পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

লাঠির সামনে লহরী- রাষ্ট্র যখন তাল হারাল

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 203 view(s)
  • লিখেছেন : উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়
মার্কস বলেছিলেন ধর্ম আফিম। জেন জি যোগ করল: রাষ্ট্রের ভয়টাও আফিম। মায়ানমার ২০০৭-এর বৌদ্ধ সন্যাসী, লাতিন আমেরিকার লিবারেশন থিওলজি, সুফিদের জিকির - সব ভাষা কিন্তু আলাদা, সুর একটাই: মুক্তি। বাংলার বামপন্থী সংগঠনগুলোকেও এখন মানতে হচ্ছে: 'সংগঠিত চেতনা' এক এবং একমাত্র মন্ত্র না। স্বতঃস্ফূর্ততাকেও মান্যতা দিতে হবে। কারণ গণতন্ত্রের পরিসর অনেক বড়।

 

বিহারের জলকামানের সামনে যে নাচটা ভাইরাল হল, ওটাকে হাস্যরস বলে উড়িয়ে দিলে আপনি পুরো খেলাটাই মিস করবেন। কারণ ওটা হাসি ছিল না। ওটা ছিল রাষ্ট্রের সবচেয়ে পুরনো ভাষার বিরুদ্ধে নতুন একটা উচ্চারণ।

এইক্ষেত্রে রাষ্ট্র কথা বলেছে পাঁচটি পর্বে। লাঠি, জলকামান, ব্যারিকেড, কাঁদানে গ্যাস, পেলেট গান। এই পাঁচটির পরে সে একটা উত্তর চায়: 'ভয় পাও, রেগে যাও, পাল্টা মারো'। তাহলেই পরের লাইন লেখা হয়ে যায় - আইনশৃঙ্খলা, গ্রেপ্তার, মিথ্যে মামলা।

২০২৬-এর জুন-জুলাইয়ে ছাত্রছাত্রীরা সেই স্ক্রিপ্ট ছিঁড়ে দিল।

দিল্লি: অপমান থেকে সংগঠন

শুরু যন্তর মন্তর থেকে নীট ইউজি'র প্রশ্নপত্র ফাঁস। ২৪ লক্ষ ছাত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে জুয়া। রাস্তায় নামল জেন জি। নেতৃত্বে ককরোচ জনতা পার্টি। নামটা অপমান থেকে ধার করা। রাষ্ট্র 'তেলাপোকা' বললে, তেলাপোকাই ব্যাজ পরে নিল।

দাবি তিনটে: শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা, দুর্নীতিতে আত্মহত্যা করা ছাত্রদের পরিবারের জন্য ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ, আর ২০ জুলাই গ্রেপ্তার হওয়া প্রতিবাদীদের কেস প্রত্যাহার। পরে অবশ্য উঠেছিল এহেন পেলেট গানের ব্যবহার রাষ্ট্র তার নিজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নাগরিকদেরই শত্রু বানাচ্ছে অকথ্য অত্যাচারে, তাই দাবি ছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীরও জবাবদিহি।

৩২ দিনের অবস্থান। সেখান থেকে আগুন ছড়াল পাটনা, লক্ষ্ণৌ, মুম্বই। আর পাটনায় ছবিটা বেঁধে গেল: জলকামানের সামনে নাচ। জামা ভিজছে, পা থামছে না। রাষ্ট্র ভয় দেখাতে চায়, মানুষ আনন্দ দেখাল। যন্ত্রটা বোবা হয়ে গেল। কারণ ভয়ের যন্ত্র আনন্দের ব্যাকরণ পড়েনি।

এখানেই ফরাসী দার্শনিক মিশেল ফুকোর কথা মনে পড়ে। Discipline and Punish, (১৯৭৫)- এ তিনি বলেছিলেন, 'ক্ষমতা বেঁচে থাকে প্রতিক্রিয়ায়। আপনি গম্ভীর হলে সে আপনাকে প্রতিপক্ষ মানে। আপনি হিংস্র হলে সে ন্যায্য হয়।' কিন্তু, আপনি যদি খেলেন? খেলার জন্য ভারতীয় ন্যায় সংহিতায় কোনো ধারা নেই। খেলা, নাচ, গান - এগুলো অন্য রেজিস্টার। ক্ষমতা তৈরি হয়েছে নিয়ন্ত্রণের জন্য, খেলা তৈরি হয়েছে মুক্তির জন্য।

