পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের রায় – একটি প্রাথমিক বিশ্লেষণ

  • 07 June, 2024
  • 0 Comment(s)
  • 613 view(s)
  • লিখেছেন : সৌভিক ঘোষাল
সমস্ত এক্সিট পোলের ভবিষ্যৎবাণীকে ধূলিস্যাৎ করে ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচনের রায় যখন সামনে এল, তখন তা দেশ দুনিয়ার অনেককেই চমকে দিল। যে বিজেপি বলেছিল তারা নিজেরাই ৩৫০+ আসন পাচ্ছে আর জোটসঙ্গীদের নিয়ে চারশো পার করে যাবে, সেই বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার অনেক দূরে, ২৪০ আসনেই থেমে গেল। বাকি বিশ্লেষণ পড়ুন নীচের সূত্রে।

এবারেও তার জোটসঙ্গীদের সহায়তায় হয়ত সে এন ডি এ সরকার গড়ে ফেলবে, তবে তার ধার ও ভার যে অনেক কমবে, সে সম্পর্কে কোনও সন্দেহ নেই। নীতীশ কুমারের জনতা দল ইউনাইটেড আর অন্ধ্রপ্রদেশের চন্দ্রবাবু নাইডুর তেলেগু দেশম পার্টির ওপর তাদের পদে পদে নির্ভর করতে হবে, যে নেতাদের বারবার ডিগবাজী খাওয়ার কথা সর্বজনবিদিত। অন্তরঙ্গ বিশ্লেষণের আগে এক কথায় বলা যায় এই লোকসভা নির্বাচন ২০২৪ এর রায় এক অর্থে বিজেপির বিরুদ্ধেই গেছে।

বিজেপির বিপর্যয়ের প্রধান কারণ বড় ও গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলির প্রায় সবকটিতে – যার মধ্যে আছে উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ প্রভৃতি - তাদের ভরাডুবি হয়েছে। তামিলনাড়ুতে বিজেপি জোটের পরাজয় ও ইন্ডিয়া জোটের একাধিপত্য নিয়ে কারোরই কোনও সন্দেহ ছিল না। কিন্তু উত্তরপ্রদেশ এবং মহারাষ্ট্রে যে বিজেপির এই পরিমাণ ধাক্কা আসবে, তা খুব কম লোকই ভাবতে পেরেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপির বানিয়ে তোলা ফানুসটি চুপসে গেছে এবং তারা কোনওরকমে ডবল ডিজিটে পৌঁছেছে। তিরিশটি আসন পাবে দাবি করে মাত্র দশে আটকে যাওয়া দেখিয়ে দেয় যে মিডিয়া, এজেন্সি, আদালতের রায় ইত্যাদির ওপর নির্ভরশীলতার বাইরে তারা এখনো এখানে স্থায়ী জমি তৈরি করতে পারে নি।

ভোটের ঠিক আগেই দেশের সবচেয়ে বড় রাজ্য আশি আসনের উত্তরপ্রদেশে রাম মন্দিরের সাড়ম্বর উদ্বোধনের মধ্যে দিয়ে যে হিন্দুত্বের হাওয়াকে গোটা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল বিজেপি, মোদি যে উত্তরপ্রদেশ থেকে ভোটে লড়েন এবং তাদের আগামীদিনের সম্ভাব্য প্রধান মুখ আদিত্যনাথ যোগী যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, সেখানে বিজেপির আসন এই পরিমাণে কমে যাওয়া নি:সন্দেহে এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ঘটনা৷ উত্তরপ্রদেশে বিজেপি পেয়েছে মাত্র তেত্রিশটি আসন ও তার সহযোগীরা আরো গোটা চারেক। ইন্ডিয়া জোট উত্তরপ্রদেশে নিজেদের প্রত্যাশাকেও ছাপিয়ে গেছে এবং এর মূল কাণ্ডারী সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ সিংহ যাদব। সমাজবাদী পার্টি নিজেরা ছত্রিশটি আসন পেয়েছে এবং কংগ্রেসকেও সাতটি আসনে জিততে সাহায্য করেছে। সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশে ইন্ডিয়া জোটের তেতাল্লিশটি আসন জেতা ভারতীয় রাজনীতিতে সম্ভাবনার অনেক দুয়ার উন্মুক্ত করে দিল। এই ঘটনার প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া যে আগামীদিনে ভারতীয় রাজনীতিকে বিরাটভাবে প্রভাবিত করবে, এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। উত্তরপ্রদেশে বিজেপিকে কীভাবে এই পরিমাণ ধাক্কা দেওয়া গেল, তার বিশ্লেষণ দরকার। যে সব রাজ্যে এখনো বিজেপির একাধিপত্য – যেমন গুজরাট বা মধ্যপ্রদেশ সেখানে বিরোধীদের এই সংক্রান্ত বিশ্লেষণের শিক্ষাকে কাজে লাগাতে হবে।

