পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়াই এখন আইন

  • 19 April, 2023
  • 0 Comment(s)
  • 667 view(s)
  • লিখেছেন : সোমনাথ গুহ
বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার ফলে মানুষ আইনি প্রক্রিয়ায় বিচারের ওপরে আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তাই অ-আইনি পদ্ধতিতে অপরাধী শাস্তি পেলে তারা খুশি হয়। এই প্রবণতা আজকে মানুষের মধ্যে মান্যতা পেয়ে যাচ্ছে। মন্ত্রীসান্ত্রীদের সমর্থন এই প্রবণতাকে সমাজের গভীরে প্রোথিত করেছে।

 

মাফিয়া রাজ দমন করার নাম করে উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ সরকার নিজেই এখন একটা মাফিয়া হয়ে গেছে। ঐ রাজ্যে ক্ষমতার অলিন্দে একটা বাক্যই এখন চলে, ঠোক দো সালে কো। গ্রেপ্তার, আইনি প্রক্রিয়ার কোনও প্রয়োজন নেই, ওসবে খালি সময় নষ্ট। কোনও দুর্বৃত্তকে হাতের নাগালে পেলেই গুলি করে শেষ করে দাও, ইন্সট্যান্ট জাস্টিস! মাত্র দু মাস আগে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় বুক বাজিয়ে বলেছিলেন, ইয়ে মাফিয়া কো হাম মিট্টি মে মিটা দেঙ্গে। যেমন কথা তেমনি কাজ! তার কয়েক দিন আগে এলাহাবাদে উমেশ পাল নামে এক আইনজীবীকে কারাগারে অন্তরীণ কুখ্যাত এক ডন আতিক খানের পুত্র আসাদ প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করেছে। উমেশ ছিলেন ২০০৫ সালে রাজু পাল নামে এক বিএসপি বিধায়কের খুনের সাক্ষী। ঐ ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত আতিক। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর হুমকি কার্যকর করার সুযোগ পেয়ে গেলেন। হয়তো কাকতালীয় ভাবেই চিত্রনাট্যটা শাসক দলের সাহায্যার্থে সুন্দর করে সাজান হয়ে গেল। হিন্দু খতরে মেঁ হ্যায়! পুরো সিস্টেম জুড়ে এই আশঙ্কা বার্তা তিরতির করে ছড়িয়ে পড়ল। মহাপরাক্রমশালী রাষ্ট্র রে রে করে ঝাঁপিয়ে পড়লো দুর্বৃত্তদের ওপর। কয়েক দিনের মধ্যে আসাদ তো বটেই, তার বাপ আতিক, চাচা আশরফ খালাস!

যে ভাবে পুলিশ প্রহরায় থাকা দুই অপরাধীকে ভিডিও করে প্রকাশ্যে খুন করা হল তা ভয়ঙ্কর, সারা দেশকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। অভিযোগ  তিন আততায়ীর সাথে পুলিশের যোগসাজশ ছিল। প্রথমেই সন্দেহ হয় রাত্রি সাড়ে দশটায় কোনও বন্দীকে মেডিক্যাল পরীক্ষার জন্য কেন নিয়ে যাওয়া হবে, যেখানে দুই বন্দীর কারোরই কোনও আপতকালীন চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল না? কোনও এ্যাম্বুলেন্স ছাড়াই পায়ে হেঁটে তাঁরা হাসপাতালের দিকে যাচ্ছে, এটাও বিস্ময়কর! আততায়ীরা যখন হামলা করে পুলিশের দিক থেকে কোনও প্রতিরোধ তো নেইই, তারা রীতিমতো দর্শক! তারা ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি দিল, আত্মসমর্পণ করল, তারপর পুলিশের সম্বিত ফিরল। সর্বোপরি পুরো ঘটনাটা নিপুণ ভাবে ভিডিও করা হল যাতে সারা দেশ জানতে পারে যে কী হাড়হিম করা নৃশংসতায় উত্তরপ্রদেশে গ্যাংস্টারদের নিকেশ করা হয়। যেন সংখ্যালঘু মানুষদের বলা হল, কিন্তু শুধু তাঁদেরকেই বা কেন, যে কোনও বিরোধীদের বার্তা দেওয়া হল, দেখ বেশি বেগড়বাই করলে তোরও এই পরিণতি হবে।

