ধর্মাবতার, গুস্তাখী মাফ কিজিয়ে হুজুর! দুঃখিত, বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বলে ঠিক করতে পারি না, কোন ভাষায় এবং কোন শব্দগুলো দিয়ে আপনাকে এবং আপনাদেরকে সম্বোধন করব। শুরু করেছিলাম পরিষ্কার সংস্কৃত শব্দ ধর্মাবতার দিয়ে, যে শব্দটি ধর্ম এবং অবতারের সমাসবদ্ধ রূপ, দুটি শব্দই সরাসরি সংস্কৃত থেকে এসেছে, একটি বাংলা তৎসম শব্দ।
ধর্মাবতার, আপনারাই ধর্ম রক্ষাকারী অবতার। এখন প্রশ্ন কোন ধর্ম? মানবধর্ম এবং ভারতীয় নাগরিকদের সংবিধানসম্মত অধিকার রক্ষা করার কর্তব্যধর্ম। আপনারা ধর্মাবতার, তবে বিষ্ণুর দশম অবতারের মধ্যে আপনারা না পড়লেও অবতার তো বটেই। নবম অবতার বুদ্ধ এবং দশম কল্কির মধ্যে আপনাদের অবস্থান। এ কথা অস্বীকার করা সাহস আমাদের নেই। সেই কবে যেন পড়েছিলাম যখনই ধর্মের হানি ও অধর্মের অভ্যুত্থান হয় তখনই আমি নিজেকে সৃষ্টি করি, সাধুদের পরিত্রাণ, দুষ্কৃতিদের বিনাশ এবং ধর্মের সংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে জন্মগ্রহণ করি।
ধর্মাবতার, আপনারাই আমাদের মাই বাপ। বাঁচালে বাঁচাবেন, মারলে মারবেন। ধর্মাবতার এসব কথা বলছি, প্রাণের দায়ে পড়ে, ভয়ের চোটে। কারণ আপনাদের কাছে আগেভাগেই কোন ধর্ম তা নিয়ে প্রশ্ন করে ফেলেছি! হয়তো কথা বলতে বলতে আরও অনেক প্রশ্ন করে ফেলব। চারিদিকে দেখছি কোনও প্রশ্ন করা রাষ্ট্রদ্রোহ, নতুন নতুন বিশেষণে ভুষিত হতে হচ্ছে, কখনও আরবান নকশাল কখনও বা দিমাগী নকশাল। তাই প্রথমেই ধর্মাবতার, আপনাদের কাছে বলে রেখেছি গুস্তাখী মাফ কিজিয়ে হুজুর। ধর্মাবতার, এই মাফ চাওয়ার শব্দগুলি বাধ্য হয়ে অভ্যাসববশত বলে ফেলেছি, খেয়াল রাখতে পারিনি এই শব্দগুলি কোন ভাষা থেকে এসেছে? এখন দেখছি গুস্তাখী ফার্সি, মাফ আরবি, এবং কিজিয়ে উর্দু শব্দ। আসলে বাংলা ভাষাটাই যে এমন জগাখিচুড়ি মার্কা আর আইন আদালতের ভাষাও কি ছাই আমরা সেই ভাবে জানি? আবার ভুল বললাম হুজুর, আইন তো ফার্সি শব্দ আর আদালত আরবি থেকে ফার্সি ঘুরে বাংলায় এসেছে। কী করি বলুন তো ধর্মাবতার! এই বারবার ধর্মাবতার বলছি, এইটিই বরং ভালো, একেবারে সংস্কৃত, কোনও বিজাতীয় ধারার সংস্রব নেই। মাই লর্ড বলা যেত কিন্তু বাংলা লব্জে এককালে মাই লাড আসত, এখন আর আসে না। ইংরেজ সাহেবরা চলে গেছে, তারাই তো মাই বাপ ছিল। তারপর আমরা ভেবেছিলাম ওরা চলে যাওয়ার পরপর, আমরা আমাদের সবকিছু গড়ে নিতে পারব। আমাদের সংবিধান আছে, আমাদের প্রত্যেকের নাগরিকত্ব আছে, ভোটাধিকার আছে, আমরাই পারব আমাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রক হতে। তা আর হতে পারলাম কই, হুজুর? আবার ভুল সম্মোধন করে ফেললাম মালিক। হুজুর শব্দটিই তো বিজাতীয় আরবি থেকে ফার্সি ঘুরে বাংলা শব্দভান্ডারে ঢুকে গেছে, মাই বাপ। আরে আরে, মালিকও তো আরবি ফার্সি। কোথায় যে আর্য শব্দ খুঁজে পাই, বড় মুশকিলে পড়েছি। মুশকিল শব্দের উৎস নিয়ে মুশকিলে পড়ব না? ওটিও তো একই! এইসব পড়তে পড়তে বিরক্ত হচ্ছেন প্রভু? আসলে আমরা যে নাদান, নির্বোধ। আপনি বিরক্ত হবেন না ধর্মাবতার। বাংলা ভাষা নিয়ে আমাদের দুর্ভোগ কম হয়নি হুজুর। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষীরা উর্দু ভাষার আধিপত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ ছিনিয়ে নিয়েছে। আমরা পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষাভাষীরা ভারতের অন্যান্য প্রদেশগুলোতে বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য ইদানিং বারবার মার খেয়ে চলেছি।
ধর্মাবতার, পশ্চিমবঙ্গে প্রথম থেকে রাজ্যের তৎকালীন প্রধান বিরোধী নেতারা এবং কেন্দ্রীয় নেতারা কোটি কোটি রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী আছে বলে এক কাল্পনিক সংখ্যার কথা বলে গেলেন অনবরত। আসলে যে কোনও ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা করা লাগে। এর পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করাটাও ষড়যন্ত্রের অঙ্গ। এরই অঙ্গ হিসাবে গত দুবছর ধরে আমরা দেখেছি, বাইরের রাজ্যগুলিতে, একের পর এক বাংলাভাষী বাঙালিকে তার মাতৃভাষা বলার কারনে বাংলাদেশি হিসাবে গণ্য করে হেনস্থা করা হয়েছে, অত্যাচার করা হয়েছে, এবং কোথাও কোথাও খুনও করা হয়েছে। এই ধরনের ঘৃণার বেশিরভাগ শিকার হয়েছে, মালদা, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম এবং দক্ষিণ চব্বিশপরগনা জেলার পরিযায়ী শ্রমিকেরা। কেবল মুসলমান পরিযায়ী শ্রমিকেরাই নয়, শেষের দিকে ধর্মনির্বিশেষে বাংলাভাষী বাঙালীদের উপর ওরা এই অত্যাচার নামিয়ে এনেছে।
