প্রথম অধ্যায়: ট্রাম্পের সেই পুরনো খেলা - হুঙ্কার বনাম পিছুটান
হম্বিতম্বি দিয়ে শুরু, চুপসে গিয়ে শেষ
ট্রাম্প সাহেবের একটা চির চেনা স্টাইল আছে। শুরুতে পাহাড়প্রমাণ হুমকি দেবেন। মনে আছে, উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনকে নিয়ে কী বলেছিলেন? "ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি!" আগুন আর ক্রোধ! মানে কী, গোটা দেশটা উড়িয়ে দেবেন নাকি? সবাই ভয়ে আটখানা। কিন্তু কাজের বেলা কী দেখা গেল? দেখা গেল ওনার সাথে দিব্যি হেসেই হ্যান্ডশেক করছেন, আবার কখনো কখনো বলছেন, "ওহ, ও তো আমার বন্ধু!"
ইরানের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। একদিকে বলছেন ইরানকে ধুলোয় মিশিয়ে দেবেন, অন্যদিকে যখন ইরান পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ছে, তখন ট্রাম্প হঠাৎ নরম সুরে বলে বসলেন, "ইরানিরা খুব বুদ্ধিমান জাতি, ওদের আইকিউ অনেক হাই!"
এবার চিন্তা করুন, একজন নেতা যখন একদিন বলছেন "আমি তোমাকে মেরে ফেলব" আর পরের দিন বলছেন "তোমার বুদ্ধির তারিফ করি", তখন ওই নেতাকে কী বলে? সাইকোলজিস্টরা একে বলে 'বাইপোলার ডিজঅর্ডার', আর আমরা সাধারণ ভাষায় বলি - 'পাগলা ঘোড়ার লাগাম টানাটানি'।
TACO থেকে TAFU - বিবর্তনের কাহিনী
যা বলাবলি চলছে, সেটা কিন্তু সোনায় মোড়ানো কথা। আগে ট্রাম্পকে বলা হতো TACO - Trump Always Chickens Out। মানে বাঘের মতো গর্জন করে শেষে বিড়ালের মতো চুপসে যাওয়া। যেমন ধরুন, মেক্সিকো সীমান্তে দাবাড়ম্বার করে বললেন, "ওয়াল বানাব, ওয়াল বানাব!" শেষ পর্যন্ত সেই ওয়ালের পুরোটাই বানালেন? না। কংগ্রেস থেকে টাকা আনতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে গেলেন।
কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে TAFU - Trump Always F**cked Up। অর্থাৎ, উনি এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন যেখানে না পারছেন যুদ্ধটা জিততে, না পারছেন সম্মান বাঁচিয়ে বেরিয়ে আসতে। এই অবস্থাকে ইংরেজিতে বলে 'Catch-22'। আর বাংলায় কী বলে জানেন? 'যাওয়ার পথ নেই, থাকার জায়গা নেই, মরারও ঠাঁই হয়নি' - টুকলু মিয়া স্টেটাস!
মিত্রদের প্রতি অবিশ্বাস: 'আমি একাই একশ'
ট্রাম্পের নীতিতে কোনো স্থায়ী বন্ধু নেই। উনি মনে করেন আমেরিকা একাই সব করতে পারে। ন্যাটো বা ইউরোপীয় মিত্রদের উনি যেভাবে তাচ্ছিল্য করেন, তাতে সংকটের সময় কাউকেই পাশে পান না। বললেন, "ন্যাটো অপ্রচলিত!" ইউরোপের দেশগুলো শুনে হতভম্ব। মনে মনে বলল, "আচ্ছা বাবু, যেমনি তুমি বলবে। আমরা থাকি দূরে।"
এই "I don't need anybody" ভাবটা ওনার নীতিকে আরও নড়বড়ে করে দিয়েছে। যখন দেখলেন কেউ পাশে নেই, তখন হঠাৎ করে চীনের মতো চিরশত্রুর কাছেও সাহায্যের আর্জি জানাচ্ছেন। ভাবা যায়! যে চীনকে তিনি 'ভাইরাস' বলেছেন, সেই চীনকেই এখন ফোন করে বলছেন, "ইয়ার, একটু হেল্প করো না?"
এটা কি কোনো স্থিতিশীল নেতার লক্ষণ? আমার তো মনে হয়, এটা 'স্থিতিশীল' না হয়ে 'পাগলাটে'র সংজ্ঞায় পড়ে।
জুয়াড়ির চাল: ক্যাসিনো নাকি হোয়াইট হাউস?
ট্রাম্পের বিদেশ নীতি অনেকটা ক্যাসিনোর জুয়া খেলার মতো। উনি ভাবেন ভয় দেখিয়ে বা কোনো একটা বড় ডিল করে সব মিটিয়ে দেবেন। কিন্তু ভূ-রাজনীতি তো আর রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা নয়! ওখানে একবার ভুল চাল দিলে, পুরো বিশ্ব তোলপাড় হয়ে যায়।
ইরানের মতো দেশ যখন ওনার সেই 'ব্ল্যাকমেইল' পলিসিতে পা দিচ্ছে না, তখনই ওনার দোদুল্যমানতা প্রকট হয়ে ধরা পড়ছে। একবার বলছেন পরমাণু চুক্তি বাতিল করবেন, আবার বলছেন নতুন চুক্তি করবেন। এই দ্বিধাদ্বন্দ্বই আমেরিকাকে আজ কোণঠাসা করে দিয়েছে।
একে বলে 'অদূরদর্শিতা'। আর অদূরদর্শী মানুষের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে কী হয়? হয় ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা, নয়তো মহা সর্বনাশ।
টুইটার ডিপ্লোম্যাসি বনাম গ্রাউন্ড রিয়ালিটি
ট্রাম্পের নীতি অনেকটা নির্ভর করে ওনার সকালের মেজাজের ওপর। সকালে ঘুম ভেঙে যদি টুইট করতে ইচ্ছে করে, তাহলে লন্ডন মিস করে দিয়ে বলবেন, "ইসলামিক টেররিস্টরা জিতেছে!" বিকেলে আবার টুইট করবেন, "আমি ইরানের সাথে শান্তি চাই।"
এই যে খামখেয়ালিপনা, এটাকেই ওনার 'দোদুল্যমান নীতি'র মেরুদণ্ড বলা যায়। রণক্ষেত্রে সৈন্যরা যখন তৈরি হচ্ছে, ট্রাম্প তখন হয়তো হোয়াইট হাউসে বসে ভাবছেন কীভাবে এই ঝামেলা থেকে পিঠ বাঁচানো যায়। আর টুইটারে লিখছেন, "আমার জামাই কুশনার খুব ভালো শান্তি পরিকল্পনা এনেছে!"
