পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

দুর্নীতি ১ : ফাঁকা সিন্দুকের রূপকথা

  • 27 May, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 435 view(s)
  • লিখেছেন : শুভজিৎ বসাক
রিজার্ভ ব্যাংকের লেটেস্ট রিপোর্ট বলছে, এ দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ফ্রড হয়। কিন্তু এই জালিয়াতি কোনো বাইরের শত্রুর আক্রমণ ছিল না; এটা ছিল খোদ সিস্টেমের ভেতর থেকে, সিস্টেমের রক্ষকদের হাত দিয়ে পুরো কাঠামোটাকে উইপোকার মতো খেয়ে ফেলার এক নিখুঁত গল্প।

কল্পনা করুন, আপনি ব্যাংকে গিয়ে নিজের পাসবইটা আপডেট করলেন। দেখলেন সেখানে লাখ লাখ টাকা জ্ব্লজ্বল করছে। আপনি নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরে ঘুমোতে গেলেন। কিন্তু আপনি জানার আগেই মাঝরাতে কেউ একজন আপনার সেই পাসবইয়ের পাতাটা ঠিক রেখে ভেতরের আসল টাকাটা স্রেফ হাওয়া করে দিল! শুনতে কোনো জাদুকরের গল্প মনে হচ্ছে তো? কিন্তু ঠিক এই ম্যাজিকটাই গত ২৮ মাস ধরে ঘটেছে আমাদের নাকের ডগায়, খোদ সরকারি কোষাগারের সাথে।

আমরা যখনই 'ব্যাংক জালিয়াতি' শব্দটা শুনি, চোখের সামনে ভেসে ওঠে কোনো হুডি পরা চতুর হ্যাকার, করপোরেট টাই-পরা কোনো বিজনেস টাইকুন বা সুদূর কোনো দেশের সাইবার ক্রিমিনাল। কিন্তু হরিয়ানার এই ৬৪৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার কেলেঙ্কারিটা আমাদের সেই চেনা ধারণার গালে একটা মস্ত বড় থাপ্পড়। রিজার্ভ ব্যাংকের লেটেস্ট রিপোর্ট বলছে, এ দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ফ্রড হয়। কিন্তু এই জালিয়াতি কোনো বাইরের শত্রুর আক্রমণ ছিল না; এটা ছিল খোদ সিস্টেমের ভেতর থেকে, সিস্টেমের রক্ষকদের হাত দিয়ে পুরো কাঠামোটাকে উইপোকার মতো খেয়ে ফেলার এক নিখুঁত গল্প।

সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় কী জানেন? সরকারি খাতায় যে কোটি কোটি টাকা ফিক্সড ডিপোজিট হিসেবে দেখাচ্ছিল, বাস্তবে ব্যাংকের সিন্দুকে ছিল কেবল শূন্য হাওয়া! এই জালিয়াতি কিন্তু রাতারাতি আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার মতো ঘটেনি। এর শিকড় লুকিয়ে ছিল আমাদের সরকারি ব্যবস্থার সেই চেনা অলসতা আর অন্ধবিশ্বাসের মধ্যে। ফাইল চালাচালির চেনা ছক আর 'সব ঠিক আছে' ধরে নেওয়ার যে মারাত্মক রোগ আমাদের প্রশাসনে আছে, তাকেই খুব ঠান্ডা মাথায় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। বছরের পর বছর ধরে অডিটের ঢিলেমি এবং উচ্চপদস্থ কর্তাদের নজরদারির অভাব কীভাবে একটা আস্ত সরকারি তহবিলকে কিছু মানুষের ব্যক্তিগত এটিএম মেশিনে পরিণত করতে পারে—এটি তারই এক জলজ্যান্ত এবং ভয়ঙ্কর দলিল।

