পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি মুসলিম খেদাও অভিযানের হাতিয়ার

  • 04 April, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 461 view(s)
  • লিখেছেন : সুমন কল্যাণ মৌলিক
আজ যারা বৈধ ভোটারদের আন্দোলনে দেশদ্রোহের গন্ধ পাচ্ছেন তারা কিন্তু লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সির অসঙ্গতি নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলছেন না। তারা যদি সত্যি গণতান্ত্রিক মূলবোধে বিশ্বাসী হতেন তাহলে অবশ্যই প্রশ্নগুলো তুলতেন। প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যাবে না বরং তার সামনে ট্রাইবুনালের গাজর ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। আজ পর্যন্ত কিভাবে ট্রাইবুনাল কাজ করবে, এত কম সময়ের মধ্যে কিভাবে শুনানী সম্ভব -- এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যায় নি।

কাগুজে ডিগ্রিধারী,ফেসবুকে অগ্নিবর্ষী,মধ্যবিত্ত বাবুদের ভীষণ লজ্জা হয়েছে। কারণ মালদহ জেলার মোথাবাড়ীতে মানুষ বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্বেও বাস্তবে ভোটাধিকার হারানো এবং নাগরিকত্ব চলে যাওয়ার আশঙ্কায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আন্দোলন করছিলেন।বাবুরা যেহেতু এখন লজ্জার মধ্যে আছেন তাই জিজ্ঞেস করা যাচ্ছে না যে কখন থেকে ধরণা,অবরোধ, ধর্মঘট ভারতীয় সংবিধানে বেআইনি বলে চিহ্নিত হল! আর যখন মানুষের সব আশা হারিয়ে যায়,লজিক্যাল ডিসক্রেপিন্সি,অ্যাডযুডিকেশন,ট্রাইবুনাল ইত্যাদি হাজার প্যাঁচপয়জারের ফাঁসে হাজার হাজার মানুষ দিশেহারা,যখন সমস্ত ভোটবাজ দল এই অন্যায়ের প্রতীকি প্রতিবাদ করে গণতন্ত্রের মহান উৎসব সফল করতে জানপ্রাণ কবুল করে তখন ক্ষোভের আগুনে ফেটে পড়া ছাড়া আর কি থাকতে পারে এক অসহায় নাগরিকের কাছে! আইনের শাসন ভেঙে পড়েছে বলে যারা ভীষণ রকম চিন্তিত তাদের লজ্জা কোথায় থাকে যখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলে এবছর ভোট দিতে না পারলেও ভোটাধিকার যাবে না! আদালত যখন দিল্লির শাসকদের ভাষায় এ রাজ্যের মানুষদের রাজনৈতিক মেরুকরণের দায়ে অভিযুক্ত করে তখন কোথায় থাকে বাবুদের গণতান্ত্রিক বিবেক! কেন বাংলাতেই লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি( যৌক্তিক অসঙ্গতি) চালু হল তার উত্তর চাওয়ার দায় আজ বাবুদের নেই! নির্বাচন কমিশনের অস্বচ্ছ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত কাজকর্মের আপাতগ্রাহ্য প্রমাণ পেয়ে যখন সর্বোচ্চ আদালত মুখ আর মুখোশের গল্পটা বজায় রাখতে বিচারবিভাগের হাতে ৬০ লক্ষ মানুষের ভবিষ্যৎ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় তখন তো বাবুদের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ঘৃণায় ফেটে পড়তে দেখি না! বাবুরা ত্রিকালদর্শী তাই তারা জমায়েতের ছবি দেখে তার পেছনে লুকিয়ে থাকা জেহাদি চক্রান্তের ছবি দেখতে পান কিন্তু কেন বুথের পর বুথ ধরে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ হয়ে যাচ্ছে, তার রহস্য উদ্ধারের কোন দায় তাদের নেই।

আজ একথা দিনের আলোর মত পরিষ্কার যে পশ্চিমবঙ্গে চলমান এসআইআর প্রক্রিয়ার মুখ্য উদ্দেশ্য হল একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ( পড়ুন মুসলমান) মানুষদের গণ হারে বাদ দেওয়া। এস আই আরের প্রথম পর্বে যখন দেখা গেল মুসলমান অধ্যুষিত মালদা ও মুর্শিদাবাদের৷ বিভিন্ন বিধানসভার কেন্দ্রগুলোতে আনম্যাপড ভোটারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে কম এবং এক কোটি রোহিঙ্গার গল্প নিছকই ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক প্রচার তখন কৌশল বদল করে লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সির নামে হাজার হাজার ভোটারকে বিচারাধীন ভোটার হিসাবে দেগে দেওয়া হল। তাদের বক্তব্য পেশের কোন সুযোগ না দিয়ে,ন্যায় বিচারের সাধারণ শর্তগুলোকে পদদলিত করে এবং কোন কারণ না দর্শিয়ে রায় ঘোষণা হয়ে গেল।অথচ আজ পর্যন্ত লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সির কোন গ্রহনযোগ্য সংজ্ঞা কমিশন উপস্থিত করতে পারে নি।এই আগ্রাসী কার্যকলাপের পরিধি এতটাই বিস্তৃত যে আদালতের প্রাক্তন বিচারপতি,সরকারি অফিসার,নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক থেকে আম আদমি -- কেউ এর হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না।

