হোসেন দাঁড়িয়ে আছে সেই ক্যানভাসের নীচের দিকে ঠান্ডা ঘোলাটে নোংরা জমে থাকা জলের মধ্যে। বুক সমান জল। হোসেন দীঘল মানুষ। ছোটখাটো মানুষ হলে জল গলা সমান হবে। জলের রঙ কালো। তবে সে রঙ কাকচক্ষু কালো নয়। পচা জলের কালো। হোসেন দাঁড়িয়েই আছে। হোসেন নড়ছে না। নড়তে পারছে না। যদি পারত সে দমটাও আটকে রাখতো, সামান্য নড়া চড়া মানেই মৃত্যু।
তার পায়ে জড়িয়ে ধরেছে সাপ। ঠান্ডা জল, তার থেকেও ঠান্ডা একটা অনুভূতি তার ডান পা থেকে বাম পায়ে যাচ্ছে। সামান্য নড়া চড়া হলেই ছোবল আর মৃত্যু। পাঠের জাগে যে সাপ থাকে তা সাধারণ হয় না।
হোসেন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি উপেক্ষা করেই জলে নেমেছে। নামতেই হতো। পাট জাগ দেওয়া আছে। নিখুঁত কাজ এই পাট জাগ দেওয়া থেকে পাট ছাড়ানোর কাজ। এবার পাট হয়েছে ভালো, এক একটা পাট-কাঠি জোয়ান মানুষের বুড়ো আঙুলের মতো মোটা। দাম পাবে যদি আঁশ ছাড়ানো ভালো হয়। জাগ দেওয়া অতো সহজ না। মাঠে থেকে এনে কখন জলে ডোবাতে হবে, কখন কলাগাছ কেটে চাপা দিতে হবে, কখন আঁশ ছাড়াতে হবে তা সবাই পারে না। কোন ডোবাতে কতদিন রাখতে হবে, ডোবার জলের রঙ কেমন হলে পাটের আঁশ হবে রেশমের মতো, তা শুধু জানলে হয় না। গন্ধ শুঁকে আদর করে ছুঁয়ে দেখতে হয়। গতকাল পাটের জাগের রঙ আর গন্ধ শুঁকে দেখেছিল সময় হয়ে গেছে। পাট ছাড়ানোর মুনিষ ও বলে নিয়েছে। ভোর থেকেই বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টিতে জাগ হয়েছে মরা মানুষের মতো ভারী। ছেলেদের অত দম নেই। ছেলেরা ননীর পুতুল সব। কথার অবাধ্য। দুই ছেলে তো থাকে বাইরে, রাজমিস্ত্রির কাজ। বাড়িতে এক ছেলে থাকে, সে পাড়ায় পাড়ায় রকমারি জিনিস ফেরি করে, ভোরের বেলা বেরিয়ে যায়। সবাই হোসেনকে বলে,এবার জমিগুলো ভাগে দাও, শরীর আর নেবে কত! হোসেন তাদেরকে বোঝাবে কী করে, নিজের হাতে লাগানো ধান সোনালী হলে মনের মধ্যে কতটা পরিমাণ সুখ হয়। পাটের জাগ দিলে, পাট ছাড়ানোর পর যে গন্ধ আসে সে গন্ধ তাকের বেহেশতের সুবাস বলে মনে হয়।
ঠান্ডা পরশটা পা থেকে অন্ডকোষ এর উপর দিয়ে কোমরের কাছে এসে হোসেনের শরীর ছেড়ে দিচ্ছে। হোসেনের পরনে কেবল লুঙির ল্যাংট। ল্যাংটের উপর ভাগে চলে এসে নিজেকে স্থির রাখা আরও কঠিন কাজ। 'আলহামদুল্লিহা' হোসেন আল্লাকে স্মরণ করে। সাপ তাড়ানোর দোয়াটাও তার এই কঠিন সময়ে মনে ছিলো না। এখনো মনে পড়ছে না। তার দেওয়া পানি পড়া, তেল পড়া, তাবিজের অনেক জোর কিন্তু তার নিজের বিপদের সময় কাজে আসে না। ভাগ্যিস দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিল, না হলে এতক্ষণ আল্লার পেয়েরা হয়ে যেত সে।
