পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

মরার আগে মরছি না ভাই

  • 09 March, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 546 view(s)
  • লিখেছেন : শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ
অমিত শাহ বলে গেছিলেন কিছুদিন আগে, যে এখানে মমতাই বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ করতে দিয়েছে। তার পদসেবক নীতিন নবীন, ইসলামপুরে বলেছিল, 'ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট'। সোজা বাংলায় 'বের করো খুঁজে, মুছে দাও নাম, তারপরে সীমান্ত পারে ছুঁড়ে দাও'। পানিহাটির সুরজিৎ বাংলাদেশী বা রোহিঙ্গা কোনোটাই নন। তাহলে তাঁর অপরাধ?

আত্মহত্যা করার কথা এখন ভাবেন মাঝেমধ্যেই! বলছিলেন পানিহাটির সুরজিৎ গোস্বামী। কারণ তিনি মুছে গেছেন ভোটার তালিকা থেকে। অতএব তাঁর রক্ত-মাংসের অস্তিত্বও মুছে যাবার পথে। সেই আতঙ্ক তাঁকে তাড়া করছে এতটাই, যে আত্মহত্যার কথাও ভেবে ফেলেছেন। অমিত শাহ বলে গেছিলেন কিছুদিন আগে, যে এখানে মমতাই বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ করতে দিয়েছে। তার পদসেবক নীতিন নবীন, ইসলামপুরে বলেছিল, 'ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট'। সোজা বাংলায় 'বের করো খুঁজে, মুছে দাও নাম, তারপরে সীমান্ত পারে ছুঁড়ে দাও'। পানিহাটির সুরজিৎ বাংলাদেশী বা রোহিঙ্গা কোনোটাই নন। তাহলে তাঁর অপরাধ?

তাঁর অপরাধ তিনি সঙ্ঘপরিবার পরিচালিত, বিজেপি শাসিত একটি রাষ্ট্রে বাস করেন, যে রাষ্ট্র মুখে 'হিন্দু'-র কথা বলে শুধু, আসলে করে সবাইকে লুট। ২০২৪-২৫ আর্থিক বছরে বিজেপি দান, চাঁদা ইত্যাদি বাবদ পেয়েছে ৬৭৬৯ কোটি টাকার বেশী। পিএম কেয়ার ফান্ডে কত আছে তা জানার আইনী রাস্তাই বন্ধ, কারণ তার অডিট জনগণের জানার কথা নয়। এদের নেতাদের পরিবার, বন্ধু-বান্ধব এদেশে খুলে-আম লুটতরাজ চালায়। তাদের লক্ষ লক্ষ কোটির সম্পত্তি আজ। আমেরিকা আর চীনের পরেই এদেশ, বিলিয়নিয়ারের সংখ্যায়। মাত্র ৩০৮ জন তারা। কোনো ইডি, কোনো সিবিআই-এর সাহসই নেই এদের বন্ধুদের বিরুদ্ধে, এদের নেতাদের বিরুদ্ধে, এদের মুখ্যমন্ত্রীদের বিরুদ্ধে কোনো কিছুর তদন্ত করার। আগেও এরা পোষা ছিল, এখন তো পায়ে গড়াগড়িই খায় শুধু। যেমন এরা গড়াগড়ি খায় ট্রাম্পের পায়ে।

সুরজিৎ গোস্বামীর আরো অপরাধ আছে। তিনি জন্মেছেন এমন একটি রাজ্যে, যা হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার আঁতুড় ঘর। হ্যাঁ, এই ভুখণ্ড যা একদা সামগ্রিক ভাবে বাংলাদেশ ছিল, সেখানে মুসলমান সাম্প্রদায়িকতাও জন্মেছে। তাকে অস্বীকার করার মানেই নেই। কিন্তু একথাও অস্বীকার করা যাবে না, যে তা জন্মেছে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার প্রতিক্রিয়ায়। রামমোহন রায়ের অনেক সমালোচনা আছে, তবু একদা মুঘল বাদশাহের জন্য দরবার করতে গিয়েছিলেন ব্রিটেনে। কিন্তু মুঘল থেকে সিরাজ, সবাই শুধু মুসলমান নয়, হিংস্র, নৃশংস এবং কামতাড়িত মুসলমান শুধু, এই চিত্রটা বঙ্কিম, নবীন সেন, যদুনাথ সরকারেরা এবং আরো অগণন সেযুগের তথাকথিত শিক্ষিত বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকেরা গড়ে তুলেছিলেন।

