চারপাশে গাছপালা আর টেলিফোন টাওয়ারগুলো ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে, —একটা শান্ত অথচ জীবন্ত মুহূর্ত। এই ধরনের মফস্বল এলাকায় সকালে নদীর ধারে হাঁটতে গেলে হালকা ধোঁয়া আর ভেজা মাটির গন্ধ মিশে থাকে বাতাসে। মানুষজন তখনও ঘুম থেকে উঠছে, চা দোকানে ধোঁয়া উঠছে, আর দূরে ট্রেনের হুইসেল শোনা যায়। এইরকইমই এক পরিবেশে মোবাসসের সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন ঘাটের ধারে—চুপচাপ, একা। তাঁর মুখে সেই প্রশান্তি, যা জীবনে চাওয়া-পাওয়া নিয়ে সন্তুষ্ট মানুষদের চোখে দেখা যায়।
সারাজীবন ইঁট‑বালি সাপ্লাই, মিস্ত্রীর তদারকি, আর হিসাব‑নিকাশে কেটেছে তাঁর দিন। শহরের বড় বড় বিল্ডিং উঠেছে তাঁর হাতের জোগানে, অথচ নিজের ঘরটা এখনও খুবই সাদামাঠা। ভাইয়েরা অনেক দূর এগিয়ে গেছে—কেউ জমির ব্যবসায়, কেউ সরকারি চাকরিতে। মোবাসসের সাহেব কখনও হিংসা করেননি; শুধু মনে মনে ভাবেন, “আমার কাজেও তো ইবাদত আছে।”
আর আছে তাঁর মেয়ে সকিনা। ছোটবেলায় সকিনা ছিল শান্ত, কৌতূহলী আর চোখে ছিল এক অদ্ভুত গভীরতা। গাল ছিল গোল, ত্বকে শিশিরের মতো কোমলতা। নীল পাড়ের শাড়ি পরে, ফুলে সাজানো চুলে তাকে দেখাতো যেন গ্রামের সকালবেলার শিশিরের মতো। তার চোখে ছিল বিস্ময়ের দীপ্তি—বড় বড় কালো চোখ যেন পৃথিবীর সবকিছু প্রথমবার দেখছে। বাবার ইঁট‑বালি ব্যবসা তখনও ছোট পরিসরে। সকিনা দেখত, বাবা ভোরে বেরিয়ে যান, মিস্ত্রিদের সঙ্গে কথা বলেন, আর সন্ধ্যায় ক্লান্ত মুখে ফিরে আসেন।
উমরাহ থেকে ফিরে এসে মসজিদের নতুন দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর সকাল শুরু হয় আজান দিয়ে। তারপর নদীর ধারে হাঁটতে বেরোন, যেখানে কুয়াশার ভেতর দিয়ে মসজিদের মিনার দেখা যায়। সেই দৃশ্যটা তাঁকে মনে করিয়ে দেয় মক্কাশরীফের সাদা প্রভা—যেখানে তিনি কয়েক মাস আগে দাঁড়িয়ে ছিলেন, চোখে জল নিয়ে।
মোবাসসের সাহেবের জীবনে যেন নতুন দায়িত্ব এসে পড়ল। মসজিদে নামাজ পড়তে আসা মানুষজন অনেকদিন ধরেই বলছিলেন—ছাদে ফাটল ধরেছে, জায়গা কম পড়ে যাচ্ছে, আর পুরনো দেওয়ালগুলোতে স্যাঁতসেঁতে জমে গেছে। অন্য কেউ এগিয়ে না আসায় তিনি নিজেই দায়িত্ব নিলেন।
ইঁট‑বালি‑লোহা‑লক্কড় থেকে শুরু করে মিস্ত্রি পর্যন্ত সবই তাঁর পরিচিত জগৎ। তাই কাজের তদারকি করতে তাঁর কোনও অসুবিধা হলো না। প্রতিদিন সকালে তিনি মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে মিস্ত্রিদের কাজ দেখতেন—কোথায় নতুন দেওয়াল উঠছে, কোথায় ছাদে লোহার রড বসানো হচ্ছে। তাঁর হাতের জোগানেই চলতে লাগল পুরো নির্মাণ।
মসজিদের কাজ এগোতে থাকলেও মোবাসসের সাহেবের পরিবারে নতুন দ্বন্দ্ব দেখা দিল। ভাইয়েরা কেউ জমির ব্যবসায়, কেউ চাকরিতে—তাদের চোখে মোবাসসের সাহেবের এই উদ্যোগটা যেন সময় নষ্ট। একদিন তাঁর স্ত্রীর সামনেই ছোটভাই বলে বসলো,
