পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

আম্বেদকরের ভারত-ভাবনা ও জনতার ভোটাধিকার

  • 14 April, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 489 view(s)
  • লিখেছেন : শংকর
আজ বাবাসাহেব আম্বেদকরের জন্মদিন। আজ আমরা আবার সেই একই দৃশ্য দেখতে পাব। আম্বেদকরের পতাকার পদদলনকারীদের আম্বেদকরের স্মৃতিতে সমবেত রুদালী। ভারতের সংবিধান প্রণয়নের সময়, যেখানে তিনি খসড়া কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন, সেখানে তিনি সর্বজনীন ভোটাধিকারের নীতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর ফলে স্বাধীনতার পরপরই ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যেখানে জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ বা সম্পত্তির ভিত্তিতে ভোটাধিকার সীমাবদ্ধ করা হয়নি।

আজ বাবাসাহেব আম্বেদকরের জন্মদিন। ১৮৯১ সালের এই দিনেই তাঁর জন্ম হয়েছিল। পরাধীন ভারতে গণতান্ত্রিক ভারত নির্মাণের যে পতাকা তিনি উত্তোলন করেছিলেন সে পতাকা আজ স্বাধীন ভারতের ধুলোয় ভূলুণ্ঠিত। ইতিহাসের এটা পরিহাস নাকি নিয়ম তা বুঝে ওঠা কঠিন।

আজ আমরা আবার সেই একই দৃশ্য দেখতে পাব। আম্বেদকরের পতাকার পদদলনকারীদের আম্বেদকরের স্মৃতিতে সমবেত রুদালী। যে সংবিধানের সাথে আম্বেদকরের সংগ্রামের রক্তের সম্পর্ক তা প্রতিদিন হিটলারীয় হোমাগ্নিতে দহন করছে যারা আম্বেদকরের প্রতিকৃতিতে তাদেরই কপট মাল্যদান আর আবেগঘন ভাষণ! মনুস্মৃতিকে পবিত্র শাস্ত্রের স্থান থেকে উপড়ে ফেলে কোটি কোটি শ্রমজীবি মানুষের ঘৃণার অনলে দাহ করে অমর হয়েছিলেন যিনি তাঁর কপট পূজার অভিনয় হবে দেশজুড়ে মনুরই শিষ্যদের দ্বারা। সর্বজনীন ভোটাধিকার ভিত্তিক ভারতীয় সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতার প্রতি শ্রদ্ধাবিগলিত নাট্যমঞ্চে এই নাট্যদলের দলপতিদের হাতেই আজ গোটা দেশে সাড়ে চার কোটি শ্রমজীবি মানুষের ভোটাধিকার আক্রান্ত।

 

শ্রমজীবি মানুষ আম্বেদকরকে বিভিন্নভাবে মানুষ মনে রেখেছেন, রাখবেন। কারণ এক নয়া ভারত নির্মানে আম্বেদকরের সংগ্রাম ছিল বহুস্তরীয়। তিনি দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলেন, শিক্ষার প্রসারে কাজ করেন এবং আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সমতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। এই সংগ্রামের একটি দিক যেমন ছিল দলিত তথা শূদ্রদের রাজনৈতিক ক্ষমতালাভের উপপ্লবীয় উত্থান তেমনি অন্যদিকটি হল দেশের প্রতিটি মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। ঔপনিবেশিক ভারতের সময় ভোটাধিকার সীমাবদ্ধ ছিল সম্পত্তি, শিক্ষা বা সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে। ফলে সমাজের বৃহত্তর অংশ—বিশেষত দলিত, শ্রমজীবী ও নারীরা—রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত থাকত। আম্বেদকর এই ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেন এবং দাবি তোলেন যে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ভোটাধিকার থাকা উচিত, কারণ গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হল জনগণের সার্বভৌমত্ব।

 