ধর্মাবতার, আমরা জানি, আপনাদের সময়ের মূল্য অনেক, তাইতো অপ্রয়োজনীয় কথা শোনেন না, যে কথা শুনতে আপনাদের ভালো লাগে না তা আপনারা সরাসরি মুখের উপর বলে দেন আদালতের সময় এত সস্তা নয়, ওসব কথা শোনার সময় নেই, পুলিশের দ্বারা ছাত্রদের উপর অত্যাচারের ভিডিও দেখার সময় আমাদের নেই, আবার প্রয়োজন হলে আদালত খুলে কাউকে কাউকে জামিন দিয়ে দেন আপনাদেরই কোনও পূর্বসূরী। সেখানে আমরা তো নিতান্তই ছোট মাপের নগণ্য মানুষ, তাও আপনাদের কাছে আর্জি জানাই, আপনাদের আদেশের দিকে কাতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি, মাই বাপ।
ধর্মাবতার, আমরা কারা? আমরা ওই তারাই, যারা ভেবেছিলাম আমাদের সবকিছুই আমরা গড়ে নিতে পারব, শাসককে বসাব তাদের ন্যায্য আসনে, আবার তারা অপদার্থতা দেখালে গণতান্ত্রিক পথেই তাদের সরাব। স্বাধীন ভারতে তখনও অবধি যে আমাদের ভোটাধিকার ছিল। আজ আর তা নেই। আমরা আজ ভোটাধিকার হারানো হতভাগ্য ভারতীয় নাগরিক। অন্য সময় আমাদের কথা আপনি শুনতে না চাইলেও আজ আপনাকে শুনতেই হবে ধর্মাবতার। ২০০২ সালেও ভোটার লিস্টের সংশোধন-পর্ব চলেছিল, সে ছিল সহজ সরল। কোনও কাগজই দিতে হয়নি। পরিবার প্রতি একটি তালিকা তৈরি করে সদস্যদের নামধাম বয়স ইত্যাদি লিখে সেই তালিকায় পরিবারের প্রধানের স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েই নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু এবার পরিবারের প্রত্যেকের জন্য আলাদা এনুমারেশন ফর্ম এবং তা পূরণের দায়িত্ব আমাদের। ধর্মাবতার, যে এনুমারেশন ফর্মের বৈধতা নিয়ে অনেক আগেই আপনাদের দরবারে আর্জি পেশ করা হয়েছিল কিন্তু আজ অবধি সেই আর্জির ফয়সালা করা হয়নি। নির্বাচন কমিশনের ভালো ভালো কথা দিয়ে শুরু হল নভেম্বর ২৫ এর এনুমারেশান পর্ব। বেশ তো! মৃত, অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, ডুপ্লিকেট ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হবে, এ তো স্বস্তির কথা। কিন্তু নতুন কথা, প্রজেনি ম্যাপিং, সেও আমাদেরই করতে হবে? নির্বাচন কমিশনের কাছেই তো আমাদের বা আমাদের বাপ দাদুদের নামধাম আছে, সেখান থেকেই তো ওরা দেখে নিতে পারত। তা নয়, আমরা একেবারে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে খুঁজে দেখতে লাগলাম ২০০২ সালে কোথায় ছিলাম আমরা ও আমাদের নাম ছিল কোন ভোটার লিস্টে? আতঙ্কেও পড়েছি, আবার ভরসাও করেছি মিস্টার জ্ঞানেশ কুমারের কথায়, যখন এস আই এর পর্বের শুরুতেই তিনি বলেছেন, জিন লোগোকো নাম ২০০২ মতদাতা সূচিমে হ্যায়, উসকি প্রবেটিভ ভ্যালু, উসকি এভিডেনসারি ভ্যালু, যে উও নাগরিক হ্যায়। উসকি কোই জাঁজ করনা কা আবশ্যোকাতা নেহি।
ধর্মাবতার, ১৬ ই ডিসেম্বর খসড়া তালিকা প্রকাশ অবধি আমরা বেশ মজাতেই ছিলাম। কারণ তখন তো জানতাম যারা এনুমারেশন ফর্ম ফিলাপ করেনি বা মৃত, স্থানান্তরিত বা ডুপ্লিকেট তারাই বাদ পড়েছেন। আমরা তো অধিকাংশই ওই তালিকায় টিঁকে আছি। যারা অন্তত লিংক করতে পেরেছি। মাদারি কা খেল শুরু হল তারপরই। হুজুর, একটু ধৈর্য ধরে শুনতে হবে। কতদিন আর আমাদের কথা না শুনে কাচের ঘরের আড়ালে লুকোবেন? খসড়া তালিকার আগে মোট ভোটার ছিল প্রায় ৭.৬৬ কোটি, সেটি এক ধাক্কায় হয়ে গেল ৭.০৮ কোটি। ধর্মাবতার, আমরা তখন অবধি নিশ্চিত ছিলাম, আমাদের উপর নিশ্চয়ই কোনও অবিচার হবে না, আমরা তো বহু পুরুষ ধরে ভারতীয়! তবে আমাদের মধ্যে তখনও অবধি টিকে ছিল ৩২ লক্ষ আনম্যাপড ভোটার। ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার উপর প্রবল আস্থাবান আমরা জানতাম এবং আস্থা রেখেছিলাম যে আনম্যাপড ভোটারদের উপর আইন অনুযায়ী যা হওয়ার তা হবে, আমাদের ওতে মাথাব্যাথা করার কিছু নেই। এরপরই আমরা শিকার হলাম গোপন এক ষড়যন্ত্রের, যা আমরা আগে শুনিওনি বা বুঝতেও পারিনি। আমাদের সামনে ভাসিয়ে দেওয়া হল নতুন একটি শব্দবন্ধ লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি বা যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি। যে শব্দবন্ধটির অস্তিত্ব নির্বাচন কমিশনের বিধিবদ্ধ আইনের মধ্যে ছিল না বা নেইও। এখানেই ধর্মাবতার, কতকগুলি কথা বলি। গণতন্ত্রের মূলভিত্তি হল ভোটাধিকার। সেই অধিকার যদি প্রশাসনিক বা প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়ার আড়ালে প্রশ্নের মুখে পড়ে তবে তা কেবল একটি দফতরীয় জটিলতা নয় বরং গভীর রাজনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত হয়ে দাঁড়ায়। লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি নামক যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক ভোটারকে শুনানির মুখোমুখি করা হয়েছিল তা পশ্চিমবঙ্গের গণতান্ত্রিক কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে। স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠে- এটি কি ছিল নিছক তথ্য সংশোধনের প্রয়াস নাকি একটি বৃহত্তর ছাটাই প্রক্রিয়ার অংশ?
