পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

মোদী ও যোগীরা ভারতের ভাষার ইতিহাসকে মুছে দিতে চাইছে

  • 27 April, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 387 view(s)
  • লিখেছেন : সুজাত ভদ্র
প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃক উবাচ নির্দিষ্ট শব্দটি -- ইশতেহার - নিয়ে দুচার কথা বলা যাক। পবিত্র সরকার তাঁর নিবন্ধে ইশতেহার শব্দটি সম্পর্কে একটিমাত্র বাক্য ব্যবহার করেছেন: "... তাঁর গুরু, যাঁকে তিনি আদর করে ' বঙ্কিমদা' বলেন, তিনিই ১৮৯২ নাগাদ সংস্কৃত 'বিজ্ঞাপন' কথাটার জায়গায় 'ইশতিহার' কথাটা ব্যবহার করতে সুপারিশ করে গিয়েছেন লেখায়।" তাহলে আজ মোদী ও যোগীদের ভারতের ভাষার ইতিহাস মুছে দেওয়ার উদ্দেশ্য কী?

"To be right-wing all  you have to do is be proud of your own ignorance." 

 

কথা গুলো লেখিকা মেরি শেলী আদৌ বলেছিলেন কিনা তা নিয়ে সংশয়, বিতর্ক আছে। তবে মানতেই হবে, যিনিই বলুন না কেন,  কথাগুলো নির্মম সত্য । বাস্তবে সেটা তো "নতুন ভারতে " আমরা রোজই কম বেশি দেখছি। গত ৬ এপ্রিল আবার আমরা মুখোমুখি হলাম এক নিদারুণ অভিজ্ঞতার ।
 
আমাদের দেশের নাগরিক হিসেবে তৃতীয় স্থানাধিকারী ব্যক্তিত্ব, 'entire'  রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিষয়ের উপর যিনি স্নাতকোত্তর স্তরে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ, তিনি ৬ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গে এক নির্বাচনী সভায় তোপ দাগলেন। প্রসঙ্গ টেনে বলেন, তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি যুক্ত ঘোষণা পত্রটির নামকরণটিই বাংলা ভাষার প্রতি অবমাননার একটি  জ্বলন্ত উদাহরণ (এবং  অনুচ্চ ইঙ্গিত = তাই মুসলিম    সম্প্রদায়ের প্রতি " তোষণবাদের" পরিচায়ক)। প্রমাণ হিসেবে বলেন এই দলটি 'ইশতেহার/ইস্তেহার'  শব্দটি ব্যবহার করেছে। তাঁর মতে, এই শব্দটি উর্দু শব্দ এবং এর ব্যবহারের ফলে বাংলা ভাষার গৌরব নষ্ট করে দিয়েছে এই রাজ্যের শাসক দলটি।
 
প্রধানমন্ত্রীর বাকি নির্বাচনী বক্তব্য আমাদের আলোচ্য প্রসঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানান তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে শিক্ষা মন্ত্রী; বলেন, এই শব্দটি উর্দু নয়, আরবী। তারপর বিষয়টি আর এগোয় নি। 'বঙ্কিমদার' ভাইও আর বলেননি ব্রাত্যজনদের যে, আরে ভাইয়া, মানছি, আমার  মুখ ফসকে উর্দু বেরিয়ে গেছে। কিন্তু আরবী  শব্দটি  তো আরও বিশুদ্ধ মুসলমানি শব্দ।  আপনাদের উত্তর আমার অভিযোগটাকেই -- তুষ্টিবাদের -- আরো মজবুত করছে। বাংলা ভাষার এত দৈন্য  ঘটেছে যে, তাকে বিদেশি আরবী/ উর্দু  শব্দ ব্যবহার করতে হবে? আমরা ক্ষমতায় এলে বাংলা ভাষাকে অনুপ্রবেশকারী বিদেশি শব্দমুক্ত " সুনার বংলা" করে দেবো।
 
