পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

জনতা কার্ফু এবং সামাজিক দূরত্ব

  • 22 March, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 592 view(s)
  • লিখেছেন : সুমন সেনগুপ্ত
যে সময়টাতে সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন বিজ্ঞান চর্চার এবং কুসংস্কার এবং অপবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে কথা বলার এবং এই বার্তাটি আসার কথা ছিল খোদ প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সেটা যখন আসেনি তখন কি এটা ধরে নিতে হবে উনিও মনে মনে এটা বিশ্বাস করেন যে এভাবে একদিন বন্ধ বা জনতা কার্ফু করে এবং শাঁখ কাঁসর ঘণ্টা বাজিয়ে এই রোগের জীবাণুকে মেরে ফেলা যায়? যদি সেটা সত্যি হয় তাহলে এটা মানতে হবে যে ভারতবাসী আগামী দিনে সমূহ বিপদে পড়তে চলেছে।

 

এই মুহূর্তে সারা পৃথিবীর অবস্থা ভয়াবহ। রোজ মানুষ মারা যাচ্ছেন, এক ভাইরাস সংক্রমণে। কি সেই ভাইরাস তা এখন সোশ্যাল মিডিয়া বিস্ফোরণের যুগে আর নতুন করে বলার কিছু নেই। সবাই সব জানেন। সঙ্গে এও নিশ্চিত জানেন যে কত ডিগ্রি তাপমাত্রায় এই ভাইরাস বাঁচে? রোদে ১৫ মিনিট দাঁড়ালে এই ভাইরাস নাকি মারা যায় কারণ দেশের কোনও এক মন্ত্রী বলে দিয়েছেন। মানুষের জানার ক্ষেত্রে ইদানীং একটা সুবিধা হয়েছে কোনও বই পড়তে হয়না। কোনও বিজ্ঞান জানতে হয় না এমনকি ডাক্তারিও জানতে হয় না। কারণ মানুষের হাতে এখন একটি অমোঘ অস্ত্র এসে গেছে যার নাম স্মার্টফোন। সেই স্মার্টফোন এবং সেই সংক্রান্ত যা যা জিনিস আছে তা দিয়ে মানুষ এখন সত্যিই ‘ কর লো দুনিয়া মুঠঠি মে’। তাই বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থা কি তা জানতে হয় না, ইউনেস্কো কিসের  জন্য তৈরি হয়েছে তা জানতে হয় না।

এক শ্রেণীর মানুষের হাতে এখন পয়সা চলে এসেছে, আগেও ছিল কিন্তু ইদানীং দেখে মনে হচ্ছে সমাজে বৈষম্য কিঞ্চিৎ বেড়েছে বই কমেনি। আগে যারা কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা ভ্রমণ করতেন তাঁদের অনেকেই ইদানীং বিদেশে যান। তা যেতেই পারেন। কিন্তু তাঁর আচরণ নিশ্চিত একজন সাধারণ সেই অর্থে অশিক্ষিত মানুষের মতন হবার কথা নয়। তাঁদের নিশ্চিত জানা উচিৎ কিভাবে এই রোগ ছড়ায় এবং কিভাবে একটা নয়, বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোতে কিভাবে একের পর এক মানুষ মারা যাচ্ছেন। তা সত্ত্বেও তাঁরা জেনে অথবা না জেনে কেন নিজে থেকে নিজেদের বন্দী পরিভাষায় যাকে আইসোলেশনে রাখলেন না? ও কিছু হবে না ভেবে কেন কোনও সামাজিক নিয়ম মানলেন না? তাহলে এই আচরণকে কি বলা উচিৎ? পরোয়া না  করা? নাকি অজ্ঞানতা? নাকি জেনে বুঝে অন্যের ক্ষতি করা?

