এ হেন হরিপদবাবুর একটা বিশেষ গুণ আছে। পৃথিবীর যে-কোনও জটিল ঘটনার তিনি সহজ ব্যাখ্যা করে দিতে পারেন। পাড়ার মুদি দোকানে চিনি নেই—বিশ্বপুঁজির চক্রান্ত। পাশের বাড়ির বিড়াল তিনদিন ধরে ডাকছে—বন্যপ্রাণী সঙ্কট। একদিন নিজের ছাতা হারালেন। বললেন, “এটা নিছক ছাতা চুরি নয়, এটা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র গণতন্ত্রের ওপর আঘাত।”
সেদিন বাজার থেকে ফিরছিলাম। হাতে পটল-টমেটো, আর মাথায় হালকা অন্ধকার। মোড়ে হরিপদবাবু আটকালেন। চোখে সেই জ্যোতি—আজই দেশ শেষ শেষ হয়ে যাবে আচমকা হরিপদ বাবু আমাকে বললেন বললেন, “তিনটে বড় ভুল হয়ে গেছে।”
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম তিনটে বড় বড় ভুল হয়ে গেছে ? উনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন হ্যাঁ তিনটে বিশাল বড় ভুল হয়ে গেছে
আমি চুপ করে দাঁড়ালাম। তিনি বললেন, “প্রথম ভুল মানুষকে বোকা ভাবা ঠিক নয়। দ্বিতীয় ভুল—সবাইকে খুশি করতে গিয়ে কাউকেই খুশি করতে না পারা। আর তিন নম্বর ভুল—ফাঁদ চিনতে না পারা।” হরিপদ বাবুর মুখ দেখে এই মারাত্মক তত্ত্ব গুলো শোনার পর দেখলাম আর দেরি করা ঠিক হবে না আজকে ছুটির দিন আমরা সোজা চলে গেলাম ‘মা তারা টি স্টল’-এ। পাড়ার ভাষায়—মন্ত্রিসভা। নিতাই আমাদের চা দেয়, বাকিরা দেশ চালায়। হাজির নির্মলবাবু, গণেশ মাছওয়ালা, ভীম।
হরিপদবাবু বললেন, “মানুষকে বোকা ভাবা সবচেয়ে বড় ভুল। অন্যায় হলে মানুষ চুপ করে থাকে, কিন্তু ভুলে যায় না। অপমান জমা রাখে। মনে রাখবেন যে অত্যাচার করে সে ভুলে যায় কিন্তু যে অত্যাচারিত হয় সে কখনো ভুলতে পারে না”
নির্মলবাবু চশমা নামিয়ে বললেন, “মানে সুদে-আসলে ফেরত দেয়?”
হরিপদবাবু মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, “ একদম ঠিক ধরেছে নির্মল বাবু মানুষ ঠিক সময়ে, ঠিক জায়গায় সুদে আসলে ফেরত দেয়।”
চা এল। হরিপদবাবু বললেন, “দ্বিতীয় ভুল—সবাইকে খুশি করতে যাওয়া। একটু ধর্ম, একটু সেকুলার, একটু এই, একটু ওই—শেষে দাঁড়ায় কী? মিক্সড ভেজিটেবল তরকারি।”
ভীম হেসে বলল, “আমরা তো সবই সবকিছু খাই দাদা।”হরিপদবাবু বললেন, “খাওয়া আর বিশ্বাস এক জিনিস নয়। পেট অনেক কিছু মানে, কিন্তু ভোট দেওয়ার সময় মানুষের মাথায় আলাদা অঙ্ক। ”
হরিপদ বাবু আমাদের দিকেএকটু ঝুঁকে এলেন। বললেন, “তৃতীয় ভুল—ফাঁদ না চেনা। তালিকায় নাম নেই, কাগজের জট এই ধরুন এসআইআর—এগুলো নিছক গাফিলতি নয়। এগুলোই এখন কাগুজে বাঘ হয়ে আপনার ঘাড়-মটকাতে এসেছে।”
নিতাই ও সুযোগ বুঝে সুর মিলিয়ে বলল, “আমার খুড়তুতো ভাই নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে ঘুরছে।”
কয়েক সেকেন্ড চুপ। আমি বুঝতে পারলাম সত্যি কথা খুব ছোট হয়, তাই বেশি লাগে।
ক্লাবের ভেতরে পটলা বসে ছিল। বেকার, কিন্তু ব্যস্ত খুব। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “এ পটলা তুই কোন দলে?”
