পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

বলির পাঁঠা (নিরামিষ রান্না)

  • 29 April, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 187 view(s)
  • লিখেছেন : শামিম আহমেদ
হরিচরণের কথা অনুযায়ী, পাঁঠা ‘বলদ মহিষ বকরা’ যা খুশি হতে পারে। তবে মাথায় রাখবেন এই নিরামিষ রান্নায় মানুষের মাংস নিলে চলবে না। বলদ, মোষ, পাঁঠা বা খাসিই নিতে হবে। কেন? মানুষ হল সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব, তারা ভদ্র, রাজনৈতিক ও অর্থবান প্রাণী। বলির পাঁঠা বলে যাদের উল্লেখ করা হল তারা হল ইতর প্রাণী। তাদের অর্থ বা বিত্ত নেই। তাদের জীবন অর্থহীন বা তাৎপর্যহীন।

 

 

৭ই অক্টোবর

আজ পুনরায় আমার রেসিপিটা বদলে দিলাম। কারণ আমার আগের রান্নাগুলো নিজের কাছেই বেশ বিচ্ছিরি। আমার তৈরি করা পদ যারাই খেয়েছে তারাই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বুর্জোয়াতন্ত্রে পৌঁছনোর লক্ষ্যে, আমি চোখের উপর দুটো ডিমভাজি নিয়ে প্যারির রাস্তায় ঘণ্টা খানেক হেঁটে বেড়ালুম।  কামুকে বেছে নিয়ে তার কাছে দৌড়ে গেলুম। সে আমাকে “বেচারা গবেট” বলে খিস্তি করল আর বলল, “বাড়ি যা আর আমার মুখ ধুয়ে ফেল।” রেগেমেগে আমি তার কোলে এক বাটি ঝোল উলটে দিলাম। সে বেজায় খেপে গেল, কাগজে জড়ানো একটি স্ট্র তুলে তার একদিক ছিঁড়ে ফেলল ও ফুঁ দিতে লাগল, তার পর করল কী, সোজ্জা আমার চোখে। “ওহ, তুই বাঁড়া!” আমি চীৎকার করে উঠলাম। সঙ্গে সঙ্গে লাফ মেরে, চোখ চেপে ধরে তাকে গালিগালাজ করতে করতে পালালাম।

                                                                            --জাঁ পল সার্ত্র            

 

‘বলির পাঁঠা’ বলতে শুধু পাঁঠা (পাঁটা)-কে বুঝলে চলবে না। ‘পাঁঠার মাংস’ বলতে যা বুঝি, তা কিন্তু সব সময় পাঁঠার হয় না; খাসি (অণ্ডকোষহীন পাঁঠা) বা মাদি ছাগলেরও হয়। আসল পাঁঠার একটা বোঁটকা গন্ধ থাকে, অনেকেই খেতে চান না। আবার যাঁরা পছন্দ করেন তাঁরা বলেন, ওটাই পাঁঠার মাংসের ডেলিকেসি। ধারেকাছে কোথাও জ্যান্ত পাঁঠা ঘুরে বেড়ালে তার শরীরের বদবু নাকে লাগে।

 

বলির পাঁঠার মাংস নিরামিষ রান্না করতে হয়। অবশ্য সকলে তা যে করেন তা নয়। মুসলমানদের কুরবানি (বলি)-র পাঁঠা আমিষ-নিরামিষ রান্না দুইই হতে পারে। অবশ্য যাঁরা বলি সমর্থন করেন না, তাঁরা কশাইয়ের কাছ থেকে মাংস কিনে নেবেন। তবে এই মাংস বলদ-মোষ-বকরার হলেও কোনও অসুবিধে নেই। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর কালজয়ী শব্দকোষে বলছেন, পাঁটা (-ঠা) মানে জোয়ান—বলদ মহিষ বকরা। তার পর জানাচ্ছেন, পাঁঠা হল ছাগলের পুংশাবক, পাঁঠার মাংস বা মাংসের ব্যঞ্জন, মূর্খ (গালি অর্থে)। পণ নিয়ে পুত্রের বিয়ে দিলে তাকে পাঁঠা-বেচা বলে।

 

বলির পাঁঠা। ‘বলি’ মানে দেয় (given), পূজোপহার, ভুতযজ্ঞ (মনু)। সাত চিরজীবীর অন্যতম হলেন বলি। অন্ধ ঋষি দীর্ঘতমা (যিনি গোধর্ম শিক্ষা করে যত্রতত্র সঙ্গম করে বেড়াতেন বলে তাঁর স্ত্রী প্রদ্বেষী ও পুত্ররা তাঁকে ভেলায় ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। রাজা বলি তাঁকে উদ্ধার করে বাড়ি নিয়ে যান। বলির স্ত্রী সুদেষ্ণার গর্ভে  দীর্ঘতমা মুনি অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, সুহ্ম, পুণ্ড্র নামের পাঁচ পুত্রের জন্ম দেন। বলির মেজ ছেলে (ক্ষেত্রজ) বঙ্গ আমাদের আদি রাজা। 