২) জালিয়াতির নিখুঁত ব্লু-প্রিন্ট বা মেকানিজম

একটা সাড়ে ছশো কোটি টাকার ডাকাতি হবে, অথচ কোনো সাইরেন বাজবে না, কোনো লকার ভাঙা হবে না, এমনকি সিসিটিভি ক্যামেরায় একটা সন্দেহভাজন মুখও ধরা পড়বে না—ভাবা যায়? একেই বলে প্রাতিষ্ঠানিক জালিয়াতির ‘পিওর আর্ট’। খাতা-কলমে সবকিছু একদম দুধ দিয়ে ধোয়া, অথচ ভেতরে ভেতরে পুরো পুকুর চুরি! এই অবিশ্বাস্য ক্রাইম থ্রিলারের নেপথ্য কারিগর কীভাবে একটা ফুল-প্রুফ ব্লু-প্রিন্ট সাজিয়েছিলেন, চলুন সেই মনস্তাত্ত্বিক আর টেকনিক্যাল খেলাটা একটু সহজ করে বোঝা যাক। পুরো অপারেশনটা চলেছে চারটে মোক্ষম চালে:

• প্রথম চাল— 'হানি ট্র্যাপ' নয়, 'ট্রাস্ট ট্র্যাপ': যেকোনো বড় চুরির প্রথম শর্ত হলো উল্টোদিকের মানুষের চোখে সর্ষে ফুল দেখানো। এখানে অস্ত্র ছিল অসম্ভব ভালো ব্যবহার আর নিখুঁত জনসংযোগ। সরকারি দপ্তরের বড় বড় বাবুদের সাথে এমন এক মধুর সম্পর্কের জাল বোনা হলো, যাতে তারা নিয়মের ফাইলটা অন্ধের মতো সই করে দেন। এতটাই সম্মোহন ছিল যে, ঘরের কাছের ব্যাংক ছেড়ে সবাই মাইল মাইল দূরের একটা নির্দিষ্ট ব্রাঞ্চে টাকা রাখার জন্য লাইন দিলেন। কেন দিলেন? সেই 'কেন'-র উত্তরটাই হলো এই জালিয়াতির প্রথম সাকসেস।

• দ্বিতীয় চাল— অদৃশ্য কাগজের ভূত (শেল কোম্পানি): বাবুরা তো টাকা দিতে রাজি, কিন্তু সেই টাকা নিজের পকেটে ভরার জন্য একটা নিরাপদ চ্যানেল চাই। তাই জন্ম নিল এমন কিছু কোম্পানি, যাদের অস্তিত্ব কেবল ডায়েরির পাতায় বা ল্যাপটপের ফোল্ডারে। আরও মজার বিষয়, এই কোম্পানিগুলোর ডিরেক্টর বা মালিক কারা ছিলেন জানেন? ঘরের বিশ্বস্ত ড্রাইভারের বউ, নিজের জন্মদাত্রী মা, কিংবা পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট! এদের সামনে রেখে এমন একটা গোলকধাঁধা তৈরি করা হলো, যার শেষ চাবিটা ছিল কেবল ওই মাস্টারমাইন্ডের হাতে।

• তৃতীয় চাল— 'আসল' নামের নকল ম্যাজিক: সরকারি অফিসাররা তো আর বোকা নন, তারা টাকা জমা দিয়ে প্রমাণ চাইবেন। এখানেই এলো আসল টুইস্ট। তাদের হাতে তুলে দেওয়া হলো এমন কিছু ফিক্সড ডিপোজিটের সার্টিফিকেট (FDR), যা দেখতে একদম হুবহু আসল, সিকিউরিটি হোলোগ্রাম থেকে শুরু করে ব্যাংকের সিল—সব পারফেক্ট। কিন্তু ব্যাংকের মেইন সার্ভারে সেই কাগজের কোনো অস্তিত্বই ছিল না! অফিসাররা সেই জাল কাগজ ফাইলের ভেতরে রেখে শান্তিতে ঘুমাতে গেলেন, আর ওদিকে আসল টাকা ব্যাংকের গেট গলে সোজা ঢুকে গেল ওই কাগজের কোম্পানিগুলোর পেটে।

