পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ডাকু বৃত্তান্ত

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 205 view(s)
  • লিখেছেন : নীহারুল ইসলাম
বিকেল শেষ হয়ে আসছে। সন্ধ্যা আসন্ন। ইনসান আলি বসে আছে তার বাড়ির বৈঠক-বারান্দায় একটি চেয়ারে। সামনে চলমান রাস্তা। মানুষ হাঁটছে কম। সাইকেল চলছে আরও কম। তবে বেশি বেশি চলছে টোটো, মোটরবাইক আর চারচাকা। মাঝে মধ্যে ছোট লরি। এই মফস্বলে ‘হাতি’ নামে যার পরিচিতি।

তার মধ্যেই কখনও কখনও আবার চোদ্দ চাকার লরি। এর মধ্যে মাগরিবের আযান ভেসে এল। আযান মানে নামাজের জন্য ডাক। দিনোমানে পাঁচবার সেই ডাক পড়ে মসজিদের মাইক থেকে। ইনসান আলি সেই ডাক কবে থেকে শুনে আসছে। কিন্তু কখনোই সেই ডাকে সাড়া দেওয়ার ইচ্ছা হয় নি তার।    

ইনসান আলির বয়স এখন আটান্ন। জীবনের প্রথম আট বছর হয়ত এসব নিয়ে সে ভাবত। ধর্ম! কর্ম! জান্নাত! জাহান্নাম! এখন আর ভাবে না। বরং এখন এসব দেখেশুনে তার বিরক্ত লাগে। যেমন এখন মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় অথচ দিকে দিকে ধর্মীয় জালসার মরশুম চলছে! পাশাপাশি নামকীর্তন! এই তো ভেসে আসছে তারস্বরে মাইকের আওয়াজ। আশেপাশে কোথাও দুটোই চলছে। কানে এসে বিঁধছে চিল-চিৎকার গলা, উৎপটাং সুর। তার কিছু ভাল লাগছে না। বিরক্তি ঝরে পড়ছে মন থেকে শরীরে। সে আর পারছে নিতে পারছে না। এবার তার বাড়িতে ঢুকে ঘরে গিয়ে বসা উচিৎ। এমন ভেবে ইনসান আলি চেয়ার ছেড়ে উঠতে যাবে তার আগেই সে দেখে টলমল পায়ে পাড়ার গোবিন্দ মানে ডাকুকে এগিয়ে আসতে।

ডাকু ইনসান আলির শুধু প্রতিবেশি নয়, ইনসান আলি ডাকুকে নিজের ভাই মনে করে। ডাকুর বাবা শম্ভু ঘোষকে সে কাকা বলে ডাকত। শম্ভু ঘোষ এমনিতে খুব ভাল মনের মানুষ ছিল। তাকে স্নেহ করত। বাড়িতে ভালমন্দ কিছু রান্না হলে তাকে কোলে তুলে নিয়ে যেত নিজের বাড়ি। আসনে বসিয়ে নিজ হাতে খাওয়াত। কিন্তু ওই শম্ভু ঘোষই মদ খেলেই তেড়েফুঁড়ে মুসলমানদের গালিগালাজ করত। সেটা জানতেই বুঝি ইনসান আলি একদিন তার শম্ভুকাকাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “ কাকা-  তুমি আমাদের এত গাল পাড় কেন? ”

শম্ভুকাকা বলেছিল, “ তোধের কুণ্ঠে গালি পাড়ি? হামি তো গাল পাড়ি শালা মুসলমানদের। শালারা অধের মাঠে হারঘের গরুমহিষ নামতে দেয় না। বলে কী- হামরা নাকি হারঘের গরুমহিষ অধের মাঠে নামিয়ে ফসল চরিয়ে দিই! তা তোরঘের তো জমিজিরাত নাই। তা হইলে তোর তাতে আপত্তি কেনে বাপ? ”

ইনসান আলি বলেছিল, “ আমরাও যে মুসলমান কাকা। ”

