পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

নয়ডায় শ্রমিক আন্দোলন কি নতুন পথ দেখাচ্ছে ?

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 202 view(s)
  • লিখেছেন : নোটন কর
১৮৮৬ সালের ১লা মে, শিকাগোতে প্রায় ৮০,০০০ শ্রমিক এবং যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে কয়েক লক্ষ শ্রমিক কঠোর আট ঘণ্টার কর্মদিবসের দাবিতে একটি সাধারণ ধর্মঘট শুরু করে। এই আন্দোলনের জের ধরেই ৪ঠা মে হেমার্কেট অ্যাফেয়ার সংঘটিত হয়, যেখানে পুলিশের দিকে বোমা ছোড়ার ফলে সহিংসতার সৃষ্টি হয় এবং শ্রমিক সমাবেশটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও মর্মান্তিক ঘটনায় পরিণত হয়। আজকের উত্তর ভারতের শ্রমিক আন্দোলনের প্ররিপ্রেক্ষিতে মে দিবসের প্রাসঙ্গিকতাকে বোঝার চেষ্টা।

গত কয়েকদিন আগে নয়ডা সহ উত্তর ভারতে তীব্র শ্রমিক আন্দোলনের জেরে উত্তরপ্রদেশ সরকার ঠিকা শ্রমিকদের জন্য যৎসামান্য মজুরি বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। যদিও তা বর্তমান বাজার মূল্য থেকে যথেষ্ট কম। নয়ডা, গুরুগ্রাম, ফরিদাবাদ সহ আশেপাশের অঞ্চল এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল এবং হাজার হাজার বড়, মাঝারি, ক্ষুদ্র কল কারখানা এখানে রয়েছে। এই কল কারখানায় লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কাজ করেন যার পঁচানব্বই শতাংশ ঠিকা বা অস্থায়ী শ্রমিক।

শ্রমিকদের মূল দাবি ছিল ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, বকেয়া পরিশোধ, অতিরিক্ত সময়ের কাজে দ্বিগুণ পারিশ্রমিক, আট ঘন্টার কাজ, শ্রম আইন অনুযায়ী ইএসআই পিএফ-এর সুযোগ এবং চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকদের স্থায়ীকরণ। প্রায় চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ হাজার শ্রমিক এই আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন। আন্দোলনরত চারশো শ্রমিক ও অন্যান্যদের পুলিশ মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করেছে। গত কয়েক বছর ধরে এই এলাকার শ্রমিকরা দাবি করে আসছেন যে পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে মাসিক কুড়ি হাজার টাকারও বেশি আয় দরকার। কিন্তু বারো থেকে চোদ্দ ঘন্টা কাজ করে তারা মজুরি পান গড়পড়তা আট থেকে নয় হাজার টাকা। কর্মক্ষেত্রে কোনো সুরক্ষা নেই। নারী শ্রমিকরা আরও অসহায়। এই মজুরি দীর্ঘদিন ধরে এক অবস্থায় রয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষকে আরও তীব্র করে প্রতিবেশী হরিয়ানা রাজ্যের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত। যেখানে ন্যূনতম মজুরি প্রায় পঁয়ত্রিশ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই বৈষম্য নয়ডার শ্রমিকদের বঞ্চনার অনুভূতি ও ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে উত্তরপ্রদেশ সরকার সাময়িকভাবে মাত্র দু’ হাজার টাকা মজুরি বৃদ্ধি করেছে। শ্রমিকেরা সরকারি এই সিদ্ধান্তকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখছেন না। তাদের দাবি, এটি কেবল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য একটি পদক্ষেপ। আমাদের রাজ্যে বিভিন্ন শিল্প তালুকে অবস্থাটা প্রায় একই রকম। চা শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে ন্যূনতম মজুরি পায়না। সরকার এব্যাপারে মালিকের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করে না।

গত কয়েক মাস ধরে শিল্প শ্রমিকরা বিহারের বারৌনি, গুজরাটের সুরাট এবং হরিয়ানার মানেসর ও পানিপথে, ন্যূনতম মজুরি, ওভারটাইম, উন্নত কাজের পরিবেশ ইত্যাদি দাবি নিয়ে আন্দোলন করছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ঐসব রাজ্যে নতুন শ্রম আইন ‘শ্রমকোড’ চালুর পর প্রত্যাশার চেয়ে কম মজুরি বৃদ্ধির কারণেই এই অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়, বিশেষকরে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-মার্কিন চলমান সংঘাতের মধ্যে রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের কালোবাজারি দামের তীব্র বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকদের দুর্ভোগ ও অসন্তোষ আরও বেড়েছে।

