পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

অশ্বচরিত

  • 04 April, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 734 view(s)
  • লিখেছেন : শামিম আহমেদ
গল্প বলে যে সব বেদুইন রাভিয়ারা, তারা ঘোড়ায় চেপে আসে, প্রতি বছর, এই ফতে সিং পরগণায়। তাদের সঙ্গে থাকে তাঁবু। আর তিরধনুক, বর্শার মতো নানা অস্ত্র। পশুপাখি শিকারের পর তারা তাঁবু খাটিয়ে সন্ধ্যায় মশাল জ্বেলে গল্প বলে। তাদের সঙ্গে থাকা রমণীরা কখনো নাচগান করে।

 

 

 

ঘোড়াটাকে দেখা ইস্তক আর ঘুমোতে পারছে না ছকু দেওয়ান। প্রথমে ভেবেছিল কাঠের। কিন্তু ঘোড়াটা সামান্য নড়েচড়ে উঠতেই তার ভুল ভাঙল। খুব বেশি নড়নচড়ন না, শুধু লেজ দিয়ে একটা মশা না ডাঁশ তাড়ালো সে।

গল্প বলে যে সব বেদুইন রাভিয়ারা, তারা ঘোড়ায় চেপে আসে, প্রতি বছর, এই ফতে সিং পরগণায়। তাদের সঙ্গে থাকে তাঁবু। আর তিরধনুক, বর্শার মতো নানা অস্ত্র। পশুপাখি শিকারের পর তারা তাঁবু খাটিয়ে সন্ধ্যায় মশাল জ্বেলে গল্প বলে। তাদের সঙ্গে থাকা রমণীরা কখনো নাচগান করে। আশেপাশের গ্রামে বাস করে যে সব থিতু মানুষেরা, তারা রাভিয়া আসার খবর পেলেই ছুটে যায় গল্প শুনতে। ভাগ্য ভাল হলে মিলে যায় নাচ গান উপভোগের সুযোগ। রাভিয়াদের গল্প একটানা চলতে থাকে। সে সব কাহিনি অনেক। দিল্লি, লাহোর, লখনউ, মুর্শিদাবাদ সব যেন উঠে আসে শীতের সেই উপাখ্যানের তাঁবুতে, পাশে গনগন করে জ্বলে আগুন। মনে হয় যেন হোমের অগ্নিকুণ্ড। শ্রোতাদের বিনিময়ে দিতে হয় খানিকটা চাল বা গম শস্যদানা। সে সব হল প্রণামী। নাচগানের জন্য অবশ্য জোরাজুরি নেই।   

হোমকুণ্ডের মতো আগুন জ্বালিয়ে রাভিয়াদের নারীরা রান্না করতে থাকে। ঝলসায় পাখি ও পশুদের মাংস। পাশে পড়ে থাকা বিশ্রামরত তীর ধনুক আর বর্শা সেই আগুনে রূপ বদলে ফেলে। রাভিয়াদের সন্তানরা তখন ঘুমের দূর দেশে বাস করে। একে একে জড়ো হতে থাকে শ্রোতার দল।

রাভিয়ারা গল্প বলে শিকারের, পলায়নের, মহব্বতের, চাকা কিংবা আগুনের, ইচ্ছে হলে ফসল ঝাড়াই আর বীজ সংগ্রহের। নিরীহ পশুদের কিভাবে হত্যা করা হয়, ডালে বসে থাকা পাখিদের মেরে আগুনে ঝলসানো হয় কেমন করে, কীভাবে তাড়া খেলে পালাতে হয় ঘোড়ার পিঠে চেপে, কেমন করে ভালবাসতে হয় নিজের রমণী ও শিশুদের। আগুন কেন কাছে রাখতে হয়, কারা সেই আগুনকে ধরে এনেছিল বনের দাবানল থেকে, বন পুড়ে ছাই হয়ে চাষের জমি হল কেমন করে, কীভাবে রমণীরা না খেয়েও বাঁচিয়ে রাখে বীজশস্য, সেই সব দস্তান।