“ ধ্যাৎ- তোরা মুসলমান হতে যাবি কীসের দুঃখে? তোরা তো সব শিক্ষতি মানুষ! তোর দাদো হারঘের এলাকার একমাত্র পণ্ডিত মানুষ ছিল। আর তোর বাপ ছিল মাস্টর। তোধের বাড়িতে থেক্যা কত হিন্দু-মুসলমানের ঘরের বালবাচ্চা হিন্দু-মুসলমান ভুলে মানুষ হইল। হামি কি কিছুই জানি না ভাবছিস? হামি সব জানি। চোখের সামনে দেখ্যাছি সব। হামিও একসুমায় ভেব্যাছিনু তোধের বাড়িতে থেক্যা মানুষ হবো। কিন্তু হামার তখুন আর শিখার বয়স ছিল না। তাছাড়া খুব অভাবের সংসার ছিল হারঘের। তার ওপর হামি বাড়ির বড় পুত। বাপের সুথে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে সংসারের ঘানি টানতে হয়েছিল। তবে তোধের বাড়িতে রেখে হামার ডাকুকে হামি মানুষ করতে চেহেছিনু। শ্যাষ তক হামার চাওহাটাই সার হয়েছিল। ছোঁড়াকে কুনু মতেই তোধের বাড়ি-মুখিন করাতে পারিনি। ”

“ কেন? ”

“ তোধের বাড়ি লিয়ে যাবো বুলতেই ছুঁড়া বুল্যাছিল, ওই গোরু-খেকাধের বাড়িতে হামি পা রাখবো না। ”

“ ডাকু এসব শিখেছিল কার কাছ থেকে? ”

“ হামার মায়ের কাছ থেক্যা বোধায়! হামার মা ছিল মনপ্রাণে বৈষ্ণব। নিরামিষাশী। সাঁঝ-সকাল পূজা-আর্চা লিয়ে থাকত। তার পূজার ফুল এন্যা দেওয়া থেকে প্রসাদ বিলানো, জ্ঞান হওয়া থেক্যা ডাকুই ওসব করতো। হয়তো মায়ের ছোঁয়া পড়্যাছিল ছোঁড়ার ওপর! ”

হবেও বা! এমন ভেবে ইনসান সেদিন তার শম্ভুকাকার সঙ্গে আলোচনার ইতি টেনেছিল সেখানেই।

 

~দুই~

হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচি! কী ব্যাপার? বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতে গিয়েও, ইনসান বাড়িতে ঢুকতে পারে না।  বিশ্বজিতের চায়ের দোকানের দিকে এগিয়ে যায়। দেখে, দোকানের ভেতরে ডাকুর সঙ্গে অন্যান্য চা-পায়ীদের বচসা। ইনসান বুঝতে পারে, তার সামনাসামনি হবে না বলে ডাকু বিশ্বজিতের চায়ের দোকানে ঢুকে পড়েছে। তা নিয়েই এই হট্টগোল।

কেননা, ডাকুকে এই পাড়ায় কেউই সহ্য করতে পারে না। ইনসান নিজেও পারে না। আপদ ভাবে। তাই এড়িয়ে চলে। কিন্তু বিশ্বজিতের চায়ের দোকানে এখন যদি কোনও অঘটন ঘটে যায়! ডাকু বলে কথা! সেবার রথের মেলায় মদ খেয়ে যাদের মারল, তারাই বদলা নিতে এসে তাদের বাড়ি আক্রমণ করল। তাকে পেল না। তার মাকে কুপিয়ে চলে গেল। কোথায় ছেলে মায়ের দুধের ঋণ শোধ করবে, তা না, উলটে মা প্রাণ হারিয়ে ছেলেকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেল!

এমন আরও অনেক কীর্তি আছে ডাকুর। আর কোনও কীর্তি যেন না ঘটে, এমন ভেবে ইনসান বিশ্বজিতের চায়ের দোকানে ঢুকে ডাকুর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ইনসানকে দেখে ডাকু মাথা নিচু করে নেয়।

ইনসান তাকে জিজ্ঞেস করে, মাথা নামাচ্ছিস যে!

ডাকু মাথা নত করেই বলে, লজ্জা দিও না দাদা!

-নেশা করেছিস?

ডাকু উত্তর দেয় না। তার মানে সে নেশা করেছে। কিন্তু টাকা কোথায় পেল?

ইনসানের সন্দেহ হয়। কেননা, সে যতদূর জানে, ডাকু আজকাল কাজকাম কিছুই করে না। বাড়িতেই সারাদিন শুয়ে কাটায়। সন্ধ্যা হলে বেরিয়ে পড়ে। নেশা করে বাড়ি ফেরে গভীর রাতে। তার বউ রেখা ইনসানের সংসারে টুকটাক কাজ করে দেয়। বিনিময়ে কিছু টাকা পায়। পাড়ার এরকম আরও কয়েটি বাড়ির সংসারে কাজ করে রেখা তার সংসার অতিবাহিত করে। তাদের একটি সন্তান আছে। তাদের ছেলের নাম ইনসানের ছেলের নামেই। ইনসান রেখাকে ‘বউমা’ বলে ডাকে। ইনসান তার মুখেই শুনতে পায় ডাকুর কীর্তিকাহিনী।

আজ ডাকুকে সামনে পেয়ে ইনসান জিজ্ঞেস না করে থাকতে পারে না, কোথায় পাস তুই নেশা করার টাকা? কে দেয় তোকে?