শ্রমিক বিক্ষোভের মুখে সরকার শ্রমিকদের 'আইনলঙ্ঘনকারী,' 'অপরাধী' বলে চিহ্নিত করতে চেয়েছে। উত্তরপ্রদেশের শ্রমমন্ত্রী এই বিক্ষোভকে 'পাকিস্তানের ষড়যন্ত্র' এবং আন্দোলনে নকশালদের হাত আছে বলে অভিহিত করেছে। যখন শাসকশ্রেণি দেশের শ্রমজীবীদের অর্থনৈতিক সুরাহা ও জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারেনা, তখন সেই প্রশ্নকে উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে রূপান্তরিত করে। আন্দোলনরত শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণের পরিবর্তে তাদের “পাকিস্তানি এজেন্ট” বা “বহিরাগত প্রভাবিত” বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা সরকারের এই ধারাবাহিকতার অংশ। যাতে দেশের অন্য অংশের শ্রমজীবীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করা এবং তাদের আন্দোলনের মধ্যে বিভাজিকা তৈরি করা যায়। এগুলো শাসকশ্রেণির পুরোন কৌশল। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার বিজেপি ও তাদের শাসিত রাজ্য সরকারগুলি এই পদ্ধতি বারবার ব্যবহার করে আসছে। তবে এত কিছুর পর নয়ডার শ্রমিক আন্দোলন সরকার ধর্মের নামে বিভাজন করতে পারে নি। বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদের সংকট শ্রমিকশ্রেনীর উপর চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে নয়ডার শ্রমিক আন্দোলন এখন শ্রম ও পুঁজির দ্বন্দ্বে প্রধান হয়ে ওঠেছে। শ্রমিকশ্রেণী ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের শ্রমশক্তি দিয়ে পুঁজির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় শ্রমজীবীদের আন্দোলনে এইদিকটি এখন প্রধান হয়ে ওঠছে।

কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষার অভাবে কর্মীদের জীবনের ঝুঁকি কোন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে, তার প্রমাণ সম্প্রতি ছত্তীসগঢ়ে কর্পোরেট বেদান্ত কোম্পানির তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বয়লার বিস্ফোরণে কুড়ি জনেরও বেশি শ্রমিকের মৃত্যু। সব ধরনের কল-কারখানার নিরাপত্তা নিয়মিত পরিদর্শনের কথা শ্রম আধিকারিকদের। এ বিষয়ে নতুন শ্রমআইন শ্রমকোড ক্রমশ নমনীয় হয়েছে, প্রয়োগ আরও শিথিল হয়েছে। ফলে বৃহৎ রাসায়নিক, শিল্প, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কারখানা, সর্বত্র শ্রমিক বিপন্ন। জল জমি জঙ্গল পাহাড় কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেবার বিরুদ্ধে লড়াই চলছে। সম্প্রতি ওড়িশায় সিজলামালি পাহাড় বেদান্ত কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিবাদে হাজার হাজার জনজাতি মানুষ তীব্র বিক্ষোভ দেখিয়েছেন ও গ্রেফতার হয়েছেন।

নয়ডা শ্রমিক আন্দোলন কোনো শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়নের নেতৃত্বে হয়নি। ফলে হাজার হাজার শ্রমিক স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নামলেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অভাবে আন্দোলন সঠিক পথে পরিচালিত হতে পারেনি। ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় যে শ্রমিক আন্দোলনগুলো চলছে এখন দরকার একটি সংগ্রামী ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে সেগুলো ঐক্যবদ্ধ করা, নেতৃত্ব দেওয়া ও সঠিক পথে পরিচালনা করা। আজকের উত্তর ভারতের শ্রমিক আন্দোলন যে অন্য ইঙ্গিত বয়ে আনবে না কে বলতে পারে? রাস্তায় বেরোলেই তো রাস্তার সন্ধান পাওয়া যায়। 

 

লেখক গণ আন্দোলনের কর্মী।

0 Comments

Post Comment