ছকু দেওয়ান ভাবে, রাভিয়াদের বলা কিসসারাও আসলে বাস করে গুহায়, ঘোড়ার পিঠে কিংবা মহানিম গাছে, কখনও নদীতে, কোনও কোনও সময় ফসলের ক্ষেতে আর হোমকুণ্ডে। সেই সব উপাখ্যানদের নামিয়ে কিংবা বের করে এনে অনেক কসরতের সঙ্গে নুন মশলা তেল আর আগুন মেখে কানে গুঁজে দেওয়া হয় আগন্তুকদের। শ্রবণেন্দ্রিয় তখন রসনেন্দ্রিয়ের থেকেও প্রখর হয়ে ওঠে ছকু ও তার মতো থিতু মানুষদের।

কিন্তু রাভিয়ার দল এই কাঠের ঘোড়া, থুড়ি, জ্যান্ত ছোট্ট ঘোটকীকে এই গ্রামে ফেলে রেখে গেল কেন?

পঞ্চাশ বছর আগে পর্যন্ত গ্রামটিতে ঘোড়ার রমরমা ছিল খুব। এমনকি এই গাঁয়ের নামটা পর্যন্ত ঘোড়ার চিরুনির নামে। ‘খাঁড়েরা’ হল একটি লোহার দণ্ড যার মাথায় লাগানো থাকে আল মিশান যাকে বলা হয় লোহার চিরুনি, ঘোড়ার লোম পরিষ্কার করা হয় তা দিয়ে। খাঁড়েরা গ্রামে এখন আর ঘোড়া পাওয়া যায় না। অশ্ব পোষা বেশ ঝক্কির, তার খাবারদাবার জোগানো চাট্টিখানি কথা নয়। গরু ছাগলের মতো ঘোড়া শুধু ঘাসপাতা আর খড় খেয়ে থাকে না, তার জন্য লাগে ছোলা আর গুড়। সে সব খাবার এখন মানুষেই খেতে পায় না। তবে যাদের পয়সা আছে তারা বাইসাইকেল কিংবা বাইক কেনে। নিকটবর্তী শহর বা বাজারে যাওয়ার জন্য আছে রিকশা ভ্যান। এখন আবার মোটর লাগানো রিকশায় ছেয়ে গিয়েছে এই তল্লাট, কে আর ঘোড়া পুষতে যায়!

এই বাচ্চা ঘোড়াটাকে তবে তারা ফেলে রেখে গেল কেন? ঘোড়া যাযাবর হলেও তার ঘুমনোর জন্য আস্তানা চায়, যাকে আস্তাবল বলা হয়। বৃষ্টি বাদলে অনবরত তার ভিজলে চলে না। এই শিশু ঘোড়াটি শুধু ঘাস পাতা খেলে তার পেশী তৈরি হবে না। তার উপর খড় পাকিয়ে লাগাম বানিয়ে কেউ কেউ সেই অল্পবয়সী ঘোটকীর উপর চেপে তাকে বশে আনতে চায়। এতে করে ঘোড়াটি আরও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। দু চার জন বাচ্চা ছেলেমেয়ে দূর থেকে ঘোড়াটিকে ঢিলও ছোড়ে। কেউ আবার পটকা ছুঁড়ে তাকে ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়ে তীব্র আনন্দ পায়। ছকু দেওয়ান একবার ভেবেছিল, ঘোটকীকে নিয়ে গিয়ে তার বাড়িতে রাখবে। কিন্তু পাড়ার দু একজনের আপত্তিতে সে আর সাহস পেল না। রাভিয়াদের ফেলে যাওয়া এই ঘোড়া নাকি খুব সাধারণ নয়। বানজারা রাভিয়ারা তাঁকে ফেলে রেখে গিয়েছে মানে এই ঘোড়ার মধ্যে কোনও দুষ্ট আত্মা রয়েছে। নইলে কেনই বা তাকে ফেলে যাবে! এই দুষ্ট আত্মাকে গ্রামে রাখলে ঘোর বিপদ আসতে পারে। তবে কেউ কেউ বলল, ঘোড়ার মধ্যে পবিত্র রুহ থাকে।  