জামাইয়ের পরিকল্পনায় বিশ্বশান্তি হবে? সত্যি বলছি, এই জোক টুইটারে দেওয়া উচিত।
দ্বিতীয় অধ্যায়: হরমুজ প্রণালী - তেলের গলার কাঁটা
বিশ্বের এনার্জি হাইওয়ে, কিন্তু কতটা সরু!
আপনারা যদি ম্যাপটা দেখেন (সবাই দেখেছেন নিশ্চয়ই), দেখবেন পারস্য উপসাগর থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র রাস্তা হলো এই হরমুজ প্রণালী। এটা এতটাই সরু যে এর সবচেয়ে কম চওড়া জায়গাটা মাত্র ৩৩ কিলোমিটারের মতো! ৩৩ কিলোমিটার মানে মালদা টাউন থেকে বালুরঘাটের দিকে যেতে দেওতলার দূরত্বের সমান। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, দুনিয়ার মোট সমুদ্রজাত তেলের প্রায় ২০-৩০ শতাংশ প্রতিদিন এইটুকু রাস্তা দিয়েই পাস করে।
মানে বুঝতেই পারছেন, এই রাস্তাটা বন্ধ হওয়া মানে সারা বিশ্বের গাড়ির চাকা থমকে যাওয়া। আর চাকা থমকালে কী হয়, সেটা আমরা মালদাইয়া বা কলকাতাইয়া স্ট্যান্ডিং জ্যামে বসে ভালো করেই জানি। শুধু পার্থক্য হলো, এখানে হর্ন দেয়ার কেউ থাকবে না, থাকবে শুধু অর্থনীতির মৃতদেহ।
ইরানের 'ডেডলক' টেকনিক
ইরান খুব ভালো করেই জানে তাদের শক্তি কোথায়। তারা সরাসরি আমেরিকাকে যুদ্ধে না হারিয়েও চাপে রাখতে পারে স্রেফ এই রাস্তাটা ব্লক করার হুমকি দিয়ে। এটা অনেকটা পাড়ার মোড়ে ব্যারিকেড দিয়ে রাস্তা আটকে রাখার মতো দাদাগিরি। কিন্তু দাদা যখন ইরান, তখন তার কথা শুনতেই হয়।
ভিডিওতে যেমনটা দেখলাম, ইরান এখন এই প্রণালীর গভীর জলে মাইন বিছিয়ে রেখেছে। মাইন মানে কী সবাই জানেন নিশ্চয়ই? সেটা হলো জলের নিচে রাখা বোমা। কোনো জাহাজ যদি ইরানের পারমিশন ছাড়া বা তাদের ঘোষণা না দিয়ে এখান দিয়ে যেতে চায়, তবে সেটা স্রেফ উড়িয়ে দেওয়া হতে পারে। পটাস! জাহাজ, তেল, মালপত্র, নাবিক - সব শেষ।
এখন প্রশ্ন হলো, ইরান এত সাহস পেল কোথায়? পেয়েছে তাদের মিসাইল টেকনোলজি আর ড্রোন থেকে। শহীদ ড্রোন তো এখন সেলিব্রিটি হয়ে গেছে। বলতে পারেন, 'শহীদ' এখন ইন্টারন্যাশনাল সুপারস্টার।
তেলের দাম আর মুদ্রাস্ফীতির নাচন
অর্থনীতির অংকটা খুব সোজা - সাপ্লাই কমলে দাম বাড়বে। গোল্ডম্যান স্যাকস-এর মতো বড় বড় সংস্থারা বলছে, এই অশান্তি যদি আরও দু-তিন মাস চলে, তবে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ থেকে ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এখন তেলের দাম বাড়া মানে সবকিছুর দাম বাড়া। যেমন ধরো, কলকাতায় চায়ের দোকানে চায়ের কাপের দাম হঠাৎ ১০ টাকা বেড়ে গেল। কারণ, চা বানাতে গ্যাস লাগে, গ্যাসের দাম বেড়েছে। গ্যাসের দাম বেড়েছে কারণ তেলের দাম বেড়েছে। তেলের দাম বেড়েছে কারণ হরমুজ প্রণালীতে ঝামেলা। আর হরমুজ প্রণালীতে ঝামেলা করেছে ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকা। কিন্তু শেষমেশ দোষটা কার? চা বিক্রেতার? না।
ভারত বা জাপানের মতো দেশগুলো, যারা প্রচুর তেল ইমপোর্ট করে, তাদের তো মাথায় হাত পড়বে! ভারতের জিডিপি প্রায় ৫ শতাংশের ওপর নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। মানে, আমরা যে ৭-৮% গ্রোথের স্বপ্ন দেখি, সেটা হয়তো স্বপ্নই থেকে যাবে। আর জেগে দেখবো ৫% নিয়ে কেঁদে মরি।
