–ফটো দেখে কি আসল চেহারা বোঝা যায়? এখন তো দেখতে গেলেও বিউটি পার্লারের কেরামতি। এই বলে লখাই আদরিনীর ঠোঁটটা টিপে বলে, 'এটাই হলো মেয়ে দেখা। একেবারে একশো ভাগ খাঁটি। কোনো ভেজাল নেই।'
–ধ্যাৎ। ছাড় তো। আমি কি সুন্দর?
–তুই আমার হেমা মালিনী।
–তুমি কি ধর্মেন্দ্র?
লখাই ওকে জড়িয়ে ধরে বলে–আমি উত্তমকুমার।
এ দৃশ্যটির স্থায়িত্ব মিনিট খানেক। আর তারপর আগের পজিশনে দাঁড়িয়ে লখাই পূর্ব প্রসঙ্গে ফিরে যায়, 'দেনা পাওনার কী হ'ল তাই বল।'
'বাবার কোনো দাবি ছিল না' -আদরিণী জানায়। তাছাড়া আমাদের বংশে কেউ
কোনোদিন ছেলের বিয়েতে পণ নেয় নি, যদিও আমাদের ঘরের অবস্থা মোটেই ভালো না। নইলে আমি কেন বাবুদের বাড়িতে কাজ করতে যেতাম? সেই বারো বছর বয়স থেকে বাবুদের বাড়িতে কাজ করছি। ঐ একটা বাড়িতেই। এখন তো ওদের ঘরের মেয়ের মতো হয়ে গেছি। দাদা তো একটা মুদি দোকানে কাজ করে। মা বাবা ঘরেই থাকে। একটু চাষের জমি আছে–এটুকুই যা সম্বল। তবুও বাবা পণের বিরুদ্ধে।
মেয়ের বাবাকে সাফ জানিয়ে দিয়ে বাবা বলেছিল, 'পণের কথা বললে আপনি আসতে পারেন। এখানে হবে না।'
মেয়ের বাবা জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'গয়নাগাটি'?
–'মেয়ের গায়ে এখন যা আছে তাই পরিয়ে পাঠাবেন। আমরাতো মেয়েকে সাজিয়ে রাখতে আনবো না। তবে আর গয়না কিসের। বেনারসিই বা কেন! আটপৌরে শাড়ি পরিয়েই বিয়ের পিঁড়িতে বসাবেন। তাতে যদি আপনার সম্মানে লাগে না হয় একটু দামি শাড়িই দেবেন।'
---জামাইকে কী দিয়ে আশীর্বাদ করবো?
---একটা এক টাকার কয়েন।
–তাই কি হয়।
তবে ইমিটেশনের আংটি বা চেন দিয়ে আশীর্বাদ করবেন। সোনা তো নয়ই–রূপো দিয়েও নয়।
মেয়ের বাবা এবং সঙ্গে যাঁরা এসেছিলেন-মুখ চাওয়া চাওয়ি করলেন।
মেয়ের বাবা শেষে বললেন আপনি যখন বলছেন তবে তাই হবে।
আদরিনীর কাছে সব বৃত্তান্ত শুনে মূর্খ লখাই বুঝতে পারে আদরিনীর বাবা সদাশিব মানুষ। অতএব তার মেয়েকে বিয়ে করলে নিশ্চয়ই ওরা মেনে নেবে। কিন্তু তার দাদা? দাদা যদি মেনে না নেয়! লখাই মনে মনে একটু শক্ত হয়ে ভাবে, 'না মানলে কী হবে। পৈতৃক সম্পত্তিতে তারও তো অর্ধেক অধিকার আছে। দরকার হলে আলাদা হয়ে যাবে। আলাদা সংসার পাতবে।'
কিন্তু খাওয়াবে কী? লখাই এবার ভবিষ্যৎ ভাবতে শুরু করলো। নাঃ গাছে গাছে ঘুরে বেড়ালে হবে না। রোজগারের কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে। কী করবে! কোথায় কাজ পাবে! কে কাজ দেবে তাকে!
