পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

স্বৈরাচারের পরিণতি করুণই হয়

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 202 view(s)
  • লিখেছেন : মানস ঘোষ
ইনস্টাগ্রামে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন রিলে নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে স্লোগান ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছে, তাঁকে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে। আসলে এটি বিগত ২৩ -২৪ বছরে মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে পদ্ধতিগতভাবে নির্মিত একটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্বকে ভেঙে ফেলা। তিনি প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে একটি পুরো প্রজন্ম বড় হয়েছে এবং তারা যে ভারতকে দেখেন তা বিশ্বের তুলনায় বেশ খারাপ। সোশ্যাল মিডিয়া এবং ইন্টারনেট ছিল তাদের প্রথম খেলার মাঠ। আপনি তাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে বোকা বানাতে পারবেন না।

তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। নাৎসি জার্মানি একের পর এক প্রোপাগান্ডা মেটেরিয়াল তৈরি করছে। তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রোপাগান্ডা ছিল লেনি রিফেনস্টাহলের তৈরি তথ্যচিত্র দ্য ট্রাম্ফ অফ দ্য উইল (১৯৩৫)। প্রখ্যাত স্প্যানিশ চলচ্চিত্রকার এবং ফেদেরিকো লোরকার বন্ধু লুইস বুনুয়েল তখন ফ্যাসিস্টদের তাড়া খেয়ে ইউরোপ থেকে মেক্সিকো হয়ে আমেরিকায় আশ্রয় নিয়েছেন। তাকে বলা হলো ওই লেনি রিফেনস্টাহলের দ্য ট্রাম্ফ অব দ্য উইল ছবির একটা ছোট ভার্সন তৈরি করতে। সেটা তৈরি করে আমেরিকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ডাকলেন বুনুয়েল, উদ্দেশ্য – কীভাবে এই নাৎসি প্রচারের বিরোধিতা করা যায় তার দিশা ঠিক করা। ছবি দেখতে এলেন প্রখ্যাত দুই চলচ্চিত্রকার রেনে ক্লেয়ার এবং চার্লি চ্যাপলিন।

বুনুয়েল তার আত্মজীবনীতে লিখছেন: ওই নাৎসি প্রোপাগান্ডা ছবি দেখলেন দুই পরিচালক, যেখানে একের পর এক দৃশ্য রয়েছে হিটলারের উত্তেজক বক্তৃতার। কিন্তু রেনে ক্লেয়ার এবং চার্লি চ্যাপলিনের প্রতিক্রিয়া হল সম্পূর্ণ ভিন্নরকম। বুনুয়েল লিখছেন, রেনে ক্লেয়ার খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন এবং গম্ভীর হয়ে গেলেন। আর আশ্চর্য প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল চার্লি চ্যাপলিনের কাছে থেকে। যতবারই হিটলারকে দেখা যাচ্ছিল বক্তৃতা দিতে ততবারই চ্যাপলিন অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিলেন। বুনুয়েল বলছেন, একবার তো চ্যাপলিন হাসতে হাসতে চেয়ার থেকে পড়েই যাচ্ছিলেন। পরের ইতিহাসটা আমরা জানি। দ্য গ্রেট ডিক্টেটার। সে ছবিতে বিদ্রুপের কষাঘাতে ওই জার্মান ডিক্টেটরের লার্জার দ্যান লাইফ ইমেজ ভুলুন্ঠিত হলো চ্যাপলিনের হাতে। হ্যাঁ, এটাই বিদ্রুপ এবং ব্যাঙ্গের ক্ষমতা। তত্ত্বের কথায় যাচ্ছি না। সোভিয়েত সাহিত্য তাত্ত্বিক মিখাইল বাখতিন, ফরাসি দার্শনিক অরি বার্গস ও কানাডার সাহিত্য সমালোচক নরথরপ ফ্রেই এসব কথার ব্যাখ্যা করেছেন সবিস্তারে। অপরাজেয় রাজাকে মুহূর্তে সে বানাতে পারে হাসির খোরাক। ক্ষমতার অলিন্দে সে ঘটাতে পারে অট্টহাস্যের বিস্ফোরণ। আজকের সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছেন না? বিভিন্ন মিম, পোস্টার, ছাত্রযুবদের দ্বারা তৈরি ছোট ছোট ভিডিও আর হাসির লাইভ কিভাবে ভূলুণ্ঠিত করছে ভারতবর্ষের ফ্যাসিবাদী শাসক ও তাদের পালের গোদা মোদিকে।