কলকাতা: ২৪ জুলাই ২০২৬, আঠেরোর তবলা:

ঠিক তার পরের দিন, শুক্রবার। কলকাতা নামল। সুকান্তের 'আঠেরো বছর বয়স' এবার কবিতা থেকে রাস্তায়। যৌবন জল তরঙ্গে মহানগর ভাসল। মৃতপ্রায় শহরের বুকে সোনার কাঠির ছোঁয়া।
মিছিলের ডাক দিয়েছিল বামপন্থী ছাত্র-যুব সংগঠন। কিন্তু লাটাই আর তাদের হাতে ছিল না। হাজির হল দলমত নির্বিশেষে মানুষ। হিজাব পরা তরুণী, এলজিবিটিকিউ, আইটি কর্মী, ২০০০-এর পর জন্মানো ছেলে-মেয়ে। কারো হাতে লাল পতাকা, কারো হাতে তেরঙা। বাংলা, হিন্দি, ওড়িয়া, উত্তর-পূর্বের ভাষা। ডাফলি বেজেছে, 'আজাদী' উঠেছে। ভগৎ সিং, নেতাজী, চে-র ছবি হেঁটেছে। রাষ্ট্রপ্রধানেরও কার্টুন হেঁটেছে।

কত যুগ ধরে মিছিলে সাদা চুল দেখে চোখ ক্লান্ত হয়েছিল। আজ যতদূর চোখ যায় শুধু কালো চুল। গুটি কয়েক পাকা। এক লাখ না দেড় লাখ - সংখ্যা নিয়ে হয়তো তর্ক পরে হবে। আগে বোঝা উচিত : মানুষ শাসকের বিরুদ্ধে এক হওয়ার প্রয়োজনটা নিজেই বুঝে গেছে , বলা বাহুল্য , রাজনৈতিক দলগুলোকেও শিখিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক দলগুলো ছুঁৎমার্গ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। কারণ সঠিক সময়ের আহ্বান কোনো দল দেয় না, মানুষ দেয়। নেতা নিজে তৈরি হয় না, মানুষ তাকে তৈরি করে।

২০ জুলাই,২০২৬ : জাতীয় সঙ্গীত আর লাঠি কেড়ে নেওয়া :

দিল্লিতে ফেরা যাক আবার। ২০ জুলাই, যন্তর মন্তর। কাঁদানে গ্যাস, পেলেট গান। ভিড় সরল না। বরং শুরু হল জাতীয় সঙ্গীত। এটা প্যারাডক্স। রাষ্ট্র যে প্রতীকের জোরে শাসন করে, সেই প্রতীকই তার হাত থামিয়ে দিল। প্রাতিষ্ঠানিক আদেশ আর সাংস্কৃতিক সংস্কারের সংঘর্ষে যন্ত্র থেমে যায়।

সেই দিনই আরেকটা ফ্রেম: দুটো মেয়ে পুলিশের হাত থেকে লাঠি কেড়ে নিল। ভয় আসলে একটা চুক্তি। দুপক্ষের সম্মতিতে তৈরি। যতক্ষণ শরীর কাঁপে, লাঠি হল ক্ষমতার অঙ্গ। কাঁপুনি থামলে লাঠি আবার কাঠ। একজন চুক্তি ভাঙলে সাহস ছড়ায়। জেন জি' র এই আচরণ বোঝা সহজ না। মিম্, হালকা খিস্তি, নাচ, গান। কেউ জাজমেন্টাল হলে ভুল বলবেন। অন্তত এখন।

