ঈশ্বরের দূত, অঙ্কের ভূত ও দেহের দলিল:-
আধুনিক রাষ্ট্র কেবল ভূখণ্ড শাসন করে না। সে চারটি বিষয়কে একসাথে শাসন করে - শব্দ, দেহ, গণনা এবং সম্পদ। শব্দ দিয়ে সে শত্রু তৈরি করে, দেহ দিয়ে সে আনুগত্য আদায় করে, গণনা দিয়ে সে বৈধতা তৈরি করে, আর সম্পদ দিয়ে সে সেই বৈধতাকে কিনে নেয়। ভারতের গত একশ বছরের রাজনীতি এই চার-চাকার রথের এক যৌথ পরীক্ষাগার। আমরা যদি এই চারটি চাকাকে একসঙ্গে না দেখি, তাহলে হয়তো বুঝতে পারব না কেন একজন মানুষ একই সঙ্গে তার ভাষা হারাচ্ছে, তার শরীরের উপর অধিকার হারাচ্ছে, তার ভোট হারাচ্ছে এবং তার সম্পদ বা আর্থিক অবনমন হচ্ছে বা মানুষ অর্থাভাবে অনিরাপত্তায় ঢুকে পড়ছে। ধনী স্বচ্ছল দের তুলনায় অস্বচ্ছলদের ব্যবধান বেড়েই চলেছে।
প্রথম চাকা হলো শব্দের রাজনীতি। ভারতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত, সবচেয়ে বেশি ক্ষয়প্রাপ্ত, সবচেয়ে বেশি অপব্যবহৃত শব্দটি হলো 'ফ্যাসিবাদ'। শব্দটির জন্ম ইতালিতে, লাতিন ফাসেস থেকে, যার অর্থ একগুচ্ছ লাঠি একসঙ্গে বাঁধা। মুসোলিনির হাতে এটি হয়ে উঠল একটি রাষ্ট্রীয় মতাদর্শ। কিন্তু ভারতে তার পুনর্জন্ম হলো একটি গালাগালি হিসেবে, একটি ব্রহ্মাস্ত্র হিসেবে, যেটা ছুঁড়লে আর কোনো যুক্তি লাগে না। যিনি ক্ষমতায় নেই, তিনি ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিকে ফ্যাসিবাদী বলেছেন। আর যিনি ক্ষমতায় আছেন, তিনি বিরোধীকে দেশদ্রোহী বলেছেন। এই দুই গালির মাঝখানে আসল ইতিহাসটা হারিয়ে গেছে।
১৯৩০ সালে যখন ইউরোপে মুসোলিনির কালো জামা বাহিনী কুচকাওয়াজ করছে, তখন ভারতে হিন্দু মহাসভার নেতা ডা. বি এস মুঞ্জে ইউরোপ ঘুরে এসে নাসিকে ভোঁসলা মিলিটারি স্কুল বানাচ্ছেন। অন্যদিকে জওহরলাল নেহেরু তার কন্যা ইন্দিরাকে লেখা চিঠিতে বলছেন এই সামরিকীকরণ, এই ইউনিফর্ম, এই কুচকাওয়াজের মধ্যেই ফ্যাসিবাদের ছায়া আছে। তখন থেকেই শুরু। এরপর প্রতিটি দশকে এই 'শব্দ'টি হাতবদল হয়েই চলেছে।
১৯৪৭ এর পর শব্দটির প্রথম বড় রাষ্ট্রীয় ব্যবহার হয় ১৯৫৯ সালে কেরালায়। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম ব্যালটে নির্বাচিত কমিউনিস্ট সরকার, ই এম এস নাম্বুদিরিপাদের সরকারকে যখন ৩৫৬ ধারা দিয়ে ফেলে দেওয়া হলো, তখন কমিউনিস্টরা কংগ্রেসকে ফ্যাসিবাদী বলল। এই ঘটনা থেকেই ভারতের বাম রাজনীতিতে একটি স্থায়ী বয়ান তৈরি হলো - 'কংগ্রেস বিপদে পড়লেই ফ্যাসিবাদী পথ নেয়'।
এই বয়ানের সবচেয়ে জটিল রূপ দেখা যায় নকশালবাড়ি পর্বে। ষাটের দশকের শেষ দিকে ১৯৬৭ সালে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময়ে সিপিআইএম এর দার্জিলিং জেলা কমিটি থেকে চারু মজুমদার, কানু সান্যালরা যখন সিপিআই(এম)-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলেন, তখন তারা সিপিআই(এম)-কে সরাসরি ফ্যাসিবাদী বলেননি, বলেছিলেন 'নব্য সংশোধনবাদী' ও ফ্যাসিবাদের দোসর। জ্যোতি বসু ছিলেন উপ-মুখ্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র সহ সাধারণ প্রশাসন দপ্তরের মন্ত্রী। যাইহোক , নব্য-সংশোধনবাদী ও ফ্যাসিবাদী শব্দবন্ধ দুটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সাধারণ মানুষ এগুলোর অর্থ বোঝেননি। সাধারণ মানুষের কাছে ফ্যাসিবাদ মানে হলো সরাসরি লাঠি, গুলি, জেল। আর সংশোধনবাদী মানে কী? সংশোধনবাদী মানে হলো তত্ত্বের ভাষায়, যে বিপ্লবের