হোসেন কে ঘিরে বসেছিল সবাই। আসরের নামাজের পর থেকে মগরেব পর্যন্ত সময়টুকু এখন অনেকটা সময়। মসজিদটা নতুন হয়েছে। টাইলস দেওয়া মেঝে, চারটা দামী ফ্যান। মিনার অনেক উঁচু। এই গাঁয়ে পাকা বাড়ি থাকলেও দোতলা-তিনতলা বাড়ি এখনো নেই। গাঁ শুরুর মোড়ে দু-চারটা যেগুলো আছে তা এই গাঁয়ের লোক না।নীচে দোকান ঘর আর উপরে থাকার জন্য সেগুলো দোতালা করা হয়েছে। মসজিদে ফুল লতা পাতার ডিজাইন আছে, দেওয়াল রঙচঙে। মসজিদটা তৈরি করতে অনেক কাঠখড় পুড়েছে। কেবল গাঁয়ের লোকের চাঁদায় এত বড় করে মসজিদ করা সম্ভব না।
হোসেনের সাথে ঘটে যাওয়া সাপের ঘটনাটা রটে গেছে।
হোসেন বলছিল, সাপ হলো শয়তান। আদম হাওয়াকে সেই ভুল বুঝিয়েছিল। একেবারে জলজ্যান্ত শয়তান। কিন্তু শয়তানের যম দুয়া। দুয়া পড়তেই বাপ বাপ করে পলালো। যে শরীরে নামাজ আছে, আল্লার জিকির যে শরীরে, সেই শরীরে শালোর ক্ষমতা আছে কামড় দিবে।" মসজিদে যখন সে বসে তখন সময়টা হোসেন নিজের মধ্যে থাকে না। চোখের সামনে যেন চারিদিকের দরজা খুলে যায়। সে তখন অন্য মানুষ। লোক আসে পানি পড়া, তেল পড়া নিতে। সন্তান হবার জন্য তাবিজ নিতে। জ্বিন পরী ছাড়ানোর তাবিজ নিতে। এই সব কাজ করানোর জন্য তাকে দূরে, ভিন গাঁয়েও যেতে হয়। সে পীর নয়, তাই মুরিদ বলা চলে না। কিন্তু শ্রদ্ধা ভক্তি ভালোই পায়।
তার চাচাতো ভাই ছিল পীর। তার ন্যাওটা কিশোর বেলা থেকে। তার বয়সের ছেলে রা যখন বাপের সাথে মাঠে যেতো, বর্ষার সময় ফুটবল নিয়ে দাপাদাপি করতো, সে যেত চাচাতো ভাই মোস্তফার কাছে।
মোস্তফা দৃশ্যমান দুনিয়ায় কথা বলত না, বলতো অদেখা দুনিয়ার কথা। ঘোর লাগতো হোসেনের। সেই অদেখা দুনিয়ায় কথা তাকেও জানতে হবে। নবী, আল্লার সাথে কথা বলতে পারলে, সে হয়ে উঠবে পীর। মোস্তফার কাছে কত বড় বড় লোক আসে। চাকরি করা লোক আসে, স্কুলের মাস্টার আসে। কত খাতির ভক্তি করে, তাদের বাড়িতে গেলে কত আপ্যায়ন। এতো আরাম, এতো সম্মান তার শ্যাওলা ধরা উঠোনে নেই। বরং তার বাপ তাকে নিত্য গালি পাড়ে। সাতখানা ভাই বোন তারা। হাঁড়িতে ভাত উঠাতে বাপের মাঠে খেটে হাড়গোড় এক হয়ে যায়। নিজের জমি বলতে, মাত্র তিন বিঘা। ঘরের ধান হয়। কিন্তু শুধু ধানে কি সংসার চলে? পাটের দাম নেই। সবজি চাষে খাটনি অনেক। মেয়েদের বিয়ে দিতে, টাকা জমলেই শেষ হয়ে যায়। দুই ছেলে মাঠে খাটে, বাগে আনতে পারে না হোসেন কে।