এই ভদ্র সমাজের একটা ধারাবাহিক ঐতিহ্য আছে, দ্বিচারিতার। ১৮৫৭-এর মহাবিদ্রোহ কিংবা মূলনিবাসী মানুষদের বিদ্রোহ এঁরা সমর্থন করেননি কখনো। তাহলে যে নীলবিদ্রোহ সমর্থন করলেন? আজ্ঞে, এঁরা সব জমিদার বা তাদের পদলেহীর দল, নীলচাষে নিজেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলেন বলে, পেছন থেকে সমর্থন দিয়েছেন। তাও সক্কলে নয়। কয়েকজন। যদি সত্যিই কৃষকের জন্য, সহমর্মিতা থাকতো, তাহলে সেকালের বাংলাদেশের (বিহার ইত্যাদিও তার মধ্যে ছিল) সবচেয়ে বেশী জমিদারীর মালিক হয়ে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে কৃষকদের ঘর জ্বালিয়ে, শ্যামচাঁদের বাড়ি মেরে, খুন-জখম-ধর্ষণ করে, দিনের পর দিন চালাতে চেষ্টা করতেন না। সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক ধর্মত তখন মুসলমান। আরেকটি বৃহৎ সংখ্যা তথাকথিত হিন্দু নীচুজাত। মূলনিবাসীদেরও রক্ত-মাংস ছিবড়ে করেছেন এরাই। তাই বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ, মুসলমান ও দাগানো নীচু জাত, কোনোদিন এঁদের কোনো আন্দোলনে আসেননি। এঁরাও চাননি ঘেমো গন্ধের মানুষেরা আসুন, নিজেদের কথা বলুন।

অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায় এর। বাংলার মুসলমানেরা ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গে খুব সামান্যই অংশ নিয়েছেন। কেন নিচ্ছিলেন না তার কিছু কথা ইতিহাস ছাড়াও রবি ঠাকুরের 'ঘরে-বাইরে'-তে পেয়ে যাবেন। কিন্তু যাঁদের কথা পাবেন না, তাঁরা হলেন হিন্দুদের নীচু জাত। শরৎবাবুর রোমান্টিক দেশপ্রেমের নভেল 'পথের দাবী'-তেও অতিনায়ক সব্যসাচী চাষা-শ্রমিককে নিয়ে কাব্য বা গান করতে কবিকে বারণ করে। জাতের উঁচু-নীচু খারাপ, কিন্তু জমিদার-মিল মালিক আর চাষা-শ্রমিকের যে উঁচুনীচু তা তো আসলে বিধাতার দান। সে কথা সব্যসাচী ঘুরিয়ে বলে। বলে শিক্ষিত আর নিরক্ষরের পার্থক্য 'সত্যিকার জাত এবং ভগবানই তা তৈরী করে দিয়েছেন'।

বাবু ভদ্রদের এই চাল, মতুয়া নমশূদ্ররা একদা বুঝে নিয়েছিলেন। পূব বাংলার বিরাট কৃষক অংশ এঁরা। হরিচাঁদ বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। তাই তারা বাবুদের 'জাতীয়তাবাদী' বা 'বিপ্লবী' কোনো আন্দোলনেই আসেননি। এঁদের জন্যই ব্রিটিশের অনুগত হয়েছিলেন আরো। কারণ ব্রিটিশ তাঁদের বিদ্যালয় থেকে চাকরি সবের ব্যবস্থা করছিল। শরৎবাবুদের মতো বাবুরা, নিতান্ত জাত-পাতের নোংরাই দূর করতে পারেননি, শিক্ষা এবং অর্থের ব্যবস্থা দেবেন নীচুজাতদের?

এই শরৎবাবুই আবার 'বর্তমান হিন্দু-মুসলমান সমস্যা' প্রবন্ধে বারেবারে তুলে আনেন মুসলমানের হিন্দু মহিলা ধর্ষণ, বলপূর্বক আটক, অপহরণের কথা। অখ্যাত অনেক লেখকের এমন কথা উপন্যাসে অনেকের যথেষ্ট পড়া। কিন্তু বিখ্যাতবাবুদের কথাই বলি। শরৎবাবু কি মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'বুঢ়্‌ শালিকের ঘাড়ে রোঁ' পড়েছেন? নিজের চোখে না-হয় কিছুই দেখতে পান না, অন্যের চোখেও দেখেননি কেন? সেখানে যে জমিদার ভক্তপ্রসাদবাবুর কথা আছে পড়ে দেখেছেন? একদিকে ব্রাহ্মণ বাচষ্পতির ব্রহ্মোত্তর জমি দখল করে সে, অন্যদিকে মুসলমান কৃষক হানিফের বিবি ফতেমাকে ফসলিয়ে বা তুলে এনেও নিজের যৌন কামনা/লালসা মেটাতে চায় পড়েননি? মানে এগুলো কখনো ঘটেনি না?