• চতুর্থ চাল— ডিজিটাল ট্রেইল ব্লাস্ট: আজকালকার যুগে ব্যাংকিং জালিয়াতি করতে গেলে আইটি সেল বা পুলিশ 'মানি ট্রেইল' বা ডিজিটাল পায়ের ছাপ ধরে ঠিক চোরের কলার চেপে ধরে। আমাদের খলনায়ক সেটা জানতেন। তাই তিনি ডিজিটাল টাকাকে এক লহমায় বাতাসে মিলিয়ে দেওয়ার জন্য বেছে নিলেন পুরনো আমলের সোনা ব্যবসায়ীদের। ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা ট্রান্সফার হলো জুয়েলার্সদের খাতায়, আর সেখান থেকে ব্যাগে ব্যাগে ভরে বেরিয়ে এলো একদম কাঁচা ক্যাশ বা নগদ টাকা। ব্যস! প্রযুক্তির দুনিয়ায় টাকার ট্র্যাক করার ক্ষমতা ওখানেই ভ্যানিশ।

সবচেয়ে মারাত্মক সাইকোলজিটা ছিল এই পুরো চেইনের শেষ প্রান্তে। একে আচরণবিজ্ঞানের ভাষায় বলে 'ডিফিউশন অফ রেসপন্সিবিলিটি'। সই করা অফিসার ভাবলেন—'আমার কাজ তো শুধু সাইন করা, ভেরিফাই করার কাজ তো ফাইনান্সের'। ফাইনান্স অফিসার ভাবলেন—'অ্যাকাউন্ট তো ডিপার্টমেন্ট খুলেছে, আমার কী!' আর ডিপার্টমেন্ট ভাবল—'ব্যাংক যখন সার্টিফিকেট দিয়েছে, তখন আর চিন্তা কী!' এই 'কেউ না কেউ তো দেখছেই' নামক অন্ধবিশ্বাসের ফাঁক গলে একটা আস্ত সিস্টেমের চোখের সামনে দিয়ে ৬৪৫ কোটি টাকা স্রেফ কর্পূরের মতো উড়ে গেল।

৩) তদন্তের মুখে আমলারা

সাড়ে ছশো কোটি টাকার এই মহাকাব্যিক লুটের গল্পে যদি আপনি ভাবেন যে ওই ব্যাংক ম্যানেজার একাই পুরো লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছেন, তবে আপনি বড্ড সরল। এতগুলো সরকারি দপ্তরের চাবি যারাই নাড়াচাড়া করুন না কেন, তাদের টেবিলের ওপরে কিন্তু বড় বড় নেমপ্লেট ঝোলে—যাতে খোদাই করা থাকে ‘IAS’ বা ‘IFS’। সিবিআই যখন এই দুর্নীতির পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানো শুরু করল, তখন ভেতরের গন্ধটা সোজা গিয়ে পৌঁছাল রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক অলিন্দে। বর্তমানে একজন নয়, দুজন নয়—একেবারে আটজন হেভিওয়েট আইএএস (IAS) এবং একজন আইএফএস (IFS) অফিসার কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের স্ক্যানারের নিচে!

চলুন দেখে নেওয়া যাক, ক্ষমতার কোন কোন চূড়ায় এখন সিবিআই-এর হাতুড়ি পড়ছে:

• বোর্ডের মাথায় বজ্রপাত (বিনীত গর্গ, ১৯৯১ ব্যাচ): যিনি হরিয়ানা স্টেট পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ডের চেয়ারম্যান। যে দপ্তরটি সবথেকে বেশি (১৬৯ কোটি) খুইয়েছে, সেই দপ্তরের প্রধান হিসেবে এঁর দায় এড়ানোর কোনো জায়গা নেই।