দশ কাঠা জমির ওপর ওদের বাড়ি এবং বাগানবাড়ি। লখাইয়ের প্রাপ্য পাঁচ কাঠা। তার কিছুটা বিক্রি করে সে একটা দু'কামরার ঘর বানিয়ে একটায় পান বিড়ির দোকান করবে। তারপর যা হবার হবে। লখাই বেশি গভীরে আর ভাবতে চায় না।
লখাই আর আদরিণী এখন রূপেনের বিয়ের দিন ধার্য্য হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকে।
দিন সাতেকের মধ্যে ঠিক হয় আগামী পনেরোই ফাল্গুন রূপেনের বিয়ে। খবরটা আদরিনী চটজলদি লখাইকে জানিয়ে বাবুদের বাড়িতে কাজ করতে চলে যায়। তারপর দিন চারেক আদরিণীর আর দেখা নেই।
কী হল! জানবেই বা কী করে! লখাইয়ের মন খারাপ। কিছু অঘটন হয়নি তো? কোনো কিছুতেই তার মন বসছে না। রূপেনদের পাড়ায় বেশ কয়েকবার গিয়েও কিছু জানতে পারে নি। কাকে জিজ্ঞেস করবে! ওর সেই পরিচিত ছেলেটিরও দেখা পাচ্ছে না। এইভাবে চরম অস্বস্তিতে কাটলো চার পাঁচটা দিন। মানে বিয়ের আর পঁচিশ দিন বাকি। ঠিক সেই সময় এক বিকেলে সেই পুকুরের রাস্তায় আদরিনীকে দেখতে পায়।
তখনও পুকুরে পৌঁছাতে একটু পথ বাকি। দূর থেকে দেখে প্রায় ছুটে আসার মতো হাঁটতে হাঁটতে লখাই আদরিণীর পথ আটকে দাঁড়ায়। বলে, 'এতদিন কোথায় ছিলি?'
ওদের মধ্যে এখন অনেকটাই বেপরোয়া ভাব। আর তো কয়েকটা দিন। যে যা ভাববে ভাবুক। আর শরম নয়। আদরিনী জানায়,, সে বাবার সঙ্গে আত্মীয়দের বাড়িতে নেমন্তন্ন করতে গিয়েছিল। তাড়াহুড়োতে খবর দেওয়া হয় নি।
লখাই নিশ্চিন্ত হয়। যাক্, আদরিণী পাল্টে যায়নি। ঠিকই আছে। সে বলে, 'দাদার বিয়ের আনন্দে আমাদের কথাটা ভুলে যাস না। এবার আমাদেরও তৈরি হতে হবে।'
-–তা আর বলতে! কিন্তু উপায়টা তো তোমাকেই বের করতে হবে। আমি তোমার সঙ্গে যাবো। নিয়ে তো যাবে তুমি। তাই কীভাবে নিয়ে যাবে তা তোমাকেই ঠিক করতে হবে।
–সেসব হবে। তবে তোকে যা যা বলবো তাই করবি তো?
–পারলে করবো।
আদরিনী পুকুর ঘাটে যাবার আগে লখাইকে বলে যায়, 'কাল সকালে ঐ হাই স্কুলের সামনাসামনি তুমি আসবে। আরও কথা আছে।'
(৭)
যথাসময়ে লখাই এসে হাজির গেটের সামনে। একটু পরে আদরিনীও। এসেই আদরিনী বলে, 'জানো, এক আত্মীয়ের বাড়িতে আমার বিয়ের ব্যাপারে বাবার সাথে ওরা কথা বলছিল। ওদের দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের নাকি বড় ছেলে রেলে কাজ করে। দেখতে শুনতে ভালো। একটিই ছেলে। মেয়ে নেই। ওদের কোনো দাবিও নেই। আমাকে নাকি ওদের খুব পছন্দ। বাবা বলেছে ছেলের বিয়েটা পার হোক। তারপর কথাবার্তা হবে। আমার আপত্তি নেই।'
কথাটা শুনে লখাই হাসতে হাসতে বলে, 'ঠিকই তো। আগে রূপেনের বিয়েটা হোক। তারপর বুঝিয়ে দেবো কত ধানে কত চাল। আমার নাম লক্ষ্মণ। আমাকে চেনে না তো। কথাবার্তা বলবে কী, তার আগেই কথা বলার রাস্তাটা বন্ধ করে দেবো। তুই শুধু ঠিক থাকিস।'