ধর্মাবতার,লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি নামক ঘাতক অস্ত্রের আঘাতে আমাদের অনেকের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ১৩ টি নথি বা ডকুমেন্টের একটি তালিকা প্রকাশ করলেন। সেই তালিকাটিও কোনও বিধিবদ্ধ তালিকা নয়, অনেকের দৃষ্টিতে স্বকল্পিত এবং ষড়যন্ত্রমূলক। এটিই বাস্তব, পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ ভোটারদের কাছে কমিশন ঘোষিত ১৩টি নথি বা ডকুমেন্টের মধ্যে মাত্র ১টি আছে। আধার কার্ড। কিন্তু একমাত্র সম্বল আধারেও আপত্তি দেওয়া হয়েছে এই বলে ‘আধারের জন্য কমিশনের ০৯/০৯/ ২০২৫ তারিখের নির্দেশ নম্বর ২৩/২৫ ই আর এস /ভল টু প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ ওটি কোনও কাজেই আসবে না। তফসিলী জাতি, উপজাতি বা অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণীভুক্ত হওয়ার সার্টিফিকেট থাকলে তবে তাদের অবশ্য ভোটাধিকার বাঁচবে। না হলে নয়। আর এক্ষেত্রে মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষদের মুষ্টিমেয়র কাছেই ওবিসি সার্টিফিকেট ছিল। ওরা বেঁচে গেল। বাকিরা?
আধার বাদ দিয়ে বাকি যেসব কাগজপত্র আছে সেগুলি কি কোনও কাজেই আসবে না? কী আছে? আধার ছাড়াও আছে ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড, কারও কারও প্যান কার্ড। ওগুলোর একটিও নির্দিষ্ট বাকি (আধার বাদে) ১২টি ডকুমেন্ট এর মধ্যে পড়ে না। তাহলে? লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সির জন্য হিয়ারিংয়ে ডাক পড়া মানুষজনের কাছে আধার,ভোটার, রেশন কার্ড, প্যান কার্ড থাকলেও নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য মতো তারা বাদ পড়েছেন। বছরের পর বছর, যুগের পর, এ দেশের আদি অধিবাসী হওয়া সত্ত্বেও ভোটার লিস্ট থেকে নাম বাদ যাওয়াটা অসহনীয় হয়েছে, ধর্মাবতার, এস আই আর শুরুর আগে বলা হয়েছিল, যাদের নিজের অথবা পিতৃপুরুষের নাম ২০০২ সালের ভোটার লিস্টে আছে, তাদের নাম বাদ যাবে না। অথচ ম্যাপড ৬.৭৬ কোটি ভোটারের মধ্য থেকে লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি দেখিয়ে১.২৬ কোটি প্রাথমিক সনাক্তকরণের পর ৯৪ লক্ষ ভোটারকে ইআরও এর কাছে হাজিরা দিতে বাধ্য করা হল। আবার এদিকে এই বিপুল সংখ্যক লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি বের করার পদ্ধতিতেই ছিল গোড়ায় গলদ। আনটেস্টেড এ আই সফটওয়্যার (অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন সফটওয়্যার) ২০০২ সালের ভোটার লিস্টে থাকা নামগুলির বাংলা থেকে ইংরেজিতে ট্রান্সলেট করেছে। সেখানেই অজস্র ভুল হয়েছে। যেমন মোজাম্মেল হক হয়েছে Mojanmel Haque, কুদ্দুস আলী হয়েছে Quddas Ali, সিরাজুল হক হল Crajul Haque, শামসুল হক হল Y Haque, সাফাই তুল্লা হল Y Y. এই সংখ্যাটি অজস্র বা ভুরিভুরি নয়, লক্ষ লক্ষ। এতে সাধারণ মানুষের হয়রানি এবং ফাইনাল ভোটার লিস্ট থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়া হল। মোহাম্মদ,মহম্মদ,মোহা,মহঃ,খাঁন,খাঁ, এইসব বানানে ভিন্নতা তো আছেই, সাথে আছে মুসলিম মেয়েদের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের নামকরণ। কুমারী অবস্থায় থাকে তারা খাতুন হিসেবে। বিবাহিত মহিলাদের থাকে বিবি বা বেগম। আর বিধবা অবস্থায় তারা অনেকে বেওয়া। নামের মধ্যে এই পরিবর্তন সামাজিক এবং ঐতিহাসিকগতভাবে সত্য যা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বোঝে না। এই লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সির ফল ভুগেছে আমাদের মেয়েরা। মুখার্জি মুখোপাধ্যায়, ব্যানার্জি বন্দ্যোপাধ্যায়, ভটচাজ, ভট্টাচার্যি, চট্টোপাধ্যায় চ্যাটার্জী, যে একই ধরনের পদবী এ আই কি তা বোঝে? এমন ধরনের অজস্র উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যাই হোক না কেন, এ আইয়ের পরিচালকদের অপদার্থতার দায় সাধারণ মানুষকে বেনাগরিক হয়ে দিতে হয়েছে, ধর্মাবতার। না, অদৃশ্য প্রভুদের অঙ্গুলিহেলনে এই কাজ চলেছে? লজিক্যাল ডিক্রিপেন্সির পাঁচটি ক্যাটাগরি ছিল, যার মধ্যে প্রজেনি ৬ (৬টির বেশি সন্তানযুক্ত ব্যক্তি), বাবার নামের অমিল, পিতামাতার সাথে বয়সের পার্থক্য ১৫ বছর বা তার কম, পিতামাতার সাথে বয়সের পার্থক্য ৫০ বছর বা তার বেশি এবং ঠাকুরদা-ঠাকুমার সাথে বয়সের পার্থক্য ৪০ বছর বা তার কম। যারা কোনো ক্যাটাগরিতে পড়েছে তাদেরই শুনানির জন্য ডাকা হয়েছিল। কোন আইনে লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সির আবির্ভাব তা বহুবার আপনাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। ধর্মাবতার, কখনও আপনারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। এ আমাদের অভিযোগ নয় অনুযোগ।
ধর্মাবতার লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি যাদের হয়েছে তাদের মধ্যে আনুমানিক অর্ধেকেরও যদি আধার কার্ড বাদ দিয়ে বাকি ১২টি ডকুমেন্টের একটিও না থাকে তাহলে? সত্যিই ভেবে পাওয়া যাচ্ছিল না তা। নিশ্চিতভাবেই আমাদের ভোটের অধিকার হরণ করা হবে এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। বংশানুক্রমিকভাবে এদেশে জন্ম নেওয়া আমাদের অনেকের কাছে আছে জমির দলিল, মাধ্যমিকের না হলেও, স্কুলের, অন্ততপক্ষে প্রাইমারি স্কুলের সার্টিফিকেট। যে জিনিসগুলি আগে ছিল দামি এখন কোনও এক অঙ্গুলিহেলনে হয়ে গেল মূল্যহীন। এবং ঘটনাক্রমে তাইই হয়েছে। ২৮/০২/২০২৬ তারিখে ফাইনাল ভোটার লিস্ট প্রকাশের সময় দেখা গেল এত হিয়ারিং এবং উপযুক্ত কাগজ দস্তাবেজ দলিল দেওয়ার পরও ৬০ লক্ষ ম্যাপড ভোটারকে আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন নামক নতুন এক ব্যবস্থার মধ্যে ঠেলে ফেলে দেওয়া হল। তখন আমাদেরকে দাগিয়ে দেওয়া হল সন্দেহজনক ভোটার হিসাবে।