ডাকু কিছু বলে না। মাথা নত করে চুপ থাকে। তা দেখে ইনসানের খুব রাগ হয়। পারলে যেন আচ্ছা করে পেটায়! কিন্তু পেটাতে পারে না বয়সজনিত কারণে।

ইনসানের মনের কথা যেন পড়ে ফেলে ডাকু। আর তৎক্ষণাৎ সে ইনসানের পায়ে পড়ে মিনতি করে। বলে, দাদা- মারিও না। খুলে বলছি সব। চল তোমার বৈঠক-বারান্দায়।

ইনসান রাগ সম্বরণ করে ডাকুকে ধরে নিয়ে এসে বসায় নিজের বৈঠক-বারান্দায়। জিজ্ঞেস করি, জল খাবি?

ডাকু বলে, খাবো।

পাশে কেউ নেই। অগত্যা ইনসান নিজেই বাড়ি ঢুকে ডাকুর জন্য এক গেলাস জল নিয়ে আসে। সেটা ডাকুর হাতে দিতেই সে এক ঢোকে গিলে ফেলে। তারপর বলে, দাদা- একটা বিড়ি ধরাব?

ডাকুর এমন আবদারে ইনসান যে অবাক হয় না, তা নয়- তবু তার আবদারে সম্মতি দেয়। সে তড়িঘড়ি তার লুঙ্গির কাছা থেকে বিড়ি বের করতে যায়, কিন্তু তার কাছা থেকে বিড়ির বাণ্ডিলের বদলে এক বান্ডিল টাকা খসে পড়ে ইনসানের বৈঠক-বারান্দার মেঝেতে।

এতে ইনসান না যতটা বিপন্ন বোধ করে তার চেয়ে বেশি বিপন্ন বোধ করে ডাকু। তবু সরাসরি ইনসানের চোখে চোখ রাখে। যদিও কিছু বলতে পারে না। কেমন ফ্যাকাশে দৃষ্টি তার।  

ইনসান জিজ্ঞেস করে, এত টাকা কোথায় পেলি তুই?

-কোথায় টাকা?

ইনসান টাকার বাণ্ডিলটা তুলে ধরে তার চোখের সামনে।

সে আবার চোখ নামিয়ে নেয়। মাথা নত করে। কিছু বলে না।

ইনসান জিজ্ঞেস করে, কিছু বলছিস না যে!

ডাকু কেঁদে ওঠে। কাঁদতে কাঁদতে বলে, কী বলবো দাদা- বাপ মানুষ হবার জন্যে আপনাদের বাড়িতে রাখতে চেয়েছিল। আমি রাজী হইনি। সেই ফল ভুগছি গো দাদা।

-কী ফল ভুগছিস তুই?

-আমি নাকি রণজিৎবাবুর ভাড়াটিয়া কনক সোনারকে খুন করেছি!

-কে বললে তোকে একথা?

-কে বলবে আবার! সবাই বলে। আদালত থেকে সমন আসে। পুলিশ বাড়িতে এসে আমার খোঁজ করে। তাই আমি বাড়িতে থাকি না দাদা, পালিয়ে বেড়াই। নেশা করি।

ডাকুর এই ব্যাপারটা ইনসানও শুনেছিল। বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। রণজিৎবাবুর ছেলেরা বহুদিনের ভাড়াটিয়া কনক সোনারকে তাদের ঘর থেকে ওঠাতে পারছিল না। ডাকু তখন রণজিৎ বাবুদের বাড়ির খাস লোক। ডাকুকে দিয়ে ঘটনাটি তারাই ঘটিয়েছে। যদিও ব্যাপারটা আমার বিশ্বাস হয়নি। কিন্তু এখন ডাকুর লুঙ্গির কাছা থেকে নোটের বাণ্ডিল খসে পড়া দেখে ইনসানের ঘটনাটি সত্য বলে মনে হয়।

ইনসান সরাসরি ডাকুকে জিজ্ঞেস করে, তুই কি সত্যিই কনক সোনারকে খুন করেছিলি?

-না দাদা। তবু কেন যে সেই পাপের ফল ভোগ করছি, কে জানে!