আদরিনী বলে, 'আমাকে নিয়ে ভেবো না। রেল হোক্ আর উড়াকল, আমাকে টলাতে পারবে না। তবে তুমি তাড়াতাড়ি একটা ব্যবস্থা করো। ওরা যেন কোনো সুযোগই না পায়।
-– আমি তৈরি আছি। সব প্ল্যান আমার পাক্কা।
-–কী প্ল্যান শুনি।
-–এখন বলবো না। তুই ভাবতে থাক। মজা আছে।
এইভাবে পুকুর ঘাট, গলিঘুঁজি, ব্রীজের ফুটপাত, গাছতলা, ঝোপঝাড়, কাকভোর, দুপুর এবং সন্ধ্যাবেলা তারা দুজন রঙিন স্বপ্ন নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কখন যেন পৌঁছে গেলো ফাগুনের পনেরোয়।
প্যান্ডেল, রকমারি লাইট, আত্মীয়স্বজনের কোলাহল এবং সবশেষে মাইক ও বাজনায় ভরে গেল উপেনের ঘর।
ঘরের মুখোমুখি একটা ঘেরা দেওয়া জায়গায় ভোজের আয়োজন। এই বিয়ে উপলক্ষে অনেক আগন্তুকের মধ্যে আদরিনীর মাসতুতো বোন 'সুজাতা'র আগমন আদরিনীকে সবচেয়ে বেশি খুশি করেছিল। তার সঙ্গে যখন-তখন সে বেরিয়ে পড়ে এখানে ওখানে। আজ আর তার কোনো বাঁধন নেই। বাড়িতে এখন 'আমরা সবাই রাজা'।
সুজাতাকে ওদের বাড়ির লোক 'সুজি' বলে ডাকে। ঘরে ঠিক আছে। কিন্তু ভিন জায়গায় সুজি বলে ডাকলে ওর রাগ হয়। সুজু বললেও না হয় ঠিক আছে। কিন্তু 'সুজি'!
আরে বাবা তাই কি হয় নাকি। ঘরের লোক কি অতই বোকা। এখানে কেউ ওকে সুজি বলে ডাকে না সুজাতাই বলে। খুশি হয় মেয়েটি।
সুজাতার মোবাইল আছে। স্মার্ট ফোন। সারা পৃথিবীটা যেন ওর মধ্যে ঢুকে আছে। পৃথিবী কেন, বলা যায় ত্রিভুবন। আদরিনী সেই মোবাইল থেকে কত কী যে দেখে! অবাক লাগে তার। এমন তো সে কখনোই দেখেনি। জিজ্ঞেস করে কত টাকা লেগেছিল রে?
-–বারো হাজার।
-–অ্যাতো দাম!
আদরিনী ভাবে, 'লখাইয়ের একটা ফোন থাকলে এই সুযোগে আলাপটা ওর বেশ জমিয়ে করা যেতো।'
সে গুড়ে বালি। কী করা যায়।
সুজাতা থাকে রাঁচিতে। ওর বাবা সেখানে চাকরি করে। ভালো মাইনে পায়। অভাব তো নেই, বরং প্রয়োজনের চেয়ে বেশিই রোজগার করে। তাই সুজাতার কাছে মোবাইল। এতে আশ্চর্য হবার কী আছে।
সুজাতারও বয়ফ্রেন্ড আছে রাঁচিতে। বছর তিনেকের সম্পর্ক। আদরিনী জানে। সুজাতাই গত বছর যখন এসেছিল, সব বলেছিল তাকে।
আদরিনী তাই মনে মনে ঠিক করলো, এবার তার প্রেমের কাহিনীও সে সুজাতাকে জানাবে। জানিয়ে একটু বেশিই আনন্দ পাবে সে। দ্বিতীয় কাউকে না জানালে যেন দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রেমের হাওয়াটা বেশি বেশি করে মাখতে হলে তৃতীয় পক্ষের উৎসাহ প্রয়োজন বৈকী।
একদিন বলেই ফেললো সে। আর সঙ্গে সঙ্গে সুজাতা ওর গায়ে ঢলে পড়ে বললো 'দারুন কান্ড করেছিস। তোকে সাব্বাস। তো, ছোকরাকে দেখাবি না?'