নুর আলম কলবলি এই গ্রামের এক ছোকরা। সে বলল, ওই ঘোড়াটির মা যে তার একটি চোখ কানা ছিল। মা ঘোড়াটি গ্রাম থেকে একজন বানজারাকে নিয়ে যখন রওনা দিয়েছিল মানে চলে যাচ্ছিল, তখন বাচ্চা ঘোড়াটি আপন মনে খেলছিল। মা-ঘোড়া যে চোখটিতে দেখতে পায় না, বাচ্চাটি ছিল সেই দিকে। বানজারারা চলে যাওয়ার পর ছোট্ট ঘোড়াটি মাকে অনেক খোঁজে। তার পর এক সময় বুঝে যায়, সে একা। কিন্তু তার কীই বা করার আছে!

ভুলু হাজরা অবশ্য বলে অন্য কথা। এই ঘোড়া নাকি আদৌ ওই হাঘরে গল্পকথকদের নয়। এই গ্রামের উত্তরে আছে যে প্রকাণ্ড বটগাছ, রতনদীঘির এক পাশে, যেখানে এক কালে ছিল শিব ঠাকুরের থান। এখন মাটির নীচে চাপা পড়ে আছে শিবলিঙ্গ। সেই বটগাছে নিশুতি রাত এলে ঘোড়াপোকার আমদানি হয়, তারা আকাশে উড়তে থাকে, নীচে নামা বারণ। ওই পোকাদের কেউ কেউ মাটিতে পড়ে গেলে তাদের হয় ঘোড়াজন্ম। এই বাচ্চা ঘোড়াটি সেখান থেকেই এসেছে।

নুর আলম কলবলি তার গুরু ধানু ফকিরের কাছে গিয়ে বলে, এই ঘোটকীকে সে পুষতে চায়। বড় হলে এর পিঠে চেপে চাঁদনি রাতে চলে যাবে বহু দূর দেশে। কিন্তু বাদ সাধছে ভুলু হাজরা। সে বলছে, এ হল বাবা শিবের ঘোড়া। পকেট থেকে ছিলিম বের করে নুর আলম বলে, বিশ্বাস করুন বাবা! শিব ঠাকুরের ঘোড়া হলে তিনি আমাকে জ্যান্ত রাখবেন না।

ধানু ফকির পাউরুটি আর জিলিপি খেতে খেতে বলে, ঘোড়ার কথা যখন বললি বাপজান, তখন তোকে শোনায় দু চার কথা। ভাল করে তামাক সাজ আগে।

নুর আলম কলবলি ছিলিমে গাঁজা সাজলে তাতে আগুন ধরিয়ে টান দিতে দিতে ধানু ফকির বলে, সাত আসমানের মতো জানবা সব জীব সাত কিসিমের। সে তুমি ঘোড়া বলো, গরু কিংবা বকরা!

নুর আলম বলে, সে কী রকম ওস্তাদ! আমি তো কেবল ঘোড়ার এক রকম গান শুনেছি!

“একটু শোনা দেখি! আমি ততক্ষণ আর একটু দম দিয়ে নিই!”

নুর আলম কলবলি গান ধরে, সোনার বান্দাইল্লা নাও পিতলের ঘোড়ারে পিতলের ঘোড়া, ও রঙ্গের ঘোড়া উড়াইয়া যাও...

“শোন বেটা! রঙ্গের ঘোড়া!! এই হল গিয়ে এক নম্বর। উড়ে পালায়।’’

“ঘোড়ার আবার পাখি নাকি যে সে উড়বে?”

“পাখা থাকলেই উড়বে! হাওয়াই জাহাজ উড়ে না! ঘুড্ডিরা ওড়ে কিনা, তুই বল?”