ধর্মাবতার, ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট টিমের ওয়ার্ল্ড কাপ বিজয়ী উইকেটকিপার-ব্যাটার রিচা ঘোষ, রাজ্যের প্রথম মহিলা চিফ-সেক্রেটারি নন্দিনী চক্রবর্তী এবং রাজ্যের তখনকার পরিবেশ ও নন কনভেনশনাল এনার্জি মন্ত্রী গোলাম রব্বানী যখন আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন বা নির্বাচন কমিশনের ভাষায় বিচারাধীন হন সেখানে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ যে বিচারাধীন হবেন তা এখনকার সময়ে অবাক হওয়ার বিষয় নয়। কেন এমন হল ধর্মাবতার? কিছুই আপনাদের অজানা নয় ধর্মাবতার, এস আই আর এর ভিত্তি রচিত হচ্ছিল অনেক আগে থেকেই। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল লাগাতার তখন প্রচার করে চলেছে সীমান্তবর্তি প্রদেশগুলোতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশী মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যা কেবল লক্ষাধিক নয়, কোটিরও অধিক। তারা এস আই আর কে রোহিঙ্গা ও অনুপ্রবেশকারী মুসলমানদের তাড়ানোর একটা পদক্ষেপ হিসাবে লাগাতার প্রচার করতে শুরু করে। অভিযোগ, সহযোগী সামাজিক সংগঠনের মুখোশের আড়ালে থাকা দলটি ঘোষিতভাবে মুসলিমবিরোধী, তাই সম্মিলিত এই লাগাতার প্রচার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হতে শুরু করে। এই সফল প্রচার এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের মানসিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এটাও রাজনৈতিক দলটি প্রচার করল ওদেশ থেকে আসা সংখ্যালঘু হিন্দুদের কোনো বিপদ নেই। পাড়ায় পাড়ায় ক্যাম্প করে CAA এর টোপ ফেলল। ওদের উদ্দেশ্য পুরোপুরি না হোক কিছু পরিমাণ সফল হল তো বটেই। এই ঘৃণার বাতাবরণ তৈরির পদ্ধতি ঘুসপেটিয়া তত্ত্ব, CAA হল ঝোলানো গাজর। কিন্তু অবাক হতে হয়, বিহারের এস আই আর মিটে যাওয়ার পরও বিহার রাজ্যে কতজন বিদেশী নাগরিক এবং রোহিঙ্গার সন্ধান পাওয়া গেছে, তার সদুত্তর নির্বাচন কমিশনের থেকে আজও অবধি পাওয়া যায়নি।
ধর্মাবতার, নাগরিকত্বের প্রশ্নকে ভোটাধিকারের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে ভারতীয় আইন অনুসারেও যারা জন্মগতভাবে ভারতীয় নাগরিক তাদেরও ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার কার্যক্রম আমরা দেখতে পেয়েছি। কোন যুক্তিতে ২০০২ সালকে কেবল ভিত্তিবর্ষ হিসেবে ধরা হল, তারও কোনও ব্যাখ্যা নেই। বহু ভারতীয় ২০০২ সালের আগে বা তারও আগের ভোটার, কিন্তু তাদের ভাগ্যের পরিহাস ২০০২ সালের ভোটার লিস্টে নাম না থাকায় অর্থাৎ ম্যাপ না করাতে পারায় তাদের ভোটাধিকার চলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হল। সবচাইতে বড় অন্যায় অবিচার ঘটে তখনই যখন নির্বাচন কমিশন ইচ্ছামতো নির্দিষ্ট তেরোটি ডকুমেন্ট বেছে নিয়েছে যা দেশের গরীব, অসংগঠিত শ্রমজীবী মানুষের কাছে থাকতে পারে না। দলিত, জনজাতি, প্রান্তিক এবং সংখ্যালঘু মানুষ ওদের ঠিক করা কাগজ দেখাতে বেশি করে ব্যর্থ হয়েছে। নারী, উদ্বাস্তু, স্থানান্তরিত, শ্রমজীবী, বন্যা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়তাড়িত মানুষ তাদের কাগজপত্র ঠিকভাবে সংরক্ষিত করতে অপারগ হওয়ার কারণে তাদের উপরে নির্বাচন কমিশনের কোপ যেন বেশি করে পড়েছে। এতদিন পর্যন্ত নাগরিককে যে ভোটাধিকার নির্বাচন কমিশন দিয়ে এসেছে তার জন্য নাগরিককে আলাদা করে কোনও প্রমাণ দাখিল করতে হয়নি। এই প্রথম ভোটাধিকার প্রমাণের দায় নাগরিকের উপর চাপিয়ে দিল নির্বাচন কমিশন। ধর্মাবতার সবই আপনারা অবগত আছেন।
ধর্মাবতার, এই লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি টার্মটি আমরা আগে কখনও শুনিনি। ভারতীয় জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে এর অস্তিত্ব নেই। আচ্ছা, লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির প্রয়োগ অন্য রাজ্যে হয়েছে কি? না, বিহারে তা হয়নি। অন্যত্র? হয়েছে, তবে সেখানে বিতর্ক বা অন্যায় ঘটেনি। যা কিছু হল তা আমাদের এই পশ্চিমবঙ্গে। নতুন এক চরিত্রের আবির্ভাব ঘটাল নির্বাচন কমিশন। সংখ্যায় তারা ৮১০০ জন। মাইক্রো অবজারভার। তাদের উপর আছেন আবার বেশ কয়েকজন রোল অবজারভার এবং স্পেশাল রোল অবজারভার। অন্য রাজ্যেও লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি নিয়ে শুনানি হল এবং তা বি এল ও এবং ই আর ও রাই নথি দেখে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। আইনগতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ই আর ও দের। ওসব রাজ্যে তারাই তা নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে সেই সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া হল না। ই আর ও দের সাথে বসিয়ে দেওয়া হল একাধিক মাইক্রো অবজারভার। তারা সবাই বাছা বাছা অনুগত কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী। এই মাইক্রো অবজারভারদের নিয়োগে নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা, রাজ্য সরকারের কাছ থেকে তারা নাকি যথেষ্ট সহযোগিতা পাননি তাই ই আর ও দের উপর নজর রাখতে ৮১০০ মাইক্রো অবজারভার নিয়োগ করা হয়েছিল। প্রথম থেকেই তৎকালীন রাজ্য সরকারের এই নিয়োগে আপত্তি ছিল। কিন্তু যাইহোক, তবুও মানুষ মেনে নিয়েছিল সবই।
