পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ইজ প্যারিস বার্নিং?

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 201 view(s)
  • লিখেছেন : শোভনলাল চক্রবর্তী
প্যারিসের জেন জি আন্দোলন শুরু হয় স্কুলগুলোর জরাজীর্ণ দশা, শিক্ষক সংকট এবং শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দের ঘাটতির প্রতিবাদে। ভারতে এই আন্দোলন রাজনৈতিক ও বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনের জন্য শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর বর্তমানে নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার বিরুদ্ধে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে।

প্রাককথন  


লেখার শিরোনামটি "ইজ প্যারিস বার্নিং?" ল্যারি কলিন্স এবং দমিনিক লাপিয়ের লেখা একটি বিশ্বখ্যাত ঐতিহাসিক বই এর শিরোনাম। বইটির পটভূমি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে, ১৯ আগস্ট থেকে ২৬ আগস্ট ১৯৪৪ সালের মধ্যে নাৎসি জার্মানির কবল থেকে প্যারিস শহর মুক্ত হওয়ার রোমাঞ্চকর ঘটনা। অ্যাডলফ হিটলার পরাজয় নিশ্চিত বুঝে প্যারিস শহরকে পুরোপুরি পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়ার, আইফেল টাওয়ার, নটরডেম ক্যাথেড্রাল সহ সমস্ত ঐতিহাসিক স্থান বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার গোপন নির্দেশ দিয়েছিলেন। ১৯৪৫ সালের ২৫ আগস্ট হিটলার তার সেনাকর্তাদের ফোনে বারবার রাগান্বিত হয়ে বারবার  এই একটাই প্রশ্ন করেছিলেন— "প্যারিস কি জ্বলছে?" ("Is Paris Burning?")। সেই বিখ্যাত উক্তি থেকেই বইটির নামকরণ করা হয়। জার্মান সামরিক গভর্নর জেনারল দিতরিক ফন সল্টিৎস হিটলারের হুকুম অমান্য করে শহর ধ্বংস করা থেকে বিরত থাকেন এবং মিত্রবাহিনী ও ফরাসি প্রতিরোধ বাহিনী প্যারিসকে রক্ষা করে। আবার খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে প্যারিস, তবে ভিন্ন কারনে।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আন্দোলনের জোয়ার 

প্যারিস সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক (অক্টোবর ২০২৬) আন্দোলন ও বিক্ষোভের খবর শিরোনাম হয়েছে দুনিয়া জুড়ে। কেন এই আন্দোলন ও বিক্ষোভ সেই প্রশ্নও উঠেছে।যদিও রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে পিছিয়ে থাকাকেই এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে কিন্তু শুধু তাই নয় - অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুযোগ-সুবিধার সংকট কাজ করছে বিক্ষোভের কারণ হিসেবে। দেশ ভেদে আন্দোলনের কারণগুলো ভিন্ন, যেমন, ফ্রান্সে (প্যারিস সহ)আন্দোলনের অন্যতম কারণ,শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা, স্কুলের খারাপ অবকাঠামো, সুযোগ-সুবিধার অভাব এবং শিক্ষক সংকট। এর প্রতিবাদে প্রথমে উচ্চবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। পরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে আকাশছোঁয়া তেল ও জ্বালানির দাম এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলো সরকারবিরোধী বিক্ষোভে যোগ দেয়। এরই মধ্যে সরকারি অতিরিক্ত নিয়মকানুন, উচ্চ কর এবং পরিবেশগত নীতির কারণে কৃষকরা 'সিজ অব প্যারিস' বা প্যারিস অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। আসলে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর অর্থনৈতিক নীতি ও উচ্চ ঋণের বোঝা সামাল দিতে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।এই সবই একত্রিত হয়ে শুরু হয় ব্যাপক আন্দোলন।অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে আন্দোলনের কারণগুলি ভিন্ন, যেমন স্পেন ও পর্তুগালে বাড়িভাড়া অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ ফান্ডগুলোর মাধ্যমে উচ্ছেদের প্রতিবাদে মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। এমন অবস্থা যে অতিরিক্ত পর্যটনের কারণে স্থানীয়দের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসনের অভাব দেখা দিয়েছে।পর্তুগালে ও স্পেনে জীবনযাত্রার ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতি সংকট তৈরি হয়েছে, এবং এর বিরুদ্ধে মানুষ পথে নেমেছেন। ইতালির ব্যাপারটা একটু  আলাদা। সেখানে জোড়া ফলার কাজ করেছে বাজেট সংকোচন ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি। দীর্ঘদিনের কঠোর ব্যয়সংকোচ নীতির অবসান, উচ্চ মজুরি, এবং কর্মসংস্থানের দাবিতে সোচ্চার মানুষ বিক্ষোভ করছেন সেখানে। ইতালিতে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে ৪.২ শতাংশে পৌঁছেছে। যেটা স্পেন ও পর্তুগালের থেকে প্রায় এক শতাংশ বেশি। অন্যদিকে আলবেনিয়াতে সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতার অভিযোগ তুলে নাগরিকরা প্রতিবাদ করছেন।সেখানে বিচার বিভাগের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে মানুষ কোর্ট চত্বরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন ।জার্মানি ও অন্যান্য দেশে মূলত জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, কৃষি নীতি এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।