–দেখাবো! দেখাবো।
–কবে?
–বৌভাতের দিন।
(৮)
বৌভাতের দিন পর্যন্ত আর অপেক্ষা করতে হল না। পনেরোই ফাল্গুন মানে আদরিনীর দাদা রূপেনের বিয়ের দিন সকাল থেকেই লখাই বিয়ে বাড়ির আশেপাশে ঘোরাঘুরি শুরু করে দিয়েছে। বিয়ে বাড়ি তো। কত লোকই আসা যাওয়া করছে। কে কার খোঁজ রাখে। এই ভেবে লখাই প্রায়ই ঐ রাস্তায় আনাগোনা করতে থাকে। উদ্দেশ্য আর কিছু না, আদরিনী কখন ঘর থেকে বেরোবে, কত সেজেছে, কত ব্যস্ত আছে এইসব দেখার ইচ্ছে।
একবার দুবার তিনবার না। অনেক মেয়েই আসা যাওয়া করছে কিন্তু আদরিনী আর বের হয় না। তর সইছে না লখাইয়ের। কী করছে কী আদরিনী ঘরের মধ্যে। ঘরের যাবতীয় কাজের ভার কি ওর ওপরেই। দরজাটার সামনেও তো একবার আসতে পারে।
এইসব ভাবতে ভাবতে চতুর্থ বার সে যখন ওদের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ট্যাক্সির এক সাইডে গিয়ে দাঁড়ায়, ঠিক সেই মুহূর্তে আদরিনী ঘর থেকে বের হতে গিয়েই ওকে দেখতে পায়। আর তৎক্ষণাৎ একটা মুচকি হাসি দেখিয়ে দিয়েই সে ঝটপট ভেতরে চলে যায়।
'যাঃ বাবা। এটা কেমন হল। একটু দাঁড়ালোও না। কেমন সাজগোজ করেছে, ভালভাবে দেখতেও পেলাম না। আর কি বেরোবে এখন?' হতাশ হয়ে লখাই ট্যাক্সি চালকের সাথে কী সব কথা বলতে থাকে।
কী কথা বলে ড্রাইভারের সাথে? ড্রাইভার কি তার পরিচিত? না, তা মোটেই নয়। কোনোদিন তার সাথে তার দেখাই হয়নি। এবার সে পরিচয় করে নিচ্ছে একমাত্র সময় কাটানোর জন্য।
তোমার নিজের ট্যাক্সি? নাকি ভাড়ায় চালাও?
কোথায় বাড়ি তোমার?
সারাদিন কত রোজগার হয়?
এখন তো ডিজেলের দাম অনেক বেড়েছে। পোষায়?
আচ্ছা, এটায় ক'জন বসতে পারবে? এইরকম অজস্র প্রশ্ন লখাইয়ের।
ট্যাক্সি ড্রাইভার বিরক্ত হয় না। ওকেও তো চুপচাপ বসে থাকতে হবে। সেই বিকেল চারটেয় গাড়ি ছাড়বে। বরযাত্রী যাবে মোটামুটি সেই সময়। অতএব কথা বলার কেউ থাকলে তারও সময় কাটাতে সুবিধে হয়। তাই দুজনের আলাপ বেশ জমে ওঠে।
আলাপচারিতার মধ্যেই লখাইয়ের নজর ঐ বিয়েবাড়ির ঘর, ঘরের লোকজনের দিকে।
সেই সঙ্গে অপেক্ষা, উৎকণ্ঠা।
এদিকে, আদরিণী ঘরে গিয়েই সুজাতার হাত ধরে টেনে বলে, 'দিদি! আয়, তোকে একটা জিনিস দেখাবো।'
সুজাতা তখন মাছ কাটছিল। বললো-দাঁড়া। মাছটা কেটে নিই।
–পরে কাটবি। এখন চল তো।
মাসি বলে ওঠে, 'কী এমন জিনিস যে এখুনি যেতে হবে।' বিয়ে বাড়িতে কত কাজ। কাজ ছেড়ে এবার যেন সার্কাস দেখতে যাবে। একটু পরে যাবি। মাছ কাটাটা শেষ হোক্। তারপর যত খুশি দেখে বেড়াবি।'