হোসেনকে নেশায় পেয়েছে, অন্য জগতের নেশা। যে জগতে সীমা নাই, বাঁধন নাই, মৃত আর জীবনের ফারাক নাই। মোস্তফা বলে, "আমাতে আর তাতে ফারাক নাই কোনো, এখানে বসে কাবা দেখতে পাবে, কবরের লোকের সাথে কথা বলতে পারবে।ঘরে বসেই গোটা দুনিয়া ঘুরে আসা যায়। দেখা যায় অদেখাকে। মরলে শরীর নষ্ট হয়। রুহ নষ্ট হয় না। আল্লার পেয়ারা রুহ কবরে আটক থাকে না, সে ইচ্ছা মতো ঘুরতে পারে, যেখানে মন চাই যেতে পারে, শরীর ওয়ালা মানুষের সাথে কথা বলতে পারে। তারা গায়েবি খবর জানে।"
মোস্তফার কাছে শুনে শুনে তার নেশা লেগেছে। সে ও দেখতে পায় বুড়া পীর তার সাথে কথা বলছে, আল আকসাতে নামাজ পড়ছে। নারকেল গাছের উপর ছোট বেঁটে লোমশ তিনখানা জ্বিনকে দিব্যি দেখতে পায়। সাপের বিষ শরীরে ছড়ালো কি ছড়ালো না, রোগীর গায়ে হাত দিয়ে বুঝতে পারে। সে কেবল নবীকে দেখতে পায়নি এখনো। মোস্তফার কাছে শুনেছে, নবীকে দেখতে হলে আরও আমল করতে হবে, নবীর প্রেমে দিওয়ানা হতে হবে। তখন নবী কেন আল্লাও আসবে কাছে। আল্লার ভালোবাসা মাএর ভালোবাসার চেয়ে বাহাত্তর গুণ বেশি। সন্তান একবার কাঁদলে মা এর বুক ফাটে, আল্লাকে দেখার জন্য কাঁদলে আল্লা দেখা দেবে না?
হোসেন তার মা কে দেখেছে সামান্য। হোসেনের পর আরেকটা বাচ্চা পেটে এসেছিল, সে বাচ্চা হতে গিয়ে মারা গিয়েছিল তার মা।
হোসেন রাত জাগে আর আল্লার জিকির করে। তার বাপ তাকে গাল পাড়ে, ঘরের খেয়ে আল্লা ওয়ালা হছে, গতর না খাটালে আল্লা এসে খাওয়াবে। নামাজ রোজা কি আমরা করি না? এতো পাগলামির কী আছে? পেটে ভাত না পড়লে সব পাগলের ছাঁট পালাবে।
হোসেন বাড়ি ছেড়ে দিলো । নবীর জন্য সে সব করতে পারে। নবীর নাম মুখে থাকলে খিদে লাগে না, ঘুম আসে না। হোসেন গিয়ে উঠলো মোস্তফার বাড়ি। মোস্তফার ভরা সংসার। দুটো ধানের গোলা। গোয়াল ঘরে গরু। উঠোনে চারটা খাসি রাজার মতো ঘুমায়। ছেলেরা জোয়ান মদ্দ। হাল টানা পুরুষ। পোতা পুতিতে ভরা সংসার। মোস্তফা এই পথে এসেছে হটাৎ করে। স্বপ্নে দেখেছিল কেউ তাকে ডাকছে। প্রায় এই স্বপ্ন দেখতো। তারপর মুরিদ হলো বড় পীরের হাত ধরে। বড় পীর থুরথুরে বুড়ো। মরার আগে মোস্তফার মধ্যে কিছু একটা দেখলো, তাকেই দিলো পীরত্ব।