• সেচের জলে টান (পঙ্কজ আগরওয়াল, ২০০০ ব্যাচ): ইরিগেশন ও মাইনিংয়ের মতো হাই-প্রোফাইল দপ্তরের প্রাক্তন প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি। কোটি কোটি টাকার ফাইল এঁর টেবিল পার করেই ব্যাংকের ভুয়ো অ্যাকাউন্টে গেছে।

• মুখ্যমন্ত্রীর ঘরের লোক (সাকেত কুমার, ২০০৫ ব্যাচ): ইনি খোদ মুখ্যমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রধান সচিব ছিলেন! এই কেলেঙ্কারির আঁচ লাগার সাথে সাথেই এঁর ডানা ছাঁটা হয়েছে এবং সমস্ত বড় দায়িত্ব থেকে এঁকে মুক্ত করা হয়েছে।

• বাকি কুশীলবদের লম্বা লাইন: তালিকায় আছেন পাবলিক হেলথ ও ফাইনান্সের প্রাক্তন প্রধান মোহাম্মদ শয়ম (২০০২ ব্যাচ), গভর্নরের সেক্রেটারিয়েট থেকে বদলি হওয়া ডি কে বেহেরা (২০০৭ ব্যাচ), এবং মানিরাম (২০০৯ ব্যাচ)। এছাড়া সিআরইএসটি (CREST)-এর সিইও, আইএফএস অফিসার নবীত কুমার শ্রীবাস্তব (২০১৪ ব্যাচ)-এর বিরুদ্ধেও তদন্তের সবুজ সংকেত দিয়ে দিয়েছে কেন্দ্র।

সবচেয়ে বড় টুইস্ট হলো, ইতিমধ্যে প্রদীপ কুমার (২০১১ ব্যাচ) এবং রামকুমার সিং (২০১২ ব্যাচ) নামের দুই আইএএস অফিসারকে সরাসরি সাসপেন্ড বা বরখাস্ত করা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই সাহেবরা কি সত্যিই কিচ্ছু জানতেন না? তারা কি স্রেফ বোকা বনে যাওয়া ‘ভিকটিম’, নাকি এই লুটের মালের বখরা তাঁদের ড্রয়ারেও গেছে? সিবিআই-এর লকআপে থাকা অপরাধীদের জবানবন্দী আর কিছু মারাত্মক গোপন অডিও রেকর্ডিং কিন্তু ইঙ্গিত দিচ্ছে যে—সাহেবরা হয়তো জানতেন, আর জেনেও ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ ছিলেন। খোদ হরিয়ানা সরকার যখন এই অফিসারদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন আইনের 'সেকশন ১৭-এ' ধারায় তদন্তের অফিশিয়াল পারমিশন দিয়ে দিয়েছে, তখন এটা পরিষ্কার যে—ডাল মে কুছ কালা নেহি, পুরী ডাল হি কালী হ্যায়!

৪) একটি মর্মান্তিক আত্মহত্যা ও ব্যবস্থার ব্যর্থতা

সাড়ে ছশো কোটি টাকার এই পুরো ফাইলটা ওল্টাতে ওল্টাতে হঠাৎ একটা পাতায় এসে হাতটা থমকে যায়। কারণ এতক্ষণ ধরে যে গল্পটাকে একটা টানটান ক্রাইম থ্রিলার মনে হচ্ছিল, এই পয়েন্টে এসে সেটা একটা রক্তমাংসের ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়। জালিয়াতির হিসেব মেলাতে মেলাতে যখনই সিবিআই-এর নোটিশ গিয়ে পৌঁছাল এক সাধারণ অ্যাকাউন্টস অফিসারের টেবিলে, তখনই ঘটে গেল এক চরম বিপর্যয়। হরিয়ানা সিভিল সেক্রেটারিয়েটের আট তলার জানলা গলে একটা মানুষ সোজা গিয়ে পড়লেন মৃত্যুর কোলে।