এই নির্বাচনের দ্বিতীয় বড় ঘটনা মহারাষ্ট্রে বিজেপি জোটের বিরাট পরিমাণে ধাক্কা। মহারাষ্ট্রে যে বিজেপি বেকায়দায় পড়তে চলেছে সেই বিষয়ে পূর্বাভাষ ছিল। মারাঠী অস্মিতা বনাম গুজরাটি অস্মিতা মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মহারাষ্ট্রের বিজনেস লবি অনেকদিন ধরেই গুজরাটি ক্রোনি পুঁজিপতিদের দ্বারা কোণঠাসা হচ্ছিল এবং ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজছিল। রাহুল গান্ধীর লাগাতার আম্বানি আদানিকে আক্রমণ এই লড়াইতেই মারাঠী অস্মিতার পাশে দাঁড়ানোর বার্তাবাহী ছিল। এই বার্তা ইন্ডিয়া জোটকে অনেকটা সাহায্য করেছে৷ শিবসেনা এবং এন সি পিকে ভেঙে মহারাষ্ট্রে ক্ষমতা দখল মারাঠী জনতা যে ভালোভাবে নেয় নি, এই নির্বাচনের ফলাফল থেকে সেটাও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী যেখানে এবং অর্থনৈতিকভাবে যে রাজ্যটি সবচেয়ে এগিয়ে থাকা, সেই রাজ্যে বিজেপির নির্ণায়ক পরাজয়ও আগামী দিনের ভারতীয় রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে৷

কর্ণাটকেও বিজেপি তাদের প্রত্যাশিত সাফল্য পায় নি, তবে তার চেয়েও বড় ধাক্কা এসেছে রাজস্থানে। ২০১৯ সালে রাজস্থানের পঁচিশটি আসনের মধ্যে চব্বিশটিতেই তারা জিতেছিল। এইবার তাদের আসন সংখ্যা নেমে এসেছে চোদ্দতে। কংগ্রেস রাজস্থানে পেয়েছে আটটি আসন। বামেদের জন্য আনন্দের খবর কৃষক আন্দোলনের অন্যতম কাণ্ডারী সি পি আই (এম) এর অমরা রাম রাজস্থানের শিকর লোকসভা আসন থেকে প্রায় তিয়াত্তর হাজার ভোটে জিতেছেন।

পশ্চিমবঙ্গে সি পি আই (এম) ও বামেদের মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা বেশ কিছু কেন্দ্রে উৎসাহব্যঞ্জক প্রচার সত্ত্বেও আরো একবার ভয়াবহভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে। কোনও আসনেই তারা জিততে পারল না এবং ভোট শতাংশও আটকে রইলো ছয় শতাংশের মধ্যে। শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয় কেরালাতেও সি পি আই (এম) এর পরাজয় ঘটেছে বিরাট মাত্রায়। তারা যেখানে রাজ্য সরকার চালাচ্ছে, সেখানেও কুড়িটির মধ্যে সি পি আই (এম) মাত্র একটি ও আর এস পি একটি আসনে বিজয়ী হয়েছে। তামিলনাড়ু থেকে আগের বারের মতোই সি পি আই ও সি পি আই (এম) দুটি করে আসনে বিজয়ী হয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের মতো ত্রিপুরাতেও ক্ষমতা থেকে চলে যাবার পর তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর কোনও সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ত্রিপুরাতে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে দুটি আসনের একটিতে তারা লড়েছিল। ত্রিপুরা পূর্বের সেই আসনটিতে তারা শুধু বিজেপির কাছে হেরেছে তাই নয়, হারের ব্যবধান চার লক্ষ আশি হাজার ভোট।