আবার প্যারিস জ্বলছে

তবে সবটাই শুরু হয়েছে প্যারিস থেকে। তবে সেখানে আন্দোলনের শুরু কোনও বিস্ফোরক ঘটনায় নয়। তাই এটিকে ২০০৫ বা ২০২৩-এর দাঙ্গার ঘটনার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। ওই দুই ক্ষেত্রেই ট্রিগার ছিল পুলিশের হাতে,পুলিশের গুলিতে কিশোরদের মৃত্যু হয়। এবারের আন্দোলন শুরু হয় গত মাসে প্যারিসের উত্তরের শ্রমজীবী উপশহরের উচ্চবিদ্যালয়গুলোতে। শিক্ষক স্বল্পতা আর জীর্ণ অবকাঠামো নিয়ে ক্ষোভ ক্রমে বৈষম্য, সরকারি ব্যয় ও জীবনযাত্রার মানের বৃহত্তর আন্দোলনের রূপ নেয়। সূচনাবিন্দু ছিল সেন-সাঁ-দ্যনি। এটি প্যারিসের উত্তরের একটি দরিদ্র জেলা। আউবারভিলিয়ের একটি স্কুলে শিক্ষক না থাকায় শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকে অঙ্ক, ইংরেজি আর খেলাধুলার ক্লাস বন্ধ ছিল বলে জানানো হয়েছে। ইউনিয়নের দাবি, এই জেলার দুই-তৃতীয়াংশ স্কুলে শিক্ষকের পদ খালি। তাপপ্রবাহে ক্লাসরুম অসহনীয় গরম হয়ে ওঠার অভিযোগও ছিল। সময়সূচি, ক্লাসের আকার আর শিক্ষকস্বল্পতা নিয়ে শিক্ষার্থীরা স্কুলের সামনে অবরোধ শুরু করে। ১৬ বছরের এক ছাত্রীর কথা সংবাদে এসেছে। সে বলেছে, ‘আমরা উপশহরের সন্তানেরা পরিত্যক্ত, অবহেলিত।’ স্কুলের অবস্থাকে সে ‘অস্বাস্থ্যকর’ বলেছে। ২৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় পর্যায়ে সরকারি খাতের ধর্মঘট ছিল। সেদিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে প্রায় ৩,৭০০ স্কুলের মধ্যে ১৪০০টি শিক্ষকদের অবরোধে ব্যাঘাতের শিকার হয়েছে। এভাবে ছাত্র আন্দোলন আর শিক্ষকের ধর্মঘট একসঙ্গে মিশে যায়।সংবাদ মাধ্যম সিএনএন জানায়, একশোর বেশি হাইস্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শুধু প্যারিস অঞ্চলেই, মোট ক্ষতি আনুমানিক ৭০ লাখ ইউরো। তখনই বোঝা গিয়েছিল ক্ষোভ স্কুলের চৌহদ্দিতে আটকে থাকবে না। ১৭ অক্টোবর তার সঙ্গে যোগ হয় আরেকটি ধারা। ট্রেড ইউনিয়ন এবং ‘ইয়েলো ভেস্ট’ পরিচয়ধারী নাগরিকেরা জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে পথে নামে। সংবাদ সংস্থা  ইউরো নিউজ এই মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ দায়ী বলে উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ বিদ্যালয়ের ক্ষোভ, মজুরির ক্ষোভ আর জ্বালানির ক্ষোভ একই রাস্তায় এসে মিশেছে। তাই "কারা করছে" প্রশ্নের একক কোনো উত্তর নেই। প্রতিবেদন ও প্রেক্ষাপট থেকে চারটি স্তরের মানুষকে আলাদা করা যেতে পারে।