২৫ জুলাই, ২০২৬: ইস্তফা, কিন্তু শেষ না

৩৬ দিনের মাথায় প্রথম জয়। ২৫ জুলাই, ২০২৬। ধর্মেন্দ্র প্রধান X-এ লিখলেন: 'যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানিয়ে ইস্তফা দিচ্ছি'। CJP-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত দীপকে বললেন, 'if you do not bow down... we can take the resignation of anyone'। কিন্তু আন্দোলন থামল না। 'আমাদের আরও দুটো দাবি আছে'।

এখানে ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ডমরু-চরিত মনে পড়ে। ভূত ভয় দেখাতে এসে মানুষের যুক্তি আর হাসিতে হেরে যায়। ভয়ের চরিত্রটা যত গম্ভীর করা হয়, সে তত ঠুনকো হয়। ২০২৬-এর তরুণরাও তাই করল। জলকামান, পেলেট, ব্যারিকেড - সবচেয়ে গম্ভীর প্রতীকগুলোকে নাচ, গান, জাতীয় সঙ্গীত দিয়ে এমন হাল্কা করে দিল যে ওগুলো নিজের ওজন হারাল।

এইরকম ভাষার আখ্যান তখনকার দিনে নতুন করে এসেছিল:
আন্দোলনের নতুনত্ব অবশ্য ছিল :-

গান্ধী, ১৯০৬-১৯৪৭: সত্যাগ্রহ। অস্ত্র ছাড়া প্রতিরোধ।  
আম্বেদকর, ১৯৫৬: Educate, Agitate, Organize। অর্থাৎ,শিক্ষিত হও, আন্দোলন করো, সংগঠিত হও।  
জওহরলাল নেহেরু, ১৯৪৭-১৯৬৪: Scientific Temper। যুক্তি, প্রশ্ন, প্রমাণ। অলৌকিক ভাগ্যের হাতে দেশ ছাড়া না।
লোহিয়া, ১৯৬০-এর দশক: সাংস্কৃতিক বিপ্লব। রাজনীতিকে রাস্তায় নামাও।

মার্কস বলেছিলেন ধর্ম আফিম। জেন জি যোগ করল: রাষ্ট্রের ভয়টাও আফিম। মায়ানমার ২০০৭-এর বৌদ্ধ সন্যাসী, লাতিন আমেরিকার লিবারেশন থিওলজি, সুফিদের জিকির - সব ভাষা কিন্তু আলাদা, সুর একটাই: মুক্তি। বাংলার বামপন্থী সংগঠনগুলোকেও এখন মানতে হচ্ছে: 'সংগঠিত চেতনা' এক এবং একমাত্র মন্ত্র না। স্বতঃস্ফূর্ততাকেও মান্যতা দিতে হবে। কারণ গণতন্ত্রের পরিসর অনেক বড়।

সাহিত্য-সিনেমার আয়নায় :

রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী (১৯২৪)-এ নন্দিনী গানে শিকল ভাঙে। মান্টোর টোবা টেক সিং (১৯৫৫)-এ পাগলরাই সুস্থ। পরশুরাম, ত্রৈলোক্যনাথ হাসিয়ে ভয় মারেন। দক্ষিণারঞ্জনের ঠাকুরমার ঝুলি শেখায় বুদ্ধি দিয়ে রাক্ষস মারতে হয়।

সিনেমাও একই কথা বলে। চ্যাপলিনের The Great Dictator (1940) - ট্যাংকের সামনে মানবতার ভাষণ। কোরিয়ার ছবি : When the Day Comes (2017)_ - ১৯৮৭ সালের যুদ্ধে মোমবাতির সামনে বন্দুক হার মানে। ইরানের A Separation (2011) - চিৎকার নেই, শুধু ন্যায়ের জেদ। মালায়ালাম জালিকাট্টু - জনতা একসাথে ছুটলে রাষ্ট্র কাঁপে। আর আমাদের? বাদল সরকারের 'এবং ইন্দ্রজিৎ', ১৯৬৩ - মধ্যবিত্তের নীরবতা। বিজন ভট্টাচার্যের নাটক, _নবান্ন (১৯৪৪)  - খিদে কীভাবে রাজনীতি হয়। জেন জি' র জুন-জুলাই ২০২৬-ও তাই: বেকারত্ব আর অনিশ্চয়তার নাটক, মঞ্চটা রাস্তা। কলকাতার ২৪ জুলাই,২০২৬ তার একটা অ্যাক্ট।