ধর্মাবতার, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সিতে ধরা পড়া নাগরিকদের শুনানিতে যখন অন্যায় অজুহাতে নির্বাচন কমিশন মাইক্রো অবজারভারদের জুড়ে দিল তখন থেকেই মূল সমস্যা শুরু। আইনগতভাবে এই শুনানিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল ই আর ও দের। অনেক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ই আর ও এবং মাইক্রো অবজারভাররা একমত হলেন না। প্রথম থেকেই লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সিজাত শুনানি প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ ও চাপ সৃষ্টিকারী বলে অভিযোগ ওঠে। রাজ্য সরকার যুক্ত হয়ে গেলেন মোস্তারি বানু ভার্সেস নির্বাচন কমিশনের কেসে। পিটিশনগুলোতে দাবি করা হয় যে এস আই আর ভোটাধিকার হরণের চেষ্টা এবং নির্বাচন কমিশন তার লক্ষ্য পূরণের জন্য অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে। ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ এ শুনানির পর ধর্মাবতার আপনারাই নির্দেশ দিলেন,
ক) লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির আওতায় পড়া ১.২৫-১.৩৬ কোটি ভোটারের নাম ডিসক্রিপেন্সির কারন সহ গ্রাম পঞ্চায়েত, ব্লক, সাব-ডিভিশন অফিস এবং শহরের ওয়ার্ড অফিসে টাঙিয়ে দিতে হবে।
খ) অথরাইজড রিপ্রেজেন্টেটিভের মাধ্যমে নথি জমা করা যাবে।
গ) অতিরিক্ত ১০ দিন সময় দেওয়া হবে নথি জমা/আপত্তির জন্য।
ঘ) ক্লাস টেন অ্যাডমিট কার্ড বা পাস সার্টিফিকেটকে বৈধ বয়স প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
এই নির্দেশের পর আবার শুনানির কাজ চলছিল ভালোই। মানুষের মনে ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও মানুষ অংশগ্রহণ করছিল। তখনও অবধি আমরা আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন এই কথাটিই শুনিনি। আমাদের সকলেরই ধারণা ছিল শুনানির পরবর্তীতে ফাইনাল ভোটার লিস্টে হয় নাম থাকবে অথবা নাম বাতিল হবে। বাতিল হওয়ার কারণও বলে দেওয়া হবে। অনেক নাম বাতিল হওয়ার সংশয় যে ছিল না, তা নয় কারণ শুনানিতে যে নথিগুলো চাওয়া হয়েছিল সেগুলো নিয়ে একটু পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে বেশিরভাগ নথিই সাধারণ মানুষের কাছে নেই।
২০০২ সালের ভোটার লিস্টে নাম ছিল। দারিদ্র্যর কারণে বা অন্য কোনো কারণে সেইভাবে লেখাপড়া শেখেনি। তাদের কাছে স্বীকৃত পর্ষদ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও সার্টিফিকেট নেই। পশ্চিমবঙ্গে এমন মানুষ লক্ষ লক্ষ পাবেন। বিশেষ করে আমাদের মেয়েদের মধ্যে। এদেরকে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সিতে ধরা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত অন্যায্যভাবে তাদেরকে ধরা হয়েছে। আধার, ভোটার ও রেশন কার্ড ছাড়া এদের কাছে নিচের ১৩ টি ডকুমেন্টের একটিও থাকবে কি? আপনারাই বিচার করে দেখুন। নিচের নথিগুলির এক বা একাধিক জমা করার কথা বলা হল।
১. যেকোনো পরিচয়পত্র/ পেনশন পেমেন্ট অর্ডার যেটি কেন্দ্রীয় সরকার/ রাজ্য সরকার/ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার যেকোনো নিয়মিত কর্মী/ পেনশনপ্রাপককে দেওয়া হয়েছে।
২. যে কোনো পরিচয়পত্র/ শংসাপত্র/ নথি যেটি ০১/০৭/১৯৮৭ এই তারিখের পূর্বে সরকার/ স্থানীয় কর্তৃপক্ষ/ ব্যাংক/ডাকঘর/ ভারতীয় জীবনবিমা নিগম/রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত।
৩. উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত জন্মের শংসাপত্র।
৪. পাসপোর্ট।
৫. স্বীকৃত পর্ষদ/ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত ম্যাট্রিকুলেশন/শিক্ষাগত যোগ্যতার শংসাপত্র।
৬. রাজ্যের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত স্থায়ী বাসস্থানের শংসাপত্র।
৭. বনভূমি অধিকার শংসাপত্র।
৮. উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অন্যান্য অনগ্রসর সম্প্রদায়/ তপশিলি জাতি/ তপশিলি উপজাতি বা অন্য অনগ্রসর জাতির শংসাপত্র।
৯. নাগরিকদের জাতীয় রেজিস্টার (যে সমস্ত ক্ষেত্রে এটা রয়েছে)।
১০. রাজ্য/স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দ্বারা তৈরি পারিবারিক রেজিস্টার।
১১. কোনো জমি/ বাড়ি বরাদ্দের সরকারি শংসাপত্র।
১২. আধারের জন্য কমিশনের ০৯.০৯.২০২৫ তারিখের নির্দেশ নং ২৩/২০২৫-ই আর এস/ভল.২ প্রযোজ্য হবে।
১৩. ০১.০৭.২০২৫ অনুযায়ী বিহারের এস. আই. আর এর নির্বাচক তালিকার নির্যাস।
সুতরাং কয়েক লক্ষ নাম যারা ২০০২ সালের ভোটার লিস্টের সাথে ম্যাপড ছিল অথচ নথির অভাবে তাদের নাম বাদ পড়ার সম্ভাবনা হল এবং পরবর্তীতে বাদ পড়ল।