সাভারকার, আরএসএস, অধুনালুপ্ত জনসংঘ, বিজেপির কট্টর উর্দু ভাষার বিরোধিতার ব্যাপার জানা ছিল। তা নিয়ে আমাদের সংক্ষিপ্ত লেখাও ছিল। এই নিবন্ধে পরে আমরা তা নিয়ে আলোচনাও করেছি। কিন্তু  বাংলা ভাষায় কোন "বিদেশি শব্দটি  অনুপ্রবেশ/কোনটিই বা শরণার্থী" তা নিয়ে তেমন কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না।  
 
ভাষাতত্ত্ব জগতের পরিচিত নাম, অধ্যাপক  পবিত্র সরকার 'মান্নীয়' প্রধানমন্ত্রীর 'শুদ্ধ'  বাংলা নিয়ে আক্ষেপ বিষয়ে আমাদের একটি মনোজ্ঞ উত্তর সম্পাদকীয় নিবন্ধ উপহার দিয়েছেন [ দ্র সংবাদ প্রতিদিন, ২১ এপ্রিল, ২০২৬, পৃ ৪]।
 
এই আলোচ্য নিবন্ধের  লেখক ভাষাতত্ত্ব জগতের লোক না হয়েও, বেশ কিছুটা "অনধিকার চর্চার" বা মূর্খতার তকমা পাওয়ার ঝুঁকি নিয়েই ('বঙ্কিমদা'র  ভাইয়ের সৌজন্যে জাগরিত) কৌতুহল মেটানোর নিমিত্তে  বাংলা ভাষার বিবর্তনমূলক ইতিহাস ও  কিছু প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যামূলক অভিধান নাড়াচাড়া  করেছে।
 
প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃক উবাচ নির্দিষ্ট শব্দটি -- ইশতেহার - নিয়ে দুচার কথা  বলা যাক। পবিত্র সরকার তাঁর প্রাগুক্ত  নিবন্ধে ইশতেহার  শব্দটি সম্পর্কে  একটিমাত্র বাক্য ব্যবহার করেছেন: "... তাঁর গুরু, যাঁকে তিনি আদর করে ' বঙ্কিমদা' বলেন, তিনিই ১৮৯২  নাগাদ সংস্কৃত 'বিজ্ঞাপন'  কথাটার জায়গায় 'ইশতিহার' কথাটা ব্যবহার করতে সুপারিশ করে গিয়েছেন লেখায়।" মোক্ষম দৃষ্টান্ত। আর কোনো নিদর্শনের দরকার পড়ে না। তবু যেহেতু  "ইশতেহার" শব্দটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে  সাধারণ্যে খুবই পরিচিত শব্দ  হওয়া সত্ত্বেও এর প্রয়োগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর আপত্তি আলোড়িত হয়েছে, সেহেতু আরও কিছু উদাহরণ দিয়ে দেখানো সম্ভব শব্দটি বঙ্গীয় শব্দকোষের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শব্দটির অর্থ বহুবিধ:  বিজ্ঞাপন,বিজ্ঞপ্তি, বিজ্ঞপ্তিপত্র, নোটিশ, প্রচারপত্র।
 
১। কালী প্রসন্ন সিংহের হুতোম প্যাঁচার নকশা - র ( রচনা কাল:১৮৬১) এক জায়গায় উল্লেখ আছে: " ম্যাজিস্ট্রেট ইডেনের ইস্তাহারে... রোগ সারতে পারেন।" উদাহরণ
২। অষ্টাদশ শতাব্দীতে  খুবই বিখ্যাত  ক্যালকাতা গেজেট ( ১৭৮৭)- এ  লেখা হয়েছিল: "সকল লোককে ইস্তহার দেওয়া হয়েছিল।"
৩। জোনাথন ডানকান লিখছেন: "ব্যবস্থাপক সাহেব ইহার ইস্তহারনামা বাংলা ও পারসির অক্ষর লিখিয়া...প্রকাশ্য স্থানে টানাইবেন।"(১৭৮৪)।
৪। সমাচার দর্পণ - এ শব্দটির   অসংখ্যবার ব্যবহৃত নিদর্শন থেকে একটিমাত্র উদাহরণ (১৮৩৩ সালের) এখানে  উল্লেখ করা হল : ' ইঙ্গলণ্ডীয় সম্বাদ পত্রে তৎপত্রের ইশতেহার প্রকাশ হয়।'
৫। আপাতত সর্বশেষ উদাহরণটি বিদ্যাসাগর থেকে দেওয়া যেতে পারে: 'ইস্তাহার দ্বারা ... হুকুম দেওয়া যাইবেক।' (১৮৯১)।