কথা বলে বিপ্লবকে ঠেকিয়ে রাখে, সংসদের লোভে বিপ্লবকে বিক্রি করে দেয়। নকশালদের যুক্তি ছিল, সিপিআই(এম) সবে ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছে, সে বিপ্লব ভুলে গেছে, নির্বাচনে জিতে সরকার দখল করলেই বিপ্লব হয়ে যাবে ,তাই এই বিকৃতিতেই পুলিশ দিয়ে কৃষক আন্দোলন দমন করেছে, কৃষককে গুলি করেছে। একদিন যে পুলিশ কংগ্রেসের হয়ে লাঠি চালাতো, পরদিন সেই পুলিশই সিপিআই(এম)-এর হয়ে লাঠি চালাচ্ছে। অতএব সিপিআই(এম) আর কংগ্রেসের মধ্যে কোনো ফারাক নেই, দুজনেই শাসক শ্রেণীর প্রতিনিধি। তাই সিপিআই(এম) সংশোধনবাদী হয়ে সে ফ্যাসিবাদের রাস্তা পরিষ্কার করে দিচ্ছে, অতএব সে ফ্যাসিবাদের দোসর। এই তাত্ত্বিক কূটকচালি সাধারণ কৃষক,শ্রমিক, খেটেখাওয়া মানুষজন বোঝেননি, কিন্তু শব্দটির মুদ্রাস্ফীতি হয়ে গেল শুরু। 'স্বৈরতন্ত্র মানেই ফ্যাসিবাদ' - এই সরলীকরণ শুরু হয়ে গেল।
একই সরলীকরণ করল সিপিআই(এম) নিজেও, কিন্তু উল্টো দিক থেকে। সত্তরের দশকে সিপিআই(এম)-এর দলীয় দলিলে কংগ্রেসকে আধা-ফ্যাসিবাদী বলা হলো। যুক্তি কী? যুক্তি হলো, কংগ্রেস বুর্জোয়া-জমিদার জোটের প্রতিনিধি, সে গণতন্ত্রকে বাইরে থেকে রেখেছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে স্বৈরাচারী। এই আধা-ফ্যাসিবাদ তত্ত্বটি ছিল খুবই সুবিধাজনক। এতে একদিকে কংগ্রেসকে গালাগালি করা যায়, অন্যদিকে কংগ্রেসের সঙ্গে প্রয়োজনে ফ্রন্টও করা যায়, কারণ সে তো পুরো ফ্যাসিবাদী নয়, আধা-ফ্যাসিবাদী। ইতিহাসবিদ গৌতম ভদ্র তার ২০১৫ সালে 'নিম্নবর্গের ইতিহাস চর্চা' সংক্রান্ত এক প্রবন্ধে স্পষ্ট দেখিয়েছেন, "ভারতে বাম রাজনীতিতে এই ধরনের তত্ত্ব অনেক সময়েই বাস্তবতা থেকে বেশি, সাংগঠনিক সুবিধা থেকে তৈরি হয়েছে"। আবার ইতিহাসবিদ রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য ২০১৮ সালে 'মার্কসবাদী পরিভাষা' নিয়ে এক আলোচনায় বলেছেন, "ভারতে মার্কসবাদী পরিভাষা অনেক সময়েই ইউরোপীয় বই থেকে সরাসরি অনুবাদ করা হয়েছে, ভারতীয় বাস্তবতায় তা পরীক্ষা না করেই। 'আধা-ফ্যাসিবাদ' শব্দটিও তাই"।
এই তত্ত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলন। ১৯৭৪ সালে বিহারে যখন ছাত্র, যুবরা বিপুল সংহতিতে জেপির 'সম্পূর্ণ বিপ্লব'-এর ডাকে রাস্তায় নামল, তখন ভারতের রাজনীতির প্রায় সমস্ত বিরোধী বাম ও গণতান্ত্রিক জোট সেই আন্দোলনে যোগ দিল। তখন বিজেপি ছিল না, ছিল জনসংঘ। জনসংঘীরা গণতান্ত্রিকভাবেই ইন্দিরার স্বৈরতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে সমস্ত গণতান্ত্রিক এবং বিরোধী শক্তিদের সাথে এক হয়ে একটি অখন্ড পার্টি 'জনতা পার্টি'তে মিশে গিয়েছিল। জনতা পার্টির ভেতরে জনসংঘ তার আলাদা সত্তা বিলীন করে দিয়েছিল, নিজেদের পতাকা, প্রতীক সব তুলে দিয়ে। পরে সেই জনতা পার্টি ভেঙে গেলে সেখান থেকে আবার বেরিয়ে এসে বিজেপি তৈরি হয়, যার তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি হলো আরএসএস। জনসংঘ যখন ছিল ,তখনও পিছনে আরএসএস ই ছিল। কিন্তু ১৯৭৪-৭৭ পর্বে তারা আলাদা ছিল না, তারা অখন্ড জনতা পার্টির র ভেতরেই ছিল।