তখন মোস্তফার ভরা জীবন। পীরত্ব পাওয়া মানে একটা অলিখিত মুকুট পাওয়া। শতাধিক মুরিদ, অদৃশ্য অদেখা দুনিয়ায় সীমানা। এই সীমানার ব্যপারটা হোসেন জেনেছিল, এক মোস্তফার সাথে এক মুরিদের বাড়িতে জ্বিন ছাড়াতে গিয়ে। সে এক দেখার জিনিস বটে। মুরিদের ছেলের বৌ এর উপর জ্বিন এসেছিল। উথালি পাথালি করে কেবল, মানুষকে চিনতে পারে না। তিন বছরের বিয়ে করা স্বামীকে লাথি মারে। ছেলে পুলে হচ্ছিল না, স্বামী বৌ তে ঝামেলা করে বিছানা ভাগ করে নিয়ে ছিল। এই সময়ই জ্বিন এর নজর পড়ে বেশি। বিয়ে হয়া বৌ পোয়াতি না হলে আইবুড়ো মেয়ের চেয়েও নজর লাগা হয়। মোস্তফা গিয়ে নাম-সাকিন জিজ্ঞেস করলো। সাকিন শুনে মোস্তফা বলল, ভিন দেশের জ্বিন। সেই দেশের ওস্তাদের নাম করল মোস্তফা, সে নাম শুনেই জ্বিন ভয়ে একসা। বলে, আমি এখুনি চলে যাচ্ছি, আর কোনদিন আসবো না। আপনার পায়ে পড়ি আমার ওস্তাদকে বলবেন না কখনও।
কথা হয়েছিল দুর্বোধ্য বাংলায়। তর্জমা করে মোস্তফা সকল লোককে শুনিয়েছিল। সে গল্প এখনো হোসেন সবাইকে শোনায়। বলে, এমন মস্ত বড় মাস্তান পীর ছিল বড়ভাই। এলাকার জ্বিন তো দূরের কথা, আসে পাশের সকল এলাকার জ্বিনদের মাথা ছিল তাঁবে। দোস্তি ছিল। ভাইকে মানত তারা।
হোসেন এখন জ্বিন ছাড়ায় না। একবার জ্বিন ছাড়াতে গিয়ে কেলেঙ্কারির একসা। জ্বিন তো ছাড়ে না উলটে তার উপর রোগী চড়াও হয়। সেদিন ও কি হয়েছিল কে জানে, আমল করা কোন দোয়ায় কাজে আসেনি। লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে গিয়েছিল। এই ঘটনায় সে পীরত্ব ও পেল না। মোস্তফা সাফ জানিয়ে দিয়েছিল, তার জ্ঞান কম। পীর হওয়ার উপযুক্ত আমল তার নেই।
বাপ একরকম জোর করেই বিয়ে দিয়েছিল। বাপের ভয় ছিল, ঘর ছাড়া হয়ে যাবে। বাড়ির ব্যাটা যদি ঘর ছেড়ে বনে বাদাড়ে ঘোরে, লোকে বলবে পাগল। পাগল ব্যাটার বাপ হওয়ার চেয়ে ব্যাটা মরে যাওয়া ভালো।
