পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

নারীবিদ্বেষ আর বর্ণবিদ্বেষ পিঠোপিঠি অবস্থান করছে হাথরাসের ঘটনায়

  • 30 September, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 912 view(s)
  • লিখেছেন : শতাব্দী দাশ
ধর্ষকের সমর্থনে তার স্বজাতি বা স্ববর্ণ-র পুরুষ ( কখনও আবার মহিলাও) পথে নামছে, প্রকাশ্যে ধর্না দিচ্ছে বা মিছিল করছে, এরকম নজির তার মানে বাড়ছে। এরকম নজির যত বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে, ধর্ষণ একটি সামাজিক অপরাধ, ব্যক্তির বিকৃতি নয়। কোথাও ধর্ষণে নারীবিদ্বেষের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ধর্মীয় বিদ্বেষ, কোথাও বর্ণবিদ্বেষ৷ কিন্তু এই সকল প্রকার বিদ্বেষ, যতটা না ব্যক্তিগত, তার চেয়ে অনেক বেশি সামাজিক।

যদিও দেশের বর্তমান আইন মোতাবেক ধর্ষিতার নাম প্রকাশ করা যায় না, তবু মিডিয়ার কল্যাণে উত্তর প্রদেশের হাথরাসের ধর্ষিত, সদ্যমৃত মেয়েটির নাম সকলে জানে। এবং সকলেরই চোখে পড়েছে, তার পদবীটি বাল্মিকী। ঘটনাচক্রে যে রাম ও রামায়ণকে ঘিরে ( বস্তুত, রামায়ণের একটি বিকৃত সংকীর্ণ হিন্দুত্ববাদী রূপকে ঘিরে) আবর্তিত হয় বিজেপির রাজনীতির অনেকখানি, তার অন্যতম প্রধান রূপকারকেও আমরা বাল্মীকি নামেই চিনি। এর মধ্যে অনেকে রূপক খুঁজেছেন বিজেপির স্ববিরোধের, যেহেতু বাল্মীকি পদবীধারী দলিত মেয়েটি বিজেপি অধ্যুষিত যোগীরাজ্যেই ধর্ষিত ও খুন হয়েছে। ঠিক যেমন মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া কিংবা জিভ ছিঁড়ে নেওয়ারও প্রতীকী অর্থ খুঁজেছেন কেউ।

লক্ষ্যনীয়, হায়দ্রাবাদ বা উন্নাও-এর পর আবার একটি ধর্ষণ জাতীয়-আলোচনায় এসেছে। আগের মতোই, স্পষ্টত দুটি ফ্যাক্টর কাজ করেছে। এক, ধর্ষিতা শুধু ধর্ষিত হয়নি, তার মৃত্যুও ঘটেছে। আর দুই, ধর্ষণের নৃশংসতা মারাত্মক। এই দুই ফ্যাক্টরের অনুপস্থিতিতে সচরাচর কোনো ধর্ষণের ঘটনা জাতির কাছে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে না। বরং ধর্ষিতার চরিত্রে কালিমালেপনই মুখ্য হয়ে ওঠে। মনে রাখতে হবে, এ'দেশে প্রতি পনের মিনিটে একটি ধর্ষণ ঘটে।