এই সময়ে সিপিআই-এর ভূমিকা ছিল সবচেয়ে চমকপ্রদ। সিপিআই ভাবল, জনসংঘ যেহেতু ইতালি বা জার্মানির আদতে ফ্যাসিস্ত দর্শনের বাইরে নয়, তারা হিন্দু রাষ্ট্রের কথা বলে, মুসলমানদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বানাতে চায়, অতএব তারা ফ্যাসিবাদী। তাই জনসংঘীরা যেখানে ঢুকেছে সেই আন্দোলনটাই ফ্যাসিবাদী হয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রতিটি পলিটিক্যাল গ্রুপগুলোকে জনসংঘীদের সহ-মতামতের ধারণাতেই বিচার করা হলো। তাই সিপিআই বলল, জেপির আন্দোলনই ফ্যাসিবাদী, অতএব জেপিও ফ্যাসিবাদের দোসর অতএব ফ্যাসিবাদী। আর যেহেতু জেপি ফ্যাসিবাদী, অতএব ইন্দিরা গান্ধী প্রগতিশীল। এই যুক্তিতে সিপিআই ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থাকেও সমর্থন করল। তারা বলল, আমরা ফ্যাসিবাদী জনসংঘ-জামাত জোটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইন্দিরার পাশে আছি। তখন অন্যদিক থেকে আবার সিপিআই-কে নতুন নামে ভূষিত করা হলো - 'ডানপন্থী কমিউনিস্ট' বলে। আর সিপিআই(এম) নিজেদের পরিচয় দিল বামপন্থী কমিউনিস্ট (সংসদীয়)বলে। তাই, সাধারণ মানুষের কাছে তখন ফ্যাসিবাদ শব্দটি তার তাত্ত্বিক গুরুত্ব হারিয়ে একটি দৈনন্দিন গালিতে পরিণত হলো।
এই গালির রাজনীতি চলল আশি এবং নব্বই দশকেও। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে সিপিআই(এম)-কে লাল ফ্যাসিবাদী বলল, সিপিআই(এম) বিজেপিকে গেরুয়া ফ্যাসিবাদী বলল। এরপর ২০১৪ সালের পর থেকে সিপিআই(এম) বিজেপি সম্পর্কে আরেকটি নতুন শব্দ চালু করল - 'নয়া-ফ্যাসিবাদ'। প্রশ্ন হলো নয়া-ফ্যাসিবাদ কী? পুরনো ফ্যাসিবাদের সঙ্গে এর তফাত কী? এর কোনো স্পষ্ট উত্তর দলীয় দলিলে নেই। ফলে সংজ্ঞা ক্রমশ ঝাপসা হতে থাকে।
আসল ঘটনাটি কী? আসল ঘটনাটি হলো ফ্যাসিবাদ ভারতে সত্যিই যদি আসে, তার চেহারা এইসব সংজ্ঞার সঙ্গে মেলে না বলে আমরা তাকে চিনতে পারছি না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হুয়ান লিঞ্জ তার 'টোটালিটারিয়ান অ্যান্ড অথোরিটারিয়ান রেজিমস' বইতে দেখিয়েছেন, স্বৈরতন্ত্রের মূল লক্ষ্য হলো ক্ষমতা ধরে রাখা। তার কোনো বড় মতাদর্শ নাও থাকতে পারে। সে জনগণকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে চায়। সে জনগণ কে বলতে চায় , জনগণের ত রাজনীতি করার দরকার নেই; বরং সে ত নিজেই আছে জনগণের দেখভালের জন্যে। জনগণ যেন সমর্থন করে। অনেকটা চোখ রাঙিয়ে অনুরোধ করার মতন। কাজেকাজেই সে দমন করে গোপনে। ইতিহাসবিদ রবার্ট প্যাক্সটন তার 'দ্য অ্যানাটমি অফ ফ্যাসিজম' বইতে দেখিয়েছেন, ফ্যাসিবাদ ঠিক উল্টো কাজ করে। ফ্যাসিবাদের একটি জোরালো মতাদর্শ আছে। সে জনগণকে ঘরে ঢুকিয়ে দেয় না, রাস্তায় নামায়। বিশাল মিছিল, পতাকা, স্লোগান, ইউনিফর্ম দিয়ে সে জনগণকে আবেগে ভাসায়। সে আসলে একটা পছন্দসই জাতির মস্তিষ্ক দখল নিতে চায়। তার চলাফেরা, তার সংষ্কৃতি, পছন্দ , বেশভূষা ,খাদ্যরীতি সবকিছুর। উমবের্তো ইকো তার 'উর-ফ্যাসিজম' প্রবন্ধে ফ্যাসিবাদের চোদ্দটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন, যার মধ্যে একটি হলো ভিন্ন মতের প্রতি ঘৃণা এবং যুদ্ধের প্রতি প্রেম। জার্মান দার্শনিক হান্না আরেন্ট তার 'দ্য অরিজিনস অফ টোটালিটারিয়ানিজম' বইতে দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি কাল্পনিক শত্রু তৈরি করে সমাজকে একজোট করা হয়। গ্রেট ব্রিটেনের অক্সফোর্ড ব্রুকস বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক রজার গ্রিফিন বলেছেন, 'ফ্যাসিবাদের মূল হলো প্যালিনজেনেসিস বা জাতির পুনর্জন্মের মিথ। অর্থাৎ জাতি অধঃপতিত হয়েছে, তাকে আবার পবিত্র অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে'।