ধর্মাবতার, লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির তথ্য বিশ্লেষণ করলে কতকগুলি সাধারণ ধারণা মনের মধ্যে উঠে এসেছিল। মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় সবচাইতে বেশি লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি কেন? তবে কি বিশেষ একটি সম্প্রদায়কে বাদ দেওয়ার জন্যই এই সব জেলাগুলিতে বেশি করে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সিতে ভোটারকে ফেলা হয়েছিল? অনেকেই এ সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন এবং তাদের মতো মতামত দিয়েছিলেন। এনুমারেশন ফর্মে যখন ধর্ম লেখার জায়গা নেই তখন বেছে বেছে কীভাবে একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সিতে আনা যাবে, এ প্রশ্ন স্বাভাবিক। তবে খতিয়ে দেখা গেছিল, চলতি জেমিনি অথবা চ্যাট জিপিটিকে দিয়েই তালিকা থেকে ধর্মভিত্তিক মানুষকে আলাদা করা যায়। তাহলে সেরকমই কিছু কি ঘটেছিল? প্রশ্ন অনেক। সবকিছুর উত্তর পাওয়া যায়নি। ধর্মকতার, আপনারও একবারও এসব জানতে চাননি।জন প্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫১-এর অধীনে ই আর ও-দের লোকাল ডিসক্রিশন (স্থানীয় বিবেচনা) থাকার কথা, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সেন্ট্রালাইজড সফটওয়্যার সেই ক্ষমতা কেড়ে নেয়। ফলে, ইতিমধ্যে নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির কেসগুলোও পুনরায় রিভিউ করতে বলা হয়, যা ই আর ও-এর জুরিসডিকশনের ক্ষমতাকে অস্বীকার করে করা হয়। কিছুই আপনাদের অগোচরে ছিল না।
এই লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির চূড়ান্ত পরিণতি হল ধর্মাবতার আপনাদের হস্তক্ষেপে। ২০ শে ফেব্রুয়ারি মহামান্য সুপ্রিমকোর্ট কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করেন যেন ডিস্ট্রিক্ট জজ/অ্যাডিশনাল ডিস্ট্রিক্ট জজ র্যাঙ্কের কর্মরত ও প্রাক্তন জুডিশিয়াল অফিসারদের মোতায়েন করা হয়।
এঁরা "লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি/অন ম্যাপড" ক্যাটাগরির অমীমাংসিত দাবি/আপত্তি অ্যাডজুডিকেট (বিচার) করবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় এই আদেশ বেরোনোর আগে ও পরে অনেক নোংরা খেলা হল।
অভিযোগ এমন , ই আর ও রা সময়মতো অধিকাংশ শুনানির নিষ্পত্তি করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের পছন্দমাফিক হয়নি। কারণ নাম বাতিলের যে টার্গেট নির্ধারণ করা ছিল,ই আর ও দের সিদ্ধান্ত মেনে নিলে সেই টার্গেটের ত্রিসীমানায় যাওয়া সম্ভব ছিল না। তাই ১৫-২১ ফেব্রুয়ারি,ডকুমেন্ট স্ক্রুটিনি করার অছিলায় আবার এ আই ব্যবহার করে এবং বিধানসভা বেছে বেছে ৬০ লক্ষ ভোটারদের নাম ডকুমেন্ট টু বি রিভিউড লিখে ফেরত পাঠানো হল। ই আর ও- রা এই ৬০ লাখের মধ্যে সিংহভাগ আবার রিভিউ করে অনুমোদন করেও দিয়েছিলেন ২১ শে ফেব্রুয়ারীর মধ্যে। কিন্তু আমাদের মতো অনেকেরই দুর্ভাগ্য ভারত সরকার দত্ত পাসপোর্টের মতো সব থেকে শক্তিশালী ডকুমেন্ট থাকা এবং তা পেশ করা সত্ত্বেও লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম আন্ডার এডজুডিকেশনের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
ধর্মাবতার, ২০ শে ফেব্রুয়ারি আপনারা বিধানসভা ক্ষেত্র অনুযায়ী কত কেস অমীমাংসিত তার কোনো তালিকা দিতে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিলেন না। ২১ শে ফেব্রুয়ারি, রাত ১২ টায় স্ক্রুটিনি বন্ধ হওয়ার সময় সিস্টেমে খুব বেশি হলে ২০ লাখ কেস অমীমাংসিত ছিল। কিন্তু আবার আমাদের দুর্ভাগ্য
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুসারে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি, ২৪ শে ফেব্রুয়ারি সুপ্রিমকোর্টকে জানালেন যে আনুমানিক ৫০ লক্ষ কেস অমীমাংসিত। ধর্মাবতার আপনারা বিনাপ্রশ্নে সেটা শুধু মেনে নিলেন তাই নয়, কোনও প্রশ্নই সেটা নিয়ে করতে দিলেন না। এ আমাদের অনুযোগ। তারপর সেই ৫০ লাখ বেড়ে হয়ে গেল ৬০ লাখ। কীভাবে এই সংখ্যা বেড়ে গেল, সেটিও রহস্যই থেকে যাবে। কোনও প্রশ্ন করবেন না আপনারা?
ধর্মাবতার, নির্বাচন কমিশন এবং রাজ্য সরকারের মধ্যে ট্রাস্ট ডেফিসিটের কারণ দেখিয়ে আর্টিকেল ১৪২ ব্যবহার করেছেন আপনারা। প্রয়োজনে ঝাড়খন্ড ও উড়িষ্যা থেকে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের আন্ডার অ্যাডজুডিকেশনের শুনানিতে অংশগ্রহণ করতে বলেছেন । বললেন,২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ ফাইনাল রোল প্রকাশ করতে হবে। তবে এটি "অসম্পূর্ণ" এবং সাপ্লিমেন্টারি লিস্টগুলো পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হবে। ২৮ শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ যখন ফাইনাল ভোটার লিস্ট প্রকাশিত হল তখনই অবাক হয়ে আমরা দেখলাম লক্ষ লক্ষ ম্যাপড ভোটারের নামের উপর আন্ডার এডজুডিকেটেড ছাপ পড়েছে। বাংলায় চূড়ান্ত ভোটার লিস্টে ৬০ লক্ষের বেশি ভোটার কেন 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন' বা 'বিচারাধীন'-- এর দায় কার? কমিশনের দাবি, ইআরও–এইআরওদের একাংশের জন্য এতগুলো ভোটারের কেস ফয়সালা হয়নি। কমিশনের এই বিবৃতির পরেই ডব্লিউবিসিএস অফিসারদের সংগঠন জানিয়ে দেয়, এই দায় ইআরও, এইআরও-দের নয়। এই দায় কমিশন নিযুক্ত অবজ়ার্ভারদের। কারণ, কমিশনের নিযুক্ত অবজ়ার্ভার এবং মাইক্রো অবজ়ার্ভাররা কোনও পর্যবেক্ষণ ও মতামত ছাড়াই লক্ষ লক্ষ নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া কেস রিভিউ করতে বলেছেন। সেই কারণেই 'আন্ডার অ্যাজুডিকেশন'-এর তালিকায় এত বেশি নাম যুক্ত হয়েছে। এ বার এ নিয়ে উঠে এল আরও চমকপ্রদ তথ্য। একাধিক জেলায় দেখা গিয়েছে, দেড়-দু'দিনে বা একদিনে লাখ খানেকের মতো ভোটারের (কেস) রিভিউয়ের জন্য একাই সিলেক্ট করেছেন এক–এক জন রোল অবজ়ার্ভার। ধর্মাবতার, একি অন্যায় ছিল না?