“চাঁদা তোলা, মিস্ত্রির খরচ দেখা—এসব করে কী হবে? নিজের ঘরটা আগে ঠিক করো।”
কৈশোরে সকিনার মুখে ফুটে উঠল পরিণতির লক্ষণ। চোখের দৃষ্টি গভীর হলো, ঠোঁটে এল হালকা আত্মবিশ্বাসের রেখা। তার মুখের গড়ন আরও স্পষ্ট, গালের হাড়ে সূক্ষ্ম ছায়া পড়তে শুরু করল। কৈশোরে সকিনা বুঝতে শুরু করল সংসারের টানাপোড়েন। মসজিদের দায়িত্ব নেওয়ার পর বাবার সময় কমে গেল ঘরে। মসজিদের কাজের জন্য চাঁদা তোলা, মালপত্র সরবরাহ—সবকিছু সে দেখত গর্বের চোখে। সে বাবার কাজ বুঝতে শুরু করল—ইঁট‑বালি‑মিস্ত্রির জগৎ তার কাছে হয়ে উঠল এক বাস্তব জীবনের পাঠশালা। মা মাঝে মাঝে বলতেন,
“তোর বাবা এখন সমাজের কাজেই মগ্ন।”
সকিনা চুপ করে শুনত, কিন্তু তার মনে হতো—বাবা যা করছেন, তা ঠিকই করছেন। মসজিদের দায়িত্ব নিয়ে বাবার ব্যস্ততা সে দেখত মুগ্ধ হয়ে, যদিও মাঝে মাঝে সংসারে মা‑এর অভিযোগ শুনে মনটা ভারী হয়ে যেত।
কিন্তু মোবাসসের সাহেবের মনে ছিল অন্য কথা। চাঁদা তোলার কাজও তিনি উৎসাহ নিয়ে শুরু করলেন। বাজারে গিয়ে দোকানদারদের সঙ্গে কথা বললেন, পাড়ার মানুষদের কাছে গেলেন। কেউ তাঁকে অবহেলা করত, কেউ সরাসরি বিরোধিতা করত। তাতেও না দমে গিয়ে তিনি বলতে লাগলেন, "মসজিদ শুধু নামাজের জায়গা নয়, সমাজের কেন্দ্র।"
যারা ছাদে ফাটল, জায়গা না ধরা নিয়ে নালিশ করতো তাদেরকেই বেশি করে ধরলেন। ধীরে ধীরে কিছু কিছু করে মানুষের আস্থা বাড়তে থাকলে মসজিদের কাজ এগোতে লাগল।
এরকম সময়েই বাস ধরার জন্য এক চায়ের দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল এক যুবতী। মুখের গড়ন তীক্ষ্ণ, ঠোঁটে হালকা হাসি—যা আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। কপালের টিপ আর সামান্য কিছু গয়নার ঝলক তার সৌন্দর্যকে রাজকীয় করে তোলে। তার চোখে এখন চিন্তার ছায়া, কিন্তু সেই সঙ্গে আছে দৃঢ়তা। সে যৌবনে এক পরিণত, সংযত নারী হয়ে ওঠা সকিনা। তার কানে এল কিছু মানুষ চায়ের দোকানে বসে বলে চলেছে,
“মোবাসসের সাহেব মসজিদের নামে টাকা কামাচ্ছেন।”
“দেখেছো, মসজিদের নামে ব্যবসা করছে।”
কেউ আবার ফিসফিস করে বলছে,
“চাঁদার টাকায় নিজের পকেট ভরছে।”
সকিনা প্রথমে রাগে কেঁপে উঠল, পরে ধীরে ধীরে বুঝে নিল, মানুষ সবসময় সত্য দেখে না। পরে শান্তভাবে মনে মনে বলে, “মানুষের কথা নয়, কাজই প্রমাণ।”
সে ঘরে ফিরে বাবাকে বলেছিল,
“তুমি কাজটা শেষ কর, মানুষ একদিন বুঝবে।”
মোবাসসের সাহেব শুধু হাসলেন—
“বাবা-মেয়ে দুজনেই বিশ্বাসে বাঁচি।”
আসলে মোবাসসের সাহেবের কাছে আগে থেকেই সব খবর পৌঁছেছিল। মসজিদের কাজ যত এগোতে লাগল, ততই সমাজে নতুন নতুন কথা ছড়াতে শুরু করল। যেসব মানুষ এতদিন কোনও দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসেনি, তারাই এখন রটাতে লাগল—মোবাসসের সাহেব নাকি ঠিকাদারির দায়িত্ব নিয়ে দু’পয়সা কামাচ্ছেন।