মিত্রদের পিঠটান: 'রায়তা তুমি ছড়িয়েছো, তুমিই সামলাও'
ট্রাম্প সাহেব ভাবছিলেন হম্বিতম্বি করলে সব দেশ ওনার পাশে এসে দাঁড়াবে আর হরমুজ প্রণালী জোর করে খুলে দেবে। কিন্তু বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা! মিত্র দেশগুলো (জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা ইউরোপ) দেখছে এই রাস্তায় যুদ্ধ মানে নিজেদের অর্থনীতিকে সুইসাইড করানো।
তাই ট্রাম্প যখন বললেন, "সবাই মিলে চলো রাস্তাটা খুলি", তারা পরিষ্কার বলে দিল - "ভাই, রায়তা তুমি ছড়িয়েছো, তুমিই সামলাও। আমাদের জাহাজ আমরা বিপদে ফেলব না।"
একে বলে 'ফ্রেন্ড ইন নিড ইজ আ ফ্রেন্ড ইনডিড' - মানে বিপদের সময় বন্ধুই আসল বন্ধু। কিন্তু যখন দেখলে বন্ধু নিজেই বিপদে পড়েছে, তখন সে আর বন্ধু থাকে না, থাকে শুধু 'আন্ডারটেকার'।
ইরানের 'কিল বক্স' স্ট্র্যাটেজি
রণকৌশল হিসেবে ইরান এটাকে একটা 'কিল বক্স' হিসেবে তৈরি করেছে। আমেরিকান নেভির বড় বড় যুদ্ধজাহাজ বা এয়ারক্রাফ্ট ক্যারিয়ার যখন এই সরু প্রণালী দিয়ে ঢোকে, তখন তারা আসলে ইরানের মিসাইল আর ড্রোনের জন্য খুব সহজ টার্গেট হয়ে যায়।
খোলা সমুদ্রে আমেরিকার শক্তি বেশি হতে পারে, কিন্তু এইটুকু সরু জায়গায় ইরানই রাজা। ঠিক এই কারণেই ইউএস নেভি এখন উপকূল থেকে কয়েকশ মাইল দূরে সরে থাকতে বাধ্য হচ্ছে।
একে বলে 'টেকটিক্যাল রিট্রিট'। আর বাংলায় কী বলে জানেন? 'পালানো নয়, কৌশলী পশ্চাদপসরণ'। কিন্তু ট্রাম্প তো সেটা মানবেন না। তিনি বলবেন, "আমি ইরানকে ভয় পাই না, আমি শুধু তাদের বেশি কাছ থেকে দেখতে চাই না। গ্লাসেস ভুলে এসেছি।"
তৃতীয় অধ্যায়: নেতানিয়াহু রহস্য - মানুষ না কি অ্যালগরিদম?
নিখোঁজ সংবাদ ও সোশ্যাল মিডিয়া প্যানিক
বেশ কিছুদিন ধরে নেতানিয়াহুকে কোনো লাইভ সরকারি মিটিং বা পাবলিক ইভেন্টে দেখা যাচ্ছিল না। আর ব্যাস! অমনি ইন্টারনেটে দাবানলের মতো খবর ছড়িয়ে পড়ল যে, ইরানি হামলায় হয়তো ওনার চ্যাপ্টার ক্লোজ হয়ে গেছে।
লোকে বলতে শুরু করল, "নেতানিয়াহু ইজ ডেড!" "ইসরায়েলের পিএম নেই!" টিকটকে ভিডিও ভাইরাল - "রিপ নেতানিয়াহু"। ফেসবুকে মিম - "মোসাদ এখন খুঁজছে তাদের লিডারকে"।
কিন্তু ইসরায়েল সরকার তো আর সেটা মেনে নেবে না, তাই শুরু হলো এক অদ্ভুত লুকোচুরি খেলা। একে বলে 'গেম অফ থ্রোনস' মিডল ইস্ট এডিশন।
ক্যাফেটেরিয়া ভিডিও বনাম 'এআই' এনালিটিক্স
এই গুজব থামাতে ইসরায়েল একটা ভিডিও রিলিজ করল। সেখানে দেখা যাচ্ছে নেতানিয়াহু জেরুজালেমের একটা ক্যাফেতে বসে আয়েশ করে কফি খাচ্ছেন। কিন্তু ভাই, আজকের জমানায় মানুষ কি আর অত বোকা? যারা টেক-স্যাভি, তারা ভিডিওটা খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করল।
কেউ বলল, "ভিডিওতে ওনার আঙুল ৫টার বদলে ৬টা!" যদিও পরে সেটা ভুল প্রমাণিত হয়, কিন্তু ততক্ষণে ইন্টারনেটে ঝড় উঠেছে। কেউ বলল, "কফির ধোঁয়া আর গ্লাসের রিফ্লেকশনটা বড্ড 'আনরিয়েল'।" এমনকি অনেক AI Analyzer সফটওয়্যার তো সিগন্যাল দিয়ে দিল যে - "বস, এটা এআই জেনারেটেড ভিডিও!"