এই প্যালিনজেনেটিক মিথটি বোঝা খুব জরুরি। ফ্যাসিবাদ কখনো বলে না আমরা নতুন কিছু বানাচ্ছি। সে বলে আমরা পুরনো গৌরব ফিরিয়ে আনছি। এবং এই ফিরিয়ে আনার জন্য যা যা করতে হবে তা বৈধ। এই বৈধতার জন্য ফ্যাসিবাদ একটি ধর্মীয় আবরণ ব্যবহার করে। এবং শাসক নিজেকে ঈশ্বরের দূত বলে জনমানসে অভিহিত করে। সে বলে আমি অবতার, আমি ঈশ্বর প্রেরিত। এবং দরিদ্র বা প্রান্তিক মানুষ বা মহিলাদের অবদমনটা ঈশ্বর প্রেরিত সমাজের ভাল করার জন্যই ঘটে থাকে। অর্থাৎ গরীবরা গরীব থাকবে, মহিলা পুরুষতন্ত্রের অধীনেই চিরকাল থাকবে আর তাতে সমাজ ভাল থাকে, সমাজের স্বাস্থ্য ভাল থাকে। এই ভঙ্গীটাই আনার চেষ্টা করেছিল হিটলার, মুসোলিনি। হিটলার বলেছিল ইহুদিরা সমাজের রোগ, মুসোলিনি বলেছিল দুর্বলরা সমাজের বোঝা। ভারতেও এর অদৃশ্য ছায়া দেখা যাচ্ছে। প্রান্তিকদের অবদমিত রাখা ও সমাজে উঁচুনিচু ভেদাভেদ রাখা এটা নাকি দেবতার কাছে ভাল ও সমাজের স্বাস্থ্যের পক্ষেও ভাল। এই যুক্তিতেই বুলডোজার দিয়ে দোকান ভাঙা হয়, এই যুক্তিতেই মহিলাদের পোশাক নিয়ে ফতোয়া দেওয়া হয়, এই যুক্তিতেই বলা হয় গরীবদের বিনামূল্যে রেশন দিলেই হলো, তাদের অধিকার দিতে হবে না। অবশ্য কাগজে কলমে তারা দেশবাসী না হলে কিছুই পাবে না।
আধুনিক আরতে ফ্যাসিবাদের তিনটি পর্ব ঘটে গেছে। প্রথম পর্ব ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর। বাবরি মসজিদ ধ্বংস। এটি ছিল ভারতে ফ্যাসিবাদের প্রথম প্রকাশ্য মহড়া। রাষ্ট্র বলল আমরা মসজিদ রক্ষা করতে পারিনি, কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তা দেখল। হাজার হাজার উন্মত্ত জনতা তাদের পূজোনীয় নেতাদের প্ররোচনায় আইন হাতে তুলে নিল এবং সেই আইন হাতে তুলে নেওয়াকে 'বীরত্ব' বলা হলো। এটাই ফ্যাসিবাদের প্রথম লক্ষণ - সহিংসতাকে উদযাপন করা, তাকে লজ্জা নয়, গৌরব বলে মনে করা।
দ্বিতীয় পর্ব ২০০২ সালের গুজরাত দাঙ্গা।গুজরাত রাজ্য হলেও সে সেই রাজ্যের সরকার প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে যেন রাষ্ট্রের ভূমিকা পালন করেছে তার আচরণে । ভারত রাষ্ট্র কিন্তু তখন গুজরাট দাঙ্গাকে বৈধতা দেয়নি, মান্যতা দেয়নি যদিও তখন বিজেপির অটল বিহারী বাজপেয়ীর শাসনে ছিল ভারত রাষ্ট্র । এই প্রসঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী তৎকালীন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রীকে ভাববাচ্যে বলেছিলেন 'রাজধর্ম পালন করুন'। এই বাক্যটি ইতিহাসে থেকে গেছে, কারণ অটল বা আদবানীর মধ্যে ততটুকুও যে উদারনীতির অবশিষ্ট ছিল হয়তোবা, বা, উপরের একটি পালিশ ছিল , তা পরবর্তীকালে বিজেপি সারা ভারতে সেই উদারনীতি বা পালিশ থেকেও বিচ্যুত হয়েছে। এবং ধীরে ধীরে বয়সজনিত কারণ দেখিয়ে আসলে বাজপেয়ী ও আদবানীদের পুরোন ধ্যানধারণাকে 'ব্রাত্য' বলে মনে করে তাদের মতামত নেবার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেছে। তাই,ফ্যাসিবাদ আর সুপ্ত অবস্থানে থাকল না - সে প্রকট ও তার কদর্য রূপ প্রকাশ্যে এসে গেলো। পরবর্তীতে তারা মনে করলো 'রাজ'-ই ধর্ম , 'রাজধর্ম' নয়। যাইহোক, গুজরাট দাঙ্গার পরে অভিযুক্ত ব্যক্তিরাই নির্বাচনে বিপুল ভোটে জিতলেন। অর্থাৎ দাঙ্গা করলে ভোট বাড়ে - এই নতুন রাজনৈতিক অঙ্কটি প্রতিষ্ঠিত হলো।