উগ্র ভণ্ড হিন্দুত্ববাদী তথা নির্বাচনের প্রাক্কালে লোক দেখানো বাংলাভাষা প্রেমীরা সচেতন ভাবেই বুঝতে  চাইবেন না যে, সব ভাষার মতোই বাংলা ভাষাতে নানা বিদেশি ভাষার শব্দাবলী অন্তর্ভুক্তি স্বাভাবিক নিয়মেই এসেছে এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।  অজ্ঞানী বিকারগ্রস্ত হয়ে বাংলা ভাষা থেকে আরবী - ফার্ সী- তুর্কী - হিন্দী - উর্দু শব্দাবলী  ছেঁটে ফেলতে চান ।সেটা সম্ভব?
           
এই বিষয়ক অভিধান রচয়িতারা বলছেন, বাংলা ভাষায় প্রাগুক্ত পাঁচটি ভাষার শব্দ সংখ্যা কয়েক হাজার। ২০০৪ সালে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত অভিধানের সংকলক ও সম্পাদক কাজী রফিকুল হক তাঁর সংকলনে ' মোট ৩৩৫৯ টি  একক আরবি - ফার্ সী - তুর্কী - হিন্দী - উর্দু শব্দ  সংগ্রহ ' করেছেন [পৃ উনিশ]। তিনি ড: মুহম্মদ শহীদুল্লাহ - এর  "বাংলা সাহিত্যের কথা"( ১৯৬৫) গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, এমনকি সতের দশকের প্রথম দিকে কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্য চরিতামৃত কাব্যেও হিন্দী - উর্দু ভাষার কয়েকটি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছিল:
"গ্রাম সম্বন্ধে চক্রবর্তী মোর হয় চাচা।
.... ......
নীলাম্বর চক্রবর্তী হয় তোমার নানা।"
 
এক কথায়, চাচা, চাচি, নানি, মামু, মামি, দাদা, দাদী, ভাবী ইত্যাদি আত্মীয়তা বাচক শব্দ গুলো হিন্দী - উর্দু জাত। আবার, হিন্দু - মুসলিম সমাজে  অনেক পদবী/ উপাধি আছে, যা আরবী - ফারসী - তুর্কী  জাত। যেমন, শাহ পদবী ফারসী শব্দ; মজুমদার শব্দ আরবী - ফারসী জাত। প্রধান মন্ত্রীর তো তাহলে প্রথমেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত বাবু  ও শিক্ষার প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত বাবুকে পদবী/ উপাধি ত্যাগ করতে বলা উচিত ছিল। আপনি আচরি ধর্ম পরেরে শিখাও।  
 