মানে, নেতানিয়াহু বেঁচে আছেন নাকি ডিপফেক? এটা এখন 'মার্ডার মিস্ট্রি' সিরিজের মতো রহস্যময়।
ডিজিটাল ঘোস্ট বা 'এআই অবতার'
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে উনি সুস্থ-সবল, কিন্তু কেন জানি ওনার গায়ের চামড়ার টেক্সচার বা চোখের পলক ফেলার ধরণটা একটু যান্ত্রিক মনে হচ্ছে। গুজব রটেছে যে, জনগণের মনোবল চাঙ্গা রাখতে মোসাদ বা ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ওনার একটা হাই-ডেফিনিশন 'এআই অবতার' তৈরি করেছে, যেটা দিয়ে একের পর এক ভিডিও বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
মানে মানুষটা হয়তো বাঙ্কারে লুকিয়ে আছেন অথবা আরও খারাপ কিছু হয়েছে, কিন্তু স্ক্রিনে আমরা দেখছি এক 'ডিজিটাল নেতানিয়াহু'কে। এটা অনেকটা হলিউড সিনেমার প্লটের মতো। থ্যাঙ্কসগিভিংয়ে বাপু কই? ওই তো, স্ক্রিনে!
নিরাপত্তার দোহাই না কি অক্ষমতা?
সরকার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে নিরাপত্তার কারণে উনি জনসমক্ষে আসছেন না। কিন্তু পাল্টাযুক্তি হলো - ইরান এখন এতটাই শক্তিশালী যে তারা নেতানিয়াহুর সুনির্দিষ্ট লোকেশন ট্র্যাক করে ফেলতে পারে। যদি উনি সত্যি বেঁচেও থাকেন, তবে উনি এখন স্রেফ একজন 'পলাতক' নেতা।
ওনার এই আড়ালে থাকাটা পরোক্ষভাবে ইরানের টার্গেটিং ক্যাপাসিটির জয় হিসেবেই দেখা হচ্ছে। মানে, উনি জীবিত থাকলেও ওনার রাজনৈতিক ভাবমূর্তিটা এখন অনেকটা 'ডিজিটাল ভূতের' মতোই হয়ে গেছে।
একে বলে 'দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু আছে'। ইংরেজিতে বলে 'ভ্যানিশিং অ্যাক্ট'।
গুজব যখন যুদ্ধের অস্ত্র
এই যে নেতানিয়াহুকে নিয়ে ধোঁয়াশা, এটা কিন্তু একটা বড় সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার। ইসরায়েলি জনগণ দুশ্চিন্তায় যে তাদের লিডার কোথায়, আর অন্যদিকে ইরান ও তার সমর্থকরা এই সুযোগে সোশ্যাল মিডিয়ায় মিম বানিয়ে ট্রোল করছে।
ভিডিওতে তো আরও মজা করে দেখানো হলো যে, নেতানিয়াহুর ওই একই ক্যাফেতে উত্তর কোরিয়ার কিম জং উন আর ইরানের মুজতবা খামেনির এআই ভার্সনও কফি খেতে পৌঁছে গেছে! তিন এআই নেতা এক টেবিলে বসে কফি খাচ্ছেন, আর ইসরায়েলি গোয়েন্দারা বিভ্রান্ত।
মানে পুরো বিষয়টাই এখন একটা ডিজিটাল সার্কাসে পরিণত হয়েছে। সার্কাসের নাম 'দ্য ডিসঅ্যাপিয়ারিং পিএম শো'।
চতুর্থ অধ্যায়: একলা চলো রে - সুপারপাওয়ার যখন একা
পুরনো বন্ধুদের পিঠটান
ট্রাম্প সাহেব ভাবছিলেন এক আঙুলের ইশারায় ন্যাটো থেকে শুরু করে সব মিত্র দেশ ডুগডুগি বাজাতে বাজাতে চলে আসবে। কিন্তু বাস্তবটা পুরো উল্টো। কানাডার জাস্টিন ট্রুডো তো অন রেকর্ড বলে দিলেন - "বাপু, তোমাদের এই অফেনসিভ অপারেশনে আমরা নেই, আর কোনোদিন থাকবও না।"
এতটুকুও বললেন না যে, "ট্রাম্প, তুমি যাও, আমরা আসছি।" সরাসরি বলে দিলেন, "গেট লস্ট!"
এমনকি ফ্রান্সও তাদের যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে সাফ মানা করে দিয়েছে। ম্যাক্রোঁ বলে দিলেন, "আমাদের তেল চাই, যুদ্ধ চাই না। তোমার জঙ্গি মনোভাব নিয়ে থাকো তুমি।"
মানে যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর ন্যাটো ছিল আমেরিকার ডান হাত-বাম হাত, তারা এখন বলছে, "রায়তা তুমি ছড়িয়েছো, তুমিই সামলাও। আমরা তো শুধু দর্শক।"
ইউকের 'না' এবং দ্বীপের রাজনীতি
ব্রিটিশরা তো আমেরিকার ছায়াসঙ্গী হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু এবার তারাও বেঁকে বসেছে। যদিও ব্রিটিশ ঘাঁটি থেকে আমেরিকান বম্বাররা উড়ছে, কিন্তু ইউকে সরকার তাদের নিজস্ব রণতরী পাঠাতে রাজি হয়নি।
এটা আমেরিকার জন্য একটা বড়সড় ইগো-চেক। মানে সবচেয়ে কাছের বন্ধুটাও যখন বলছে "সাহায্য করব না", তখন বুঝতেই পারছিস আমেরিকার গ্লোবাল রেসপেক্ট কোন তলানিতে ঠেকেছে।
একে বলে 'স্পেশাল রিলেশনশিপ'? এটা তো 'স্পেশাল অ্যাবসেন্স' হয়ে গেল।
এয়ারস্পেস আর বেস নিয়ে টানাটানি
সুইজারল্যান্ড তাদের আকাশপথ বন্ধ করে দিয়েছে এই অপারেশনের জন্য। সুইসরা বলে, "আমরা নিরপেক্ষ। আমাদের দেশের ওপর দিয়ে বোমারু বিমান চলতে পারে না।" স্পেন তো আরও এক কাঠি উপরে - তারা এখন ভাবছে তাদের দেশ থেকে আমেরিকান মিলিটারি বেসগুলোই বের করে দেবে কি না!