তৃতীয় পর্বের নাম SIR বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন। এই পর্বটি সবচেয়ে সূক্ষ্ম এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক। এখানে আর প্রকাশ্যে মসজিদ ভাঙতে হয় না, প্রকাশ্যে দাঙ্গা করতে হয় না। এখন নাগরিকের তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়ে দেওয়া যায়। কেন বাদ গেলো তা নাকি এ্যালগরিদম্ ; যার মর্মার্থ সাধারণ মানুষ কেন, পন্ডিতেরাও বুঝতে পারেন নি। বেশ কিছু ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে কাউকে অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, মৃত বলে ঘোষণা করা যায়। যে মানুষটি বাজারে সবজি বিক্রি করছে, সে কাগজে মৃত দেখা গেল। এই মৃত ঘোষণা করার ক্ষমতাই হলো আধুনিক ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা। কারণ এর মাধ্যমে 'অপর' তৈরি করা যায়। 'অপর' মানে হলো অন্য। সেই অন্য যে আর নাগরিক নয়, সে অনুপ্রবেশকারী, সে রোহিঙ্গা, সে বাংলাদেশি। একবার 'অপর' তৈরি করতে পারলে তার বিরুদ্ধে যে কোনো সহিংসতা বৈধ হয়ে যায়। আগে লোকে লজ্জা পেতো মিথ্যে বলতে, এখন গর্ব করে মিথ্যে বলা যায় , বুক ফুলিয়ে বলা যায়, টিভি ক্যামেরার সামনে।
এই 'অপর' তৈরির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সহিংসতার উদযাপন। ২০২০ সালের দিল্লি নির্বাচনের আগে এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রকাশ্য মিছিলে স্লোগান দিলেন - 'গোলি মারো শালোকো'। এই স্লোগানটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আগে দাঙ্গা হতো রাতের অন্ধকারে, এখন দাঙ্গার হুমকি দেওয়া হয় দিনের আলোয় মাইকে। আগে খুন করে লুকিয়ে পড়তে হতো, এখন খুন করে ভিডিও তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। গরীব বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিককে প্রবাসে ধরে প্রকাশ্যে পেটাতে হয়, তারপর তার মুখের উপর পেচ্ছাব করে সেটাকে খেতে জোর করা হয় ,অর্থাৎ, সহিংসতা আর কোনো ঢাকঢাক গুড়গুড় নেই, সে নেমে এসেছে উদযাপনে। এটাই ফ্যাসিবাদের মূল বৈশিষ্ট্য যা স্বৈরতন্ত্র থেকে তাকে আলাদা করে। স্বৈরতন্ত্র হিংসা করে গোপনে, ফ্যাসিবাদ হিংসা করে প্রকাশ্যে এবং তাকে উৎসব বানায়।
এখানেই দ্বিতীয় প্রযুক্তি, অর্থাৎ জৈব-রাজনীতি বা বায়োপলিটিক্স এসে মেশে। মিশেল ফুকো তার 'দ্য বার্থ অফ বায়োপলিটিক্স'(১৯৭৮-৭৯) প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, আধুনিক রাষ্ট্র কীভাবে জনসংখ্যার জন্ম, মৃত্যু, স্বাস্থ্য, রোগকে শাসনের হাতিয়ার করে তোলে। রাষ্ট্র আর শুধু আইন দিয়ে শাসন করে না, সে শরীর দিয়ে শাসন করে। ইতালীয় দার্শনিক জর্জিও আগাম্বেন 'স্টেট অফ এক্সেপশন' এ বলেছেন 'ব্যতিক্রমী অবস্থা'। তিনি বলেছেন, হিটলারের জার্মানি থেকে শুরু করে ফ্যাসিবাদে কীভাবে জরুরি অবস্থা ঘোষনা করে বা না করেও জরুরি অবস্থা তৈরি করে গণতান্ত্রিক অধিকার স্থগিত করা হয় এবং ধীরে ধীরে সেটাকেই স্বাভাবিক করা হয় । কোভিডের সময়ে আমরা দেখেছি কীভাবে জনস্বাস্থ্যের নামে দেহকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটি মহামারী চুক্তির প্রস্তাব করল, জাতীয় সরকারগুলি একটি জনস্বাস্থ্য বিল আনল, এবং রাতারাতি জনস্বাস্থ্যের নামে লোকস্বাস্থ্যকে স্থগিত করা হলো। যুক্তি ছিল খুব সরল - 'স্বাস্থ্য যদি না থাকে, স্বাধীনতা দিয়ে কী হবে'?