প্রথমেই বলে রাখা দরকার এটা নিয়ে কোনও সন্দেহই নেই যে আতিক, মুখতার আনসারিদের মতো মাফিয়া ডনরা যারা কয়েক দশক ধরে রাজ্যে এক অন্ধকার জগত কায়েম করেছে তাঁদের শুধু নিয়ন্ত্রণ করা নয়, যথাযথ শাস্তি হওয়াও প্রয়োজন। তাদের বিরুদ্ধে পাহাড়প্রমাণ অভিযোগ। সিকি শতাব্দী ধরে তারা খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, তোলাবাজির এক সমান্তরাল ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এখানে রাজনীতির সাথে অপরাধের অবিচ্ছেদ্য যোগাযোগ। এই কুখ্যাত অপরাধীরাই নির্বাচনে দাঁড়ায়, জনতার প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়। নেতাদের ছত্রছায়ায় এদের নেটওয়ার্ক ফুলেফেঁপে ওঠে। এখন খালি সমাজবাদী দলের নাম উঠছে, কিন্তু সব পার্টিই এদের নিজেদের মতো ব্যবহার করেছে। নেহাত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হওয়ার ফলে দুএকটি দল এদের স্পর্শ করেনি। জনান্তিকে শোনা যায় তারা নাকি আবার ঠাকুর গ্যাঙয়ের সাহায্য নিয়ে থাকে।

গত ছয় বছর ধরে যোগী আদিত্যনাথ তাঁর রাজ্যে আইন-বহির্ভুত ভাবে অপরাধ দমন করার একটা মডেল গড়ে তুলেছেন। তার ‘বুলেট ও বুলডোজার’ বা জিরো-টলারেন্স নীতি রাজ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। শুধুমাত্র বাহুবলিরাই নয় সরকার-বিরোধী সমাজকর্মী, মানবাধিকার কর্মী, বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা, কর্মী সবাই এই নীতির নিশানা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাগরিকত্ব বিল বিরোধী আন্দোলন তিনি নির্মম ভাবে দমন করেছিলেন। আন্দোলনকারীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিলো। তাঁদের ছবি ও তথাকথিত অপরাধের খতিয়ান প্রধান রাস্তাগুলোতে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সেই সব ছবি দীর্ঘ দিন সরানো হয়নি। পয়গম্বর সম্পর্কে কটুক্তি করার জন্য যখন মুসলিমরা এলাহাবাদ শহরে বিক্ষোভ দেখায়, তখন প্রশাসন জাভেদ মহম্মদকে দোষী সাবস্ত্য করে। অথচ জাভেদ রাজ্যের এক প্রভাবশালী ব্যাক্তি যিনি শান্তি বজায় রাখার জন্য মুসলিমদের কাছে আবেদন করেছিলেন। ঘটনার দুদিন বাদেই তাঁর বাড়ি যেটা আদতে তাঁর স্ত্রীর নামে, বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রথমে বলা হয় সেটি একটি অবৈধ নির্মাণ। তারপর বলা হয় তাঁর বাড়িতে নাকি সন্ত্রাসবাদীদের আনাগোনা আছে। তাঁর কন্যা আফরিন ফতিমা, যিনি নিজে সিএএ-বিরোধী আন্দোলনের এক অন্যতম মুখ, তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান যে তাঁর পিতাকে গ্রেপ্তার করে এক অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে এনএসএ প্রয়োগ করা হয় এবং একটার পর একটা মামলায় ফাঁসানো হয়। সমাজবাদী দলের নেতারাও এই নীতির স্বীকার হয়েছে। বিধায়ক দীপ নারায়ণ সিং এবং ইরফান সোলাঙ্কির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। আইনের কোনও তোয়াক্কা না করে শুধুমাত্র ক্ষমতার জোরে যোগী সরকার এক পাল্টা বাহুবলি শাসন কায়েম করেছে।   