তবে চতুর্থ স্তরের পরিচয় নিয়ে প্রমাণ সবচেয়ে কম, তাই সেটা কেবল অনুমান। প্রথম স্তরে ছিলেন সিভিল সোসাইটির সদস্য, এরা ছিলেন আগাগোড়া আন্দোলন - এর শান্তিপূর্ণ অংশ। শিক্ষক, অভিভাবক, ইউনিয়ন কর্মী, কৃষক, অবসরপ্রাপ্ত মানুষ আর ইয়েলো ভেস্ট সমর্থকেরা এর মধ্যে পড়েন। ভাঙচুরের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক নেই। ১৯ বছরের এক বিক্ষোভকারী রয়টার্সকে বলেছেন, জীবনযাত্রার খরচ আর জ্বালানির দাম খুব বেশি, আর স্কুলছাত্রদের ওপর পুলিশের আক্রমণ তাঁকে ক্ষুব্ধ করেছে। দ্বিতীয় স্তরে ছিল এরা, স্কুলছাত্র ও উপশহরের তরুণেরা। আন্দোলনের ইঞ্জিন এরাই। এদের কেউ কেউ স্কুলের সামনে ময়লার ঝুড়ি আর সাইকেলে আগুন দিয়েছে, ঢিল ছুড়েছে। তবে সরকারি তথ্য এই ছকের উল্টো চিত্র তুলে ধরেছে। ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, সহিংস ঘটনার পর প্রায় ৪০০ জন গ্রেপ্তার হয়েছে এবং তাদের বেশির ভাগই প্রাপ্তবয়স্ক। সুতরাং "উপশহরের কিশোরদের দাঙ্গা" বলে পুরো ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা যায় না। তৃতীয় স্তরে ছিল সংগঠিত, কালো পোশাকের মুখোশধারী গোষ্ঠী।এরা কারা? মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে,প্যারিসের বেশির ভাগ তরুণ কালো পোশাক, হুডি, মুখোশ ও কাঁদানে গ্যাস থেকে বাঁচতে গগলস পরে ছিল।এদিকে এই পোশাক ইউরোপে ‘ব্ল্যাক ব্লক’ ধরনের চরমপন্থী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পরিচিত। তবে সংবাদগুলোতে এই নাম সরাসরি দেওয়া হয়নি।কিন্তু সরকার এদের দিকে বেশি করে ইঙ্গিত করেছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু সহিংসতার জন্য "বাম চরমপন্থী" ও এই অপরাধীদের দায়ী করেছেন। তিনি এটা বলেছেন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, তাই এটি একটি দাবি মাত্র, প্রমাণিত সিদ্ধান্ত নয়। অন্য পক্ষ বলছে, বিক্ষোভকারীদের অনেকে মনে করেন বেশির ভাগ মানুষ শান্তিপূর্ণ ছিল আর সহিংসতার পেছনে ছিল তারা যারা এসেছিল ক্ষতি করতে ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াতে।