একজন ক্ষমতায় থাকার এনটাইটলমেন্ট নিয়ে যখন ক্ষমতার নিচে থাকা কোন মানুষকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করে সেটা হৃদয়হীনতা বলে আমরা মনে করি। দাম্ভিক বড়লোক যখন অসহায় গরিবকে ব্যঙ্গ করে আমাদের ঘৃণা সেই বড়লোকের দিকে ধাবিত হয়। কিন্তু আমরা চিরকালই দেখেছি ক্ষমতাহীন বা শোষিত, বঞ্চিত, যার হাতে মিলিটারি নেই, পুলিশ নেই, আধা-সামরিক বাহিনী নেই, পেলেট গান নেই, কাঁদানে গ্যাস নেই, চাটুকার সভাসদ বা পোষা গণমাধ্যম নেই সে যখন বিদ্রুপ ছুঁড়ে দেয় শাসকের উদ্দেশ্যে তা মধ্যাহ্নের সূর্যের সামনে ধরা আতস কাঁচের মতো উজ্জ্বল আর তীব্র আলোক রস্মি হেনে জ্বালা ধরিয়ে দেয় অত্যাচারীর অন্তরাত্মায়। একটা বিখ্যাত চলচ্চিত্র থেকে তার একটা উদাহরণ দিতে চাই।

১৯৮৮ সালে আর্জেন্টিনার বিপ্লবী পরিচালক ফ্রেনান্দ সোলানাসের সুর বা সাউথ নামের ছবিটি প্রকাশিত হয়। সে ছবিতে একটা ভয়ংকর সময়ের গল্প বলা হয়েছিল। ১৯৭৬ সাল থেকে এক ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারী শাসন আর্জেন্টিনার গণতন্ত্রের টুঁটি টিপে মেরেছিল, যাকে ইতিহাসে ‘ডার্টি ওয়ার’ বলা হয়। ছবিতে দেখছি একদল সশস্ত্র সৈন্য দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ছে এক বৃদ্ধ-বৃদ্ধার বাড়িতে। যাঁরা ট্রেডি ইউনিয়ন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাড়িতে ঢুকে সেনারা নির্বিচারে গুলি চালাতে থাকে স্বয়ংক্রিয় ইনসাস রাইফেল থেকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃদ্ধ-বৃদ্ধার রক্তাক্ত দেহ লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। এই হত্যাযজ্ঞ যখন চলছে তখন শোনা যায়, কোথাও থেকে একটা কন্ঠ অশ্রাব্য গালিগালাজ বর্ষণ করছে সৈন্য এবং স্বৈরাচারী শাসকের উদ্দেশ্যে। এমন সব গালিগালাজ যা শুনে কানে আঙুল দিতে হয়। কিন্তু এই কন্ঠশ্বর এর মালিক কোথায়? কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর দেখা যায় গালিগালাজ ভেসে আসছে মাথার উপর থেকে। সিলিং এর কাছে বসে আছে ওই বাড়ির পোষা কাকাতুয়া। অশ্রাব্য ভাষায় সৈন্য আর তাদের মালিক স্বৈরাচারীদের উদ্দেশ্যে সে একের পর এক নিক্ষেপ করছে অব্যর্থ গালাগালির বাণ। আর কি বা সে করতে পারত! ফলে ইনসাস রাইফেল এর বিরুদ্ধে গালাগালিই তার অস্ত্র।