কারও এই মর্মান্তিক আত্মহত্যাই তাঁর অপরাধের অকাট্য প্রমাণ—এমনটা ভাবা ভুল। কিন্তু এটা যে একটা ভেঙে পড়া, পচে যাওয়া সিস্টেমের চূড়ান্ত প্রমাণ, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। যখন একজন সাধারণ সরকারি কর্মচারী সিবিআই-এর জেরা আর সিস্টেমের নোংরামির চাপ সহ্য করতে না পেরে আট তলার ওপর থেকে ঝাঁপ দেওয়ার মতো মরিয়া পথ বেছে নেন, তখন বুঝতে হবে ভেতরের অন্ধকারটা ঠিক কতটা গভীর ছিল! এই ধাক্কায় ইতিমধ্যেই তিনজন অ্যাকাউন্টস অফিসারকে চাকরি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে প্রাণটা গেল, তার দায় নেবে কে?

এই ৬৪৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকাটা কিন্তু স্রেফ চণ্ডীগড়ের একটা ব্যাংকের কম্পিউটার স্ক্রিনে ভেসে থাকা কোনো সংখ্যা নয়। এটা হলো হরিয়ানার ২ কোটি ৮০ লক্ষ সাধারণ মানুষের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা ট্যাক্সের টাকা। এই টাকাটা চুরি যাওয়া মানে—কোনো একটা প্রত্যন্ত গ্রামের ভাঙা রাস্তাটা আর পিচ দিয়ে বাঁধানো হলো না, কোনো একটা সরকারি হাসপাতালের আইসিইউ-তে হয়তো নতুন লাইফ সাপোর্ট মেশিনটা আর এলো না, কিংবা কোনো একটা হতদরিদ্র স্কুলের ল্যাবে বাচ্চারা হয়তো বিজ্ঞানের নতুন কোনো যন্ত্রপাতি ছুঁয়েও দেখতে পেল না।

আমরা সাধারণ মানুষ সারাজীবন ভাবি যে বড় কোনো সাইবার অ্যাটাক হবে, বিদেশি কোনো হ্যাকার আমাদের দেশ লুট করে নেবে, কিংবা কোনো করপোরেট হাঙর এসে টাকা গিলবে। কিন্তু এই মহাকাপট্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, আসল চোরেরা কোনো ভিনদেশি দস্যু নয়। তারা ববকাটের চুলে বা দামি স্যুটের আড়ালে, খোদ সরকারি সিলমোহর দেওয়া চেয়ারে বসেই আমজনতার পকেট কাটছে। সিবিআই ১৪ই মে চণ্ডীগড় আর পঞ্চকুলার সাত-সাতটা জায়গায় চিরুনি তল্লাশি চালিয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রশ্নটা একটা নির্দিষ্ট অপরাধী বা একজন ব্যাংক ম্যানেজারের নয়। প্রশ্নটা হলো আমাদের গোটা প্রশাসনিক জবাবদিহিতার কাঠামোর ওপর। আজ একটা মুখোশ খুলেছে বলে এই সাড়ে ছশো কোটির হিসেবটা আমরা তাও জানতে পারছি, কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে এমন কত শত ফাইল যে আজও ধামাচাপা পড়ে আছে, তার উত্তর কার কাছে?