জাপানের সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে প্রটেস্ট করছে যাতে তাদের সরকার আমেরিকার এই খামখেয়ালিপনায় সায় না দেয়। "নো ওয়ার! নো ট্রাম্প!" স্লোগানে ফেটে পড়ছে টোকিও।
মানে যে দেশগুলো আগে আমেরিকার এক ডাকে দৌড়ে আসত, তারা এখন নিজেদের 'সেফ ডিস্টেন্স' বজায় রাখছে। করোনার সময় যেমন সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং ছিল, এখন তেমনি 'পলিটিক্যাল ডিস্ট্যান্সিং' চালু হয়েছে।
চীনের 'ত্রাতা' ইমেজ বনাম আমেরিকার পতন
আমেরিকা যখন একা হয়ে কোণঠাসা, তখন ড্রাগন কিন্তু ধীরে ধীরে গুহা থেকে বেরিয়ে আসছে। চীন প্রথমে শান্তভাবে বলল "যুদ্ধ থামাও", আর এখন বলছে তারা "মানবিক সাহায্য" পাঠাবে।
এটা একটা মাস্টারস্ট্রোক! মানে আমেরিকা যখন বোমা ফেলছে, চীন তখন খাবার আর ওষুধ পাঠিয়ে বিশ্বের চোখে 'শান্তির দূত' সাজার চেষ্টা করছে। রাশিয়া আর চীন আড়ালে হাসছে, কারণ তারা জানে এই একটা যুদ্ধই আমেরিকার বিশ্ব-মোড়লগিরি শেষ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
একে বলে 'সফট পাওয়ার'। আর ট্রাম্প যা করছেন, সেটা হলো 'হার্ড পাওয়ার' যেটা 'ডাম্ব পাওয়ার' হয়ে যাচ্ছে।
৫ বছরের বাচ্চার মতো ট্রাম্পের চিৎকার
যেটা দেখতে পাচ্ছি, ট্রাম্প এখন রাগে-ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন। উনি বলছেন, "কাউকে আমাদের দরকার নেই, আমরাই বিশ্বের স্ট্রংগেস্ট নেশন!"
কিন্তু ভেতরে ভেতরে উনিও জানেন যে মিত্রহীন আমেরিকা একটা দাঁতহীন বাঘের মতো। ট্রাম্পের এই "আমি একাই একশ" ভাবটা আসলে ওনার চরম নিরাপত্তাহীনতারই বহিঃপ্রকাশ। উনি বুঝতে পারছেন যে, ওনার 'আমেরিকা ফার্স্ট' পলিসি আসলে আমেরিকাকে 'আমেরিকা অ্যালোন' করে দিয়েছে।
একে বলে 'ব্রেভাডো'। আর ব্রেভাডো মানে হলো, ভয় পেয়েও সাহস দেখানো। যেমন ছোটবেলায় অন্ধকারে ভয় পেয়ে বলতাম, "আমি ভয় পাইনি, টর্চ নিভিয়ে দাও।"
পঞ্চম অধ্যায়: ইরানি কামড় - যখন শিকারি নিজেই শিকার
আমেরিকান ঈগলের ডানা ছাঁটা
ভাবা যায়, যে আমেরিকা তাদের বি-২ বম্বার আর বিশাল বিশাল এয়ারক্রাফ্ট ক্যারিয়ার নিয়ে দাপিয়ে বেড়াত, তারা এখন ইরানের ভয়ে কাঁপছে! ইরানের শহীদ ড্রোন আর ব্যালেস্টিক মিসাইলের পাল্লা থেকে বাঁচতে আমেরিকান নেভি তাদের ক্যারিয়ারগুলোকে উপকূল থেকে প্রায় ৭০০-১০০০ কিমি দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।
মানে, বাঘকে তার নিজের ডেরাতেই কোণঠাসো করে দিয়েছে ইরান। এখন প্রশ্ন হলো, আমেরিকার সেই সব 'শো অফ পাওয়ার' গেল কোথায়? ওই তো, দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে।
একে বলে 'ডিটেরেন্স ফেলিয়োর'। বাংলায় বলতে পারেন, 'ভয় দেখানোর খেলা ভেস্তে যাওয়া'।
বগদাদের 'গ্রিন জোন' আর বিনিদ্র রজনী
আমেরিকা ভেবেছিল বগদাদের গ্রিন জোন মানেই নিরাপদ কেল্লা। কিন্তু ইরান বুঝিয়ে দিল, তাদের জন্য কোনো জায়গাই সেফ নয়। রাতভর একের পর এক রকেট আর ড্রোন অ্যাটাকে আমেরিকান বেইসগুলোর হাল খারাপ।
এমনকি আমেরিকা তাদের নিজেদের ডিফেন্স সিস্টেম দিয়েও এই ঝাড়ে-বংশে আসা ড্রোনগুলোকে পুরোপুরি আটকাতে পারছে না। এটা শুধু হামলা নয় ভাই, এটা আমেরিকার 'সুপারপাওয়ার' ইমেজে সরাসরি চড়!