          

হরিচরণের কথা অনুযায়ী, পাঁঠা ‘বলদ মহিষ বকরা’ যা খুশি হতে পারে। তবে মাথায় রাখবেন এই নিরামিষ রান্নায় মানুষের মাংস নিলে চলবে না। বলদ, মোষ, পাঁঠা বা খাসিই নিতে হবে। কেন? মানুষ হল সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব, তারা ভদ্র, রাজনৈতিক ও অর্থবান প্রাণী। বলির পাঁঠা বলে যাদের উল্লেখ করা হল তারা হল ইতর প্রাণী। তাদের অর্থ বা বিত্ত নেই। তাদের জীবন অর্থহীন বা তাৎপর্যহীন। রাস্তায় বা গোয়ালে তাদের বাস। দূর দেশে যেতে বা সেখান থেকে আসতে গেলে তাদের হাঁটিয়ে কিংবা কপাল ভাল হলে ট্রাকে গাদাগাদি করে নিয়ে যাওয়া হয়। তারা কখনও এরোপ্লেনে করে স্বগৃহে ফেরে না। তাদের আসলে গৃহই নেই। কোনও ইতর প্রাণী খাবার মজুত করে না, তাদের গুদাম নেই, ব্যাঙ্কে টাকা নেই, সঙ্গী বা সঙ্গিনীকে তারা দামি উপহার দেয় না। গাড়ি-প্রাসাদ কিছুই নেই তাদের। খিদের জ্বালায় অন্যের জমানো খাবার বা ফসল খেয়ে ফেললে কয়েদখানা বা খোঁয়াড়ে ঠাঁই হয়। তাদের পাচার করা হয় এক দেশ থেকে অন্য দেশে। বলির পাঁঠা হিসাবেই।

 

আপনি যদি বলি-কুরবানি সমর্থন না করেন তাহলে কশাইয়ের কাছ থেকে মাংস কিনবেন। আপনাকে জবাই করতে হবে না, কশাই সেই কাজ সুনিপুণভাবে করে দেয়। চাইলে সেইই মাংস বঁটি বা কিমা করে দেবে। সেই মাংস তেল-নুন ও অন্যান্য মশলা দিয়ে জমিয়ে খাওয়া যায়। মনে রাখবেন, বলির মাংস নিরামিষ হয়। পেঁয়াজ-রসুন পড়বে না। পেঁয়াজ ফারসি শব্দ। সংস্কৃত নাম পলাণ্ডু।  রসুন তার জাতভাই।    

বলির পাঁঠার যে রেসিপি, তার প্রধান মশলা হল ধনে বা ধনিয়া। The Big Four-এ ধনিয়া হল শূদ্র মশলা। সে সর্বহারা, শোষিত, নির্যাতিত, উৎপীড়িত। কেন? বলছি। বহু জায়গায় দেখবেন পেঁয়াজ ভেজে তাতে টম্যাটো দিয়ে একটা রান্না হয়। মশলা হিসাবে দেওয়া হয় জিরে, ধনে, হলুদ, লঙ্কা। রান্নার শরিয়তে এটাকে ব্লাসফেমি বলে। জিরে ও ধনে এক জায়গায় থাকতে পারে না। জিরে হল বৈশ্য। জিরে ধনেকে গ্রাস করে নেয়, ধনেও মরার আগে বৈশ্যকে খতম করে। They kill each other। তাই তাদের একত্রবাস সম্ভব নয়। অতএব বলির পাঁঠায় জিরে বাদ, কিন্তু লঙ্কা থাকবে। সে বীর সেনানী। তবে তাকেও কায়দা করে রাখতে হবে এই রান্নায়। লঙ্কাকে সশরীরে নেওয়া যাবে না। শুধু তার বলবীর্য নির্যাসটুকু নিতে হবে, রক্ষা করতে হবে ব্যঞ্জন নামক রাষ্ট্রকে। কেমন করে, সে প্রসঙ্গে আসা যাবে। ব্রাহ্মণ হলুদ এই রান্নায় ব্রাত্য। সে বুদ্ধিজীবী, বৈশ্য ও ক্ষত্রিয়ের বশীভূত। তার সঙ্গে বলির পাঁঠার কোনও পিরিত নেই।