তবে, শুধু উগ্র মুসলিম বিদ্বেষী মোদী - শাহ রা নন, বিজেপি - আরএসএস নয়। অতীতে  অনেকেই চেষ্টা করেছেন বাংলা ভাষায় শুধু খাঁটি সংস্কৃত শব্দ প্রয়োগের। পারেন নি, কারণ সম্ভব ছিল না, আজও নেই। পরম শ্রদ্বেয়  পণ্ডিত প্রবর হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘ  আটাশ বছর ধরে  যে সুবিশাল অভিধান রচনা করেছিলেন(  খণ্ডশ: বঙ্গীয় ১৩৪০- ১৩৫৩), তাতে তিনি সংস্কৃত ছাড়াও আরবী, ফারসী, ইংরাজী, পর্তুগীজ প্রভৃতি ভাষার বাংলায় প্রচলিত ও প্রয়োগযোগ্য শব্দ সমূহকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। যেমন, অতি প্রচলিত শব্দ: ইস্তাফা। আরবী শব্দ। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখায় আছে, "এখানে ইস্তাফা তবে, যা হবার তা হ'য়ে গেল।"। বা, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত বঙ্গ সাহিত্য পরিচয় - এ বলা হয়েছিল," ইস্তাফা পত্রমিদং " (পৃ ৩৫৮)। তেমনি, আরবী  শব্দ, ইস্তমাল - কে  অভ্যাস, অনুশীলন, প্রয়োগ অর্থে  তাঁর শব্দকোষে স্থান দিয়েছিলেন (তদেব)।
 
ছেঁটে ফেলা তো দূর স্থান,  এগুলোর ব্যবহার আজ বাংলা ভাষায় অনিবার্য। বঙ্গাব্দ ১৩২১ ( ইং ১৯১৪-  ১৯১৫) সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকায়  শ্রী হরপ্রসাদ শাস্ত্রী  লিখছেন:
"...সাত শত বৎসর মুসলমানদের সহিত একত্রে বাস করিয়া বাঙ্গলা মুসলমান হইতে অনেক জিনিস লইয়া ফেলিয়াছে। সে সব  জিনিস বাঙ্গলার হাড়ে মাসে জড়িত হইয়াছে। এখন তাহাকে বাহির করিয়া দিবার চেষ্টা কিছুতেই সফল হইবে না।..."
এই নিবন্ধের একটু পরের অংশে লিখছেন,...আমাদের বাঙ্গলার বিভক্তি 'রা' ও 'দের' মুসলমানদের কাছ হইতে লওয়া।... যে সকল শব্দ একবারে আপামর সাধারণের ভিতর চলিয়া গিয়াছে, লিখিবার সময় সেগুলি তাঁহারা ব্যবহার করিবেন না। ..."।
ভারত রাষ্ট্রের সরকারী ভাষা হলো হিন্দী। তার  থেকে উর্দু শব্দ বাছাই করে প্রধানমন্ত্রী বাদ দিতে পারবেন? স্বয়ং মোদীর ২০১৪ সালের ক্ষমতায় আসার আগে স্লোগান কি ছিল: Abki Baar, Modi Sarkaar!। সরকার  ফারসি উর্দু শব্দ। পরের বারও সেই স্লোগান: 'ফির এক বার ,মোদী সরকার'। বিমুদ্রাকরণের পর্বে মোদীর বিখ্যাত উক্তিটি স্মরণ করুন: "হাম তো ফকির আদমি..."; ফকির তো আরবী শব্দ; আদমি  তো ফারসি শব্দ। ঝোলা উর্দু শব্দ।
 
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে ২০২৫ সালের ১৮সেপ্টেম্বরে। মহারাষ্ট্রের থানে অঞ্চলের বাসিন্দা, জনৈক বিজেপি কর্মী , এস. কে. শ্রীবাস্তব  কেন্দ্রীয় সরকারের  তথ্য সংস্কৃতি দপ্তরে (CPGRAMS  পোর্টাল -এর মাধ্যমে) চিঠি লিখে দাবি করেন,  আজ তক, এবিপি হিন্দী নিউজ, টিভি ১৮, জি  নিউজ প্রভৃতি তাদের হিন্দী  খবরে ৩০% উর্দু শব্দ ব্যবহার করে ; তাঁর  তাই দাবি, উর্দু শব্দ বর্জন করে বিশুদ্ধ হিন্দী শব্দ দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করার জন্য সরকারি আদেশ  দেওয়ার।
 