সে বলল, “উন্নয়নের দলে।”
আমি বললাম“কোথায় উন্নয়ন আর কারই বা উন্নয়ন?”
পাল্টা পটলায় হাসতে হাসতে বলল, “আমার উন্নয়ন।”
পটলা আরো বলতে লাগলো, “শুনুন দাদা ভোট এখন মতাদর্শ নয়, পুরোটাই ম্যানেজমেন্ট। ভোটের দিন ঘোষণা হওয়ার থেকে ভোট পড়া পর্যন্ত সবটাই ম্যানেজমেন্ট অফিসের কারসাজি কোন নেতা কোথায় দাঁড়াবে কি বলবে? কখন বলবে? এমনকি কোন কর্মী কোথায় থাকবে কোন বুথে থাকবে? মিছিলের সামনে কে থাকবে কারা কারা বাইক চালাবে ভোটের দিন কে বুড়ো মানুষ নিয়ে আসবে সব আগে থেকে অফিসের হাত ধরে ঠিক করা থাকে আর ভোটের দিন যারা ভোট করাতে পারবে তারাই জিতবে।।আর দেখছেন না সব পার্টি কেমন আইপ্যাক এর মতন টিম রাখছে।"
আমি আমি বলতে শুরু করলাম “ কিন্তু সাধারণ মানুষ।.. ” পটলা আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল “সাধারণ মানুষ শালা সব বোঝে। যে মাল দেবে সাধারণ মানুষ তার তাইতো ভোটের আগে থেকে ভোটের দিন পর্যন্ত আমরা ঘিরে ঘিরে রাখি।”
এই ‘আমরা’ শব্দটা শুনে আমারঅদ্ভুত ঠান্ডা লাগল। কারণ গণতন্ত্রে আমরা এই ছোট্ট শব্দটাই মাঝে মাঝে সবচেয়ে বড় হেঁয়ালি শুনতে লাগে।
দুপুরে হরিপদবাবুর বাড়ি। হরিপদ বাবু স্ত্রী শৈলবালাদেবী ভাত বাড়ছেন। হরিপদবাবু বলছেন, “বুঝলে শৈল এবার আর পুরনো প্রতিশ্রুতিতে কোনো কাজ হবে না। মানুষের মনে অসংখ্য প্রশ্ন ”
শৈলবালা দেবী থালা নামিয়ে বললেন, “মানুষ অনেকদিন ধরেই প্রশ্ন করছে। কিন্তু শুনছে কে”তিনি থামলেন না। বললেন, জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে গ্যাসের দাম পেট্রোলের দাম বাড়ছে, সংসারের কষ্ট —এই বাস্তব টা না বুঝলে রাজনীতি বোঝা যায় না।”
হরিপদ বাবু চুপ। কারণ হরিপদ বাবু জানেন এই বাড়ির আসল বিরোধী দল একজনই— তাঁর স্ত্রী শৈলবালা দেবী।
ভোট উপলক্ষে পাড়ায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হল—“গণতন্ত্র ও গীতাঞ্জলি সন্ধ্যা”। নেতা এলেন। এবার বক্তৃতা দেওয়ার পালা সবশেষে নেতা বারবার করে বললেন, “আমরা উন্নয়ন করেছি।”
পেছন থেকে কেউ বলল, “কোথায় উন্নয়ন?”