এভাবেই ইউরোপিয়দের চোখে আরবকে দেখে বিপুল যৌন কামনার ধারণা এখানে চলে আসে। জেমস মিলের থেকে যদুনাথে চলে আসে 'মুসলমান যুগ' ইতিহাসে। মুসলমান যুগ তো এসবেরই যুগ হয়ে যায়। আড়ালে চলে যায় কত কিছু। স্রেফ একটা উদাহরণই দিই। অথর্ববেদের ৬/২/৩ অংশে আছে 'নারী শিশু অন্য কোথাও জন্মাক/এখানে শুধু পুরুষ শিশুদের জন্ম নিতে দাও'। ভ্রুণহত্যা, জন্মানো শিশু নারী হত্যা, সতী, দেবদাসী কত হাজার হাজার বিকৃতপন্থা নিয়েছে এদেশে ব্রাহ্মণ্যবাদ নারী খুন করতে? আর এই বাংলার বাল্যবিবাহ? কুলীনগিরি রাখতে আর জাত রাখতে একেকজনের একশো-দুশো বিয়ে? অকাল বৈধব্য আর কাশী-বারাণসীতে যৌনকর্মীর ভিড় জমা? বৃন্দাবনে? মহর্ষি বলে পরিচিত ব্যক্তিত্বের ঐ অতো সন্তান? একজন নারীকে কত কষ্টই না সইতে হয়েছে অত সন্তানের জন্ম দিতে!

থাক। অন্য কথা বলি। মুসলমান কি নিখুঁত? না নয়। পৃথিবীতে যে-কোনো ধর্ম যখনই সম্পদ আর ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয় তা জন্ম দেয় নৃশংস স্বৈরতন্ত্রের, পুরুষের স্বৈরতন্ত্রের। এই ধরণের সব ধর্মের 'এপস্টাইন ফাইল' খোলা যায় কোটি কোটি। প্রত্যেক জায়গায় ধর্মের জুজুতেই দরিদ্রকে শোষণ করে ধনীরা। সব মুসলমানদের দেশ ইউনাইটেড আরব এমিরেটস হয়ে যায়নি। ওখানেও শ্রেণীবৈষম্য আছে। কিন্তু ফুটপাথে উদলা পড়ে থাকা শিশুদের দেশ ওটা এখনো নয়। তেলের টাকা এখনো কিছু সামাজিক রক্ষাকবচ রেখেছে। যেদিন তেল ফুরোবে সেদিন বাকী দ্বন্দ্বটা উদলাও হবে। ঐস্লামিক সাম্প্রদায়িকতাও ছাড় দেবার বস্তু নয়, যখন তা অন্যকে আক্রমণ করে।

কিন্তু কথা তো সেটা নয়। আমরা শুধু মুসলমান ভোটার তাড়াচ্ছে এইটাকেই সামনে রাখছি কেন? যারা বিজেপি-র বিরুদ্ধে তাঁরা কেন ভাবতে পারছেন না, একইভাবে আক্রান্ত যে যেখানে দুর্বল সেই-ই? যেখানেই বিজেপি-র ভোট কম সেখানেই ধরে ধরে নাম কাটার কাজ করেছে নির্বাচন কমিশন বিজেপি-কে জেতাতে। তা করতে গিয়ে তথাকথিত 'হিন্দু' বাদ গেলে, বিদেশী বলে বিতাড়িত হলে, যাক। ওদের জিততেই হবে।

