পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

কেন্দ্রের নয়া শ্রমবিধির বিরুদ্ধে কেন ১২ ফেব্রুয়ারি শিল্প ধর্মঘট

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 202 view(s)
  • লিখেছেন : নোটন কর
শ্রমিকবিরোধী শ্রমকোড বাতিলের দাবিতে শ্রমিকশ্রেণির ঐক্যবদ্ধ লড়াই ছাড়া বিকল্প পথ নেই। কয়েক বছর আগে দিল্লির কৃষক আন্দোলন সেই শিক্ষা দিয়েছে। সেই জায়গা থেকেই ১২ ফেব্রুয়ারি শিল্প ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের পক্ষে।

নতুন চার শ্রমকোড কার্যকর হয়েছে গত ২১ নভেম্বর। কেন্দ্র সরকার পুরনো ২৯টি শ্রম আইনকে মিশিয়ে দিয়ে শ্রমিক কর্মচারীদের জন্য নতুন চার শ্রমকোড তৈরি করেছে। চার বিধি হল (ক) মজুরি বিধি সংক্রান্ত কোড (খ) শিল্পক্ষেত্রে সম্পর্ক বিধি (গ) সামাজিক সুরক্ষা বিধি এবং (ঘ) পেশাগত সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও কাজের পরিবেশ সংক্রান্ত কোড। মজুরি সংক্রান্ত বিল ২০১৯ সালে মহামারীর সময় বিনা বাধায় পাশ হয় সংসদে। বাকিগুলি পাশ হয় পরের বছর ২০২০ সালে। ওই তিনটি বিলও একপ্রকার বিনা বাধাতেই রাজ্যসভায় পাশ করিয়ে নিয়েছিল কেন্দ্র। ওই সময় সংসদের বাইরে কৃষি বিলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন বিরোধীরা। তখন প্রায় ‘বিরোধীহীন’ রাজ্যসভায় তিনটি শ্রমকোড বিল কৌশলে পাশ করিয়ে নেয় কেন্দ্র।

কেন্দ্র আগেই জানিয়েছিল, তারা শ্রমক্ষেত্রে সংস্কারের জন্য শ্রমবিধি চালু করছে। যদিও কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য, পুরনো দিনের শ্রম আইনগুলিকে যুগোপযোগী করার জন্যই এই সংস্কার করা হয়েছে।  কিন্তু নয়া চার শ্রমবিধি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বিস্তর। এই নয়া চার শ্রমবিধির মাধ্যমে শ্রমিকদের স্বার্থকে অবহেলা করা হয়েছে বলে ট্রেড ইউনিয়নগুলি অভিযোগ তুলেছে। তাদের অভিযোগ নয়া শ্রমবিধির ফলে ৭০ শতাংশ শ্রমিক শ্রম আইনের বাইরে চলে যাবেন এবং মালিকরা অবাধে শ্রমিক ছাঁটাই, লে-অফ, লক-আউট ইত্যাদি করবে।

নতুন শ্রম আইনে মজুরি বিধিতে ন্যূনতম দৈনিক মজুরির (ফ্লোর ওয়েজ) কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকার দৈনিক মজুরি নির্ধারণ করেছে ১৭৮ টাকা। ১৯৪৮ সালে গঠিত ফেয়ার ওয়েজ কমিটি সুপারিশ করেছিল শ্রমিক-কর্মচারীদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে পরিবার নিয়ে বাঁচার মতো ভিত্তিতে। কিন্তু বিধিতে আমরা বিপরীত প্রক্রিয়াই দেখতে পেলাম। এখানে উল্লেখ্য ২০১৭ সালে কেন্দ্রীয় সরকার ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য ডঃ অনুপ শতপথীর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেছিল। এই কমিটি দৈনিক মজুরি ৩৭৫ টাকা এবং মাসে ১৪৩০ টাকা ঘর ভাড়া দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছিল। বলা বাহুল্য সরকার তা মানেনি। বিধিতে বলা হয়েছে শ্রম দিবস হবে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা, কিন্তু সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা। এর ফলে মালিকরা আইনের সুযোগ নিয়ে শ্রমিকদের এক কর্মদিবসে ১২ ঘণ্টা কাজ করাতে পারবে। অন্যদিকে তিনটে শিফটের কাজ দুটি শিফটে করিয়ে শ্রমিক ছাঁটাই এর পথ মালিকদের জন্য আরো সহজ হবে।