ইরানিরা বুঝিয়ে দিয়েছে, "তোমার প্যাট্রিয়ট মিসাইল আছে? আমার শহীদ ড্রোন আছে। চলো দেখি কে জিতি।"
একে বলে 'অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার'। মানে, আমি তোমার মতো বড় না হলেও, তোমাকে কষ্ট দিতে পারব।
টুইটার বনাম গ্রাউন্ড রিয়ালিটি
ইরানের সামরিক কর্তারা এখন ট্রাম্পকে রীতিমতো লেকচার দিচ্ছে, তাও আবার ইংরেজিতে! তারা বলছে - "ভাই ট্রাম্প, যুদ্ধটা টুইটারে হয় না, ওটা মাটিতে লড়তে হয়।"
ইরানের জেনারেলরা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ছে যে, আমেরিকান ফোর্সেসদের সাহস নেই ইরানের মাটির কাছাকাছি আসার। এই যে আত্মবিশ্বাস, এটা কিন্তু স্রেফ কথার কথা নয়; তারা জানে তাদের মিসাইল টেকনোলজি এখন কতটা নিখুঁত হয়েছে।
ট্রাম্প টুইটারে লিখলেন, "আমার বাটন তোমার চেয়ে বড়!" ইরান জবাব দিল, "বাটনে ক্লিক করা সহজ, কিন্তু তার পরিণাম ভোগ করা কঠিন।"
একে বলে 'টুইটার ডিপ্লোম্যাসি'। আর এর পরিণাম হলো 'ডিজাস্টার ডিপ্লোম্যাসি'।
নিখুঁত নিশানায় ইসরায়েলি ক্ষতি
ইরান যখন পাল্টাতে মিসাইল দাগছে, তখন সেগুলোর ওজন আর ধ্বংসক্ষমতা দেখে ইসরায়েলও থতমত খেয়ে গেছে। প্রায় এক টনের ওয়ারহেড নিয়ে এই মিসাইলগুলো যখন এসে পড়ছে, তখন বড় বড় বাঙ্কারও তাসের ঘরের মতো ভেঙে যাচ্ছে।
যদিও অনেক তথ্য সেন্সর করা হচ্ছে, সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে ফেলা হচ্ছে, তাও অফিশিয়াল রিপোর্ট বলছে ৩০০০-এর বেশি ইসরায়েলি ইনজ্যুরড আর প্রচুর সৈন্য হতাহত হয়েছে।
মানে ইরান এখন আর শুধু হুমকি দিচ্ছে না, তারা সরাসরি আঘাত হানছে এবং সেটা বেশ ভালোমতোই লাগছে। ইসরায়েলের 'আয়রন ডোম' এখন 'রাস্টি ডোম' হয়ে যাচ্ছে।
গোপন ডেরায় হামলা ও টার্গেটিং ক্যাডেন্স
ইরানের ইন্টেলিজেন্স এখন এতটাই শার্প যে তারা ঠিক জানে কখন কোথায় মারতে হবে। তারা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে - আমেরিকার যেকোনো ইন্টারেস্ট, তা সেটা কমার্শিয়াল হোক বা মিলিটারি, সবই এখন তাদের লিজিটিমেট টার্গেট।
এই ভয়েই এখন দুবাই বা বিদেশের বড় বড় এয়ারপোর্টগুলো বারবার বন্ধ করতে হচ্ছে। পর্যটকরা আটকে পড়ছে, ফ্লাইট ক্যান্সেল হচ্ছে, আর সবাই ভাবছে - "এসব কী হচ্ছে!"
ইরান আসলে আমেরিকার গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন আর মিলিটারি ইগো - দুটোকেই একসাথে টার্গেট করেছে। আর ট্রাম্প বসে বসে টুইট করছে, "আমি খুব ব্যস্ত, পরে বল।"
ষষ্ঠ অধ্যায়: ট্রাম্পের মাথায় জট - যখন ইগো আর রিয়ালিটি লড়ছে
খেই হারিয়ে ফেলা বা 'ব্রেন ফেড'
ট্রাম্পের এখন এমন দশা যে উনি কার সঙ্গে কথা বলছেন আর কাকে গালি দিচ্ছেন, সেটাই গুলিয়ে ফেলছেন। শুনেছেন তো, ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসামকে পচাতে গিয়ে উনি ভুল করে ওনাকে 'আমেরিকার প্রেসিডেন্ট' বলে বসলেন!
মানে নিজের চেয়ারটার কথাই ওনার মনে নেই। এই যে নাম আর পজিশন গুলিয়ে ফেলা, এটা কিন্তু স্রেফ কথার কথা নয় ভাই, এটা ওনার চরম মানসিক চাপের লক্ষণ।
ডাক্তারি ভাষায় একে বলে 'কগনিটিভ ডিসফাংশন'। আর বাংলায় কী বলি? 'মাথায় কিছু ঢুকছে না, বেরিয়েও যাচ্ছে না'।
জুমলা বনাম গ্রাউন্ড রিয়ালিটি
ট্রাম্প সবসময় ভাবতেন ওনার সেই 'গ্লিব টক' বা চটকদার কথাবার্তা দিয়ে সব বিপদ কাটিয়ে উঠবেন। কিন্তু ভূ-রাজনীতি তো আর রিয়েল এস্টেটের ডিল নয় যে একটা মিথ্যা বলে পার পেয়ে যাবেন।
এখন যখন দেখছেন ইরান ওনার কোনো থমকানি বা ডিলি সায় দিচ্ছে না, তখন ওনার ওই আত্মবিশ্বাসের বেলুনটা ফুটো হয়ে গেছে। যখন মানুষ যুক্তি দিয়ে লড়তে পারে না, তখনই সে আবোল-তাবোল বকতে শুরু করে - ট্রাম্পের এখন ঠিক সেই হাল।
একদিন বলছেন, "আমি ইরানের সাথে চুক্তি করব।" পরের দিন বলছেন, "ইরানকে ধ্বংস করব।" পরশু বলছেন, "ইরানের আইকিউ অনেক হাই।" মানুষ ভাবছে, উনি কোন আইকিউর কথা বলছেন? ওনার নিজেরটা নাকি ইরানেরটা?