ধর্মাবতার, তারপর প্রায় সাতশ মাননীয় বিচারকদের অধীন আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন ভোটারদের ঝাড়াই-বাছাই পর্ব চলেছিল। এই একতরফা শুনানিতে যদি কোনও ভোটার বাদ যান তাহলে তিনি, যারা আগের পর্বে ডিলিট হয়েছেন তাদের মতো নতুন করে ফর্ম ৬ পূরণ করে আবেদন করতে পারবেন না এমনই আপনাদের আদেশ। আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন ভোটারদের নাম যদি বিচারাধীন প্রক্রিয়ার পর বাদ হয়ে যায়, তাহলে আবেদন করার জায়গা হল আপনাদের নির্দেশে গঠিত স্বতন্ত্র অ্যাপিল ট্রাইব্যুনাল। সেই অ্যাপিল ট্রাইব্যুনালে কতজন সাধারণ দরিদ্র নাগরিক পৌঁছোতে পেরেছেন ধর্মাবতার? এমন সিদ্ধান্তে এমন প্রশ্ন উদয় হয় নাকি যে লক্ষ লক্ষ মূলনিবাসী ভারতীয় নাগরিককে কেবলমাত্র নথির অভাবে বেনাগরিক করার খেলা চলেছিল। এমন সন্দেহ প্রকাশ করা কি নেহাতই অমূলক ছিল? জুডিশিয়াল অ্যাডজুডিকেশান ভোটারদের ভোটাধিকার স্থগিত রেখেছিল—সাপ্লিমেন্টারি লিস্টে নাম যোগ না হওয়া পর্যন্ত। ফলে, শেষ হওয়া বিধানসভা নির্বাচনে লক্ষ লক্ষ ভোটার ভোট দেওয়ার অধিকার হারিয়েছে । এই পরিপ্রেক্ষিতে অনেক প্রশ্ন উঠে। নির্বাচন কমিশনের দাবি ছিল, আন্ডার অ্যাডজুডিকেশান হল নিরপেক্ষ 'ক্লিনআপ', কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, এটি অপটিক্যাল সফটওয়্যারের ত্রুটি যেমন বাংলা স্ক্রিপ্টের ভুল পড়া এবং বায়াসড থ্রেশহোল্ডের ফল, যা সংখ্যালঘু-কেন্দ্রিক এলাকায় অসমানভাবে প্রয়োগ হয়েছে। আমাদের অনেকের ভোটাধিকার হারিয়ে আমরা বেনাগরিক হয়ে গেছি ধর্মাবতার। আপনারাই তখন বলেছিলেন ধর্মাবতার, এবারে ভোট দিতে না পারলেও, পরেরবার নিশ্চয়ই ভোট দিতে পারবেন। ভুলিনি আমরা এসব কথা।
ধর্মাবতার, যার বাবার নাম আছে ২০০২ এ, তাঁর ছেলে বা মেয়ের নাম এখন ডিলিটেড! সে ট্রাইব্যুনালে যাবে কেন? যে লোকটির নাম ২০০২ এ আছে তাঁর নাম এখন ডিলিট হল কী করে? সে ট্রাইব্যুনাল যাবে কেন? যে লোকটির পাসপোর্ট আছে ২০০২ এর পর থেকে, তাঁর নাম এখন ডিলিট হল কী করে? সে ট্রাইব্যুনাল যাবে কেন? যে লোকটি মাধ্যমিক সার্টিফিকেট দিয়েছে তাঁর নাম ডিলিট হল কেন? সে ট্রাইব্যুনাল যাবে কেন? যে লোকটিকে হেয়ারিং এ ডাকাই হয়নি, তাঁর নাম ডিলিট হল কী করে? সে ট্রাইব্যুনাল যাবে কেন? কারো বাবা মায়ের নাম একসেপ্টেড, ছেলে মেয়ের নাম ডিলিট কী করে? সে ট্রাইব্যুনাল যাবে কেন? কারও ৬ ভাই বোন দুজনের নাম উঠেছে বাকিদের নাম ওঠেনি. উল্টে ডিলিট! কী করে হয়? সে ট্রাইব্যুনাল যাবে কেন? মেয়েদের বিয়ের পর পদবী চেঞ্জ হয়ই, গণহারে মেয়েদের নাম সেই ম্যাচ না হওয়ার কারণে ডিলিট! কেন? সে ট্রাইব্যুনাল যাবে কেন? আশি নব্বই বছরের যে মানুষটি গত ৫০ বছর ভোট দিয়ে আসছে. তিনি লেখাপড়া জানেন না, নামের একটু এদিক ওদিক এর জন্য তাঁর নাম ডিলিট! তিনি ট্রাইব্যুনালে যাবেন কেন?
এরকম হাজার প্রশ্ন আছে, যার জবাব নির্বাচন কমিশন দেয়নি। এইসব মানুষরা ট্রাইব্যুনাল গিয়ে খরচ কেন করবে? সেই খরচ কে দেবে? খেটে খাওয়া দিন আনা দিন খাওয়া গরীব মানুষদের ট্রাইব্যুনাল যাওয়ার খরচ কে দেবে?
ধর্মাবতার আপনাদের বিরুদ্ধে আমরা অভিযোগ জানাব না, বড়জোর অনুযোগ জানাতে পারি, আমরা নিতান্তই ভাগ্য বিড়ম্বিত ভারতীয় নাগরিক, একের পর এক আপনাদের কাছে আমাদের আবেদন নিবেদন নিয়ে গেছি কিন্তু ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছি।
ধর্মাবতার, ভোটের আগে আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন ছিলেন প্রায় ৬০ লাখ ভোটার। তিনটি রাজ্যের প্রায় ৭০০ বিচারক এদের কাগজপত্র পরীক্ষা করে ভোটার লিস্টে অন্তর্ভুক্ত করে দিয়েছিলেন ৩৩ লাখ ভোটারকে এবং ভোটার লিস্ট থেকে বাতিল করে দিয়েছিলেন আমাদের মতো ২৭ লাখ মানুষকে। আমরা বাতিল হওয়া ভোটাররা দিনের পর দিন রোদে পুড়ে, জলে ভিজে, অবর্ণনীয় অবস্থার মধ্য থেকেও ভোটার লিস্টে পুনরায় অন্তর্ভুক্তির জন্য আমাদের আবেদনগুলি জেলাশাসকদের, কোথাও কোথাও ঘোষিত মহকুমা শাসকদের দফতরে জমা করেছি। অনলাইনেও আবেদন জমা করেছি। বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগঠনগুলিও জোরদার প্রচেষ্টা চালিয়ে আমাদের মতো বাদ পড়া ভোটারদের ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে সাহায্য করেছেন। এ কাজ তারা করেছেন যখন দেখা গেছে বাদ পড়া অধিকাংশ ভোটারই কোনও না কোনও কাগজের ত্রুটি বা একেবারেই অকারণে বাদ পড়েছেন। ধর্মাবতার আপনাদের আদেশ থাকা সত্ত্বেও আমরা বাদ পড়া ভোটাররা জানতে পারিনি কী কারনে আমাদেরকে বাদ দেওয়া হয়েছে। কারণ জানতে পেরেছি তাও সংক্ষিপ্ত আকারে, যখন ট্রাইব্যুনালের শুনানিতে তলব করা হয়েছে। অনিয়মের কথা আর কত বলব!
