'লাঠি যত মারবে মিছিল তত বাড়বে'—ছাত্রজীবনে কম-বেশি অনেকেই হয়তো এই স্লোগান শুনেছি। কিন্তু সত্যি যে মিছিল-আন্দোলন এত দূর গড়াতে পারে, এবং তার ফলে যে একজন দোর্দণ্ডপ্রতাপ মন্ত্রীকে ইস্তফা দিতে হতে পারে কিংবা সরকারকে সমস্ত জালিয়াতি হওয়া চাকরির পরীক্ষা বাতিল করতে হতে পারে—তা সাম্প্রতিক কালে সাধারণ ছাত্র-যুবরাই করে দেখাল। _ডারউইনের 'অভিযোজন তত্ত্ব' ও টিকে থাকার লড়াই যেন এদের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে সত্যি। লোকমুখে প্রচলিত, নিউক্লিয়ার বোমা বিস্ফোরণের পর পৃথিবীর সব কিছু নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও নাকি আরশোলারা স্বমহিমায় বেঁচে থাকে; স্বাভাবিক ভাবে লড়াকু এই ছাত্ররা, বেকার যুবকরা যারা আরশোলার তকমা পেল, তারা সমস্ত প্রতিকূলতাকে অস্বীকার করে টিকে থাকবে এ আর নতুন কথা কী। তাই তো টিয়ার গ্যাস, ছররা গুলিকে তোয়াক্কা না করেই এরা রাজপথে লড়ে গেল। 'ককরোচ জনতা পার্টি' বা সি জে পি-র (CJP) এই প্রতিরোধ সাম্প্রতিক কালে ভারতবর্ষের যুবসমাজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আন্দোলন হিসেবে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিচ্ছে।
সি জে পি-র উত্থান, কৌশল ও নাগরিক প্রতিরোধ
সি জে পি-র সূত্রপাত কিন্তু বেশ মজাদার। ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের একজন সম্মানীয় বিচারপতি শ্রী সূর্যকান্ত একবার তাঁর বিবরণীতে বলেছিলেন, দেশের বেকার ছেলেমেয়েগুলো নাকি আরশোলার সমান। সঙ্গে সঙ্গেই সোশ্যাল মিডিয়ায় জন্ম নেয় একটি পেজ, আর হু হু করে অনুগামী সংখ্যা বাড়তে থাকে। প্রথম দিকে এটি কেবল ইন্সটাগ্রাম, ফেসবুক ও এক্স-এর পাতায় রাজনৈতিক ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও মিম তৈরির একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হিসেবেই কাজ করছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে প্রতিদিনের চাকরির পরীক্ষা বাতিল ও বেকারত্বের জ্বালা সহ্য করা লাখ লাখ তরুণ এই পেজের কমেন্ট সেকশন ও গ্রুপগুলোতে যুক্ত হতে থাকে, যা তাদের জমে থাকা ক্ষোভ প্রকাশের এক শক্তিশালী বিকল্প মঞ্চে পরিণত হয়। কিন্তু যখন নিট (NEET) কেলেঙ্কারি সামনে আসে, তখন এই অপমানিত যুবসমাজ আর নীরব না থেকে সি জে পি-র ছাতার তলায় রাজপথে নেমে আন্দোলন উত্তাল করে তোলে। কিন্তু 'আরশোলা'র মতো একটি শব্দ এত জনপ্রিয় হলো কেন? কারণ বহু—ছাত্রদের অপমানবোধ, জমে থাকা ক্ষোভ, কর্মসংস্থানের চরম অভাব এবং বারংবার পরীক্ষা বাতিলের হতাশা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলির চিরাচরিত ধারার বিপরীত মেরুতে হাঁটার প্রবণতা। সি জে পি প্রথাগত রাজনীতির ধ্বজা না ধরে মিম (Meme) এবং ইন্টারনেট-ভিত্তিক ব্যঙ্গচিত্রকে (যেমন 'পেপে দ্য ফ্রগ') তাদের মূল হাতিয়ার করে তোলে, যা খুব সহজেই জেন-জি (Gen-Z) ও ডিজিটাল প্রজন্মের মনোযোগ ও সমর্থন কেড়ে নেয়।
জাতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা বাতিল এবং বারংবার প্রশ্নফাঁস জেন-জি-র মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। বহু পরিবার তাঁদের সবটুকু সম্বল খরচ করেন পরবর্তী প্রজন্মকে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর জন্য। কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরকে যদি উল্লেখ করি, তাঁর 'অন্নপূর্ণা ও ঈশ্বরী পাটনী' কবিতায় তিনি উল্লেখ করেন—"আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে"। অর্থাৎ পরের প্রজন্মের কথা চিরকাল ভেবে এসেছেন অভিভাবকরা। সেই পরের প্রজন্মের ভবিষ্যৎ যখন অন্ধকারে, তখন দল-মত-শ্রেণি নির্বিশেষে সকল অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে এক তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং এই কারণে তাঁরা সি জে পি-র আন্দোলনকে সমর্থন জানান। সি জে পি-র আন্দোলন এক স্বতঃস্ফূর্ত নাগরিক প্রতিরোধ, যা দেশের বেকার ছাত্র-তরুণদের শুরু করা। এরা কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় না থাকার সুবাদে, নাগরিক সমাজ ও সুশীল সমাজের যে সকল ব্যক্তিত্ব এখনও শিরদাঁড়া বিকিয়ে দেননি, তাঁদের থেকে বিপুল সমর্থন পায়। এদের সাফল্যের বড় কারণ হলো—যেহেতু এরা কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত নয়, তাই বিপুল অংশের নিরপেক্ষ জেন-জি ভোটার এদের সাথে নির্দ্বিধায় যুক্ত হতে পেরেছে, কারণ তাঁদের কোনো দলীয় 'লেবেল' সেটে দেওয়ার আশঙ্কা ছিল না।
ডিজিটাল মাধ্যমের সঠিক ও কৌশলগত ব্যবহার
এদের সাফল্যের পেছনে যদি রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা একটা বড় কারণ হয়, তবে আরেকটি সমান গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো মূলধারার সংবাদ মাধ্যমকে এড়িয়ে ডিজিটাল ও সমাজ মাধ্যমের সঠিক কৌশলগত ব্যবহার। এরা যখনই অনশনে বসেছে বা রাজপথ কাঁপিয়েছে, তার সম্প্রচার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের ফেসবুক পেজ ও ইনস্টাগ্রামে সরাসরি লাইভ করেছে। মূলধারার সংবাদমাধ্যম তথা ভারতের 'চতুর্থ স্তম্ভ' আজ এমন এক বিরল রোগে আক্রান্ত, যেখানে তারা বিরোধী কণ্ঠস্বর শোনাতে খুব একটা পছন্দ করে না। কর্পোরেট চালিত ও পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদমাধ্যমের ওপর এতটুকু ভরসা না করে তরুণ সমাজ নিজস্ব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সোশ্যাল মিডিয়া নেটওয়ার্ককে বেছে নেয়। এর ফলে একদিকে যেমন তথ্য বিকৃতির সুযোগ থাকেনি, অন্যদিকে মুহূর্তের মধ্যে আন্দোলনের বার্তা লাখ লাখ মানুষের কাছে সরাসরি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে, যা এদের আন্দোলনের সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি।
শাসকদলের উদ্বেগ, রাজনীতি ও ‘জেন-জি’ ফ্যাক্টর