সংসার হলে অন্য জগতের নেশা গেল না। বরং নেশাটা যেন চেপে বসল আরও। মোস্তফা মারা যাওয়ার পর মুরিদদের বাড়ি যেতে শুরু করল। মুরিদদের বাড়িই যেন অন্য একটা জগৎ। পরিস্কার ঘর, কল ছাড়লেই পানি আসে। পানির জন্য টিউবওয়েল চাপতে হয় না।ফ্যান বা এসির বাতাস। সে গেলে বাড়ির ভালো ঘরটা বরাদ্দ হতো, সব থেকে ভালো খাবারটা রান্না হতো, বাড়ির সব সদস্যরা গোল হয়ে বসতো তার পাশে, বাড়ির মেয়েরা বসত একটু দূরে, মাথায় ঘোমটা দিয়ে। হোসেনকে তখন কথায় ভর করতো। কত রকমের কথা বলতে পারতো সে, দোজখ বেহেশতের কথা, আরব দেশের কথা, নবীর কথা, আল্লার প্রেমের কথা। মানুষের স্বপ্নের ব্যখ্যা, বিটি শ্বশুরবাড়িতে কেমন আছে, হবু বৌমার চরিত্র কেমন, অনায়াসে বলে যেতে পারতো! একটা ঘোর লাগতো। কত সময় কেটে যেত, এতটা সম্মান সে আর কোথায় পাবে! বৌ তার কথা শুনে না, আমল জিকির তো দূরে, নামাজ ও পড়ে বা, মাথায় কাপড় থাকে বা, ব্লাউজ না পরেই পুকুরে যায়, ভিজা শরীরে রাস্তা দিয়ে আসে। বৌ যেন সাক্ষাৎ তার প্রতিদ্বন্দ্বী। মাটির বাড়িতে শুয়ে থাকা হোসেন, মাঠে মুনিষ খাটা হোসেন, জমির আল কাটা নিয়ে ঝগড়া করা হোসেন, 'ভাত হয়নি কেন' বলে বৌ -পিটানো হোসেন, আড়তদারের কাছে পাটের দাম বেশি পাবার জন্য মিনতি করা হোসেন মুরিদের বাড়িতে এলেই অদৃশ্য তাজ মাথায় উঠতো৷ পীরত্ব না পেলেও নিজের জোরে মুরিদের অন্যদিকে যেতে দেয়নি।
হোসেন এখন বেশিরভাগ সময় মসজিদে বসে থাকে। ছোট ফোন এসেছে পকেটে। ছোট ব্যাটা কিনে দিয়েছে। হোসেনের এখন সব কিছু ভুল হয়ে যায়।কোন কিছুই নিজের থাকছে না। এমনকি শরীরটাও। পেটে ব্যথা হচ্ছে কয়েক মাস থেকে। অল্প হতে হতে মাঝে মাঝে বেশি চাগাড় দিচ্ছে। সুরা ফাতেহা, আয়তালকুরসী কাজ করছে না। শেষে ছোট ছেলে জোর করে নিয়ে গেল হাসপাতাল। একসাথে রোগ ধরা পড়লো। সুগার গলব্লাডারে পাথর। সে ভেবে পেল না কিভাবে রোগ তার শরীরে বাসা বাঁধে। এত আমল করা শরীর। পাটের জাগ গত বছর ও একলা টেনেছে। দশ কিলোমিটার এক নাগাড়ে সাইকেল চালিয়েছে।
আজকাল মনে হচ্ছে কিছুই করতে পারেনি জীবনে। সামিনার বিয়ের পর থেকেই মনটা ভালো থাকে না, উচাটন করে সব সময়। খুব আদরের বিটি তার সামিনা। কোল পুঁছা বিটি। তার উপর বাপের খুব নেওটা। ছোট থেকেই বাপের খোঁজ খবর সবসময়। মাঠ থেকে ফিরলে, বাপজান বলে গলা জড়িয়ে ধরতো৷ কাদা মাথা গা গতরে ছোট শিশুর নরম আলিঙ্গন হোসেনের কলিজা ঠান্ডা হতো। একটু লায়েক হতেই মাঠ থেকে ফিরলে বাপের পানির বালতি, বাপের লুঙ্গি গেঞ্জি এগিয়ে দেওয়া থেকে রাতের খাবারের থালা ঘরে পৌঁছে দেওয়া, সব কিছুতেই তার নজর। ঠিক যেন হোসেনে মা। মা মারা গেছে কতকাল, মায়ের আদর বোঝার আগেই।