এদের পরিচয়  পাওয়া যাচ্ছে না। এরা সরকারের ভাড়াটে বাহিনী হওয়া সম্ভব। চতুর্থ স্তরে ছিল সুযোগসন্ধানী লুটেরা। দাঙ্গার ইতিহাসে ভিড়ের আড়ালে ছোট অপরাধী গোষ্ঠী সব সময়ই থাকে। সবকিছু সরকারি নজরদারির বাইরে চলে গেলে তারা সুযোগ নেয়। মুঠোফোনের দোকান লুট এবং সুপারমার্কেট লুটের মতো ঘটনা আদর্শিক প্রতিবাদের চেয়ে সুযোগসন্ধানী অপরাধের সঙ্গে বেশি মেলে। অথচ ব্যাংক ভাঙচুর বা সিটি হলে হামলা স্পষ্টতই প্রতীকী। এই পার্থক্য খেয়াল রাখা জরুরি। এটি একক কোনো ঘটনা নয়। এটি একটি বহুস্তরীয় আন্দোলন, যার মূলে শিক্ষাবৈষম্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়, আর যার ওপরে রাজনৈতিক অনাস্থা ও নির্বাচনী উত্তাপ। সহিংসতা সংখ্যালঘুর হাতে, কিন্তু সেই সংখ্যালঘু এক রকম নয়। রাষ্ট্রের প্রতীকে হামলাকারী, পুঁজির প্রতীকে আঘাতকারী আর সুযোগসন্ধানী লুটেরাকে এক ঝুড়িতে ফেলা বিশ্লেষণের দুর্বলতা। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বেশির ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক, তাই ঘটনাটিকে শুধু কিশোর বা শুধু উপশহরের সমস্যা বলা ভুল। আবার ছাত্র আন্দোলনই যে এর সূচনা, সেটাও ভোলা যাবে না। পুলিশি আচরণ এই চক্রের একটি অংশ, তবে পুলিশও বড় চাপে। কোনো পক্ষকে সম্পূর্ণ নির্দোষ বা সম্পূর্ণ দোষী ধরলে বাস্তবতা হারিয়ে যায়। সবাই তাই ভাঙচুরকারীদের সঠিক সাংগঠনিক পরিচয় পাওয়ার উপর জোর দিয়েছেন। আন্দোলন কত দিন চলবে বা সরকার রাজনৈতিক সমঝোতা করবে নাকি আরও কঠোর হবে সেটা তো সময় বলবে।গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মামলা এগোলে এবং পুলিশ-নজরদারি সংস্থার তদন্ত শেষ হলে অনেক ধারণা বদলাতে পারে। যে সমাজে ক্লাসরুমে শিক্ষক নেই, আর রাস্তায় আগুন জ্বলছে, সেখানে আগুন নেভানোর চেষ্টা আর কারণ ঠিক করার চেষ্টা আলাদা কাজ। প্রথমটি পুলিশ করতে পারে, দ্বিতীয়টি করতে হবে নীতির মাধ্যমে। ফ্রান্সের সামনের সপ্তাহগুলো দেখাবে সরকার কোনটিতে বেশি মনোযোগ দেয়।