নিরাপত্তাহীনতা আর ৫ বছরের বাচ্চার মতো জেদ
যখন কেউ ওনার পাশে নেই, তখন ট্রাম্পের ব্যবহারটা অনেকটা ওই একগুঁয়ে বাচ্চার মতো হয়ে গেছে যে বলছে, "কাউকেও আমার দরকার নেই, আমি একাই সব পারি!"
কিন্তু ভেতরে ভেতরে উনিও জানেন যে উনি ফেঁসে গেছেন। ওনার এই অযৌক্তিক জেদ আর হম্বিতম্বি আসলে ওনার চরম মানসিক অস্থিরতা আর একাকীত্ব ঢাকার একটা ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র।
একে বলে 'ইনসিকিউরিটি কমপ্লেক্স'। আর এই কমপ্লেক্সের বাড়ি হলো হোয়াইট হাউস, ঠিকানা ১৬০০ পেনসিলভানিয়া অ্যাভিনিউ।
কগনিটিভ অ্যাবিলিটি নিয়ে টানাটানি
ট্রাম্প এখন অন্যের বুদ্ধি বা চিন্তাশক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, অথচ ওনার নিজের কথাবার্তাই এখন অসংলগ্ন। এই যে প্রজেকশন (নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানো), এটা ক্লিনিক্যাল ভাষায় মেন্টাল স্ট্রেসের একটা বড় প্রমাণ।
ইরানের আইকিউ নিয়ে প্রশংসা করা আর পরক্ষণেই আবার আক্রমণাত্মক হওয়া - এই যে ঘনঘন পাল্টি খাওয়া, এটা কোনো স্থিতিশীল নেতার লক্ষণ নয়।
একটি মনস্তাত্ত্বিক বলেছেন, "ট্রাম্পের মধ্যে দুইটা মানুষ বাস করে। একজন শান্তি প্রিয়, আর একজন যুদ্ধ প্রিয়। ওরা কেউ জানে না কখন কে বের হবে।"
অতীতের ভূত আর আগামীর ভয়
ট্রাম্পের চোখে এখন হয়তো আফগানিস্তান বা ভিয়েতনামের সেই হারের ভূত নাচছে। উনি বুঝতে পারছেন যে এই যুদ্ধের কোনো 'কুইক এন্ড' বা চটজলদি সমাধান নেই। তেলের রিজার্ভ ফুরিয়ে গেলে কী হবে, মিত্ররা মুখ ফিরিয়ে নিলে কী হবে - এই সব চিন্তায় ওনার 'মানসিক ভারসাম্য' এখন দোদুল্যমান।
ওনার প্রেস কনফারেন্সগুলোতে এখন আর সেই দাপট নেই, আছে শুধু বিভ্রান্তি আর বিরক্তি। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে জ্বালাময় উত্তর দেন, আবার কখনো কখনো চুপ করে থাকেন।
একে বলে 'কনফিউশন জোন'। আর এই জোন থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না ট্রাম্প।
সপ্তম অধ্যায়: উপসংহার - যখন দোদুল্যমানতা বিশ্বাসের সংকট তৈরি করে
সংক্ষিপ্ত চিত্র: তিনটি ধাঁধার গল্প
ট্রাম্পের দোদুল্যমান নীতি, হরমুজ প্রণালীর জলপথ আর নেতানিয়াহুর অদৃশ্য অস্তিত্ব—এই তিনটি বিষয় কিন্তু পরস্পর জড়িয়ে আছে এক অদৃশ্য সুতোয়। ট্রাম্প যত দোদুল্যমান হচ্ছেন, ইরান তত বেশি সাহস পাচ্ছে হরমুজ প্রণালীতে মাইন বসাতে। আর ইরান যত বেশি হুমকি দিচ্ছে, নেতানিয়াহু তত বেশি অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন। আর এই পুরো চক্রটির মাঝখানে বসে আছি আমরা—সাধারণ মানুষ, যাদের পকেটে আগুন লাগছে এই অনিশ্চয়তার নামে।
ট্রাম্পের কগনিটিভ টানাটানি শুধু একটি ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি একটি ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। যখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের নেতার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াই অনিশ্চিত, তখন সেই অনিশ্চয়তার ছায়া পড়ে গোটা বিশ্বের ওপর। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার ভয়, তেলের দামের ওঠানামা, ডিজিটাল অন্ধকারের আশঙ্কা—সবকিছুর মূলে রয়েছে এই অনিশ্চিত নেতৃত্ব।
বাস্তবতার নিরিখে কয়েকটি পর্যবেক্ষণ
প্রথমত, ট্রাম্পের দোদুল্যমান নীতি আসলে আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী মিত্রতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ন্যাটো থেকে শুরু করে উপসাগরীয় দেশগুলো—সবাই এখন ভাবছে, এই অনিশ্চিত বন্ধুর জন্য নিজেদের অর্থনীতিকে বিপদে ফেলা কি ঠিক হবে? ফলে, আমেরিকার বৈশ্বিক প্রভাব ধীরে ধীরে কমছে, আর চীনের মতো দেশ সেই শূন্যস্থান পূরণ করার সুযোগ পাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, ইরান এই পরিস্থিতিকে নিজের সুবিধার জন্য ব্যবহার করছে। ট্রাম্পের হুমকি আর পিছুটানের দোলাচলে তারা বুঝে গেছে যে, সাহসী আচরণ করলেই লাভ। তাই তারা হরমুজ প্রণালীতে মাইন বসাচ্ছে, আমেরিকান ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে, এবং ট্রাম্পকে টুইটারের জবাব দিচ্ছে ইংরেজিতে। এটা শুধু সামরিক জয় নয়, এটা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধেও ইরানের জয়।
তৃতীয়ত, নেতানিয়াহুর অদৃশ্য হওয়া ইসরায়েলের জন্য এক বিশ্রী অবস্থা তৈরি করেছে। একদিকে জনগণ জানতে চায় তাদের নেতা কোথায়, অন্যদিকে শত্রুরা এই সুযোগে মিম বানিয়ে ট্রোল করছে। আর সরকার যদি সত্যিই এআই অবতার ব্যবহার করে থাকে, তাহলে তো প্রশ্ন আরও গভীর—ডিজিটাল নেতৃত্ব কি আসল নেতৃত্বের বিকল্প হতে পারে?