ধর্মাবতার, আমাদেরই ভাই বন্ধু মহম্মদ জিম ফরহাদ নওয়াজ গত ফেব্রুয়ারি মাসে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি ক্যাটাগরির সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এবং নিজের নোটিস নিয়ে আবেদন করেছিলেন। ধর্মাবতার, আপনারা তা শুনতে চাননি এবং সরাসরি খারিজ করে দেন। আপনারা মন্তব্য করেন যে বাবা-মা বা ভাই কে তা নির্ধারণের দায় আমাদের নয়; নির্বাচন কমিশনের কাছে যেতে হবে।
কোরাইশা ইয়াসমিন ও অন্যান্যরা যখন ১৩ই এপ্রিল নাম বাদ দেওয়ার বিরুদ্ধে আবেদন করেন আপনাদের কাছে, তখন আপনারা আবেদনটি প্রিম্যাচিওর বলে শুনতে রাজি হননি। আপনারা বলেন “We will not entertain this. Better you pursue there (before Appellate Tribunal)।”
সবচাইতে আহত হলাম আমরা যখন গত ২৪শে এপ্রিল আমাদের মতো হতভাগ্য ভোটাধিকার হারানো অথচ নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা ৬৫ জন নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কর্মীদের আবেদন আপনারা শুনতে রাজি হলেন না। আপনারা বললেন: “Please raise the problem before the Appellate Tribunal. We can’t change our orders every day।” হ্যাঁ সত্যিই তো, কেন বারবার পরিবর্তন করতে যাবেন। কিন্তু আমরা কি এটি অনুযোগ করব না, যে মানুষগুলির নিজেদেরই ভোটাধিকার নেই তারা কীভাবে ভোট পর্ব পরিচালনা করবে?
ধর্মাবতার, আমরা যদি আপনাদের ১৩/ ৪/ ২৬ তারিখের অর্ডার নিয়ে পর্যালোচনা করি, তবে দেখতে পাব সেখানে পরিষ্কার বলেছেন, At this juncture, we hasten to note that over 34 lakh appeals have already been filed, not only against alleged wrongful exclusion but also, in substantial number of cases, by objectors aggrieved by the inclusion of several persons in the revised electoral rolls. আমরা সেদিন ভীষণভাবে আহত হয়েছিলাম। আমরা হিসাব মেলাতে পারছিলাম না। আমরা বাদ পড়া মানুষেরা ছিলাম ২৭ লক্ষ, তাহলে আবেদন কীভাবে ৩৪ লক্ষ হয়? বিচারপতিরা এডজুডিকেশন করে নাম যোগ করে দেওয়ার পরেও বিচারপতিদের আদেশের বিরুদ্ধে কীভাবে নির্বাচন কমিশন বা অন্য কোনো ব্যক্তি ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন করতে পারে? এটি কি আপনাদের মর্যাদার পক্ষে সহায়ক হয়েছিল? আপনাদের কি একবারও মনে হল না, এটা অন্যায় হচ্ছে।
ধর্মাবতার, এই বিষয়গুলি নিয়ে গত ২৫শে অগাস্ট সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় সিনিয়র অ্যাডভোকেট গোপাল শঙ্করানারায়ণ নাম অন্তর্ভুক্তির পক্ষে আবেদনকারী সেদিনের শুনানিতে উঠে আসা ৭ লাখ আবেদকের আবেদন জরুরী ভিত্তিতে শুনানির আদেশ প্রার্থনা করেন যাতে তারা আসন্ন কলকাতা এবং হাওড়া কর্পোরেশনের ভোটে অংশগ্রহণ করতে পারেন। আমাদের বড় সৌভাগ্য যে আপনাদের পর্যবেক্ষণের মধ্যে আসে মাত্র ৮২৭৮২ টি আবেদনের নিষ্পত্তি হয়েছে এবং নাম যোগ হয়েছে ৭৫৪৪৩( ৯১.১৩% ) এবং বাদ দিয়েছে ৭৩৩৯ জন (৮.৮৬%) । এই সংখ্যাটিও জানা গেছে মাননীয় সাংসদের ঈশা খান চৌধুরীর আরটিআইয়ের যে উত্তর নির্বাচন কমিশন দিয়েছে তা থেকে। আশার কথা এই যোগ হওয়া শতাংশের হারটি আপনাদের নজরে এসেছে। আপনারা বুঝতে পেরেছেন কী শম্বুক গতিতে ট্রাইব্যুনালের কাজকর্ম চলছে এবং অধিকাংশ বাতিল ভোটার আবার তাদের ভোটাধিকার ফিরে পাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সমস্ত তথ্য সুপ্রিম কোর্টে পেশ করার কথা ছিল কিন্তু তারা তা না করে কালক্ষেপ করেছে। আগামী শুনানিতে তাদেরকে এ সংক্রান্ত হলফনামা পেশ করতে হবে বলেছেন আপনারা। আমাদের বড় সৌভাগ্য, এতদিন পর অন্তত কিছু তথ্য জানতে পারব। কিন্তু তারপরেও আপনাদের আদেশনামা পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারছি, নির্বাচন কমিশন যদি না বলেন যে তারা নাম অন্তর্ভুক্তির বিপক্ষে কতগুলি আবেদন ট্রাইবুনালে করেছে তাহলে তা আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। আমাদের কেন অনেক ভারতবাসীর চোখে নির্বাচন কমিশনের অনেক অন্যায় আপনারা দেখে সেগুলি বন্ধ করার চেষ্টা করেননি। ধর্মাবতার, ক্ষমা করবেন আপনাদেরকে দোষারোপ করছি না, আসলে সবই আমাদের ভাগ্যের পরিহাস। মহাভারতে আমরা রাজা ধৃতরাষ্ট্রকে দেখেছি। লৌহ নির্মিত নকল ভীমসেনকে অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র কর্তৃক আলিঙ্গনের সময় পৃষ্ট হয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যেতে দেখেছি। তবুও বলছি ধর্মাবতার, আপনাদের উপরে আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে। এস আই আর এর সংবিধানিক বৈধতা নিয়ে আমরা আর প্রশ্ন করি না, তবুও বলছি আপনাদের আমরা পূর্ণ বিশ্বাস করি, আপনাদের প্রতি আমরা অনুগত, আমাদের বিশ্বাস, আমরা ন্যায় পাবই। আমরা আমাদের ভোটাধিকার ফেরত পাব। কিন্তু তা কবে?
জয় হিন্দ
ভারত মাতা কি জয়।
নিবেদক,
হতভাগ্য ভোটাধিকার হারানো ভারতীয় নাগরিকবৃন্দ।