ধনিয়া বা ধনের ইতিহাস বহু পুরনো । প্রি-পটারি যুগের ফিলিস্তিনে একটি নিওলেথিক সাইটে ধনের সন্ধান মিলেছে। সাত হাজার বছর খ্রিস্টপূর্বের। গ্রিক কমেডি The Knights (by Aristophanes)-এ ধনিয়ার উল্লেখ আছে। কমেডি ছাড়া ধর্মসাহিত্যে (Book of Exodus)-ও শূদ্র ধনিয়া বহাল তবিয়তে রয়েছে। ধনিয়া নাকি স্বর্গীয়! তাই মিশরে এই মশলার কদর ছিল খুব।  বালক রাজা তুতানখামেনের কবরে পনেরোটি (১৪-টি বা ১৬-টি নয়) ধনিয়া পাওয়া যায়। আমাদের দেশও পিছিয়ে নেই ধনের দৌড়ে। কালা ধন বাইরে থেকে না আনতে পারলেও ধনিয়া আমদানি করেছে প্রাচীন ভারত। পাণিনি তাঁর অষ্টাধ্যায়ী-তে ধনেকে ‘কুস্তুম্বুরু’ বলেছেন। মনিয়ের উইলিয়মসের অভিধানেও এই শব্দ আছে। চরক বলছেন, জ্বরের চিকিৎসায় কুস্তুম্বুরু ব্যবহারের কথা। মহাভারতের সভাপর্বে (অধ্যায় ১০) কুস্তুম্বুরুর কথা আছে। সেখানে অবশ্য সে কুবেরের ভৃত্য। কুবের হলেন কুৎসিত দর্শন—ধনসম্পদের দেবতা (লক্ষ্মী সমৃদ্ধি ও ঐশ্বর্যের দেবী)। কুবেরের বাহন ‘মানুষ’, যেমন কুম্ভকার বা ধোপার গাধা। কুবের ‘মানুষ’-কে দিয়ে তাঁর সম্পদ বহন করান, যে সম্পদে ‘মানুষ’-এর অধিকার নেই। ‘ধনিয়া’-র অর্থ হল ধন্য। আর ‘কুস্তুম্বুরু’-র উপসর্গ ‘কু’ হল খারাপ, নীচ। এর ধাতু ‘তুবি’ মানে বহু হওয়া, বলশালী হওয়া। প্রত্যয় ‘উরু’ হল জোড়া বা নিবদ্ধ, সঙ্ঘবদ্ধ। নীচ ছোটলোকেরা বহু ও বলশালী, তাদের সঙ্ঘবদ্ধ করো।

কুস্তুম্বুরু বা ধনিয়া বলির পাঁঠার প্রধান মশলা। আর যা যা লাগবে—

 

বলির পাঁঠা ৫০০ গ্রাম

দুধ—১০০ মিলি

শুকনো লাল লঙ্কা—১০-টি

জায়ফল, জয়িত্রী ও জাফরান--১/২ চামচ

ঘি—৫০ গ্রাম

আদা—১ বড় চামচ

খোবানি কিংবা বাদাম—১০/১২টা

নুন—দরকার মতো

গরম মশলা, ১/২ ছোটো চামচ

 

প্রণালী—

সকাল সকাল বলি দিন। অল্প আলো আঁধারি থাকলে ভাল। বলির পরে যখন মাংস ছাড়ানো হবে, তখন রান্নাঘরে দুধ গরম ফুটিয়ে তাতে লঙ্কা ডুবিয়ে দিন, সঙ্গে দিন জায়ফল, জয়িত্রী ও জাফরান। চলে আসুন বলির আঙিনায়। তখনও চামড়া ছাড়ানো হয়নি। দেরি হবে। ততক্ষণ লঙ্কা ইত্যাদি ভিজুক দুধে।

মাংস নিয়ে রান্নাঘরে ফিরে প্রথমে দুধটা ছেঁকে নিন। ছাঁকা দুধ রক্ত রঙের হবে। এই বার মাংস ওই রক্ত রঙের দুধে মানে ভবরসে ইয়ানকাও (soak) করতে দিন। আধ ঘন্টা রেখে দিতে হবে। সেই অবসরে বাদাম ও আদা বেটে নিন। 

এই বার উনুনে কড়াই, কড়াইয়ে ঘি। তপ্ত ঘিয়ে আদা রসুনের পেস্ট বাঘার করুন। হালকা বাদামি হলে মাংস মিশিয়ে দিন। সামান্য উলুতপ্লুত করার পর ধনে ও নুন দিন। উলুতপ্লুত করতে থাকুন। ঘি মাংস থেকে ছাড়তে শুরু করলে অল্প গরম জল মেশাতে পারেন, যদি ঝোলওয়ালা মাংস চান। এই বার প্রেশার কুকারে চাপিয়ে দিন। একটা হুইসেল দেওয়ার পর উনুন বন্ধ করে দিন। মিনিট পনেরো পর আবার উনুন জ্বেলে (সিমারে রেখে) একটা সিটি পড়তে দিন। এই ভাবে মোট চার খানা সিটি দেওয়ার পর বলির পাঁঠা প্রস্তুত।

এই বার মাংস পরিবেশন করুন। খাওয়ার সময় মাথায় রাখবেন, মাংসেরও মন্ আছে। সে আবার কী? ‘মাংস’ শব্দের root হল ‘মন্’। ‘মন্’ মানে বোধ, সম্ভাবন, সম্মান।

#রান্না

 

 

 

0 Comments

Post Comment