তামিলনাড়ু ও রাজস্থান ব্যতীত অন্যত্র সি পি আই (এম) বা সি পি আই এর ব্যর্থতার চিন্তাজনক পুনরাবৃত্তির অপরদিকে বামেদের জন্য আশাব্যঞ্জক খবর এসেছে বিহার থেকে। সেখানে ইন্ডিয়া জোট খুব একটা ভালো ফল করতে পারে নি। আরজেডি মাত্র চারটি আসনে ও কংগ্রেস তিনটি আসনে জিতেছে। কিন্তু বিহারে মাত্র তিনটি আসনে লড়েই দুটি আসনে বিরাট জয় ছিনিয়ে আনতে পেরেছে সি পি আই (এম এল) লিবারেশন। আরাতে সি পি আই (এম এল) লিবারেশন প্রার্থী সুদামা প্রসাদ ও কারাকাটে লিবারেশন প্রার্থী রাজারাম সিং এর বড় ব্যবধানে জয় শুধু সি পি আই (এম এল) এর জন্যই নয়, গোটা ভারতেই ক্রমশ প্রান্তিক হতে বসা বামেদের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিহারে এবার বিজেপি, জেডিইউ, এলজেপি জোট এর সামনে আরজেডি বা কংগ্রেস প্রত্যাশা অনুযায়ী সাফল্য পায় নি। সেই কঠিন জমিতে তিনটি কেন্দ্রে লড়ার সুযোগ পেয়ে দুটি কেন্দ্রে লিবারেশন এর জয় খুবই ইতিবাচক সাফল্য।

পশ্চিমবঙ্গের ৪২ টি আসনের মধ্যে তৃণমূল পেয়েছে ২৯ টি, বিজেপি ১২ টি এবং কংগ্রেস একটি। বিজেপির আসনগুলির বেশীরভাগ এসেছে উত্তরবঙ্গ থেকে। কংগ্রেসের একমাত্র আসনটিও উত্তরবঙ্গের। মালদা দক্ষিণ কেন্দ্র থেকে বিজয়ী হয়েছেন কংগ্রেস প্রার্থী ঈশা খান চৌধুরী। দক্ষিণবঙ্গে মেদিনীপুর থেকে বিজেপি দুটি আসন জিতেছে। কাঁথি ও তমলুক। এই জয়ের পেছনে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর সাংগঠনিক দক্ষতা রয়েছে। তবে মেদিনীপুর আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর বিজেপির অগ্নিমিত্রা পল তৃণমূলের প্রার্থী জুন মালিয়ার কাছে সাতাশ হাজার ভোটে পরাস্ত হয়েছেন। ঘাটাল থেকে দেব অবশ্য বিজেপির হিরণ চট্টোপাধ্যায়কে প্রায় এক লাখ তিরাশি হাজার ভোটে হারিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া দক্ষিণবঙ্গে বিজেপি বাংলাদেশ সীমান্তে থাকা বনগাঁ ও রানাঘাট আসন দুটি জিততে পেরেছে। মূলত মতুয়া ভোট বিজেপির দিকে থাকায় বনগাঁ থেকে বিজেপির শান্তনু ঠাকুর প্রায় সাড়ে তিয়াত্তর হাজার ভোটে জিতেছেন। রানাঘাট থেকে বিজেপির জগন্নাথ সরকারের জয়ের মার্জিন আরো বেশি, প্রায় এক লক্ষ সাতাশি হাজার। দক্ষিণবঙ্গে বিজেপির বাকি দুটি আসন এসেছে পুরুলিয়া ও বিষ্ণুপুর থেকে। পুরুলিয়াতে জ্যোতির্ময় সিং মাহাতোর জয়ের মার্জিন এক লক্ষ সত্তর হাজার, বিষ্ণুপুরে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর বিজেপির সৌমিত্র খাঁ তৃণমূলের সুজাতা মন্ডলকে হারিয়েছেন সাড়ে পাঁচ হাজার ভোটে।

দক্ষিণবঙ্গে বাকি সমস্ত আসনে বিজেপিকে পরাস্ত করে তৃণমূল জিতেছে। অধিকাংশ আসনে তৃণমূলের জয়ের মার্জিন যথেষ্ট বেশি। ডায়মণ্ড হারবার থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জিতেছেন সাত লক্ষ দশ হাজারেরও বেশি ভোটে, যা বোধহয় এক সর্বকালীন রেকর্ড। টিকিট না পেয়ে ভোটের ঠিক আগে তৃণমূল থেকে বিধায়ক পদে ইস্তফা দিয়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া দুই প্রার্থী অর্জুন সিং ও তাপস রায় পরাস্ত হয়েছেন। ব্যারাকপুরে অর্জুন তৃণমূলের পার্থ ভৌমিকের কাছে হেরেছেন চৌষট্টি হাজারেরও বেশি ভোটে। কলকাতা উত্তরে তৃণমূলের সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে তাপস রায় হেরে গিয়েছেন বিরানব্বই হাজারেরও বেশি ভোটে।