আবদারের সুরে আদরিনী বলে, 'মাসি। অমন কোরো না। তুমি একটু কেটে দাও। আমরা এক্ষুনি আসছি'। এই বলে কোনো তোয়াক্কা না করেই সুজাতার হাতটা টেনে উঠিয়ে দিয়ে টানতে টানতেই 'চল ও এসেছে' বলেই ঘরের বাইরে বেরিয়ে যায়।
–ঐ দেখ। ড্রাইভারের সাথে কথা বলছে।
–বাঃ! খুব হ্যান্ডসাম তো। ভালো চয়েস করেছিস। তারপর সুজাতা বলে, 'চল্। ড্রাইভারের কাছে যাই।'
-–অমন কাজ করিস না দিদি। বিপদে পড়বো।
–'কিচ্ছু হবে না। ভয় করিস না। আমি রাঁচির মেয়ে। ফন্দি ফিকির সব বিষয়েই ওস্তাদ। চল তো।' -এই বলে দুজনে সোজা ট্যাক্সির কাছে।
লখাই আর ড্রাইভার তখন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
লখাই তো অবাক। কী করতে এলো রে বাবা। একেবারে হাতের কাছে। লখাইয়ের আনন্দ যেন উথলে উঠছে। ওদের দেখে দুজনই চুপচাপ।
সোজা ড্রাইভারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সুজাতা ড্রাইভারকে বলে–গাড়িটা একটু সরিয়ে রাখা যায় না।
–কেন দিদিমণি, কোনো অসুবিধা হচ্ছে।
–না না, তা বলছি না। আসলে গাড়ি তো সেই বিকেলে ছাড়বে। তাই বলছিলাম, একটু ফাঁকা জায়গায় রাখলেই ভালো হতো। অসুবিধা থাকলে দরকার নেই। এখানেই থাক্, বলেই সুজাতা পাশের ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করে ড্রাইভারকে বলে 'এ কি তোমার হেল্পার?'
–না না। এ কেউ নয়। এমনি কথা বলছিলাম।
সুজাতা তখন সরাসরি ছেলেটিকেই জিজ্ঞেস করে, 'তুমি কি বিয়ে বাড়িতে এসেছো?'
লখাই আদরিনীর দিকে তাকায়। ওর মনোভাব বোঝার চেষ্টা করে। আদরিনী মুচকি মুচকি হাসে। তারপর সুজাতাকে বলে, 'চল তো দিদি। কী যে করিস।’
সুজাতা বলে, 'তুই থাম তো, বিয়ে বাড়ি। কে কী উদ্দেশ্যে আসছে জানতে হবে না।'
তারপর ছেলেটির কাছে দ্বিতীয়বার ঐ একই কথা জানতে চায়।
লখাই বলে, 'কেন। আমাকে কি চোর গুন্ডা মনে হচ্ছে? আমার বন্ধু থাকে এই পাড়ায়। তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম।'
– বন্ধু। নাকি বান্ধবী!
আবার আদরিনীর আপত্তি, 'চল না দিদি। ওর বন্ধু থাক্ আর বান্ধবীই থাক্, আমাদের কী!'
–তোর গায়ে লাগছে কেন। তোর জানাশোনা নাকি?
এইভাবে ড্রাইভারকে বাদ দিয়ে তিন জনের মজা মস্করা শুরু হয়ে যায়। আর ঠিক সেই সময় রূপেন বেরিয়ে আসতেই দৃশ্যটি দেখে ফেলে। ওর সন্দেহ হয়। সেই ছেলেটিই তো যে আবাস যোজনার বিষয়ে জানতে একদিন আমাদের ঘরে এসেছিল! ওটা তাহলে অজুহাত ছিল। রূপেন মনে মনে খুব রেগে যায়। কিন্তু এই শুভ কাজে ঝামেলা না বাড়িয়ে সে আদরিনী আর সুজাতাকে বলে, 'এখানে কি করছিস। যা ঘর যা।'
দুজন চুপচাপ ফিরে গেলো।
আর লখাই?
সেও কাল বিলম্ব না করে ওখান থেকে হাওয়া!