একটিমাত্র চিঠির ভিত্তিতেই ওই দপ্তর এই সমস্ত চ্যানেলে ১৮ সেপ্টেম্বর একটি আদেশনামা  পাঠায়।  সেই বিজ্ঞপ্তির  প্রতিলিপি  'দ্য ওয়ার'  পায় ও তারা সেটি প্রকাশ করে দেখায়, বিজ্ঞপ্তিতে যে  পাঁচটি লাইন  আছে, তার মধ্যে পাঁচ- ছয়টি শব্দই ফারসি, আরবী  এবং উর্দু![ দ্র শাহাদাত খানের নিবন্ধ, The Wire, October, 20, 2025]।
 
অর্থাৎ, বাংলা ভাষার মতোই হিন্দী ভাষা থেকে উর্দু কে বিচ্ছিন্ন করা যায় না; অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই তো মহাত্মা গান্ধী তাঁর সময়ে এই বিতর্কের প্রশ্নে মতামত দিয়েছিলেন; বলেছিলেন এই দুই ভাষার মিশ্রণ ঐতিহাসিক ভাবে বাস্তব ; নাম দেওয়া উচিত হিন্দুস্থানী। ২০২৫ সালে ১৬ এপ্রিল, অর্থাৎ মাত্র একবছর আগে  আরএসএস লোকদের করা  এক মামলার রায়ে সুপ্রীম কোর্ট   জানিয়ে দিয়েছিলেন,  মারাঠী ভাষার মতোই উর্দু একই ভাবে সম মর্যাদার ভাষা এবং সংবিধানের  অষ্টম শিডিউল এর অন্তর্গত। বিচারপতি সুধাংশু ধুলিয়া এবং বিনোদ চন্দ্রন - এর পর্যবেক্ষণ ছিল এইরকম: "It is a misconception that Urdu  is alien to India."
 
মোদীদের মার্গ প্রদর্শক অটল বিহারী বাজপেয়ী  ১৯৯৯ সালের ২৮ মার্চ লখনউ তে একটি সভায় বলেন, Urdu batware ki bhasa nahin hai" ( অর্থাৎ কোনো একটি সম্প্রদায়ের ভাষা উর্দু নয়); আরও বলেন, উর্দু একটি জাতীয় ভাষা এবং তার মর্যাদাকে রক্ষা  করতেই হবে। এটা বোধহয় মুখোশের বাণী।
 
কারণ  বাজপেয়ীর জনসংঘ ১৯৫৪ সালে তাদের ইশতেহারে বলেছিল,জনসংঘ " ইংরাজী বা উর্দু ভাষাকে ভারতীয় ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত নয়"।
এখনকার বিজেপি নেতা যোগী কুৎসিত ও ঘৃণা - বিদ্বেষের ভাষা ব্যবহার করে বলেন , উর্দু হচ্ছে "কাঠমুল্লা" দের ভাষা।
রালফ রাসেল এর লেখার পর লেখা, মেগান ইটন রব এর গবেষণা, সি এম নঈম এর প্রবন্ধ সংকলন,
ফ্রেন্সেসকা ওরসিনি এর গবেষণা গ্রন্থ দেখিয়েছে, আঠারো শতকে উর্দু গদ্য ' হিন্দী ' নামে, এবং হিন্দী -উর্দু কবিতা 'রিখতা' নামে পরিচিত ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উর্দু  কবি, মীর বলতেন, তাঁর কবিতার ভাষা  উর্দু নয়, রিখতা, সংমিশ্রিত ভাষা।
 
একটা সময় ছিল, যখন উর্দু ভাষা জ্ঞান হিন্দু উচ্চবিত্তের সাধারণ শিক্ষার অংশ ছিল। বহু উর্দু সংবাদপত্র  হিন্দুরা প্রকাশ করত; যেমন, কানপুরের জামানাহ ( zamanah) সম্পাদনা করতেন মুন্সী দয়া নারায়ণ নিগম; বেরিলির shua সম্পাদনা করতেন রাজা বাহাদুর। উভয়েই হিন্দু কায়স্থ ছিলেন।আগ্রার মুসাফির সম্পাদনা করতেন পণ্ডিত তারা দাত (dat)। আর এস এস - বিজেপির মুসলিম ঘৃণা বিদ্বেষ মূলক উর্দু ভাষা বিরোধী প্রচারের উপযুক্ত জবাব দিয়েছেন অধ্যাপিকা Rakhshanda Jalil; তিনি ২০২৫ সালে সম্পাদনা ও অনুবাদ করেন  অ- মুসলমান  উর্দু লেখকের গল্পসমূহের : শিরোনাম :Whose Urdu is it anyway?
 