তবু মা বলতে হোসেনে চোখে ভাসে মাটির চুলোতে ফুঁ দিয়ে আগুন ধরাচ্ছে মা, হোসেন ল্যাংটো হয়ে বসে আছে তার পাশে। ধুয়োয় চোখ জ্বালা করছে, তবু মা এর কাছে বসে থেকে কতই শান্তি। মা মরে যাবার পরই হোসেনের বাপ তিরিক্ষি মেজাজ হলো। মা থাকলে কী হোসেন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত! সেই মা ই যেন সামিনা। কিন্তু সামিনার কপাল সুখের হলো না। তিন শতক জমি বিক্রি করে, পাটের আড়তদারের কাছে ধার নিয়ে, দু ভরি সোনা দিয়ে বিয়ে দিল সামিনার। একমাসের মধ্যেই ফেরত এলো সামিনা। স্বামীর বাইরে পরকীয়া আছে। মাথায় হাত পড়লো হোসেনের, আল্লার দরবারে কেঁদে পড়লো। গায়েবি খবর চোখের সামনে ভেসে উঠে, আর আরিফুরের যে মেয়েছেলের দোষ, এ খবর একবার চোখের সামনে ভাসলো না! সামিনার পিঠে কালশিটে দাগ, ওর মা বলেছিল। মদের গন্ধ পেয়েছিল সামিনা রাতে। সেই নিয়ে আপত্তি করতেই। শুধু তালাক টুকু দেয়নি। বাইরের টান সহ্য করে সামিনা হয়তো স্বামী ঘর করত, ছেলেপুলে হলে সংসার বসে গেলে স্বামীও ঘরে ফিরতো, কিন্তু মদ! আস্তাগফেরুল্লা!
হোসেন কেঁদেছিল খুব। মাঝ রাতে জায়নামজে। আল্লার জিকির করে কেঁদেছে অনেক রাত, কিন্তু সেদিন এজলাসে কৈফিয়ত চেয়েছিল। পরদিন সকালে নিজেকে মুনাফিক মনে হয়েছে। রব কে প্রশ্ন করা কী সাজে! তিনি কাকে কখন কোন পরিস্থিতিতে ফেলেন বোঝা বড় দায়।
কিন্তু এখন, না চাইলেও অনেক কিছু মাথায় আসে। সারাজীবন মুরিদের বাড়িতে গিয়েছে, আদর যত্ন পেয়েছে। কিন্তু তাদের বাড়ির নরম গদিতে শুয়ে "কবর আসলো বিছানা" বলে মন কে যতই বোঝাক না কেন, মন অবাধ্য হয়। পেটের ব্যথা নিয়ে কাহিল হয়ে রয়েছে কয়েকদিন ধরে, শরীরটাও আগের মতো যুত নেই।মাঝে মাঝে মনে হয় এবার হয়তো মরে যাবে। ভালো ডাক্তার দেখানোর ক্ষমতা নেই। সেখানে টাকা লাগে, গায়েবী জ্ঞান কাজে লাগে না। আজকাল নিজেকে নি:স্ব বলে মনে হয়। শরীরে বল নেই, পকেটে টাকা নেই, বিপদের সময় দোয়া গুলোও মনে আসে না। সবচেয়ে খারাপ ঘটনা ঘটেছে কিছুকাল আগে। হাজার চেষ্টা করেও কাগজ দেখাতে পারেনি সে।সে নাকি এখানের মানুষ নয়। তাহলে সে কোথা থেকে এলো। জলজ্যান্ত একটা মানুষ সে,কতবার সরকারি অফিসে গেল কেউ বিশ্বাস করলো না সে এখানের মানুষ। এতবড় লম্বা চেহেরাটার দিকে না তাকিয়ে কেবল কাগজ চাইলো তারা। কোন দোয়া পড়লে, কোন আমল করলে, তারা বিশ্বাস করবে সে মাটির মানুষ !