“তা উড়ে ওস্তাদ! বলেন, আপনি বলেন দেখি। সাত রকমের ঘুড়ার মধ্যে এই রাভিয়া ব্যাটাদের ঘুড়া কুন পর্যায়ে পড়ে, তা আমি দেখেই ছাড়ব!’’

“আর এক রকম ঘোড়া পাবি রে বাপ, তার শিং আছে! আর আছে একখান সিংহের ন্যাজ!”

“ওরে বাপ, সে তো হায়দারি ঘুড়া গো আব্বাজান!’’

“ভুলু হাজরা যদি বলে, এ হল শিবের ঘোড়া, সে ভুল কিছু বলেনি। তুই কি ওই হাঘরেদের ফেলে যাওয়া ঘোড়ার শিং দেখেছিস? তার ন্যাজখানা কেমন?’’

নুর আলম কলবলি পকেট থেকে বিড়ি বের করে ধরায়। তার পর বলে, তামাক খেয়ে আজ তেমন জুত হল না কত্তা! তুমি ওস্তাদ মানুষ, তোমাকে কী কই? কয়েক মাসের বাচ্চা, তার শিং হয় কী করে বাবা! আর ন্যাজখানা খানিক মা দুর্গার বাহন সিংহের মতন লাগল বটে!

“কাল আমি নিজে একবার সরেজমিনে তদন্ত করে দেখব!’’

“বাকি গুলান বলেন ফকির বাবা। এখনও পাঁচ খান বাকি। ফজর, জোহর, আসর, মগরব আর এশা।’’

ধানু বলে, তেসরাটির ডানা আছে, তবে সেটা ঈগল পাখির। সেই ঈগল পাখি, যে রুস্তম পালোয়ানের বাপ জালকে আশ্রয় দিয়েছিল। জালের আব্বা শাম তাঁর নিজের পুত্রকে আলবার্জ পাহাড়ে ফেলে রেখে এলে ওই ঈগল তাকে খাইয়ে দাইয়ে বড় করে তোলে। চৌঠা ঘোড়া পানিতে চলে, মাছের মতো। এই সেই মছলি যার রক্ত হালাল। আরব থেকে তারই পিঠে চড়ে দস্তান আসে। কোঙ্কন রাজ্যে। তার পর ছড়িয়ে পড়ে তামাম হিন্দুস্তানে।  

 আর শোন, পঞ্চম ঘোড়া আওরতদের বেওয়া করে, বড় নিঠুর সেই অশ্ব। আগুণ হইল ঘোড়া অরুসে আরব।

“তার নাম কী ফকির বাবা?”

“আলো। সে হল অনেকটা হোসেনের ঘোড়া দুলদুলের মতো। একাই যে একশো জন বিবিকে এক দিনে বিধবা বানিয়েছিল।’’

নুর আলম কলবলি একটু ঘাবড়ে যায় আর মনে মনে ভাবে, আলো নামটা শোনা শোনা লাগছে তার! সে কথা ফকির বাবাকে বলতেই ধানু বলে ওঠে, আপন ঘরের খবর নে না! ওরে পাগল! তোর নাম নুর, তার মানেই আলো রে! আলো হল কাল, মহাকাল! তার চলাচল আর নুরের গমন তো একই হল রে বাপ! আর দু খান ঘোড়ার কথা বলে আমি গোসল করতে যাব।

“বেশ বলেন ওস্তাদ!”

“সিকান্দারের ঘোড়া, যার মাথা ষাঁড়ের। শিব ঠাকুরের বাহন হল ষাঁড়। ওই ঘোটকীর মাথা কি গরুর মতো?’’

“না! না! না ওস্তাদ! আমি সমস্ত রকমের কিরে কেটে বলতেছি, ওই ঘোড়ার মুখ ঘোড়ার মতোই।”

ধানু বলে, সাত নম্বর আশ্চর্য ঘোড়ার আছে আটখানা পা!

