ে রেখে হাত ধুতে বেরিয়েছে।

লখাইকে ঐ অবস্থায় দেখে আদরিনী তো অবাক! “কী দরকার ছিল এখন পেঁপে পাড়ার। মুখটা তো রোদে পুড়ে ভূতের মতো কালো হয়ে গেছে।” কপাল গাল বেয়ে ঘাম ঝরছে তো ঝরছেই। কাঁধের এক জায়গায় রক্ত।

“কে তোমাকে পেঁপে পাড়তে বললো!” আদরিনী বলে, “যাও, হাতমুখ ভালোভাবে ধুয়ে নাও।” এই বলে লখাইয়ের আদু রান্নাঘর থেকে বোরোলিন এনে লখাইয়ের কাঁধে মালিশ করে। এবার সে সটান ফ্রিজের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ফ্রিজটা খোলে। ফ্রিজের এক কোনায় রাখা ছিল পঁচিশে বৈশাখ সাহাবাবুদের ঘর থেকে পাওয়া পেপসির বোতল। সেটা বের করে চটপট লখাইকে দিয়ে বলে, “নাও। পেপসি খাও। বিকেলে কোনো ডাক্তারকে দেখিয়ে আসবে।”

প্রচন্ড তেষ্টায় এক নিঃশ্বাসে লখাই ঢকঢক করে পুরো বোতলটাকেই সাফ করে দেয়। আর বলে, “ডাক্তার দেখাতে হবে না। এমনিই ঠিক হয়ে যাবে।” আর তারপরেই তার মাথায় নানারকম ভাবনার উদয় হয়। “আদরিনী কোথায় পেলো পেপসি! আমি তো আনিনি। আদুও তো কোনদিন বলেনি পেপসির কথা! তবে কি আমাকে না জানিয়ে সে কারো কাছ থেকে পেয়ে লুকিয়ে রেখেছিল! পরে সুযোগমতো খাবে বলে! আমাকে এই অবস্থায় দেখে সে হয়তো থাকতে না পেরে গোপনীয়তার কথা ভুলে গিয়ে এনে দিলো।”

লখাই জানে, আদু তো ঘর আর কাজ ছাড়া অন্য কোথাও যায়না। তবে কোথায় সে পেপসি পেলো। কে দিলো। আর দিলোই যদি, গোপন করলো কেন! তবে কি........

নানা ভাবনা এখন লখাইকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে।

“বাইরে যায় কি না তাই বা জানবো কী করে”, লখাই ভাবে। তার আরও মনে হতে থাকে, “আমি তো আট ঘন্টা ডিউটিতে থাকি। তখনও তো সে বাইরে যেতে পারে। কিন্তু কোথায় যাবে! কোথায় যেতে পারে।”

“তবে কি বাঁশ্রীয়ারবাবু।”—লখাইয়ের সন্দেহ হয়।

লখাই হিসেব মেলাবার চেষ্টা করে— “তাই কি আদু বাঁশ্রীয়ারবাবুর মেয়েটাকে দাদা-বৌদির হেফাজতে রাখার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ঝামেলামুক্ত করে দিয়েছে বাঁশ্রীয়ারবাবুকে।”

লখাই গম্ভীর হয়ে যায়!

 

(88)

আদরিনীর চোখে চোখ রেখে লখাই জানতে চেয়েছে সেই পেপসির ইতিবৃত্ত।

আদরিনী বুঝতে পারেনি লখাইয়ের মনে সন্দেহ দানা বেঁধেছে। বুঝলে আসল কথাটা তো বলেই ফেলতো সে। তা না করে, এই গলদঘর্ম মানুষটাকে একটু ফুর্তি দেওয়ার জন্য, একটু রসিকতা করতে গিয়ে পড়লো ফ্যাসাদে। শুরু হলো কথা কাটাকাটি। ক্রমে তা চরম আকার নিলো। সেসময় তাদের আশেপাশে কেউই ছিল না, যারা বোঝাবার জন্য এগিয়ে আসবে।

এমতাবস্থায় যখন বিরাট একটা কিছু অঘটন ঘটার চরম মুহূর্ত এসে গেলো, ঠিক সেইসময় আদরিনীর তলপেটটা বারবার মোচড় দিতে শুরু করলো। তলপেটে হাত দিয়ে মেঝেয় বসে পড়লো আদরিনী।

অন্তরীক্ষ থেকে কে যেন বারবার কান্নার স্বরে ডাক পাড়তে শুরু করলো। সেই ডাক পৌঁছে গেলো দুজনের কানেই।

সেই ডাক ছিল শুধুমাত্র একটা সম্বোধন করেই, যে সম্বোধন পৃথিবীর আর কারো কাছ থেকে পাওয়া যাবে না! সেই ডাকেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসে গেল ক্রমে।

আসল রহস্য যখন উদঘাটন হলো, তখন লক্ষ্মণ, লখাই, লখিন্দর বা আদু, আদরিনী, বেহুলা ডাক সব কোথায় উধাও হয়ে গেলো।

অন্তরীক্ষের সেই অদ্বিতীয় সম্বোধন, নবজাতকের ডাক লখাই ও আদরিনীকে মুহূর্তের মধ্যে সম্মোহিত করে ফেললো।

 

 

 

 

 

 

0 Comments

Post Comment