এই যুক্তি শুনতে খুব মানবিক লাগে, কিন্তু এর ভেতরে একটি ফাঁদ আছে। এই যুক্তি ধরে নেয় যে স্বাস্থ্য এবং স্বাধীনতা পরস্পরবিরোধী, একটি বেছে নিতে হবে। অথচ জনস্বাস্থ্যের মূল দর্শন বলে, স্বাস্থ্য মানে শুধু রোগের অনুপস্থিতি নয়, জনস্বাস্থ্য মানে 'লোকস্বাস্থ্য', শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিকভাবে ভাল থাকা।
জনস্বাস্থ্য মানে জনমানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্য, এ শুধু বিশেষ কোনো ব্যাধিচর্চার বিষয় না। এখানে জনস্বার্থে ব্যধির চটজলদি বিধানে লাভ আর ক্ষতি দুইই ভাবতে হবে, শুধু আজকের না আগামীকালের কথাও। জনমানুষের মধ্যে নানান বৈষম্য আছে, তাই কোনো নীতির ফলে যদি ব্যাধির ভার সচ্ছলদের থেকে অসচ্ছলদের কাঁধে গিয়ে বর্তায় তবে তা ভুল। তাই, এক বিশ্ব এক স্বাস্থ্য রচনার নীতি গ্রহণযোগ্য না, কেননা তা গণতান্ত্রিক ভাবনার বিপরীত, তাতে লোকস্বাস্থ্যের বৈশিষ্ট্য ক্ষুণ্ণ হয় এবং দমননীতি প্রয়োগে নাগরিক অধিকার ক্ষর্ব হয়। কোনো ব্যাধিকে জোর করে নির্মূল করতে গেলে যে লাভের চেয়ে ক্ষতির ভার বাড়ে তার প্রমাণ কোভিড পর্ব। উপসর্গহীন মানুষকে জোর করে রোগী বানানো ও পরীক্ষা করানো অন্যায়, অবৈজ্ঞানিক যা কোনভাবেই কমিউনিটি মেডিসিন বা সামুদায়িক চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা মান্যতা দেয় না। লোকস্বাস্থ্য দাঁড়িয়ে থাকে পারস্পরিক আস্থার উপর, ভয় দেখিয়ে বা আতঙ্ক নির্মাণ করে নয়, সচেতন করে। যা অজানা তাকে জানা বলে ভান করা জনস্বার্থের পরিপন্থী। লোকস্বাস্থ্য নিয়ে বিতর্ক থাকলেই লোকসমাজ প্রাণচঞ্চল থাকে, তাই বিতর্কের অধিকার কোনো আইন করে ছিনিয়ে নেওয়া যায় না। এবং পরিশেষে শিক্ষার সঙ্গে স্বাস্থ্যের সম্পর্ক ওতপ্রোত।
বলা বাহুল্য এই মূলনীতিগুলো কোভিডে মানা হয়নি। নাগরিককে রোগীতে পরিণত করা হলো। রোগীর সম্মতি বা ইনফর্মড কনসেন্ট তখন একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হলো। নুরেমবার্গ থেকে হেলসিঙ্কি পর্যন্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানের মূল নীতি মানুষের উপর যাই প্রয়োগ করা হোক না কেন তা যেন কখনোই 'ডু নো হার্ম' নীতি ব্যাহত না হয়। কিন্তু কোভিডে 'ডু নো হার্ম' স্থগিত হয়ে গেল। ফুকো ঠিক যে জায়গায় সাবধান করেছিলেন, সেখানেই আমরা পড়লাম - যখন রাষ্ট্র বলে তোমার শরীরের ওপর তোমার অধিকার নেই, বৃহত্তর স্বার্থে তোমাকে মেনে নিতে হবে, তখন সে আসলে নাগরিককে বায়োলজিক্যাল প্রজায় পরিণত করে।
এই জৈব-রাজনীতিতে কারা লাভবান হলো? লাভবান হলো বড় ওষুধ কোম্পানি, বড় হাসপাতাল, বড় ডেটা কোম্পানি। তারা হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করল। আর কারা নিঃস্ব হলো? নিঃস্ব হলো ছোট দোকানদার, পরিযায়ী শ্রমিক, অটো চালক, স্কুল শিক্ষক। যে মানুষটি লকডাউনে হেঁটে বাড়ি ফিরল, সে আজও নিঃস্ব। যে শিশুটি দু বছর স্কুলে যেতে পারল না, তার ক্ষতি কে পূরণ করবে? এই প্রশ্নগুলো আজ আর কেউ করে না, কারণ আমরা সবাই ভুলে গেছি। ভুলে যাওয়াটাই হলো এই শাসনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
এবং এই ভুলে যাওয়ার আড়ালেই চলছে চতুর্থ প্রযুক্তি - অর্থের প্রযুক্তি। বিশ্ব রাজনীতিতে ফ্যাসিবাদ আবার নতুনভাবে কড়া নাড়ছে, কারণ ক্রোনি ক্যাপিটালিস্টরা সম্পদ চুরি করেই যাচ্ছে, করেই যাচ্ছে, আর তাদের ঋণ খেলাপ হয়েই যাচ্ছে, হয়েই যাচ্ছে। ভারতেও একই ছবি। হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপ হচ্ছে, ব্যাংকের টাকা নিয়ে কেউ বিদেশে পালাচ্ছে, কেউ দেশেই বহাল তবিয়তে আছে। কিন্তু উপরিতলে আলোচনা হচ্ছে হিন্দু মুসলমান দ্বন্দ্ব নিয়ে, 'অপর' নিয়ে, কে