অ্যাক্টিভিজমের অবস্থান থেকে ধর্ষণকে এতটাই রক্তাক্ত এক বাস্তব ঘটনা বলে জানি যে রূপক বা প্রতীক গঠনের কোনো প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারি না।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর ঘটনাটি ঘটে। ঘাস কাটতে গেছিল পরিবারটি৷ মা, ভাই, বোন খানিক দূরে দূরে ছিল একে অপরের থেকে। সেই ফাঁকে মেয়েটিকে বাজরার ক্ষেতে টেনে নিয়ে যায় চার যুবক। মেয়ে নিখোঁজ বুঝতে পারার পর, পরিবারটি খুঁজতে শুরু করে। পাওয়া যায় তাকে অচৈতন্য অবস্থায়। পরিবারের বক্তব্য অনুসারে, পুলিশ গুরুত্ব দেয়নি প্রথমে। আইনি ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয় ঘটনার চার-পাঁচ দিন পর। আর জাতীয় মিডিয়ায় হৈ চৈ শুরু হয় মেয়টির মৃত্যুর পর। যে নিষ্ঠুরতার শিকার সে হয় ধর্ষণকালে, তা হাড় হিম করে দেয়। নিচুজাতের মেয়েটিকে প্রথমে গলায় ফাঁস লাগিয়ে টেনে নিয়ে যায় উঁচু জাতের চার যুবক। অপরিসীম ঘৃণায় জিভ ছিঁড়ে নেওয়া হয়। মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়। মেয়েটির শরীরে মাল্টিপল ফ্র‍্যাকচার ছিল। ধর্ষণের পরেও গলায় ফাঁস লাগিয়ে হত্যা করার চেষ্টা হয়েছিল। তার দুই পা সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতগ্রস্ত ছিল, হাতগুলিও পক্ষাগাতগ্রস্ত ছিল আংশিকভাবে। প্রথমে আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির জওহরলাল নেহেরু হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও শেষে সফদরগঞ্জ এআইআইএমএস-এ নিয়ে যাওয়া হয়৷ পনের দিনের যুদ্ধ শেষে সেখানেই মৃত্যু।


যোগী আদিত্যনাথের উত্তর প্রদেশ এমনিতেই ভারতের ধর্ষণকেন্দ্র। উন্নাও-এর দুটি ঘটনা মনে আছে নিশ্চয়। একটিতে ধর্ষক ছিল স্বয়ং বিজেপি এমপি, একাধিক বার মেয়েটিকে খুন করার চেষ্টাও হয়। দ্বিতীয় ঘটনায় জামিনে মুক্ত ধর্ষকরা ধর্ষিতাকে জ্বালিয়ে দেয়। খবরে প্রকাশ, উন্নাও সহ উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন জেলায় ধর্ষণের ঘটনা এত আকছার ঘটে যে ধর্ষণের হুমকির বিষয়ে নালিশ করতে গেলে পুলিশ বলে, হুমকিতেই নালিশ নিতে হলে হিসেব রাখতে পারবে না, হুমকি জলভাত। পুলিশ বলে 'এখনও তো ধর্ষণ হয়নি, হলে আসবেন।' চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের NCRB রিপোর্ট অনুসারে উত্তর প্রদেশ মহিলাদের বিরুদ্ধে হওয়া অপরাধের ক্ষেত্রে ভারতে শীর্ষস্থানেই ছিল।


প্রতীক বা রূপক গঠনের প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে অক্ষম হলেও, 'বাল্মীকি' পদবীটি আমার কাছেও বাস্তব অভিঘাত বহন করে৷ দস্যু রত্নাকর কী জাতের মানুষ ছিলেন বাল্মীকি মুনি হয়ে ওঠার আগে, তা সঠিক জানি না। কিন্তু 'বাল্মীকি' পদবীটি বর্তমানে যাঁরা বহন করেন, তাঁরা শিডিউল্ড কাস্ট। এই অপরাধটির সঙ্গে সম্পৃক্ত বর্ণগত রাজনীতি খুব স্পষ্ট। ধর্ষণের সঙ্গে যৌন সম্ভোগের চেয়ে অনেক বেশি সম্পর্ক যে ক্ষমতা-প্রদর্শনের , তা নারীবাদীরা চিরকালই বলেন। তা আরেকবার প্রমাণ হল এই ঘটনায়। হাথরাসের ওই চার যুবকের দলিত-ঘৃণার কথা লোকে জানত। এখানে নারীবিদ্বেষের সঙ্গে বর্ণবিদ্বেষ স্পষ্টতই ইন্টারসেক্ট করেছে। কাঠুয়ার নাবালিকাটির ক্ষেত্রে যেমন নারী-বিদ্বেষের সঙ্গে ইন্টারসেক্ট করেছিল সংখ্যালঘু-বিদ্বেষ। উল্লেখ করা যায়, গত ৯ই সেপ্টেম্বর জলপাইগুড়িতে দুই আদিবাসী নাবালিকাও ধর্ষিতা হয়েছিল বলে অভিযোগ। তাদের মধ্যে একজন কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যাও করে। অন্যজন কীটনাশক খেলেও বেঁচে যায়। তাদের ও বাড়ির লোকের দাবি, ধর্ষণ হয়েছিল বলেই আত্মহত্যার চেষ্টা। কিন্তু মেডিকাল পরীক্ষা নাকি ধর্ষণের যথেষ্ট প্রমাণ পায়নি। সে খবরও হারিয়ে যেতে বসেছে।