স্বাধীন ভারতের স্থপতিরা রাষ্ট্রের সার্বভৌমিকতাকে যখন একটি শ্রেণির, বলাই বাহুল্য ধনবান শ্রেণির, সার্বভৌমিকতা হিসাবে বুঝেছেন, আর দেশের বর্তমান শাসকরা, ফ্যাসিবাদী বিজেপি আরএসএসের কর্তাব্যক্তিরা বুঝেছেন তাদের ধান্দার স্যাঙাতগোষ্ঠীর সার্বভৌমত্ব হিসাবে, তখন আম্বেদকরের জনগণের সার্বভৌমত্বের ধারণা ছিল তাঁর শূদ্র বিপ্লবের রক্তনিশানের রক্তিম আভায় রাঙানো। আম্বেদকরের আন্দোলন ও চিন্তাধারা ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শুধু প্রসারিতই করেনি, বরং তাকে আরও মানবিক ও ন্যায়সঙ্গত করে তুলেছে।

আধুনিক ভারতের গণতান্ত্রিক ভিত্তি নির্মাণে অন্যতম প্রধান স্থপতি আম্বেদকরের চিন্তা ও সংগ্রামের কেন্দ্রে ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, সমতাভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন—যেখানে জন্ম, বর্ণ, ধর্ম বা লিঙ্গের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য থাকবে না। গণতান্ত্রিক ভারত সম্পর্কে তাঁর ধারণা এবং সর্বজনীন ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর ভূমিকা এই বৃহত্তর লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আম্বেদকরের গণতন্ত্রের ধারণা শুধুমাত্র রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি গণতন্ত্রকে দেখতেন একটি “জীবনযাপন পদ্ধতি” (way of life) হিসেবে। তাঁর মতে, প্রকৃত গণতন্ত্র তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন সমাজে স্বাধীনতা (liberty), সাম্য (equality) এবং ভ্রাতৃত্ব (fraternity) বাস্তব অর্থে কার্যকর হবে। এই তিনটি মূল্যবোধকে তিনি একে অপরের পরিপূরক বলে মনে করতেন। শুধুমাত্র আইনি সমতা থাকলেই হবে না, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সমতা প্রতিষ্ঠা জরুরি—নইলে গণতন্ত্র কেবলমাত্র একটি ফাঁপা কাঠামো হয়ে থাকবে।

ভারতের সংবিধান প্রণয়নের সময়, যেখানে তিনি খসড়া কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন, সেখানে তিনি সর্বজনীন ভোটাধিকারের নীতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর ফলে স্বাধীনতার পরপরই ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যেখানে জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ বা সম্পত্তির ভিত্তিতে ভোটাধিকার সীমাবদ্ধ করা হয়নি। এই সিদ্ধান্ত শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, সামাজিক ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রেও একটি বিপ্লবাত্মক পদক্ষেপ ছিল।

তবে আম্বেদকর শুধু আইনি স্বীকৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি বারবার সতর্ক করেছেন যে, রাজনৈতিক গণতন্ত্র যদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক গণতন্ত্র দ্বারা সমর্থিত না হয়, তবে তা টেকসই হবে না। তাঁর বিখ্যাত বক্তব্য—“one man, one vote” যদি “one man, one value”-তে পরিণত না হয়, তাহলে গণতন্ত্রের সার্থকতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। অর্থাৎ, ভোটাধিকার থাকা সত্ত্বেও যদি সমাজে বৈষম্য ও শোষণ অব্যাহত থাকে, তবে গণতন্ত্র কার্যত দুর্বল হয়ে পড়বে।

আজ আম্বেদকরের আশংকাই সত্যি হয়ে দেখা দিয়েছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা না হলে যে একদিন এই সর্বজনীন ভোটাধিকারের ব্যবস্থাটাও থাকবে না তা তিনি বুঝেছিলেন। আম্বেদকরকে অনেকেই বোঝেন একজন দলিত নেতা হিসাবে, কেউবা বোঝেন সংবিধান প্রণেতা হিসাবে। কিন্তু আম্বেদকর ছিলেন প্রকৃতপ্রস্তাবে একজন প্রকৃতই সত্যদ্রষ্টা যিনি শুধু তাঁর সমসাময়িক বর্তমানকেই বোঝেন নি, অনাগত ভবিষ্যতকেও বুঝেছিলেন। তাই আশংকিত হয়েছিলেন। তাঁর আশংকাকে অমূলক প্রমাণ করতে গেলে তাই তাঁর সংগ্রামকে চরম পরিণতির পথে নিয়ে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।

 

0 Comments

Post Comment