সেই ঘোড়া আসে সেরেন দ্বীপ থেকে। আদমের দস্তান নিয়ে ঢুকে পড়ে তামিলনাড়ু দেশে। সেই সৈন্ধব ঘোড়ার পিঠে চেপে অনেক অনেক পথ পাড়ি দিয়ে অনেক কিসসা তৈরি হয়েছে। তার পর গুজরাত দেশ, পাকিস্তান, ইরান, ইরাক হয়ে শাতিল আরব ঘুরে যবন দেশে পাড়ি দেয় সেই সব দস্তান। আবার ফিরে আসে।

চলা ফুরায় না সেই ঘোড়াদের, থামে না রাভিয়াদের দস্তান। পালে পালে রাভিয়া ছড়িয়ে পড়ে এদিক ওদিক। ঘোড়ারাও।

দস্তানরা ঘোরে ঘোড়ার পিঠে। প্রথমে আগুন ধরার কিসসা, তারপর আসে চাকা বানানোর দস্তান, ফসল ঝাড়াইয়ের গল্প।

এই সেই অশ্ব, যার পিঠে চড়ে তোমাদের দস্তান, তোমাদের সন্তানরা বোকা চারকোনা সিন্দুক থেকে মুক্তি পেয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে আগুনের আর চাকার কথা বলবে। সিন্দুক মানে সেই বোকা বাক্সের ভিতরের পচাগলা মৃতদেহটাকে পুড়িয়ে দেবে বা মাটির ভিতরে চাপা দেবে। গজাবে সবুজ অঙ্কুর, যা হবে জীবনের কিসসা, সুন্দরের উপাখ্যান, যারা তোমাদের শুষে খায় তারা মরবে। কারণ ওই পচাগলা মৃতদেহ ভর্তি দস্তানের বোকা চৌকোণা সিন্দুক তারা তোমাকেই দিয়েছে, তুমি হলে লাশের পাহারাদার। কোন লাশ?

আমাদের দস্তানের যে তেহজিব সেই জীবন্ত মুর্দার লাশ। ঘোড়া ছুটিয়ে দাও তার উপর। লাগাম খসিয়ে। ওই লাগামও পরিয়ে দিয়েছে শয়তানের দল। আমাদের অনেক ঘোড়া। কখনও সে তেত্রিশ, কখনও সাত।

সাত ঘোড়া আসলে সাত নাজারিয়া। একজন শুধু চোখ, কান, নাক আর জিভ, আর সব কী কী ব্যবহার করেই কাল কাটিয়ে দেয়। দুসরা ঘোড়া সবটা বুদ্ধি খাটিয়ে চলে। তিন নম্বর ঘোড়া আলতাজরিবিয়া আর আলেকলানিয়া মিশিয়ে বানায় বিচার। চতুর্থ ঘোড়া ভাবে, যা আছে তা সত্যি-সত্যি আছে, একা-একা। পঞ্চম অশ্ব বলে, না; তা নেই—সব নির্ভর করে মনের উপর, তাই সে আলমাথালি। ছয় নম্বর হল জওহারিয়া—সে এক সত্তা মানে। সপ্তম তার উলটো—ওয়াজুদি। তার কাছে ওয়াজুদ জওহরের আগে—সত্তার আগে মানুষের থাকা, বেঁচে থাকা, দুনিয়ার বুকে তার অস্তিত্বই প্রথম ও প্রধান কথা।

আগুণ হইল ঘোড়া অরুসে আরব। এই বার শোন, ওই ফেলে রাখা ঘোড়ার ইতিকথা।

ছকু দেওয়ান এসে গিয়েছে ততক্ষণে। চলে এসেছে একজন রাভিয়া। ভুলু হাজরাও একটি সিঁদুর মাখানো ডালায় এনেছে ছোলা, গম আর চাল।

রাভিয়াটি এসে কেড়ে নেয় ধানু ফকিরের কিসসার আলমারাথন শাইলা যাকে এই তল্লাটের লোকেরা বলে গল্পের মশাল।

এই ঘোড়া নেহাত কোনও মামুলি অশ্ব নয়। ঘোড়ার আছে পথ জুড়ে থাকার ক্ষমতা। পানি, বাষ্প, আগুন, ইলম, অণ্ড, গর্ভ আর সামে তার জন্ম। এই বাচ্চা ঘোটকীর নাম অশ্বকন্দা। অশ্বত্থ গাছের পাতা এর প্রিয়। এর দেবতা অশ্বত্থামা যিনি শিবের অবতার। দ্রুতগামী এই বাহন আসলে কিসসা বহন করে।

ছকু দেওয়ান গল্প থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করে, তোমরা একে ফেলে গেলে কেন?