সত্যিই, ইঁট‑বালি থেকে মিস্ত্রি পর্যন্ত সবকিছু তাঁর সরবরাহ থেকেই আসছিল। এতে তাঁর লাভ হচ্ছিল, কিন্তু সেটা অন্য কাউকে দিলে তারাও টাকা নিত। তবু ঈর্ষান্বিত লোকেরা বিষয়টাকে অন্যভাবে দেখাতে চাইছিল।
এইসব রটনা মোবাসসের সাহেবকে কষ্ট দিত। তিনি জানতেন, তাঁর উদ্দেশ্য পরিষ্কার—মসজিদকে নতুন করে গড়ে তোলা। কিন্তু সমাজে সবসময়ই কিছু মানুষ থাকে যারা অন্যের সাফল্যে খোঁচা দিতে চায়।
মসজিদের কাজ শেষ হওয়ার দিনটা যেন গোটা পাড়ার জন্য উৎসব হয়ে উঠল। নতুন ছাদ, মসৃণ দেওয়াল, প্রশস্ত নামাজঘর—সবকিছু দেখে মানুষজন অবাক হয়ে গেল। মোবাসসের সাহেব প্রতিদিনের মতোই কাজের তদারকি করলেন, মিস্ত্রিদের সঙ্গে বসে হিসাব মিলালেন। সেই হিসেব জনসাধারণের সামনে পাইপয়সা মিলিয়েই রাখলেন।
সত্যি বলতে, ইঁট‑বালি‑লোহা সরবরাহ থেকে তাঁর কিছু লাভ হয়েছিল। কিন্তু সেটা তিনি লুকালেন না। তাঁর যুক্তি ছিল সহজ—“যে কাজই করি, তার বিনিময়ে কিছু পাওয়া স্বাভাবিক। তবে মসজিদের দায়িত্ব আমার ব্যক্তিগত ব্যবসার সঙ্গে মিশে যাবে না।”
মসজিদের কাজ শেষ হলো, আর সেই লাভের টাকায় সকিনার বিয়ে হলো। শ্বশুরবাড়ি চলে যাওয়ার দিন সকিনা মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল—যে মসজিদে তার বাবার ঘাম, গুজব, আর গর্ব মিশে আছে।
কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পর তিনি এক অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত নিলেন। মসজিদের দায়িত্ব ছেড়ে দিলেন। সমাজের মানুষ প্রথমে অবাক হলো—যে মানুষ এত উৎসাহ নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন, তিনি কেন দায়িত্ব ছাড়ছেন? কিন্তু মোবাসসের সাহেব শান্তভাবে বললেন,
“আমি আমার দায়িত্ব শেষ করেছি। এখন মসজিদ সমাজের, আমি শুধু একজন সাধারণ মুসল্লি।”
মসজিদের কাজ শেষ হওয়ার পর দায়িত্ব চলে গেল সেই মহলের হাতে, যারা একসময় গুজব ছড়াত। তারা বড় বড় হুজুরকে আমন্ত্রণ জানাতে লাগল ওয়াজের জন্য। মোবাসসের সাহেবের হাতে সাজানো মসজিদের ভেতরে প্রতিদিন জ্ঞানগর্ভ আলোচনা চলতে থাকল—কেউ কোরআনের তাফসির করলেন, কেউ সমাজের সমস্যার সমাধান নিয়ে কথা বললেন। মসজিদের ভেতর আলো‑ছায়ার মতো মানুষের ভিড় জমতে লাগল, যেন নতুন প্রাণ ফিরে পেল এই জায়গা। আর সকিনা দূর থেকে শুনে মনে মনে বলে—
“এই মসজিদে আমার বাবার হাতের ছোঁয়া আছে।”
কিন্তু মোবাসসের সাহেব তখন আর দায়িত্বে নেই। মেয়ের বিয়ে দিয়ে তিনি যেন নিজের জীবনের বড় দায়িত্বও শেষ করেছেন। এখন তাঁর দিন কাটে নিস্তরঙ্গভাবে—সকালে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়েন, তারপর নদীর ধারে হাঁটেন, কখনও বাজারে যান। সমাজের ভেতরে তাঁর অবদান অমলিন থাকলেও তিনি নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। রাত নেমে এলেই তো সুর্যের কাজ ফুরিয়ে যায় না। সে খুঁজে নেয় অন্য এক আকাশকে।