এই ছবি শুধু ভারতের না:

১৯৮৯, তিয়েনআনমেন - ট্যাঙ্ক ম্যান।  
২০১১, তাহরির স্কোয়ার - গান আর তাঁবু।  
২০১৯, হংকং - ছাতা।  
২০২২, শ্রীলঙ্কা -বিদ্রোহী মানুষ প্রেসিডেন্টের পুলে নেমে সাঁতার।  
২০২৪, বাংলাদেশ - চাকরি ও কলেজ ইউনিভার্সিটি তে কোটা আন্দোলন।  
২০২৫, নেপাল-ইন্দোনেশিয়া - জেন জি।

সবার মূল সুর এক: ভয়ঙ্কর অস্ত্রের সামনে মানবতা। এটাই আসল আন্তর্জাতিকতাবাদ। বর্ডার এখানে অচল।

ফ্যাসিবাদ না স্বৈরতন্ত্র? :

কোনটাই নয়। দুটোই গণতন্ত্রকে সংকুচিত করে। তবে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই চলবেই কিন্তু ফ্যাসিবাদকে পরাস্ত করতে হলে সব বিরোধীদেরই একসুর থাকতে হবে। কারণ, ফ্যাসিবাদকে স্বৈরতন্ত্রী হতেই হবে, কিন্তু সব স্বৈরতন্ত্রী ফ্যাসিবাদী না। 

দার্শনিক উমবার্তো ইকো বলেতেন ফ্যাসিবাদ মস্তিষ্কের দখল নেয়। একটা 'লার্জার দ্যান লাইফ' মতাদর্শ চায়। শুধু স্বৈরতন্ত্র চায় 'চুপ'। আজ যখন রাষ্ট্রনায়ককে দেবতা বানানো হয়, যখন নদী-জঙ্গল বিক্রি করে ক্রোনি ক্যাপিটালিজমকে 'উন্নয়ন' বলা হয়, তখন বোঝা যায় মেগ্যালোম্যানিয়া ফ্যাসিবাদের চেহারা। আন্দোলনকারীর ব্যাগে ভেজা ছোলাসিদ্ধ আর আচার। MP থেকে আসা এম.কম ছাত্র। সে বলে, ভবিষ্যৎ মানে শুধু চাকরি না, বাঁচার পৃথিবীও। কলকাতার মিছিলেও তাই: আইটির ছেলে, হিজাব পরা মেয়ে, এলজিবিটিকিউ, পতাকা ছাড়া রাজনৈতিক কর্মী - সবাই। কারণ মানুষ সাম্প্রদায়িকতা চায় না। মানুষ চায় কাজ, সম্মান, নদী-জঙ্গল।

লাঠির বদলে লহরী:

ইতিহাস লিখেছে ২৫ জুলাই, ২০২৬। সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র লাঠি না, লহরী।
আর ঠিক তার আগের দিন, ২৪ জুলাই,২০২৬ এ কলকাতা প্রমাণ করল: আঠেরো বছর বয়স হার মানে না।

রাষ্ট্র পাঁচটা পর্বে কথা বলেছিল। জেন জি উত্তর দিল ষষ্ঠ পর্বে নাচ :

যে ভাষা ভারতীয় ন্যায় সংহিতাতে নেই, যে ভাষা গার্ডরেলকে খেলনা বানায়, যে ভাষা জাতীয় সঙ্গীতকে ঢাল করে - সেই ভাষাই এখন রাজনীতির ভবিষ্যৎ। জাজমেন্টাল হওয়ার সময় এখন নেই। এখন শুধু শোনার সময়। মানুষের পালস্ ধরার সময়।

0 Comments

Post Comment