মুর্শিদাবাদ জেলার দুটি কেন্দ্রে কংগ্রেস ও সি পি আই (এম) এর দুই সেনাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরী ও মহম্মদ সেলিম এর নেতৃত্বে বাম ও কংগ্রেস কর্মীরা এই নির্বাচনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিলেন। তাঁরা অতীতের তিক্ততা ও জড়তা কাটিয়ে এবার পরস্পর পরস্পরকে ভোটও দিয়েছেন বলে মনে হয়েছে। তা সত্ত্বেও সি পি আই (এম) ও কংগ্রেস শিবিরের এই দুই সেনাপতির পরাজয় ঘটেছে। মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রে জয়ের আশা নিয়ে লড়াই করেও তৃণমূলের আবু তাহের খানের কাছে সি পি আই (এম) এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম হেরে গিয়েছেন এক লক্ষ চৌষট্টি হাজার মতো ভোটে। তৃণমূলের হয়ে ভোটে দাঁড়ানো, আক্ষরিক অর্থেই ক্রিকেটের পিচ থেকে উড়ে আসা ইউসুফ পাঠানের কাছে অধীর চৌধুরীকে বহরমপুরে নিজের দুর্গে হারতে হয়েছে প্রায় পঁচাশি হাজার ভোটে।

জঙ্গিপুরে তৃণমূলের খালিলুর রহমানের কাছে পরাস্ত হওয়া কংগ্রেস প্রার্থী মুর্তজা হোসেন বকুল দ্বিতীয় স্থান পেয়েছেন। মালদা দক্ষিণ, মুর্শিদাবাদ, বহরমপুর, জঙ্গীপুরের বাইরে কংগ্রেস বা সি পি আই (এম) সহ বামপন্থীরা এই নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র তৃতীয় বা চতুর্থ স্থানে নেমে গেছেন।

যাদবপুর ও দমদমে সি পি আই (এম) সমর্থকরা ভালো ফলের আশা করেছিলেন। দমদম থেকে লড়াই করা সি পি আই (এম) এর অন্যতম প্রধান রাজ্যনেতা সুজন চক্রবর্তী বিজয়ী তৃণমূলের সৌগত রায় ও দ্বিতীয় বিজেপির শীলভদ্র দত্তর থেকে অনেকটা পিছিয়ে থেকে পেয়েছেন তৃতীয় স্থান। যাদবপুরে সি পি আই (এম) এর তরুণ প্রার্থী সৃজন ভট্টাচার্যও তৃতীয় স্থান পেয়েছেন তৃণমূলের সায়নী ঘোষ এবং বিজেপির ড অনির্বান গাঙ্গুলির পেছনে থেকে। সি পি আই (এম) এর আর এক তরুণ প্রার্থী দীপ্সিতা ধর প্রচার পর্বে সামাজিক মাধ্যমে বেশ সাড়া ফেলেছিলেন। তিনিও তৃণমূলের কল্যাণ ব্যানার্জী এবং বিজেপির কবীর শঙ্কর বোসের পেছনে থেকে তৃতীয় স্থান পেয়েছেন।

পরাজয়ের পর দিল্লির জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রনেত্রী দীপ্সিতা সংবাদ মাধ্যমের সামনে যা বলেছেন তা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। সি পি আই (এম) এর নবীন মুখ স্বীকার করে নিয়েছেন পরিস্থিতির মূল্যায়নে তাঁদের বেশ বড়সড় ভুল হয়েছিল। তারা বুঝতে পারেন নি যে এই নির্বাচন গোটা দেশের মতো পশ্চিমবঙ্গেও মূলত বিজেপিকে হারানোর প্রশ্নটিকে সামনে রেখেই হতে চলেছে। দুর্নীতি সহ অন্যান্য ইস্যু এই নির্বাচনে থাকলেও দেশের সরকার গঠনের প্রশ্নটিই এই নির্বাচনের প্রধান ও নির্ণায়ক ইস্যু ছিল। এই প্রধান ইস্যুর বিষয়টি যে তারা ধরতে পারেন নি, সেটা দীপ্সিতা অকপটে জানিয়েছেন। রাজ্য সরকারের তরফে চালানো লক্ষীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্যসাথী ইত্যাদির মতো সামাজিক ন্যায়ের প্রকল্পগুলিরও তারা বিরোধী নন বলে দীপ্সিতা একই সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন। বামফ্রন্ট সমর্থকদের একাংশ যেভাবে ভাতাকে সামাজিক মাধ্যমে কটাক্ষ করছেন, তা যে দলীয় অবস্থান একেবারেই নয়, তা জানিয়ে মুখ খুলতে হয়েছে সি পি আই (এম) এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমকে।