ইনসান আর সেই প্রসঙ্গে যায় না। জিজ্ঞেস করে, এখনো সময় আছে। মানুষ হবি?

ডাকু কাকুতি-মিনতি করে বলে, হ্যাঁ দাদা। তুমি যদি আমার পাশে থাকো, আমি মানুষ হবো, ঠিক তোমার মতো। হবোই দাদা।

এবারে ইনসান জিজ্ঞেস করে, তাহলে এই টাকা কোথায় পেলি- আগে বল?

-উজির সেখ দিয়েছে।

-উজির সেখ মানে আমাদের পাড়ার উজির?

-হ্যাঁ দাদা।

-কেন?

-তার বাড়ির সামনে থেকে কাবুয়ার তেলেভাজার দোকান গুড়িয়ে দিতে হবে।

-কাবুয়ার তেলেভাজার দোকান তো উজির সেখের বাড়ির সামনে নেই। উজির সেখের ভাই নাজির সেখের বাড়ির সামনে আছে। সেজন্য অন্ধ নাজির কিছু টাকা পায়। সেই টাকায় তার সংসার চলে।

-নাজিরচাচা অন্ধ নাকি? আমি তো জানতাম না!

ইনসান কোনও উত্তর করে না। ডাকুর সামনে নোটের বাণ্ডিল এগিয়ে দিয়ে বলে, এই নে টাকা। যা ফিরিয়ে দিয়ে আয় এক্ষুণি।

-কী বলে ফেরাবো দাদা? এর মধ্যে কিছু টাকা যে খরচ করে ফেলেছি।

-কত টাকা খরচ করেছিস?

-ঠিক জানি না। গুণে দেখতে হবে।

-আয় তবে গুণে দেখি।

 

~তিন~

তারপর থেকে যুগ যুগ ধরে এই ইনসান আলি বাণ্ডিলের টাকা গুণেই চলেছে। কিন্তু কিছুতেই সে বুঝতে পারছে না, বাণ্ডিলে ঠিক কত টাকা ছিল? তা থেকে ডাকু কতই বা খরচ করেছে? আর কতই বা আছে? গণনা এখনও চলছে। ডাকু পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কাবুয়ার তেলেভাজার দোকানের সঙ্গে অন্ধ নাজির সেখের বাড়ি কবেই গুড়িয়ে গেছে। সেখানে গড়ে উঠেছে ‘রামরহিম’ আবাসন। সেখানে যেমন মন্দির আছে, মসজিদও আছে। শুধু স্কুল নেই।  

তবে ইনসান আলির বাড়ি যেমনকার তেমনি আছে। তার বাড়ির সামনের রাস্তায় মানুষ হাঁটছে কম। সাইকেল চলছে আরও কম। তবে বেশি বেশি চলছে টোটো, মোটরবাইক আর চারচাকা। মাঝে মধ্যে ছোট লরি। এই মফস্বলে ‘হাতি’ নামে যার পরিচিতি। তার মধ্যেই কখনও কখনও আবার চোদ্দ চাকার লরি। এর মধ্যে ‘রামরহিম’ আবাসনের মন্দির থেকে ভেসে আসে ভজনের সুর আর মসজিদ থেকে ভেসে আসে মাগরিবের আযান। আযান মানে নামাজের জন্য ডাক। দিনোমানে পাঁচবার সেই ডাক পড়ে মসজিদের মাইক থেকে। ইনসান আলি সেই ডাক কবে থেকে শুনে আসছে। কিন্তু কখনোই সেই ডাকে সাড়া দেওয়ার ইচ্ছা হয় নি তার।    

ইনসান আলি টাকা গুণতে গুণতে আজকেও শুনছে সেই ডাক। অদ্ভূত ব্যাপার আজ কিন্তু ইনসান আলির কানে এসে বিঁধছে না। বরং তার মনে হচ্ছে কেউ যেন তাকে আমন্ত্রণ করছে। কী যে ভালো লাগছে তার! না, বিরক্তি ঝরে পড়ছে না তার মন থেকে শরীরে। ইনসান আলি ভাবছে, ওইসব জায়গায় তার যাওয়া উচিৎ। আগামীকাল থেকেই সে যাওয়ার চেষ্টা করবে। তার আগে টাকা গোণাটা শেষ করতে হবে। তারও আগে জানতে হবে, বাণ্ডিলে ঠিক কত টাকা ছিল? তা থেকে ডাকু কতই বা খরচ করেছে?

 

0 Comments

Post Comment