কেন আমরা গণহারে নাম ছাটাইয়ের অভিযোগ তুলছি তার স্বপক্ষে দিস্তে দিস্তে নথি দেওয়া যায়।সাম্প্রতিক বিক্ষোভের কেন্দ্র মোথাবাড়িতে বিচারাধীন ছিলেন ৭৯,৬৮৩।এর মধ্যে ৭৪ নম্বর বুথে ৫৭৭ জনের নাম তালিকায় ছিল।এর মধ্যে একজন হলেন তৃনমূল প্রার্থী নজরুল ইসলাম।সাপ্লিমেন্টারি লিস্টে দেখা গেছে ঐ নজরুল ইসলাম বাদে বাকি সমস্ত নাম বাদ পড়ে গেছে।ঐ বিধানসভা কেন্দ্রের ১৫১ নম্বর বুথে ৭০৪ জন বিচারাধীন মুসলিম ভোটারের মধ্যে বাদ গেছেন ৫৫৫ জন।পাশের বৈষ্ণবনগর বিধানসভা কেন্দ্রে ৭৮২ জনের মধ্যে বাদ গেছেন ৭৬০ জন।মালদার সুজাপুরে বিচারাধীন ১,৩৪,৫২১ ( ৫২.৫০%)।সাপ্লিমেন্টারী লিস্টের হিসাব অনুযায়ী বাদ যাবেন ৩০,০০০ ভোটার। মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জে বিচারাধীন ১,১৫,০৮৭ ( ৪৫.৯০%),বাদ পড়তে চলেছেন ৩০,০০০। লালগোলা বিধানসভা কেন্দ্র ( মুর্শিদাবাদ) বিভিন্ন বুথে মুসলিম বিচারাধীন ভোটারদের নাম বাদের গড় ৯০%।ঐ জেলারই বহু আলোচিত সামসেরগঞ্জের ৯৭, ৯৮ ,৯৯, ১০০, ১০১, ১০২, ১০৩ ও ১০৪ নম্বর বুথে বিচারাধীন ভোটারদের নাম বাদ যাওয়ার শতকরা হার যথাক্রমে ৯৩.৮%, ৯৩.৫%, ৯৪.৪%, ৯৪.২%, ৯৭.৪%, ৯৪.৭%, ৯৭.৪%, ৯৮. ২%। এই সমস্ত তথ্য এক ভয়ংকর বিপর্যয়ের ইঙ্গিতবাহী।

আজ যারা বৈধ ভোটারদের আন্দোলনে দেশদ্রোহের গন্ধ পাচ্ছেন তারা কিন্তু লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সির অসঙ্গতি নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলছেন না। তারা যদি সত্যি গণতান্ত্রিক মূলবোধে বিশ্বাসী হতেন তাহলে অবশ্যই নিচের প্রশ্নগুলো তুলতেন:

# কমিশন বলেছিল ২০০২ সালের ভিত্তিবর্ষের সাথে ম্যাপিং থাকলে তার নাম বাদ যাবে না। তাহলে হাজার হাজার মানুষের নাম বাদ যাচ্ছে কেন?

# একই পরিবারের মা/ বাবার নাম ভোটার তালিকায় আছে অথচ ছেলে/ মেয়ের নাম বাদ গেল কেন?

# একই পরিবারের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনজনের নাম ভোটার তালিকায় আছে অথচ দুজন বাদ, কেন?

# ২০০২ সাল থেকে পাসপোর্ট আছে এমন লোকের নাম বাদ কেন?

# মাধ্যমিকের সার্টিফিকেট জমা দেওয়া সত্বেও কেন তালিকায় নাম থাকবে না?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যাবে না বরং তার সামনে ট্রাইবুনালের গাজর ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। আজ পর্যন্ত কিভাবে ট্রাইবুনাল কাজ করবে,এত কম সময়ের মধ্যে কিভাবে শুনানী সম্ভব -- এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যায় নি।পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র বলে অহরহ বিজ্ঞাপিত এদেশে নাগরিকদের উপর একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের এইরকম নির্যাতন আগে কখনো এদেশের মানুষ দেখে নি।
আজ মোথাবাড়ি সহ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় মানুষ নিজেদের ভোটাধিকার রক্ষার আন্দোলনে পথে নেমেছে।এই আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্ত কিন্তু পরিস্থিতির বিচারে অনিবার্য ছিল।কোন রাজনৈতিক দল ( ডান বা বাম) আগে ভোটার পরে ভোট-- এই লক্ষ্যে তাদের আন্দোলন পরিচালিত করে নি।অধিকার হারানো মানুষ দেখেছে ৬০ লক্ষ মানুষকে বিচারাধীন রেখে যখন রাজ্যে নির্বাচন ঘোষণা হয়ে গেল তখন এক মুহূর্ত দেরি না করে সমস্ত রাজনৈতিক দল তাদের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে দিল। বিজেপির রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা পূরণ করতে দলদাস নির্বাচন কমিশন সক্রিয় কিন্তু যারা বিজেপির  বিরোধী তাদের বিরোধিতা নিয়মতান্ত্রিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকল।আজ যদি বিজেপি বিরোধী সমস্ত রাজনৈতিক দল বৈধ ভোটারদের তালিকায় ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিত, তাহলে ছবিটা অন্য রকম হতে পারত।আজ নাগরিক সমাজের একটা বড় অংশের নীরবতা ও কমিশনের কাজকর্মের প্রতি প্রশ্নহীন সমর্থন নাম বাদ পড়া মানুষগুলোকে অসহায় করে তুলেছে।হিটলারের নাৎসী জমানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পেছনে জার্মানির বৌদ্ধিক সমাজের নীরব সমর্থন ছিল।সেই সমর্থনের পরিণতি কি হয়েছিল তা সবার জানা।আজকের ভারত সেই একই সংকটকালে উপনীত।

 

0 Comments

Post Comment