বাংলাদেশি, কে রোহিঙ্গা তাই নিয়ে। আসলে এই ধর্মীয় দ্বন্দ্ব হলো ধনীদের আড়াল করার পর্দা। মানুষ যখন হিন্দু মুসলমান নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, তখন কেউ প্রশ্ন করবে না যে কার ঋণ মকুব হলো, কার সম্পদ বাড়ল। ফ্যাসিবাদের এই অর্থনৈতিক দিকটি সবচেয়ে কম আলোচিত, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ডেভিড হার্ভে ২০০৫ সালে 'এ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ নিওলিবারিলিজম' এ দেখিয়েছেন, নয়া-উদারবাদ যখন সংকটে পড়ে, তখন সে ফ্যাসিবাদকে আশ্রয় করে। কারণ ফ্যাসিবাদই পারে জনগণের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই চারটি প্রযুক্তি একসঙ্গে কাজ করেছে। প্রথমটি শব্দের প্রযুক্তি। দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলকে ফ্যাসিবাদী বলা হয়েছে, ফলে বিজেপিকে আর ফ্যাসিবাদী বলে আলাদা করা যায়নি। মানুষ ভেবেছে সবাই যখন ফ্যাসিবাদী, তখন কেউই তাহলে ফ্যাসিবাদী নয়। এই বিভ্রান্তি থেকেই স্লোগান এসেছে - 'এবারে রাম, পরে বাম'। এছাড়াও বামেদের ৩৪ বছরের দুর্গ চূর্ণবিচূর্ণ করেছেন যিনি তিনি একজন কলোনি থেকে উঠে আসা? এই পুরুষতান্ত্রিক ব্যাধী তাড়িত করেছে যাদেরকে - তাদের কাছে এইমুহুর্তে তৃণমূলের অপশাসনটাই মুখ্য বিষয় কারণ সেটা ঘটতে দেখা যাচ্ছে, অন্যরূপে কে আসবে তা তো পশ্চিমবঙ্গে ঘটতে দেখা যাচ্ছে না। তাই প্রকৃত ঘটনা যাইহোক তা ভার্চুয়াল হয়ে গেছে বামপন্থী ভোটারদের কাছে। তাই,আপাতত বিজেপিকে দিয়ে তৃণমূলকে হারাও ,এই ছিল তাথাকথিত বামেদের প্রকাশ্যে না বললেও মনের কথা।
এরপর এসেছে দেহের প্রযুক্তি। ২.৪ লক্ষ কেন্দ্রীয় বাহিনী, সাঁজোয়া গাড়ি, উত্তর প্রদেশ থেকে আনা এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট পুলিশের এক কর্তা। নির্বাচনকে একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করা।
শেষে এসেছে গণনার প্রযুক্তি। নব্বই লক্ষ নাম বাদ, পাঁচ লক্ষ নাম যোগ, ভবানীপুরের মতো কেন্দ্রে বাইশ শতাংশ ভোটার কমে যাওয়া। যে কেন্দ্রে একটি দল বাইশ শতাংশ পিছিয়ে ছিল, সে সেখানে তেত্রিশ শতাংশ এগিয়ে গেল। এই অঙ্ক কি স্বাভাবিক? পরিসংখ্যান বলছে না, এটি লক্ষ্যভিত্তিক বাদ দেওয়া, যা মুসলিম-প্রধান, দলিত এবং মহিলা ভোটারদের ওপর বেশি পড়েছে। যে মহিলা সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেয়, তার নামটাই সবচেয়ে আগে বাদ যায়, কারণ সে-ই হলো নতুন 'অপর'।
ভারতে আগে ফ্যাসিবাদ শব্দটি এতবার, এত হালকাভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যে ফ্যাসিবাদ যখন সত্যিসত্যিই তার রূপ নিয়ে আসে, তখন তাকে চেনার ভাষা আমাদের কাছে নেই। আমরা আগে প্রতিটি পুলিশি অত্যাচারকে ফ্যাসিবাদ বলেছি, প্রতিটি ভোট কারচুপিকে ফ্যাসিবাদ বলেছি। ফলে এখন যখন বাবরি থেকে গুজরাত দাঙ্গা থেকে SIR পর্যন্ত একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া চলছে, যেখানে একটি সম্প্রদায়কে ধীরে ধীরে 'অপর' বানানো হচ্ছে, তাদের নাগরিকত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে প্রকাশ্যে উদযাপন করা হচ্ছে, এবং একই সঙ্গে সেই উদযাপনের আড়ালে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হচ্ছে, তখন আমরা তাকে আর আলাদা করে চিহ্নিত করতে পারছি না। এটাই হলো শব্দের অতিস্ফীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি। যখন সবাইকে ফ্যাসিবাদী বলা হয়, তখন আসল ফ্যাসিবাদীকে আর চেনা যায় না।
আন্তোনিও গ্রামশি তার প্রিজন নোটবুকস(১৯২৯ - ১৯৩৫) , যখন মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট সরকার তাঁকে জেলে বন্দী করে রেখেছিল,