সরকার বা তাঁদের প্রধান দল বিজেপি কি এই আরশোলাদের নিয়ে আদতে চিন্তিত? দিল্লির দরবারে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে - সি জে পি- র এই আন্দোলন শাসকের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে । যেহেতু আন্দোলনটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও নিরপেক্ষ, তাই সমাজের এক বিশাল অংশের সাধারণ মানুষ এর সাথে জড়িয়ে পড়ছেন। বিজেপির মূল ভোটব্যাংক আসে যে গ্রামীণ ভারত ও হিন্দিবলয় থেকে, সেখানকার তরুণ প্রজন্মের এক বিরাট অংশ আজ চরম ক্ষুব্ধ। ব্যাংক, রেল, পোস্ট অফিস, ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষায় ক্রমাগত প্রশ্নফাঁস এবং সেই কারণে পরীক্ষা বাতিল যুব ভোটারদের শাসকদলের থেকে দূরে ঠেলে দিতে শুরু করেছে। চিন্তিত না হলে, বিজেপির মতো দল—যারা সাধারণত আন্দোলনকারীদের সাথে সহসা আলোচনায় বসতে বিশ্বাসী নয়—তাদের নেতাদেরও পিছু হটে আলোচনার টেবিলে আসতে বাধ্য হতে হতো না এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে ইস্তফা দিতে হতো না; যা বিগত ১২ বছরের শাসনকালে অত্যন্ত বিরল। এই অদলীয় ছাত্র আন্দোলন তাই শাসকদলের সাজানো রাজনৈতিক অঙ্ককে পুরোপুরি ওলটপালট করে দিয়েছে।
শাসকদলের চিন্তার কারণ আরও গভীর; কারণ কংগ্রেস বা অন্য কোনো বিরোধী দল এই আন্দোলনের ব্যাটন হাতে নেয়নি। ফলে তারা চাইলেও একে সহজে 'বিরোধীদের চক্রান্ত' বলে দাগিয়ে দিতে পারছে না বা প্রথাগত রাজনৈতিক আক্রমণ হানতে পারছে না। আর যেহেতু এটি একটি রাজনৈতিকভাবে দলনিরপেক্ষ আন্দোলন, তাই আন্দোলনকারীরা প্রতিনিয়ত মিম বানিয়ে চলেছে শাসকদলের বিরুদ্ধে। সংবাদ সংস্থা ‘The Wire’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেন-জির মনে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভকে সি জে পি একদম উপযুক্ত সময়ে কাজে লাগিয়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছে। এই ক্ষোভ বিজেপির নিশ্চিত ভোটব্যাংককে আস্তে আস্তে নষ্ট করে দিচ্ছে। সরকার যে কতটা চিন্তিত, তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পুলিশের নৃশংস আক্রমণের ছবিতে। যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণ অবস্থানে কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জ এবং সর্বশেষ হাতিয়ার ছররাগুলি—সব ধরনের উৎপীড়ন দিয়ে সি জে পি-কে থামাতে চাইছে তারা। নইলে রাজনৈতিক মগজধোলাইয়ের ওপর ভর করে শাসকদল এতদিন ধরে যেভাবে দেশ চালিয়েছে, সেই পুরোনো কৌশল আর কাজ করবে না। বিজেপি ও আরএসএস-এর চিন্তার ভাঁজ আরও বাড়ছে আসন্ন রাজ্যগুলোর নির্বাচনের কারণে—বিশেষ করে উত্তর প্রদেশ হাতছাড়া হতে পারে, কারণ সেখানে জেন-জি ভোটারদের সংখ্যা প্রচুর, যারা এবার প্রথমবার ব্যালট বাক্সে নিজেদের মতামত প্রকাশ করবে। সরকার যে কতটা উদ্বিগ্ন তা প্রমাণিত হয় সেই মুহূর্তে, যখন এই আন্দোলনের অন্যতম মুখ অভিজিৎ দীপকে- র সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট এবং বাকি 'আরশোলা'দের অ্যাকাউন্ট ভারতীয় তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৬৯ (এ) ধারায় বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকার এতটাই ভীত হয়ে পড়েছিল যে খুঁজে খুঁজে সব আরশোলাদের গ্রেপ্তার করতে শুরু করে; যদিও শেষে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সেই দমনপীড়নের অবসান ঘটে।
অতীত আন্দোলন বনাম সি জে পি-র লড়াই