মাঝরাতে ইন্সটায় এই যে মোদীবাবু বলছে, দেশকো বিটিয়াঁ ওকে নাকি ভদ্দি ভদ্দি গালিয়াঁ দিয়া, তার তো একটা প্রেক্ষাপট আছে। ওই কাকাতুয়ার মত আমাদের যাদের অবস্থা, তাদের কাছে ক্ষমতাকে, স্বৈরাচারকে গালাগালি দেওয়াটা কোন অন্যায্য কাজ নয়, ওটা ক্ষমতার বিরুদ্ধে অত্যাচারিতের উচ্চারণ, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। ‘অপরাজেয়’ বলে যে স্বৈরাচারী নিজেকে প্রচার করে তার ইমেজকে টেনে মাটিতে নামিয়ে ধুলোয় মিশিয়ে পদদলিত করার আকাঙ্ক্ষা থেকেই বেরিয়ে এসেছে এই সব গালিগালাজ। স্বৈরাচারী শাসক তার একধরনের সেক্রেড বা পবিত্র ইমেজ তৈরি করে। সেই ইমেজকে ডিসেকরিলাইজ করতে না পারলে স্বৈরাচারীকে নাড়া দেওয়া যায় না। যন্তর মন্তর থেকে শুরু করে সারা দেশের ছাত্র-যুব যে গালাগালি এবং বিদ্রুপ বাণ স্বৈরাচারী মোদির উদ্দেশ্যে নিক্ষেপ করছে, তা আসলে ওই গদি মিডিয়ার দ্বারা তৈরি মোদির সেক্রেড ইমেজ কে ডিসেক্রালাইজ করার একটা কৌশল। সেই কৌশল তারা সঠিকভাবে প্রয়োগ করেছে। এতেই নড়ে গেছে স্বৈরাচারের ভিত।

https://x.com/Sahomon1/status/2083724197621346517?s=20

সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে একটু দৃষ্টিপাত করলে দেখবেন স্বৈরাচারী শাসকরা কিভাবে আক্রমণ করেছে কার্টুনিস্ট এবং স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ানদের। একজন গণতান্ত্রিক শাসক কিন্তু কাটুনিস্ট, মিম নির্মাতা, স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ানকে জেলে ভরে না, কারণ প্রকৃত গণতন্ত্র কোন সেক্রেড ইমেজ তৈরি করে না। সেক্রেড ইমেজ তৈরি করতে হয় স্বৈরাচারীকে। সে ইমেজ ভাঙ্গিয়ে তাকে জনগণকে বোকা বানাতে হয়। ইমেজই তার সম্পদ, আর টিঁকে থাকার রহস্য। সেই ইমেজ দিয়ে সে সবাইকে ভয় দেখায় আর নিজে সে প্রতি মুহূর্তে ভয়ে থাকে, তার সেক্রেড ইমেজ বুঝি ব্যঙ্গ বিদ্রুপের কষাঘাতে ভূলুণ্ঠিত হয়।

আসলে স্বৈরাচারী ব্যঙ্গ-বিদ্রুপকে স্যাটায়ারকে ভয় পায়।  ফ্যাসিস্ট দেবতা জানে যে তাকে প্রকৃত অর্থে ভক্তি করে মুষ্টিমেয় মানুষ, বেশিরভাগই তাকে ভয়ে ভক্তি করে। ফলে এই ভয়টা ভেঙে গেলে তার খেলা শেষ। যন্তর মন্তরের আন্দোলন এবং সারাদেশের ছাত্রযুবরা বিদ্রুপের চাবুক আর হাস্যরসের মধ্যে দিয়ে এই ভয়টা ভেঙে দিয়েছে। ফলে যারা তাকে ভয়ে ভক্তি করত তারা আজ ঘৃণা আর ঠাট্টা ছুঁড়ে দিচ্ছে তার দিকে। স্বৈরাচারীর পরিণতি এইরকমই করুণ হয়।

 

0 Comments

Post Comment