ধরে নেওয়া যাক শেষটা কেউ ইচ্ছে করে করবেন না, কিন্তু আজকের সময়ে এই অজ্ঞানতা তো হবার কথা নয়। এখন তো প্রতিটি মানুষ অত্যন্ত সুবিদিত সুতরাং তাহলে কি পরোয়া না করা? নাকি আরও কিছু আছে? আসলে এখন যারা মূলত বিদেশ থেকে আসছেন তাঁদের অনেকেই কোনও না কোনও ভাবে হয়তো এই ভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছেন কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা নিজে থেকে নিজেদের শারীরিক দূরত্ব সমাজের থেকে কেন মেনে নিতে পারছেন না? কোথাও কি তাঁদের অপরাধবোধ কাজ করছে? না? তাহলে ? এঁদের মধ্যে  অনেকেই হয়তো ভাবছেন যে সামাজিক ভাবে হয়তো বাতিল হয়ে যেতে পারেন তাই হয়তো এই নিজে থেকে দূরত্ব বজায়কে তাঁরা শাস্তি হিসেবে ভাবছেন। তাহলে আমাদের মতো দেশে যেখানে এখনও ছুত-অচ্ছুৎ মানা হয়, আমাদের মতো দেশে যেখানে এখনও বাড়িতে ভিন্ন ধর্মের মানুষদের প্রবেশ নিয়ে নিষেধাজ্ঞা আছে, যেখানে এখনও একজন মানুষ যদি তিনি মুসলমান হন, তাঁর জন্য আলাদা বাসন এবং জলের গ্লাসের বন্দোবস্ত আছে বিভিন্ন বাড়িতে সেখানে একজন মানুষের পক্ষে কি এই নিয়ম মেনে চলা সম্ভব? ঠিক সেই জায়গা থেকেই এই নিয়ম না মানার বিষয়টি আসছে। কোনও মানুষই আসলে ভাবতে চাইছেন না তিনি রুগী কিন্তু এটা জানাটা যে খুব জরুরী যে কোনও একজন ভাইরাস আক্রান্ত মানুষই কিন্তু শুধুমাত্র এই রোগের বাহক নন, যেকোনো  আপাত সুস্থ মানুষ হয়তো এই রোগ নিয়ে ঘুরছেন, জেনে অথবা না জেনে। সুতরাং এই মুহূর্তে উচিৎ সমস্ত কিছু অবিলম্বে বন্ধ করা অন্তত ৭ দিনের জন্য না শুধুমাত্র ১ দিনের জন্য প্রতীকী নয়।

অনেকে বলা শুরু করেছেন যে ১ দিন বন্ধ করলে এই জীবাণু সংক্রমণ কমবে। হ্যাঁ, কমবে, ১ দিনের জন্য। কিন্তু এই মুহূর্তে কোনও বৈজ্ঞানিক তথ্য পাওয়া যায় নি যা দিয়ে এটা প্রমাণ করা যায় শধুমাত্র ১৪ ঘণ্টা বন্ধ রাখলে এই জীবাণু সংক্রমণ কমে। এই কথাটা কেউ কেউ বলছেন কিন্তু এটার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তাহলে প্রধানমন্ত্রী কেন বলেছেন ১ দিনের জন্য? এর পিছনেও একটা কারণ আছে। তিনি জানেন যে রবিবার দিন ছুটির দিন, কোনও কোনও সরকারী দপ্তরে অলিখিত ছুটি চালু হলেও বেশ কিছু বেসরকারি সংস্থা আজও খোলা। তাদেরকেও ১ দিনের জন্য এই আন্দোলনে সামিল করানো যাবে। কিন্তু উনি যেটা বুঝছেন না এতে কোনও সরকারী বেসরকারি নেই, মানুষ যদি নিয়ম করে রোজ অফিসে, আদালতে যাতায়াত করেন এবং যে কোনও সরকারী, বেসরকারি বাহনে যাতায়াত করেন তাহলে এই রোগের সংক্রমণ কোনও ভাবেই ঠেকানো সম্ভব নয়। তাই অবিলম্বে যা প্রয়োজন তা হল অন্তত ৭ দিন সম্পূর্ণ সব কিছু বন্ধ করতে হবে। এতে অনেক মানুষের অসুবিধা হবে হয়তো প্রথমিক ভাবে কিন্তু ভবিষ্যতে যদি ভারতবাসীকে বাঁচতে হয় আর কোনও অন্য উপায় নেই। সরকারের তরফ থেকে সমস্ত মানুষের কাছে খাবার পৌঁছনোর ব্যবস্থা করেই এটা করতে হবে। এর কোনও অন্যথা নেই।