হাথরাসের চার যুবক গ্রেপ্তার হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলার সঙ্গে এবার যুক্ত হবে ৩০২ ধারায় হত্যার মামলা। কঠোর শাস্তি কাম্য। বিচারে কী বিধান হবে, তা জানা নেই। কিন্তু নারীর প্রতি ও বিভিন্ন প্রান্তিকতার প্রতি এই ঘৃণা ব্যক্তির ফাঁসি দিলেও বদলাবে না।

ব্যক্তি ধর্ষকের ফাঁসির দাবি করার আগে, জেনে নেওয়া ভাল, হিন্দু উচ্চবর্ণ ইতোমধ্যেই উত্তরপ্রদেশে এই চার ধর্ষককে বাঁচাতে পথে নেমেছে। এমপির অফিসের সামনে 'রাষ্ট্রীয় সাবর্ণ পরিষদ' ধর্না দিয়েছে। তারা ডেপুটেশনও জমা দিয়েছে ও তা গৃহীতও হয়েছে৷ একইভাবে কাঠুয়া কাণ্ডের পর হিন্দু ধর্ষকদের বাঁচাতে মিছিল করেছিল বিজেপি।

ধর্ষকের সমর্থনে তার স্বজাতি বা স্ববর্ণ-র পুরুষ ( কখনও আবার মহিলাও) পথে নামছে, প্রকাশ্যে ধর্না দিচ্ছে বা মিছিল করছে, এরকম নজির তার মানে বাড়ছে। এরকম নজির যত বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে, ধর্ষণ একটি সামাজিক অপরাধ, ব্যক্তির বিকৃতি নয়। কোথাও ধর্ষণে নারীবিদ্বেষের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ধর্মীয় বিদ্বেষ, কোথাও বর্ণবিদ্বেষ৷ কিন্তু এই সকল প্রকার বিদ্বেষ, যতটা না ব্যক্তিগত, তার চেয়ে অনেক বেশি সামাজিক।

***

দলিত মেয়েদের বর্ণগত ঘৃণার কারণে ধর্ষণ উত্তরপ্রদেশ-মধ্যপ্রদেশ-গুজরাত-মহারাষ্ট্র-হরিয়ানা জুড়ে প্রায়শই ঘটে। ২০১৯ সালে ডিসেম্বরে গুজরাটে এরকমই এক উনিশ বছরের মেয়েকে ধর্ষণ করে গাছে ঝুলিয়ে দিয়েছিল উচ্চবর্ণের পুরুষরা। ২০১৪ সালে উত্তরপ্রদেশের বাদাউনে দুই দলিত কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়, কারণ তারা যে উচ্চবর্ণের পুরুষ মালিকের কাছে কাজ করত, তাকে তিনটাকা বেতন বাড়াতে বলেছিল। সে ঘটনার ছায়া পড়েছিল 'আর্টিকল ফিফটিন' চলচ্চিত্রে। বর্ণবাদী সমাজের বিধান বড় নিষ্ঠুর এবং তার কঠোরতম প্রকাশ দলিত নারীর ক্ষেত্রেই ঘটে। বিশেষত দলিত নারীটি যদি কোনোভাবে বর্ণবাদী বিধান অমান্য করে, তাহলে প্রতিহিংসা ঘনিয়ে আসেই। অথচ লিঙ্গ, শ্রেণি ও বর্ণগত প্রান্তিকতার এই ত্র‍্যহস্পর্শই কোনো মেয়েকে যে বেশি 'ভালনারেবল' করে তুলছে, তা অনালোচিতই থেকে যাচ্ছে।