ভারতের ও প্যারিসের আন্দোলনের প্রতি তুলনা

চলতি বছরের মাঝামাঝি ও শেষভাগে বিশ্বজুড়ে জেন জি  প্রজন্মের তরুণেরা বিভিন্ন দাবিতে রাজপথে নেমেছে। তবে ভারতবর্ষের জেন জি আন্দোলন এবং প্যারিসের (ফ্রান্স) ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে কয়েকটি মূল পার্থক্য রয়েছে তাদের আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট দাবি, প্রতিবাদের ধরন এবং শাসনতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে। যেমন বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্র হিসেবে ভারতবর্ষের জেন জি আন্দোলনের প্রাথমিক সূত্রপাত হয় মেডিকেল এন্ট্রান্স পরীক্ষা বাতিল ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের কেলেঙ্কারি থেকে। প্যারিসের জেন জি আন্দোলন শুরু হয় স্কুলগুলোর জরাজীর্ণ দশা, শিক্ষক সংকট এবং শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দের ঘাটতির প্রতিবাদে। ভারতে এই আন্দোলন রাজনৈতিক ও বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনের জন্য শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর বর্তমানে নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার বিরুদ্ধে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। অন্যদিকে প্যারিসের আন্দোলন  শিক্ষা ব্যবস্থার সংকটের গণ্ডি পেরিয়ে জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, আবাসন সংকট এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রতিরোধের রূপ নিয়েছে। প্রতিবাদের হিংস্রতা ও ধরন অনুযায়ী ভারতীয় তরুণদের এই আন্দোলনটি মূলত শান্তিপূর্ণ, অহিংস এবং নিয়মতান্ত্রিক ও আইনি পন্থায় পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে ব্যঙ্গাত্মক ও সৃজনশীল প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে।কিন্তু প্যারিসের আন্দোলন অত্যন্ত উত্তপ্ত ও সহিংস রূপ নিয়েছে। সেখানে পুলিশি অ্যাকশনের জবাবে ব্যারিকেড তৈরি, অগ্নিসংযোগ এবং দাঙ্গা পুলিশের সাথে সরাসরি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ভারতে রাষ্ট্রীয় দমন ও প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রশাসন দিল্লির প্রধান মেট্রো স্টেশন বন্ধ, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এবং ব্যারিকেড দিয়ে পথ আটকে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। সরকার চাপের মুখে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ মেনে নেয়। আন্দোলনের গণতান্ত্রিক বনাম অর্থনৈতিক দাবির প্রেক্ষিতে ভারতের জেন জি তরুণদের ক্ষোভ মূলত প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, পরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতি এবং ভোটাধিকার রক্ষায় নির্বাচনী জবাবদিহিতার ওপর কেন্দ্রীভূত। অপরদিকে, প্যারিসের তরুণদের ক্ষোভের প্রধান কারণ অর্থনৈতিক মন্দা, কল্যাণকামী রাষ্ট্রের বাজেট সংকোচন এবং জীবনযাত্রার সংকট।দুটি আন্দোলনের সংস্কৃতিগত ফারাকও আছে। ফ্রান্সের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিবাদের সংস্কৃতির কারণে প্যারিসের রাজপথ দ্রুত রণক্ষেত্রে পরিণত হলেও, ভারতবর্ষের তরুণরা তীব্র প্রতিকূলতা ও প্রশাসনিক কড়াকড়ির মধ্যেও তাদের আন্দোলনকে মূলত অহিংস ও নিয়মতান্ত্রিক সীমার মধ্যে ধরে রাখতে পেরেছে। ফরাসি প্রশাসন কার্ফু জারি ও কঠোর পুলিশি দমনপীড়ন চালায়, যেখানে ৫,০০০-এর বেশি বিক্ষোভকারীকে (যার বড় অংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক) গ্রেফতার করা হয়েছে। 

ভারতে কি প্যারিসের মত আন্দোলন হতে পারে?