সমস্যা আরও বেশ কিছু জায়গায় হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী না বললেও তাঁর হয়ে বলার মানুষের অভাব নেই। প্রধানমন্ত্রী হয়তো স্পেন বা ইটালির ভিডিও দেখেছেন যেখানে সবাই আওয়াজ করে জরুরী পরিষেবা যারা দিচ্ছেন তাঁদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করার যে চেষ্টা তা দেখেছেন কিন্তু ভারতে এখনও যা পরিস্থিতি বেশীরভাগ মানুষ হয় বিদেশ থেকে এই সংক্রমণ নিয়ে এসেছেন অথবা তাঁদের সংস্পর্শে এসেছেন। কিন্তু এর পরের ধাপটি ভয়ঙ্কর যেখানে সম্প্রদায় থেকে রোগের উদাহরণ আসতে থাকবে। কোনও রকম বিদেশ যাত্রা বা সেই সংক্রান্ত কোনও সংস্পর্শের ঘটনা না থাকলেও এই রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে। এই বাড়াটা এত দ্রুত হারে ঘটবে যে তখন কিন্তু ভারতের মতো জন ঘনত্বের দেশে প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ আক্রান্ত হয়ে পড়বেন,আর আমাদের যা সাস্থ্য পরিষেবার হাল তাতে সেই এক তৃতীয়াংশ মানুষকে চিকিৎসা দেওয়ার মতো পরিকাঠামো আদৌ আছে কি? যদি না থাকে সেদিন কিন্তু এই হাততালি বা ঘণ্টা বাজানোর লোকও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের তর্জমা কিভাবে হচ্ছে তা যদি উনি নিজে জানতেন তাহলে বোধহয় এই ধরনের কথা বলতেন না। কেউ কেউ ভাবছেন প্রধানমন্ত্রী সর্বশক্তিমান এবং তিনি কোনও কিছু একটা করবেন যার মধ্যে দিয়ে করোনা সংক্রমণ বন্ধ হবে। অনেকে ভাবছেন যে ওই আওয়াজে যে শব্দ তরঙ্গ তৈরি হবে তাতে করোনা জীবাণু চলে যাবে। অনেকে সেই রকম কিছু অপবিজ্ঞানের প্রচার ও করে চলেছেন। অনেকে ভাবছেন বাড়ির সমস্ত বাসনপত্র ধুয়ে মুছে তারপর সেগুলো বাজালে বুঝি এই ভাইরাস দূরে চলে যাবে। এর আগেই অনেকে বলছিলেন যে গোমূত্র খেলে এই রোগ থেকে মুক্তি হবে, কিংবা রোদে ১৫ মিনিট দাঁড়ালে আর এই রোগ হবে না।

যে সময়টাতে সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন বিজ্ঞান চর্চার এবং কুসংস্কার এবং অপবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে কথা বলার এবং এই বার্তাটি আসার কথা ছিল খোদ প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সেটা যখন আসেনি তখন কি এটা ধরে নিতে হবে উনিও মনে মনে এটা বিশ্বাস করেন যে এভাবে একদিন বন্ধ বা জনতা কার্ফু করে এবং শাঁখ কাঁসর ঘণ্টা বাজিয়ে এই রোগের জীবাণুকে মেরে ফেলা যায়? যদি সেটা সত্যি হয় তাহলে এটা মানতে হবে যে ভারতবাসী আগামী দিনে সমূহ বিপদে পড়তে চলেছে।

 

 

0 Comments

Post Comment