২০১৮ সালের এপ্রিলে মধ্যপ্রদেশের সাতনা জেলায় এক দলিত মেয়ে প্লাস্টিক ব্যাগে ছ মাসের ভ্রূণ নিয়ে থানায় গেছিল। তার মতে ভ্রূণটি ছিল 'প্রমাণ', সে তিনজন বর্ণহিন্দু পুরুষের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ করেছিল। ২০১৬ সালে হরিয়ানায় জাটদের সংরক্ষণ-বিরোধী বিক্ষোভের সময় নজন দলিত নারীকে হঠাৎই বাড়ি থেকে টেনে এনে ধর্ষণ করা হয়৷
এ তালিকার কোনো শেষ নেই।

সুতরাং যদিও সেন্টার ফর সোশ্যাল রিসার্চ-এর ডাইরেক্টর রঞ্জনা কুমারী বলেন, ধর্ষণের বিষয়ে কোনো 'কাস্ট-বেসড-ডেটা' তাঁদের কাছে নেই, তবুও বর্ণের কারণে ধর্ষণ এক ঘোর বাস্তব। নারীকে ধর্ষণ করে উচ্চবর্ণ শুধু দলিত নারীকেই শাস্তি প্রদান করতে চায় না, নিম্নবর্ণের পুরুষকে দেখাতে চায় যে, সে তার নারীকে 'রক্ষা করতে' অক্ষম। এভাবেই বর্ণবাদী পৌরুষের অহং প্রতিষ্ঠা পায়। ২০১৬ সালের NCRB রিপোর্ট অনুযায়ী, শিডিউল্ড কাস্টের প্রতি অপরাধের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক অপরাধ ঘটেছে শিডিউল্ড কাস্ট নারীর প্রতি; যৌন হয়রানি, ধর্ষণের চেষ্টা, ধর্ষণ ইত্যাদি হল তার নানা ধরন। সেই তথ্য অনুসারেই, রোজ অন্তত চারজন দলিত নারী ভারতে ধর্ষিত হয়। 'দ্য ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন আগেইন্সট দলিত হিউম্যান রাইটস' নামক এনজিও-র তথ্য অনুসারে, ২৩% দলিত নারী ভারতে ধর্ষিত হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এইসব ধর্ষণ সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে নথিভুক্তই হয় না। হলেও পুলিশ ও প্রশাসন সব ক্ষেত্রে খুব একটা তৎপর হয় না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাঁরা তৎপরতা দেখিয়ে রাতারাতি ওই মেয়েটির দেহের সৎকার করেছেন।

https://twitter.com/sumonseng/status/1311194153527644160?s=20

অথচ ভারতের সংবিধানের চোদ্দ থেকে আঠার নম্বর ধারায় সমানতার অধিকারের কথা বলা হয়েছিল। দলিত রাজনীতি, আদিবাসী রাজনীতি, রিসার্ভেশন ইত্যাদি নিয়ে সমাজমাধ্যমে প্রায়শই নানা তর্ক জমে ওঠে। বিশেষত সংরক্ষণ-বিরোধী একটা হাওয়া প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। বিজেপির আদর্শগত গুরু আরএসএস স্পষ্টতই সংরক্ষণ বিরোধী। কেন্দ্রীয় সরকার 'উচ্চবর্ণের সংরক্ষণ বিল' নিয়েও ভাবনাচিন্তা করছে। সংরক্ষণ-ব্যবস্থার বিরোধিতা করা যায় সম্ভবত দলিত ও আদিবাসীর প্রতি সামাজিক অন্যায়ে প্রত্যক্ষ মদত থাকলে, অথবা বা সেই অন্যায়ের অন্ত ঘটেছে ধরে নিলে। দ্বিতীয়টি যে ঘটেনি, তা প্রতিদিনই নানা ছোট-বড় ঘটনায় প্রমাণিত হয়। হাথরাসের ঘটনাটিতে তা বড় নির্মম ভাবে প্রমাণিত হল।

0 Comments

Post Comment