নেতা বললেন, “সব জায়গায়।”
হরিপদ বাবু ফিসফিস করে বললেন, “যেখানে দেখা যাচ্ছে না, সেখানেই বেশি হয়েছে।”
ভোটের আগের দিনগুলোতে পাড়া ভীষণ ব্যস্ত। ভীমকে সকালে গেরুয়া, বিকেলে সবুজ, রাতে লাল পতাকার তলায় দেখলাম।
বললাম, “তুই কীসের প্রতীক?”
সে বলল, “আমি জোট রাজনীতির।”
ভোটের দিন লাইন পড়েছে। বয়স্কা মহিলারা দাঁড়িয়ে, যুবকেরা বাইক নিয়ে ঘুরছে, পটলার চোখে হিসেব।
হরিপদ বাবু ধুতি পরে বেরিয়েছেন। বললেন, “সব ভোট এক রকমের হয় নারে। যেমন কিছু মানুষ ভোট দেয় কিছু পাওয়ার আশায়, কিছু মানুষ আবার ভোট দেয় নেতা দের ওপর রাগ করে, কিছু ভোট আবার হিসেব বুঝে নেওয়ার ও একটা ব্যাপার আছে। আর কিছু ভোটার আবার শুধু বলে—আপনাদের উপর আর ভরসা নেই।”
সন্ধে নামল। ফল বেরোয়নি, কিন্তু সবাই মনে মনে নিজের অঙ্ক কষছে।
রাতে শৈলবালা হরিপদ বাবুকে ঝাঁঝ মেরে বললেন, “দেশ নিয়ে ভাবতে সবাই ভালোবাসে। কিন্তু বাড়ির জল তোলার মেশিন খারাপ হয়ে গেলে তিনদিন পড়ে থাকে।তখন তোমার এই হুঁশ কোথায় থাকে এখন দেশ বাঁচাবো দেশ বাঁচানো বললে হবে আগে নিজের ঘর কে বাঁচাও" এরপর ঘর থেকে বেশ কিছু ঝনঝন দুমদাম শব্দ আসছিল সেগুলো আমি আর বলছি না। যাইহোক কিছুক্ষণ পর আমাদের পাড়ার আড্ডায় হরিপদ বাবু এলেন।
আমি হেসে বললাম, “তা হলে এবার ভোটে কি কিছু পরিবর্তন হবে? কি বুঝছেন?”
উনি দার্শনিকের মত উত্তর দিলেন, “পরিবর্তন পরিবর্তন সবকিছুরই একদিন পরিবর্তন হবে এটাই তো জগতের নিয়ম কিন্তু সব পরিবর্তনই ধীরে ধীরে হয়। আর আমরা ভুল লোক দের দেখে ,ঠিক লোকে দের চিনতে পারি।”
ক্লাবের সামনে ছেলেরা খিচুড়ি খাচ্ছে। কারও গায়ে গেরুয়া রং, কারও গায় সবুজ এর ঝলকানি, কারও গায় আবার টি-শার্টে চে গুয়েভারার ছবি। কিন্তু সকলের হাতে প্লাস্টিকের প্লেটে খিচুড়ি, আর মুখে রাজনীতির গল্প।
হঠাৎ মনে হল—এই রাজ্য টাই যেন একটা হাঁড়ি। চাল আছে -ডাল আছে, নুন ও আছে তবে কখনও তা কম, কখনও বেশি। একেই আবার ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কেউ কেউ বলেন ঐতিহ্য, কেউ কেউ বলেন বিপর্যয়। অংকটা হল এত কিছুর পরেও সবাই কিন্তু খায়। কেউ সামনে খায় কেউ আবার গোপনে খায় কিন্তু খবর একটাই সবাই কিন্তু খাচ্ছে। তবে এখানে পার্থক্য আছে—এই খিচুড়ি কিন্তু নিজে নিজে নাড়ে না। কেউ না কেউ খুন্তি ধরে নাড়ায়। আর আমরা বেশিরভাগ মানুষ সময় সময় হাঁড়ির ধারের গন্ধ নিই, ঝগড়া করি, মারামারি করি তারপর লাইনে দাঁড়িয়ে খিচুড়ি খাবার জন্য খালি প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে থাকি।