শিল্পক্ষেত্র সম্পর্ক বিধিতে (দি ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশন কোড ২০২০) ফিক্সড টার্ম এমপ্লয়মেন্টের কথা বলা হয়েছে। ফিক্সড টার্ম এমপ্লয়মেন্ট অনুযায়ী শ্রমিকরা মালিকের সাথে একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কাজের শর্তে চুক্তিবদ্ধ হবেন। মেয়াদ পূরণের পর তারা চাকরি থেকে ছাঁটাই হবেন। তাদের ন্যূনতম সুযোগ সুবিধা থাকবে না। শিল্প সংক্রান্ত কোডে প্রকারান্তরে বলা হয়েছে শ্রমিক কর্মচারীদের ধর্মঘট করা বেআইনি। কোনও শিল্প বা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট করতে হলে ১৪ দিন আগে শ্রমিকদের নোটিস দিতে হবে। পুরনো আইনে অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা ক্ষেত্র বাদে আর কোথাও ধর্মঘট করার জন্য নোটিস দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল না। এখন ধর্মঘট করলে তা বেআইনি ঘোষণা করা হবে এবং শ্রমিকদের শাস্তি পেতে হবে। বিধিতে এ-ও বলা হয়েছে বিরোধ বিষয়ে সরকারের শ্রম দপ্তরের পক্ষ থেকে আলোচনা শুরু হলে যত দিন আলোচনা চলবে ততদিন ধর্মঘট করার কোনও অধিকার শ্রমিকদের থাকবে না। বিধিতে বলা হয়েছে, অর্ধেকের বেশি শ্রমিক একযোগে ছুটি নিলে তা ধর্মঘট হিসেবে বিবেচিত হবে এবং মালিক এর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে। পুরনো ধারায়, ১০০ বা তার বেশি শ্রমিক যুক্ত কারখানায় লে-অফ, ছাঁটাই এবং ক্লোজার করার জন্য সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া আবিশ্যকতা ছিল। নতুন কেন্দ্রীয় বিধি অনুসারে, এখন সংস্থার ৩০০-র কম কর্মী থাকলে, তারা সরকারকে না জানিয়েই ব্যবসাপত্র উঠিয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ, এ ক্ষেত্রে কোনও সংস্থা বা কারখানা সাময়িক ভাবে বা সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ করে দিতে হলে সরকারি নিয়মনীতির আর তোয়াক্কা মালিকপক্ষকে করতে হবে না। পুরনো নিয়মে কোনও সংস্থায় ন্যূনতম ১০০ জন কর্মী থাকলেই, ওই সংস্থায় ‘স্ট্যান্ডিং অর্ডার’ কার্যকর হত। এ বার নয়াবিধিতে ন্যূনতম কর্মীসংখ্যা বাড়িয়ে ৩০০ করা হয়েছে। ‘স্ট্যান্ডিং অর্ডার’ বলতে বোঝায়, কোনও কর্মীকে কাজ থেকে বরখাস্ত বা সাসপেন্ড (নিলম্বিত) করার সময় নোটিস ধরানো। নয়া বিধিতে ‘স্ট্যান্ডিং অর্ডার’ কার্যকর হওয়ার জন্য সংস্থার ন্যূনতম কর্মীসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় মালিকপক্ষই সুবিধা পেয়ে যাবে। এর ফলে মালিকপক্ষর কাছে কোনও কারণ ছাড়াই কর্মীদের বরখাস্ত বা সাসপেন্ড করার সুযোগ আরও বেড়ে যাবে। বিধি অনুসারে নতুন ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও মালিক পক্ষের সাথে দর কষাকষি আরো কঠিন হয়ে ওঠবে। কারখানা পরিদর্শকদের (ইন্সপেক্টর) ক্ষমতা খর্ব করে দেওয়া হয়েছে। আজকের শ্রম-বাজারে যে শ্রমিকদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি চর্চা হয় সেই পরিযায়ী ও গিগ শ্রমিকরা নতুন বিধি অনুসারে প্রথাগত মালিক-শ্রমিক সম্পর্কের বাইরে থেকে যাবেন। তাদের কোনো আইনি অধিকার ও সুরক্ষা বিধি থাকবে না। নারী শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা শিখিল করা হয়েছে। বিপজ্জনক কাজে রাতের শিফটে এখন তাদের দিয়ে কাজ করানো যাবে। নারী কর্মীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ও অন্যান্য সুবিধা হ্রাস করা হয়েছে।

নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য এবং কল্যাণ বিষয়ক ব্যবস্থা পাওয়ার অধিকারের সীমা এমনভাবে রাখা হয়েছে তাতে পুরনো শ্রমআইনে যেটুকু ব্যবস্থা নেওয়ার বাধ্যতা নিয়োগকারীর ছিল, নতুন বিধিতে নিয়োগকারী তা সহজেই এড়িয়ে যেতে পারবে।  নতুন কোডে ফ্যাক্টরি বা কারখানার সংজ্ঞায় পরিবর্তন এনে বিদ্যুৎ ব্যবহৃত সংস্থায় সর্বনিম্ন শ্রমিক সংখ্যা ১০ থেকে ২০ এবং বিদ্যুৎ ব্যবহৃত না হওয়া সংস্থায় সংখ্যা ২০ থেকে ৪০ এ বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলস্বরূপ, অনেক ছোট শিল্প সংস্থাকে এখন কারখানা হিসেবে গণ্য করা হবে না। ফলত শ্রমিকরা ফ্যাক্টরি আইন অনুযায়ী স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও কল্যাণমূলক সুরক্ষা, পিএফ ইএসআই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন।

শ্রমকোড চালু হওয়ার সাথে সাথে বাণিজ্য ও শিল্প সংস্থার কর্তারা একে শ্রম আইনের নজিরবিহীন সংস্কার বলে স্বাগত জানিয়েছেন অন্যদিকে দেশের শ্রমিক সংগঠনগুলি নতুন শ্রমবিধিগুলি ‘শ্রমিকবিরোধী’ বলে অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, এর ফলে শ্রমিকদের বঞ্চিত করে নিয়োগদাতা সংস্থাগুলির সুবিধা করে দেওয়া হচ্ছে। শ্রমিক বিরোধী এই শ্রমকোডের বিরুদ্ধে দেশের কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন সহ অন্যান্য শ্রমিক সংগঠন যৌথভাবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী শিল্প ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। বিজেপির শ্রমিক সংগঠন ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘ স্বাভাবিকভাবে নয়া শ্রমবিধিকে স্বাগত জানিয়েছে। আমাদের রাজ্যে শাসকদল ও তাদের ট্রেড ইউনিয়ন আইএনটিটিইউসি মুখে শ্রমকোডের বিরোধিতা করেছে কিন্তু কাজে ধর্মঘটের বিরোধিতা করে। 

শ্রমিকবিরোধী শ্রমকোড বাতিলের দাবিতে শ্রমিকশ্রেণির ঐক্যবদ্ধ লড়াই ছাড়া বিকল্প পথ নেই। কয়েক বছর আগে দিল্লির কৃষক আন্দোলন সেই শিক্ষা দিয়েছে।

 

 

লেখক গণ আন্দোলনের কর্মী।

0 Comments

Post Comment