ইতিহাস বলছে, স্বাধীনতার আগে পরে মুসলিম ঘৃণা বিদ্বেষ কারীরা (সাভারকার) [এনার উর্দু বিদ্বেষী  বিবৃতিগুলোর জন্য দ্র Historic  Statements, pp. 106- 108] থেকে শুরু করে  হিন্দু  মহাসভা, আর এস এসরা) চেষ্টা করেছে উর্দু ভাষাকে ভারতের ইতিহাস ও সংস্কৃতি থেকে মুছে দিতে। তখন নেহরুরা সেই অপচেষ্টা রুখে দিয়েছিলেন । আজও মোদী - যোগীরা সেই চেষ্টা করছে। কিন্তু আজও বাস্তব,  ভারতে উর্দু অন্যতম একটি  আবশ্যিক মাধ্যম, হিন্দী ভাষার পাশাপাশি; এবং ভারতের কোটি কোটি মানুষ ( যারা মুসলিম নন) হিন্দী - উর্দু মিশ্রিত ভাষায় কথা বলেন। ১৯৭২ সালে উর্দু সংক্রান্ত বিষয়ে আই কে গুজরাল কমিটি  ১৪০ প্যারায় যে কয়েকটি সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন তা আজও  সমানভাবে প্রাসঙ্গিক: যেমন,  বিপুল জনপ্রিয় হিন্দী চলচ্চিত্র কে  সমভাবে উর্দু চলচ্চিত্রও বলা যেতে পারে।  দুটো ভাষারই চমৎকার মিশ্রণ এই জগতে পরিস্ফুট। 
 
টাইমস অফ ইন্ডিয়া ( ২৫ এপ্রিল) তে প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে,  ২৪ এপ্রিল জম্মু - কাশ্মীরের লেফট গভর্নর  এক আদেশ জানিয়েছে, এবার থেকে রাজস্ব বিভাগের নিয়োগে উর্দু ভাষা জ্ঞান আবশ্যিক নয়, ঐচ্ছিক। আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলেরা প্রতিবাদ জানিয়েছে। তাহলে এই উক্ত যুক্তির নিরিখে হিন্দী বলয়ে হিন্দী ভাষাকেও সরকারি ক্ষেত্রে আবশ্যিক না করে  ঐচ্ছিক করা উচিত।
ভারত রাষ্ট্রে আজ ক্ষমতাসীন প্রধান দল মুসলিম তথা অন্য  সংখ্যালঘু , দলিত সম্প্রদায়ের প্রতি  ঘৃণা বিদ্বেষ  পোষণ করে। তাদের সমস্ত চিহ্ন কে মুছে দিতে চায়। বলপূর্বক  মনুবাদ  চাপিয়ে দিতে চায়। তার একটা নিশানা  ভাষা। শত শত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও, আর এস এসের ঘৃণা  উৎপাদনকারী পাঠশালাগুলোতে শেখানো হয়, উর্দু ইসলামের ভাষা , বিদেশি মুসলমানদের ভাষা। তাই বিকারগ্রস্ত দের মতো আক্রমণ করো। এই পাঠশালার মহান ছাত্র ছিলেন একদা প্রচারক , বর্তমানের  প্রধান মন্ত্রী, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী। তাই, তারই সর্বশেষ উদাহরণ পশ্চিমবঙ্গে  মোদীর আলোচ্য বক্তৃতা, জম্মু কাশ্মীরে সরকারী  প্রাগুক্ত  আদেশনামা।
 
 
 
 
 
0 Comments

Post Comment