(৯)
ভিড় বাড়ছে ক্রমশ। বিকেল চারটের কাছাকাছি আর একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়ালো। বরের গাড়ি। বরের সঙ্গে থাকবে জনা তিনেক বন্ধু। আর একটাতে আট নয় জন। আদরিণী সুজাতা তো যাবেই। উপেন তো বরকর্তা। আর পাশের বাড়ি ও নিকট আত্মীয় মিলে আরও জনা পাঁচ ছয় হবে।
বাজনা নেই। বাজনা মেয়ের বাড়ি থেকে হবে।
বরযাত্রী রওনা হওয়ার দৃশ্য দেখা হয়নি লখাইয়ের। ইচ্ছে করেই সে আর আসেনি।
বাপ্ রে! সকালে যে কান্ড ঘটেছে, আর ওমুখো হতে সাহস পায় নি লখাই।
আজ সন্ধ্যায় বৌদিকে সে তার পরিকল্পনার কথা খুলে বলবেই। আর অপেক্ষা করা যাবে না।
সেইমতো সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে একথা সেকথা বলার পর সে বৌদিকে বলে, "আচ্ছা বৌদি। মনে করো আমি যদি তোমাদের না জানিয়ে বিয়ে করে বৌ নিয়ে আসি, তোমরা কি মেনে নেবে না"?
-–"ও। তুমি বুঝি তলে তলে সব ঠিক করে নিয়েছো? মেয়েটা কে? কেমন দেখতে আমায় বলবে না"?
-–'বলে কী হবে। একেবারে এনেই দেখাবো। আগে বলো, তোমরা মেনে নেবে কিনা'?
–'তোমার দাদার সাথে কথা বলে দেখি। আমি তো মালিক নই,বলো'।
–'না না। দাদাকে বলবে না। আমার দিব্যি রইলো। আমাকে আর একটু ভেবে দেখতে দাও। তারপর বলবে'।
এদিকে রূপেনের বিয়ের লগ্ন ছিল গভীর রাতে। তাই কনে দেখে এবং খাওয়া দাওয়া সেরে বরযাত্রীদের গাড়ি ফিরে এলো বিয়ে না দেখেই। রয়ে গেলো উপেন, আদরিনী আর সুজাতা।
পরের দিন বর-কনে ফিরে এলো ঘরে। সঙ্গে বরকর্তা আর রূপেনের দুই বোন। এবং কনের সঙ্গে একটি দশ বারো বছরের মেয়ে, কনের কোনো আত্মীয় হবে।
(১০)
১৭ ফাল্গুন বৌভাত। বৌভাত রাত্তিরে। সারাদিন সেই বৌভাতের যোগাড়যন্ত্র। সবজি বাজার, মশলাপাতি কেনা, মাংস আনা, আলোকসজ্জা, এইরকম হাজারো ফাইফরমাস শেষে বৌভাতের কর্মকাণ্ডের যবনিকা। পরের দিন আগত আত্মীয়স্বজনের প্রত্যাবর্তন।
উপেনদের ঘর এখন শুনশান। দুচার জন নতুন বৌ দেখতে আসা ছাড়া আর কোনো ব্যস্ততা নেই ওদের। হ্যাঁ, বিয়ে বাড়িতে আনা নানা সাজসরঞ্জাম ফেরত দেওয়ার কাজটিও সেইদিন সেরে ফেললো রূপেন আর তার কয়েকজন বন্ধু।
অবশেষে এলো উনিশে ফাল্গুন। দিনটা মনে পড়লে গা টা এখনও শিউরে ওঠে আদরিনীর। কী কান্ডই না করেছিল লখাই! ভাবা যায় না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আদরিনী চোখে সর্ষেফুল দেখে। এবার কী হবে। ঘর যাবে কী করে। রাস্তা দিয়ে পেরোনোই তো দায় হয়ে গেল তার। এত বড় সর্বনাশ যে হবে তা সে কল্পনাও করতে পারেনি। এক বালতি ভেজা কাপড় হাতে মাটিতে বসে পড়ে সে। মাথায় হাত। একসময় কেঁদে ফেলে আদরিনী। সে কান্না যেন কিছুতেই থামতে চায় না।