এবং মনে রাখবেন এসব হতে দিলে এ শুধু শুরু মাত্র। প্রথমে মুসলমান, তারপরে তথাকথিত নিম্নবর্ণ। কারণ তারা আসলে একই। কেন জানেন? মজার এবং ঢপের নৃতত্ব চর্চা হয়েছিল একদা মডার্ন রিভিউ-তে। তাতে বর্ণহিন্দু লেখক যতীন্দ্র মোহন দত্ত (খণ্ড ৪৯-এ) লিখেছিলেন 'হু দি বেঙ্গলি মোহাম্মাডান্‌স আর' প্রবন্ধে , উত্তরবঙ্গের কোচ আর মুসলমানদের চেহারা এক। পূর্ব বাংলায় আবার মুসলমানদের সঙ্গে পোদ ও চণ্ডালদের মিল। মানে তথাকথিত অন্তজরা (যাদের অনেকেই একদা ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়েছেন, যেমন একদা বৌদ্ধও থেকে থাকতে পারেন) নজরে ছিল।

এই অন্তজদের এবং উপজাতিদের, ভদ্রবাবুরা দু'ভাবে ব্যবহার করেন। সচরাচর পায়ের নীচে রাখেন। কিন্তু মুসলমানের বিরুদ্ধে লড়তে আবার এঁদেরই কাজে লাগান, খানিক আমরা তো একই ধর্মের বলে। যেদিন মুসলমান সরে যায়, সেদিন এঁদের মার খাবার পালাটা আরো বেশী করে চোখে পড়ে। বর্তমান ভারতের গুজরাট এমন নিম্নবর্ণদের শিক্ষা দেবার ও ব্যবহার করার গবেষণাগার।

ভাই ও বন্ধু সুরজিৎ গোস্বামী, আপনার পাশে এখন উচ্চবর্ণ হিন্দু, 'সংস্কৃতিবান ভদ্রলোক', এইসব ঐতিহাসিক কারণেই থাকতে পারেন না। তাঁদের বৃহদাংশই এখনো শীতল নীরবতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন কেন? কারণ পূর্বজদের তো এইটাই শিক্ষা, এইটাই তো তাঁদের ইতিহাস। নাচ-গান-নাটক-যাত্রা-লেখা-সিনেমা-চাকরি-ব্যবসা-দালালি সব করে চলছেন তাঁরা। কী এক তুচ্ছ দেড় কোটির কাছাকাছি মানুষ বাদ পড়ছেন, তাতে তাঁদের যায় আসে না। আর একাংশ 'বিশ্বাস' করেন, সব ভালোয় ভালোয় মিটে যাবে, আমরা মিছেই চেঁচাচ্ছি। আরেকাংশ তৃণমূল-কংগ্রেস-সিপিআই(এম) হয়ে নিজেদের মধ্যে এখনো খুবলো-খুবলিতে মত্ত। ভাঁড় মে যায় ভারত, ভাঁড় মে যায় বাংলা, ক্ষমতার ভাগ কাউকে দেবো না, এই তাঁদের একমাত্র জপের মন্ত্র।

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কিছু মানুষ শুধু সুরজিৎ-এর বন্ধু এখন। তাঁদের 'রাজনীতি' আছে, 'রাজনৈতিক দল' নেই। তাঁরা তাঁকে ভোলেন না। সুইটিরা যে এখনো বাংলাদেশে পড়ে আছেন, ভোলেন না। তালিকায় নাম থাকলেও নিয়ে তাঁরা আহ্লাদিত নন। কারণ জানেন, যে কেউ, কোনো একজনও যদি, ভোটাধিকারে এবং নাগরিকত্বে বঞ্চিত হন, তাহলেই তাঁদের 'পরাজয়'। তাঁরা জানেন নতুন নাৎসি বিজেপি-র বানাতে চাওয়া কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে তাঁদের থাকার দূরত্ব বেশী নয়।

তাঁরা লড়বেন সুরজিৎ। যেভাবে পারবেন লড়বেন অহিংস রাস্তায়। তাই তাঁরা 'সারা বাংলা বিচারাধীন ভোটার মঞ্চ' থেকে ডিলিটেড, ফর্ম ৬ জমা না নেওয়া, ফর্ম ৭-এ বাদ যাওয়া, বিচারাধীন সব ভোটারের হয়ে গেছিলেন নির্বাচন কমিশনে সোজা প্রশ্ন করতে এবং দাবী জানাতে। গেছিলেন ৭ইমার্চ, ২০২৬-এ। আত্মহত্যা নয়, লড়াই - এই তাঁদের ডাক। মরার আগে মরছি না ভাই, এমনটাই ভাবেন তাঁরা। মরে গেলেই তো ওদের জয়। সুইটি থেকে সুরজিৎ লড়াইটা চলবেই।

 

0 Comments

Post Comment