অতীতের সরকারবিরোধী আন্দোলনের সাথে সি জে পি-র আন্দোলনের তফাৎ অনেক। ভারতে এই ধরনের সরকারবিরোধী আন্দোলন নতুন নয়। অতীতে দেখা গেছে জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলন, যাকে থামাতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে জরুরি অবস্থা (Emergency) জারি করতে হয়েছিল; কিংবা আন্না হাজারের আন্দোলন, যা লোকপাল বিলের জন্য হয়েছিল। সত্যি কি সি জে পি-র সাথে তাদের কোনো তফাৎ আছে? জনতা আন্দোলন বা আন্নার আন্দোলনের সাথে 'আরশোলা'দের মিল হচ্ছে—উভয় ক্ষেত্রেই তারা লড়েছে দেশের বেকার, হতাশ ও ক্ষুব্ধ ছাত্র-যুবদের জন্য। কিন্তু এদের পদ্ধতিগত জায়গায় বড় তফাৎ রয়েছে। জয়প্রকাশের জনতা আন্দোলন বা আন্না হাজারের আন্দোলন গান্ধীবাদী পদ্ধতিকে মাথায় রেখে তার রূপরেখা তৈরি করেছিল এবং আমরণ অনশনের দ্বারা 'সম্পূর্ণ ক্রান্তি'র লক্ষ্যে এগিয়েছিল। তবে এই আন্দোলনগুলোকে কেন্দ্র করে পরবর্তীকালে নতুন রাজনৈতিক দল গজিয়ে ওঠে—উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭৭ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় 'জনতা পার্টি' এবং তার পরবর্তী সময়ে তৈরি হয় বর্তমান ভারতীয় জনতা পার্টির মতো দলগুলো। আন্নার ক্ষেত্রেও দেখা যায় তাঁর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গজিয়ে ওঠে 'আম আদমি পার্টি'। ফলে আন্দোলন শেষ পর্যন্ত প্রথাগত রাজনীতির ধান্দাবাজির কেন্দ্রে পরিণত হয়।
নতুন ধাঁচের আন্দোলন
আরশোলা দল কিন্তু এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ আলাদা। তারা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপকে হাতিয়ার করে ইন্টারনেট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (Artificial Intelligence) ব্যবহার করে দেশের প্রতিটি ঘরে পৌঁছে গেছে। 'আরশোলা'-র মতো একটি অপমানসূচক শব্দকে তারা নিজেদের প্রতিবাদের ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলেছে। প্রথাগত রাজনীতি থেকে যারা দূরে থাকত, সেই তরুণরাও আজ যুক্ত হয়েছে। জয়প্রকাশ বা আন্নার আন্দোলনে আমরা দেখেছি কেন্দ্রীয় নেতা গ্রেপ্তার হলে আন্দোলন থমকে যেত; কিন্তু ডিজিটাল গণমাধ্যমের যুগে আরশোলাদের আন্দোলনের নেতা গ্রেপ্তার হলেও থমকে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। অতীতের আন্দোলনগুলোতে ধর্মঘট বা হরতালের নামে দেশের সম্পত্তি নষ্ট হওয়ার নজির থাকলেও আরশোলার দল তার ব্যতিক্রম। তারা অত্যন্ত নমনীয় ও সমন্বয়ী মনোভাব দেখিয়েছে, তাই হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পার্সি থেকে শুরু করে মুসলমান, খ্রিস্টান—সব ধর্মের মানুষ এদের সমর্থনে রাজপথে নেমেছেন। একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীকে পিছু হটতে হয়েছে, সরকারের গদি আজ টলমল। এখন দেখার— সমাজমাধ্যম থেকে উঠে আসা এই অরাজনৈতিক 'আরশোলা'দের প্রতিরোধ ভবিষ্যতে দেশের মূলধারার রাজনীতিকে কতটা প্রভাবিত করে, এবং শেষ পর্যন্ত তা দেশের শাসনব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসে কি না!