আগন্তুক রাভিয়া উত্তর দেয়, সব গ্রামের আছে নিজস্ব ইতিহাস। আলহিসানের আলমিশাত তৈরি হত এই গ্রামে, যাকে তোমরা বলো ঘোড়ার চিরুনি। তার এক নাম আছে। খাঁড়েরা। সেই জনপদের ইতিহাস ভুলে গিয়ে তোমরা এখন নানা রকম দুষ্কর্মে প্রবৃত্ত হয়েছে। মাটিতে বিষ, জলে জহর ছড়াচ্ছো। এই সেই আশ্চর্য আল হিসান যে তোমাদের বেঁচে থাকার গল্প বলবে। সন্তানদের নিয়ে যাবে সুন্দর দেশে। তোমরা আবার ফিরে যাবে সুস্থ মনোরম জনপদে।

নুর আলম কলবলি বলে, বাপ রে! একটা ঘোড়ার এত ক্ষমতা?

ভুলু হাজরা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে ওঠে, বাবা শিবের কৃপা! ব্যোম ভোলে!

এমন সময় সেই ঘোটকী এসে হাজির হয়।

রাভিয়াটি বলে, তোমরা ফালতু তণ্ডা কোরো না। একটি ঘোড়াকে কয়েকটা দিন ফেলে রেখে দেওয়ার পর তোমাদের মধ্যে একের পর রচিত হয়ে চলেছে হরেক দস্তান। সেই সব দস্তান থেকে কোটি কোটি গল্প তৈরি হবে। দস্তানের তাই নিয়ম। এই দস্তান আমাদের রুহ, আমাদের আত্মা।

ধানু ফকির বলে, তবে যে তোমাদের বুড়ো রাভিয়া বলে গেল, ওয়াক্ত মানে কাল হল রুহ।

আগন্তুক রাভিয়া জবাব দেয়, কাল, রুহ, দস্তানের মধ্যে কোনও প্রভেদ নেই।

নুর আলম প্রশ্ন করে, তবে ঘোড়ার কী কাম?

রাভিয়া বলে, সেই হল এই তিনকে এক করার মালিক। তোমরা লোভে-ঝগড়ায়-হিংসায় দীর্ণ হয়ে আছো। এই একটি ঘোড়া তোমাদের জীবনে বয়ে এনে দিয়েছে নির্মল বাতাস। বোকা বাক্সের শয়তানটা এখন নির্জীব। কালে কালে সে মারা যাবে, যদি এমন অনেক অশ্বকন্দা আসে এই গ্রামে। তোমরাও রাভিয়া হয়ে সারা জাহানের গল্প এনে তুলবে এই ছোট্ট জনপদে। আর যদি তা না চাও, তবে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি আমাদের ঘোটকীকে।

ভুলু হাজরা কাঁদো কাঁদো মুখে অশ্বকন্দার মুখের কাছে তার সিঁদুর মাখানো ডালাটি নিয়ে যায়। ঘোটকীটি পরমানন্দে চাল ছোলা আর গম খেতে থাকে।

ছকু দেওয়ান কাঠ এনে হোমকুণ্ড জ্বালানোর আয়োজন করে।

ধানু ফকির বলে, আজ থেকে প্রতি সন্ধ্যায় এখানে বসবে দস্তানের আসর।

আগন্তুক রাভিয়াকে আর দেখা যায় না।

                                    --------------

 

0 Comments

Post Comment