বিরাট পরাজয়ের পরেও মানুষের পাশে থেকে তিনি ও তাঁর দল লড়াই চালিয়ে যাবেন, ভুলগুলি বিশ্লেষণ করবেন ও তা থেকে শিক্ষা নেবেন –  দীপ্সিতার মতো তরুণ প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন বাম নেতার এই ধরনের কথা আশ্বাস দেয়। তবে কিছু আশঙ্কাও থেকে যায় অতীতের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা থেকে। অনেকেরই মনে থাকার কথা দু হাজার একুশ সালের বিধানসভা নির্বাচনে একই রকমের বড়সড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হওয়ার পরে সি পি আই (এম) এর সর্বোচ্চ নেতৃত্ব প্রকাশ্যে বিজেমূল তত্ত্বকে ভুল বলেছিলেন। কিন্তু আমরা দেখেছি সি পি আই (এম) এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য শাখা ও তাদের প্রধান নেতৃত্ব সহ অধিকাংশ পার্টি নেতা কর্মী কার্যত এই বিজেমূল তত্ত্বকে সামনে রেখে এগিয়েছেন। বিজেপি এবং তৃণমূল কার্যত একই এবং একে অন্যকে সাহায্য করে, এই কথা যা বাস্তবের মাটিতে মিলমিশ খাচ্ছে না, এটা সি পি আই (এম) নেতৃত্ব কখনো কখনো মুখে স্বীকার করে ফেললেও অচিরেই ভুলে যাচ্ছেন এবং ভুল নীতিকৌশলের পুনরাবৃত্তি করে চলেছেন। এই রাজ্যে এই ভুলের মাশুল শুধু যে সি পি আই (এম)কেই দিতে হয়েছে তাই নয়, কংগ্রেস তথা তাঁদের রাজ্য সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরীকেও দিতে হয়েছে। গত লোকসভায় কংগ্রেসের বিরোধী দলনেতা মনোনীত হওয়া অধীর দেশজুড়ে কংগ্রেসের ঘুরে দাঁড়ানোর এই নির্বাচনে সংসদের বাইরে চলে যেতে বাধ্য হলেন।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বামপন্থীরা কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে সে নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও বিচার বিশ্লেষণ দরকার। কিন্তু সেই সবের প্রাকশর্ত খোলামেলাভাবে এটা স্বীকার করে নেওয়া যে দেশের প্রধান শত্রুকে চিনতে ও সেই নিরিখে রণকৌশল স্থির করার ক্ষেত্রে সি পি আই (এম) এর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্টভুক্ত বামপন্থীদের ভুল হয়েছে। জাতীয় কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট ঘনিষ্ট হয়ে পড়া রাজ্য কংগ্রেসের মধ্যেকার কিছু অস্বস্তিকর বার্তা আদানপ্রদানকেও এই নিরিখ থেকেই বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গে বাম আন্দোলনের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। সেই ঐতিহ্যে নানা ধরনের বাম শক্তি ঐক্য ও বিতর্কের মধ্যে দিয়ে কাজ করেছে। সাতাত্তর সালে বাম সরকার ক্ষমতায় আসার পর নানা ধরনের বাম শক্তির এক পুনর্বিন্যাস হয় এবং সি পি আই (এম) তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে। নকশালপন্থী শক্তিদের মধ্যে সামনের সারিতে থাকা সি পি আই (এম এল) লিবারেশন এর তরফে সোভিয়েতের পতন ও আন্তর্জাতিক বাম রাজনীতির নতুন পরিস্থিতিতে নব্বইয়ের দশকেই এসেছিল লেফট কনফেডারেশন এর ডাক। সেখানে কোনও দলের সাংগঠনিক বা সংসদীয় আধিপত্যের বাইরে বামপন্থীদের খোলামেলা মুক্ত পথে ঐক্য সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে বাম সংহতির নতুন পুনর্বিন্যাসের কথা বলা হয়েছিল। সেই সময়ে সি পি আই (এম) এর তরফে প্রাকশর্ত থাকত বামফ্রন্ট সরকারকে মান্যতা দেওয়ার প্রশ্নটিকে ঘিরে। আজ নতুন পরিস্থিতি এসেছে, বামফ্রন্ট সরকারও এক দশক আগে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু সরকারের স্মৃতি আঁকড়ে ও সরকারে ফিরে আসার স্বপ্নকে উশকে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে সেই বামফ্রন্ট মডেলকে নিয়েই বামেদের যৌথ কার্যকলাপের কথা ভাবা হচ্ছে সি পি আই (এম) এর তরফে।