হিসেব মেলে না। হোসেনের পাকা দাড়ি হিসেব মেলাতে পারে না। মুরিদদের বাড়িতেও ধীরে ধীরে কদর কমছে, পুরাতন লোকেরা নেই। নতুন ছেলেপিলেদের হাতে সময় নেই। আগে যে বাড়িতে রাতে থাকলে ধন্য মনে করত, সেই বাড়িতে এখন গেলে জিজ্ঞেস করে রাতে থাকবেন না চলে যাবেন। নতুন বৌমা ঘরে কি না। সবার এখন আলাদা ঘর চায়। ফোনেই ওয়াজ মেহেফিল শুনে তারা। কেউ কেউ তার গায়েবি কথা শুনে বিরক্ত হয়।
হোসেন মনে মনে চাই, একটা কিছু অলৌকিক হোক। ভীষণ অলৌকিক কিছু। যাতে তার হারিয়ে যাওয়া তখত ফিরে আসে। সবাই বলে, হোসেন একেবারে পাক্কা লোক আছে।সাপের ঘটনা টা ঘটার পর লোক জন জড়ো হচ্ছে তার পাশে। সামিনার ঘটনার পর মানুষ তাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করেছিল। মুরিদের বাড়িতে গেলে সামিনার কথা জিজ্ঞেস করছিল। যে নিজের মেয়েকে বাঁচাতে পারে না, অন্যকে কিভাবে বাঁচাতে পারবে।
অলৌকিক কিছু কিভাবে হবে? এখন কি আর সেই দিনকাল আছে। এখন সবকিছু পরিস্কার। মোবাইলে বসেই সব খবর জানা যায়। কবরের কথা মানুষ বিশ্বাস করতে চায় না। জ্বিন পরী ধরলে, বাচ্চা না হলে মানুষ ডাক্তার বাড়ি যায়। সবকিছু বৃথা লাগে। শরীরটাও দিন কে দিন নিঝর লাগে, জোর নেই আগের মতো। রাতে ঘুম আসে না, সারাদিন ঢুলনি। অপারেশনটা করার পর শরীর আরও বিগড়েছে। বার বার পেশাব লাগে।চাপ দিয়ে পেশাব করতে হয়।গলা শুকিয়ে যায় বার-বার। ডাক্তার বলে, হার্টে জোর নেই,কিডনি ও দূর্বল। মরণ কে দেখতে পাচ্ছে যেন। আর ক-দিন ই বা। যে দুনিয়ায় কথা, গায়েবি খবর সব জানতে পারতো, সে এখন ভয় পাচ্ছে। মরণের ভয়। আল্লার কাছে যেতে ভয় লাগছে। ভোরের বেলায় নামাজের পর মসজিদে বসতে আর ইচ্ছে করে না। মাঠের দিকে যায় সে। লকলক করে বাড়ছে ধান, মুনিষে ধান লাগিয়েছে এবার। দোয়েল শিশ দিচ্ছে। ফড়িং উড়ছে ইতিউতি। আহা এই দৃশ্য আর কি দেখতে পাবে! মরনের দিন যদি জানতে পারতো তাহলে, এই ছবি দেখেই বাকি দিনগুলো কাটিয়ে দিতো। হোসেন মাটিতে বসে পড়ে। হাঁপিয়ে গেছে। অনেকটা পথ হেঁটেছে। ঘাম হচ্ছে কপাল জুড়ে।
পরের দিন জানাজা। হোসেনের অলৌকিকতায় মুখর হলো গাঁ। মুরিদের বাড়ি গুলো থেকে সবাই এলো। চারচাকা করে এল দূরের যারা। আহারে কত আল্লা ওয়ালা লোক ছিল। আল্লার সেজদাতে রুহ কবজ হলো। মুরিদরা মিলে কবর ঘিরে দিল টাইলস দিয়ে। তাতে লেখা থাকলো " অলৌকিক জ্ঞানী হোসেন মন্ডল "।