আধিপত্যবাদ বোঝাতে গিয়ে বলেছিলেন,
ক্ষমতা শুধু পুলিশ-সেনা দিয়ে টেকে না। শাসক শ্রেণী মানুষের মন জয় করে ফেলে — শিক্ষা, ধর্ম, মিডিয়া, সংস্কৃতি দিয়ে। মানুষ তখন নিজে থেকেই শাসকের ভাবনাটাকেই নিজের ভাবনা বলে মনে করে।
ফ্যাসিবাদ বোঝার ক্ষেত্রে এটা খুব জরুরি একটা সূত্র। উনি বলেছিলেন, পুরনো ব্যবস্থা মরছে, নতুন ব্যবস্থা জন্মাতে পারছে না, এই মধ্যবর্তী সময়ে নানা রকম সমাজে রোগের লক্ষণ দেখা যায়। ভারতের বর্তমান সময়টা সেই মধ্যবর্তী সময়। পুরনো দল-ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। এই সংকটের ফাঁক দিয়েই নতুন রাজনীতি আসছে, যা ভোটকে ব্যবহার করে, কিন্তু ভোটের পরে গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে দেয় না। যা স্বাস্থ্যের নামে দেহকে নিয়ন্ত্রণ করে, নিরাপত্তার নামে ভোটকে নিয়ন্ত্রণ করে, আর জাতীয়তাবাদের নামে শব্দকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই আজকের সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো শব্দটিকে উদ্ধার করা। প্রতিটি স্বৈরাচারী আচরণ ফ্যাসিবাদ নয়। ফ্যাসিবাদ হলো সেই ব্যবস্থা যেখানে 'অপর' তৈরি করা হয়, 'অপর'কে নাগরিকত্ব থেকে বাদ দেওয়া হয়, সেই বাদ দেওয়াকে জনগণকে দিয়ে উদযাপন করানো হয়, এবং সেই উদযাপনের আড়ালে অর্থনৈতিক লুট চালানো হয়। আর এই পুরো প্রক্রিয়াকে পবিত্র করা হয় ঈশ্বরের নামে, পুনর্জন্মের নামে, জাতির স্বাস্থ্যের নামে। শাসক হাসে, কারণ সে জানে, যে জাতি তার মৃত ভোটারদের আত্মজীবনী পড়তে পারে না, সে জাতি তার জীবিত লুটেরাদের হিসাবও রাখতে পারবে না।
তথ্যসূত্র
____
১. কুনাল পুরোহিত ও আশনা আজমেরা, দ্য ওয়্যার, ১২ মে ২০২৬; দ্বৈপায়ন ঘোষ ও সুমন মন্ডল, টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ১৪ এপ্রিল ২০২৬।
২. দ্য ওয়্যার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫; সঞ্জয় বসাক, ডেকান ক্রনিকল, ৫ মে ২০২৬।
৩. রিমঝিম সিং, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ৬ আগস্ট ২০২৫; শুভাশিস দে, দ্য ইন্ডিয়া ফোরাম, ১২ জুন ২০২৬; ভানু যোশী ও নীলাঞ্জন সরকার, http://Scroll.in, ১৬ জুন ২০২৬।
৪. Juan J. Linz, Totalitarian and Authoritarian Regimes (1975) - স্বৈরতন্ত্রের সংজ্ঞা, জনগণকে অ-রাজনীতিকরণ; Robert O. Paxton, The Anatomy of Fascism (2004) - ফ্যাসিবাদের পাঁচটি ধাপ, জনগণকে রাজনীতিকরণ; Umberto Eco, Ur-Fascism (1995) - চোদ্দটি বৈশিষ্ট্য, মিথ্যা বীরত্ব; Hannah Arendt, The Origins of Totalitarianism (1951) - 'অপর' তৈরির কৌশল; Roger Griffin, The Nature of Fascism (1991) - প্যালিনজেনেটিক মিথ, জাতির পুনর্জন্ম; Antonio Gramsci, Prison Notebooks - অন্তর্বর্তী সময়ের সংকট; Michel Foucault, The Birth of Biopolitics (1978) - দেহের উপর ক্ষমতা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, বায়োপলিটিক্স; Giorgio Agamben, State of Exception (2005) - জরুরি অবস্থা কীভাবে নিয়ম হয়; David Harvey, A Brief History of Neoliberalism - ক্রোনি ক্যাপিটালিজম ও ফ্যাসিবাদের যোগ; Gautam Bhadra, Nimnoborgo Itihas Charcha, Subarnarekha 2015 - বাম তত্ত্বের সাংগঠনিক সুবিধাবাদ; Ramkrishna Bhattacharya, Marxist Paribhasha, Setu Patrika 2018 - ইউরোপীয় পরিভাষার অনুবাদ সমস্যা; Charu Mazumdar, Collected Writings; CPI(M) Documents on Semi-Fascism 1968-72; WHO Pandemic Treaty Draft 2024; National Public Health Bill 2023; GRAPH - Group for Research on Public Health Principles, জনস্বাস্থ্যের মূলনীতি সংক্রান্ত দলিল।