৫) মেহনতির রক্ত আর বুর্জোয়া ব্যবস্থার মহোৎসব

এই সাড়ে ছশো কোটির কেলেঙ্কারি আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ বা একজন ব্যাংক ম্যানেজারের চাতুর্য নয়। একজন শ্রেণী-সচেতন মানুষের চোখে এটি হলো পুঁজিবাদের সেই চেনা ও নগ্ন রূপ, যেখানে রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক কাঠামো আর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা হাত ধরাধরি করে শোষকের ভূমিকা পালন করে। যে টাকাটা ব্যাংকের ভুয়ো অ্যাকাউন্ট আর সোনা ব্যবসায়ীদের লকারে গিয়ে কাঁচা টাকায় রূপান্তরিত হলো, তার এক-একটি আনা আসলে এ দেশের খেটেখাওয়া মজুর, কৃষক আর নিম্নবিত্ত চাকুরিজীবীদের হাড়ভাঙা খাটুনির ফসল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে রাষ্ট্রের জন্মই হয়েছিল নাগরিকের সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে, সেই রাষ্ট্র কেন বারবার মেহনতি মানুষের পকেট কাটার এই উৎসবকে নিঃশব্দে প্রশ্রয় দেয়? আমজনতার মাথার ঘাম পায়ে ফেলা ট্যাক্সের টাকা যখন শোষক শ্রেণীর বিলাসবহুল জীবনের জ্বালানি হয়ে ওঠে, তখন তাকে স্রেফ 'দুর্নীতি' বলে লঘু করা যায় না—ওটা হলো সুপরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক লুণ্ঠন।

আমরা ভাবি শত্রু বুঝি বাইরে দাঁড়িয়ে, কিন্তু শ্রেণী-সংগ্রামের ইতিহাস আমাদের বারবার কী শেখায়? আসল শত্রু তো লুকিয়ে থাকে ব্যবস্থার ভেতরেই! টাই-পরা করপোরেট ম্যানেজার আর দামি স্যুট-পরা আইএএস অফিসাররা আসলে একই বুর্জোয়া ব্যবস্থার দুটি ভিন্ন ডালপালা। তারা মেহনতি মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারগুলোকে লুণ্ঠন করে নিজেদের শ্রেণীগত স্বার্থ কায়েম করে। এই টাকাটা লোপাট হওয়া মানে—কোনো শ্রমিকের সন্তানের স্কুলের ল্যাবটা আর তৈরি হলো না, কোনো গরিব ঘরের মা হয়তো হাসপাতালের মেঝেতে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে মরলেন, আর কোনো প্রত্যন্ত গ্রামের চাষী তাঁর ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হলেন। কিন্তু এ কেমন সমাজকাঠামো যেখানে মেহনতিদের কপালে জোটে শুধু বঞ্চনার ছ্যাঁকা, আর ঠান্ডা ঘরের বাবুরা অবলীলায় গিলে ফেলে কোটি কোটি টাকার জনকল্যাণ তহবিল? এই চরম অসাম্যের জবাব দেবে কে?

সিবিআই আজ তদন্ত করছে, কিছু আমলার বদলি হচ্ছে, হয়তো লোকদেখানো দু-চারজনের জেলও হবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের চোখ বেঁধে ক্ষমতার এই মিউজিক্যাল চেয়ার খেলিয়ে শোষণের আসল চাকাটাকে কি আদৌ থামানো যাবে? বুর্জোয়া রাষ্ট্রকাঠামোয় এই ধরণের তদন্ত আসলে কি এক ধরণের আইওয়াশ নয়, যা শুধুমাত্র খেটেখাওয়া মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে সাময়িকভাবে স্তিমিত করার জন্য মাঝেমধ্যে সাজানো হয়? যতক্ষণ না এই জবাবদিহিহীন আমলাতান্ত্রিক পুঁজিপতি ব্যবস্থা এবং শোষক শ্রেণীর এই গোপন চক্রকে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলা যাচ্ছে, ততক্ষণ টেবিলের তলা দিয়ে গরিবের রক্ত চোষার এই উৎসব কি সত্যিই বন্ধ হওয়া সম্ভব? আজ ৬৪৫ কোটির একটা ফাইল খুলেছে বলে আমরা হইচই করছি, কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে এমন কত লক্ষ কোটি টাকার খতিয়ান যে মেহনতিদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ধামাচাপা পড়ে আছে, তার হিসাব নিতে গেলে এই পুরো পচা গদিটাকেই উল্টে দেওয়ার সময় কি এবার সত্যিই আসেনি?

 

0 Comments

Post Comment