এই কয়েক বছরে রাজ্যের পুলিশ ১০৭১৩টা ‘এনকাউন্টার’ করেছে। মিরাট জেলায় সর্বাধিক ‘ভুয়ো সংঘর্ষ’ হয়েছে, তারপর আছে আগ্রা ও বেরিলি।  ১৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, ৪৯৪৭ জন আহত হয়েছে। ১৩ জন পুলিশের মৃত্যু হয়েছে এবং ৪৯৪৭ জন আহত হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী ইউপির কুখ্যাত গ্যাংস্টারস আইনে মার্চ ২০২৩ অবদি রাজ্যে ২০০৬৮টি এফআইআর দায়ের করা হয়েছে, যাতে ৬৪০৩৯ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। সদ্য নিহত আতিক এই আইনের সবচেয়ে বড় শিকার। তার কয়েকশো কোটি টাকার সম্পত্তি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে নয়তো বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তার দুই ঘনিষ্ঠ শাকরেদ আরবাজ এবং উসমানকে ‘এনকাউন্টার’ করা হয়েছে, অভিযোগ তারাই নাকি উমেশ পালকে হত্যা করেছিল। গ্যাঙয়ের বহু সদস্যর সম্পত্তি হয় বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে নয়তো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই পদক্ষেপগুলি আইন মোতাবেক হলে কিছু বলার ছিল না কিন্তু অধিকাংশই করা হয়েছে আইন-বহির্ভুত ভাবে। মুখ্যমন্ত্রীর এই মডেলে বিজেপির উচ্চ নেতৃত্বের সায় আছে, এমনকি তাঁরা অন্য রাজ্যে এটা প্রয়োগ করার পরামর্শ দেন। ২০২২ এর বিধানসভা নির্বাচনের মাস তিনেক আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক জনসভায় বলেন আগের সরকার মাফিয়া ও বাহুবলি দ্বারা পরিচালিত ছিল। যোগী সরকার এর বিপরীতে এই মাফিয়াকুলকে সাফাই করার কাজ করছে, তাদের ওপর বুলডোজার চালাচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে লাখনৌয়ে মহা সমারোহে ‘গ্লোবাল ইনভেস্টরস’ সামিট’ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিনিয়গকারীরা উচ্চকন্ঠে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার প্রশংসা করেন।

২০১৯এর নভেম্বর মাসে হায়দ্রাবাদে এক মহিলা পশুরোগ বিশেষজ্ঞকে গণধর্ষণ ও হত্যা করার অভিযোগে চার যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। কয়েক দিন বাদে পুলিশ তাদের ঘটনাস্থলে নিয়ে যায় ও গুলি করে হত্যা করে। বলা হয় সংঘর্ষ, ধৃতরা নাকি আগ্নেয়াস্ত্র ছিনতাই করার চেষ্টা করেছিল। জনতার মতামত বিভক্ত হয়ে যায়। বহু মানুষ আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার জন্য পুলিশের নিন্দা করে, আবার অনেকে এতো দ্রুত বিচার প্রদান করার জন্য পুলিশকে  অভিনন্দন জানায়। সর্বোপরি মহিলার পরিবার এতো দ্রুত তাঁদের কন্যার অত্যাচারীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য পুলিসকে ধন্যবাদ জানায়। বলা বাহুল্য বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার ফলে মানুষ আইনি প্রক্রিয়ায় বিচারের ওপরে আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তাই অ-আইনি পদ্ধতিতে অপরাধী শাস্তি পেলে তারা খুশি হয়। এই প্রবণতা আজকে মানুষের মধ্যে মান্যতা পেয়ে যাচ্ছে। মন্ত্রীসান্ত্রীদের সমর্থন এই প্রবণতাকে সমাজের গভীরে প্রোথিত করেছে। আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়াই এখন আইন। এটা ভয়ঙ্কর!

 

    

0 Comments

Post Comment