এই বিষয় নিয়ে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক স্তরে এবং ভারতের রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে বিষয়টি ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে।আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ফক্স নিউজ় তাদের সাম্প্রতিক এক ডিজিটাল প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ভারত, ফ্রান্স, ইটালি-সহ বিশ্বের ১৩টি দেশের ১০১টি সংগঠনকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা সংশ্লিষ্ট দেশগুলিতে তরুণ প্রজন্ম ও যুব সমাজের বিক্ষোভের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে। ওই সংগঠনগুলি সমন্বয়ের ভিত্তিতে বিভিন্ন আন্দোলন সংগঠিত করছে বলেও দাবি করা হয়েছে প্রতিবেদনে। উদাহরণ হিসেবে ‘ইন্ডিয়ান অ্যালায়েন্স প্যারিস’ (আইএপি) নামে একটি গ্রুপকে চিহ্নিত করেছে ফক্স নিউজ়। তাদের দাবি, ফ্রান্সের সাম্প্রতিক হিংসাত্মক ও ভারতে জ্ঞানেশবিরোধী বিক্ষোভের মধ্যে সমন্বয় করছে ওই সংগঠনটি। পাশাপাশি, ফক্স নিউজ়ের প্রতিবেদনে দাবি, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, ছাত্র-যুব সংগঠনের পাশাপাশি কমিউনিস্ট, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলির তথাকথিত ‘রেড-গ্রিন নেটওয়ার্ক’ বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। আঙুল তোলা হয়েছে, নিউ ইয়র্ক ও শাংহাই-ভিত্তিক ধনকুবের নেভিল রয় সিংহমের অর্থে পুষ্ট বামপন্থী নেটওয়ার্ক এবং ‘প্রগ্রেসিভ ইন্টারন্যাশনাল’ নামে সংগঠনের দিকে।ফক্স নিউজ়ের ওই প্রতিবেদনটিকে হাতিয়ার করে বিজেপি ইতিমধ্যে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে।বিজেপির অভিযোগের জবাবে কংগ্রেস নেতারা বলেছেন যে, নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহের সরকার মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে জনগণের নজর ঘোরানোর চেষ্টা করছে। এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং ভোটচুরি কোনও মনগড়া অভিযোগ নয়, প্রমাণিত সত্য। এর ফলে ১০ কোটিরও বেশি ভারতীয় নাগরিক সংবিধান প্রদত্ত ভোটাধিকার হারানোর মতো সঙ্কেটের মুখে পড়েছে। এর মধ্যেই রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্ট এবং তথ্যের অধিকার আইনে (আরটিআই) প্রাপ্ত জবাবের মতো দু’টি বিষয়ে বিরোধী শিবির এবং নেট নাগরিকদের একাংশের তরফে নানা প্রশ্ন উঠেছে। যদিও এ বিষয়ে শাসকশিবিরের তরফে কোনও গুরুত্বপূর্ণ নেতার বক্তব্য সামনে আসেনি।
বিরোধী দলগুলি ‘ভোটচুরি’ বিরোধী আন্দোলনে পুলিশি দমনপীড়ন নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের সাম্প্রতিক রিপোর্টের প্রসঙ্গ তুলেছে ইতিমধ্যেই। রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও জমায়েতের অধিকার’ বিষয়ক বিশেষ দূত জিনা রোমেরো চলতি মাসে ওই রিপোর্ট পেশ করেছিলেন। তাতে বলা হয়েছিল, ভারতে যুবসমাজ যখন লিঙ্গভিত্তিক সমতা, ন্যায়বিচারের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা বা প্রতিবাদ করে, তখন তারা রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক স্তরে প্রতিহিংসা, দমনপীড়ন ও কলঙ্কলেপনের মুখোমুখি হয়।বিরোধীদের প্রশ্ন, মোদী সরকার রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার সংস্থার অভিযোগ মানতে অস্বীকৃত হলেও ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ’ হিসাবে পরিচিত ফক্স নিউজ়ের প্রতিবেদনের সত্যতা সম্পর্কে নিঃসংশয় কেন ? এই সময়ে যে   বাস্তব পরিস্থিতি  তাতে মনে হচ্ছে যদিও প্যারিসের আন্দোলন মূলত জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি এবং স্কুল-কলেজের পরিকাঠামো নিয়ে শুরু হয়ে পরবর্তীতে সহিংস রূপ নিয়েছিল, ভারতের বর্তমান প্রতিবাদ মূলত নির্বাচন ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক দাবিকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে। ভারতের বিশ্লেষকদের একাংশ ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ফ্রান্সের মতো তীব্র ভাঙচুর ও নৈরাজ্যমূলক পরিস্থিতিতে ভারতে প্রতিরোধ করতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কড়া পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। তবে ভারতীয় তরুণদের এই মুহূর্তে আন্দোলনটি মূলত শান্তিপূর্ণ, অহিংস এবং নিয়মতান্ত্রিক ও আইনি পন্থায় পরিচালিত হচ্ছে, ভবিষ্যতেও তাই অব্যাহত থাকবে।

0 Comments

Post Comment