গোটা দেশের পরিস্থিতি গত এক দশকে আমূল বদলে গেছে। পাল্টেছে বামেদের শক্তি বিন্যাসের ভারসাম্যও। আজকে পশ্চিমবঙ্গে ও অন্যত্র বাম ঐক্যকে বাস্তবে গড়ে তুলতে চাইলে এই নতুন পরিস্থিতির উপযুক্ত মতাদর্শ, রণনীতি, রণকৌশল যেমন দরকার, তেমনি দরকার বাম আন্দোলনের নতুন মঞ্চ, যার বিন্যাসটাই হতে হবে একেবারে নতুন রকমের। রাজস্থানে সি পি আই (এম) এর অমরা রামের সাংসদ হওয়া বা বিহার থেকে সি পি আই (এম এল) এর দুজন সাংসদ হওয়া দেশের বাম রাজনীতির সামগ্রিক সঙ্কটের মধ্যেও আশার আলো। এই আলো কীভাবে জ্বলল তার বিশ্লেষণ করে সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়া খুবই দরকার। আলাদাভাবে কখনো এর সম্যক বিচার বিশ্লেষণের দিকে আমরা এগোতে চাইবো, কিন্তু আপাতত কেবল এটুকু মনে রাখতে হবে যে রাজস্থানে অমরা রাম জিতেছেন চলমান কৃষক আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসেবে। অন্যদিকে বিহারে যে দুটি আসনে সি পি আই (এম এল) জয় পেয়েছে, সেই দুটি আসনই এসেছে ভোজপুর থেকে। এই ভোজপুরই ছিল সত্তর দশকের গোড়ায় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মুখে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ার পর সাহসের সঙ্গে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে নতুন লড়াই গড়ে তোলার মূল ভিত্তিভূমি। সি পি আই (এম এল) লিবারেশন এর প্রথম সাধারণ সম্পাদক কমরেড জহর (সুব্রত দত্ত) এখানেই শহীদ হন। কমরেড জহর ও পরবর্তী সাধারণ সম্পাদক কমরেড বিনোদ মিশ্রর কর্মকান্ডের মূল এলাকা ছিল এই ভোজপুর। শত সহস্র কমরেড এখানে রাষ্ট্রীয় ও সামন্তী শক্তির মোকাবিলা করতে দশকের পর দশক ধরে জীবনপণ করেছেন, জেল খেটেছেন, শহীদ হয়েছেন। এই আন্দোলনের ওপর তৈরি রিপোর্ট “বিহারের বহ্নিমান খেতখামার থেকে” (ফ্রম দ্য ফ্লেমিং ফিল্ডস অব বিহার) ভারতের বাম রাজনীতির অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায়ের এক দলিল। এই ইতিহাসের প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে ভোজপুরের আরা ও কারাকট থেকে সি পি আই (এম এল) এর দুই কৃষক নেতা সুদামা প্রসাদ ও রাজারাম সিং এর এবার বিজয়ী হয়ে সংসদে প্রবেশ করাকে বোঝা সম্ভব নয়। সেইসঙ্গে চলমান রাজনীতির দাবিতে বিজেপি বিরোধী জোটে শরিক হওয়ার নমনীয় রণকৌশলটিকেও ভুলে গেলে চলবে না।

বাম রাজনীতি আজকে কোথায়  কেন সফল বা ব্যর্থ হচ্ছে তা থেকে শিক্ষা নেবার কথাটা বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে কেবল কিছুদিনের জন্য মুখে বললেই চলবে না, তাকে প্রয়োগ করার ইচ্ছা ও সেজন্য পুরনো ভুলকে শুধরে নেবার নমনীয়তা দরকার। আশা করা যাক নতুন পরিস্থিতিতে সেই কাজ নতুনভাবে শুরু হবে।

 

0 Comments

Post Comment