চতুর্থত, ভারতের মতো দেশ সবচেয়ে বিপদে আছে। কারণ, উপসাগরীয় অঞ্চলে আমাদের কোটির বেশি মানুষ, তেল আমদানি নির্ভরতা, আর প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি—সবকিছুই এই অনিশ্চয়তার শিকার। ট্রাম্পের এক টুইট, ইরানের এক হামলা, নেতানিয়াহুর এক অনুপস্থিতি—এসব আমাদের পকেটে সরাসরি আগুন ধরাতে পারে।
পঞ্চমত, ট্রাম্পের কগনিটিভ অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এখন আর অমূলক নয়। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নরকে 'প্রেসিডেন্ট' বলে ভুল করা, ইরানের আইকিউ নিয়ে প্রশংসা করে পাঁচ মিনিট পরেই হুমকি দেওয়া—এসব স্থিতিশীল নেতার লক্ষণ নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অবস্থায় তাঁর চারপাশের উপদেষ্টারা কী করছেন? কেউ কি তাঁকে থামানোর চেষ্টা করছেন, নাকি সবাই বসে বসে দেখছেন কীভাবে বিশ্ব রাজনীতি এক ব্যক্তির মানসিক অবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে?
কিছু খোলা প্রশ্ন
এখনও কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। যেমন—
ট্রাম্পের এই দোদুল্যমানতা কি সত্যিই মানসিক চাপের ফল, নাকি এটি একটি ইচ্ছাকৃত কৌশল? অর্থাৎ, তিনি কি ইচ্ছে করেই শত্রুকে বিভ্রান্ত করতে এমন আচরণ করছেন? যদি তা-ই হয়, তাহলে এটা ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল, কারণ এতে মিত্ররাও বিভ্রান্ত হচ্ছে।
নেতানিয়াহু কি সত্যিই বেঁচে আছেন? আর থাকলে, তিনি কেন লুকিয়ে আছেন? ইরানের টার্গেটিং ক্যাপাসিটি কি এতটাই বেড়ে গেছে যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নিরাপদে থাকতে পারেন না? নাকি এটি কোনো গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ?
হরমুজ প্রণালী যদি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে? রাশিয়া থেকে তেল আনার বিকল্প পথ কতটা কার্যকর? আর সেই পথে বীমা জটিলতা ও মার্কিন চাপ কতটা বড় বাধা?
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কি ট্রাম্পের মানসিক অবস্থা নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে? কোনো পরমাণু শক্তিধর দেশের নেতার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে, বিশ্বের দায়িত্ব কী? জাতিসংঘের কি এখানে কোনো ভূমিকা থাকা উচিত?
ভারতের মতো দেশের জন্য করণীয় কী? আমরা কি শুধু বসে বসে দেখব ট্রাম্পের টুইট আর ইরানের মিসাইল হামলা? নাকি আমাদের নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রবাসী কল্যাণ, ও কূটনৈতিক সম্পর্কগুলো আরও শক্তিশালী করার সময় এসেছে?
শেষ কথা: পকেটে আগুন আর মাথায় হাত
ট্রাম্পের কগনিটিভ টানাটানি, নেতানিয়াহুর অদৃশ্য হওয়া, ইরানের শহীদ ড্রোন—এসব দেখতে দেখতে মনে হচ্ছে, আমরা যেন একটা বিশাল থ্রিলার সিনেমার মধ্যে বাস করছি। শুধু পার্থক্য হলো, এই সিনেমার শেষ কোথায়, কে জিতবে, কে হারবে—কেউ জানে না।
একটা জিনিস পরিষ্কার: ট্রাম্পের যতই ব্রেন ফেড হোক, নেতানিয়াহু যতই অদৃশ্য হোন, ইরান যতই মাইন বসাক—এসবের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হচ্ছে আমাদের পকেটে। তেলের দাম বাড়ছে, টাকার মান পড়ছে, ডাল-ভাতের দাম আকাশছোঁয়া হচ্ছে। আর আমরা বসে বসে টিভি দেখছি, ভাবছি—এই যুদ্ধ কে জিতুক, আমাদের তো হারতে হবে!
আশা করি ট্রাম্পের ব্রেন সুনির্দিষ্টভাবে কাজ করা শুরু করবে, নেতানিয়াহু কোথাও থেকে আবির্ভূত হবেন, ইরান মাইন সরিয়ে নেবে, এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে আবার তেল চলাচল শুরু করবে। নতুবা আমাদের পকেট তো আগেই ফাঁকা, এবার মাথাও ফাঁকা হওয়ার জোগাড়!
যুদ্ধের বিলটা শেষ পর্যন্ত আমাদেরই দিতে হবে। আর সেই বিল মেটাতে গিয়ে পকেটে আগুন লাগাটা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। প্রশ্ন হলো, এই আগুন নেভানোর মতো কোনো ব্যবস্থা আমাদের আছে কি?